বৃহস্পতিবার ১৬ আগস্ট, ২০১৮, ১ ভাদ্র, ১৪২৫, ৪ জিলহজ্জ, ১৪৩৯

21st February

অভিযানে খুশি সাধারণ মানুষ, তবে…?

জুন ৪, ২০১৮ | ১:৩৬ অপরাহ্ণ

সরকার প্রধান থেকে অফিসের পিয়ন, রাজধানীয় থেকে অজ পাড়াগাঁ সবখানেই এখন আলোচনার শীর্ষে চলমান মাদকবিরোধী অভিযান। আর কক্সবাজারের কমিশনার একরামের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার স্ত্রী ও সন্তানের আর্তনাদের অডিও এখন তো সারা বাংলাদেশর বুকেই যেন অশ্রু হয়ে ঝরছে। চলমান মাদকবিরোধী অভিযানের সামনে একটা বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে এ ঘটনা।

সম্প্রতি আমার গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলাম। নিজের এলাকায় যখন যাই একজন সাংবাদিক হিসেবে তখন এলাকার অনেক মানুষ আমার কাছে আসেন। আমিও তাদের কাছে যাই। আমার কাছে তারা অনেক বিষয়ে জানতে চায়, আমিও জানতে চাই এলাকার বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে। এবার যাওয়ার পর সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল চলমান মাদকবিরোধী অভিযান। এরমধ্যেই একজন একটি অভিযোগ জানালেন। যদিও এই ধরনের অভিযোগ অন্য সময়েও পাওয়া যায় কিন্তু বর্তমানে যেহেতু  একটি বিশেষ পরিস্থিতি চলছে তাই অভিযোগটি মনোযোগ দিয়ে বিস্তারিত শুনলাম।

একজন জানালো, তার এক বন্ধুকে র‌্যাব চেক করার জন্য ধরেছে। তাকে দুই-তিনবার করে পুরো দেহ তল্লাশি করেছে। ‍কিছু পায়নি। তারপরও তাকে আটকে রাখল। মিনিট দশেক পর আবার একজন সদস্য এসে জানায়, তোর দেহ ভালো করে তল্লাশি করা হয়নি। আবার চেক। এবার তার কোমরে মিলে গেল তিন পিস ইয়াবা। ব্যস আর যায় কোথায়? সঙ্গে সঙ্গে মামলা, ছয় মাসের জেল। অভিযুক্তের দাবি, তার দেহে র‌্যাব ‍নিজেই ইয়াবা গুঁজে দিয়ে আবার খুঁজে বের করেছে।

অন্য সময়ও অনেকে এই ধরনের ঘটনার শিকার হন। আমি জানতে চাইলাম, ওই ছেলেটি আগে মাদকের ব্যবসা করত কি না, আগে কোনো মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল কি না? এ প্রশ্নে তারা জানায় আগে একটা গ্রুপের সঙ্গে সে চলত যাদের চলাফেরা যথেষ্ট সন্দেহজনক ছিল। বললাম, তাহলে আগেই এই ছেলেটির নাম আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকায় ছিল। সেই কারণেই তাকে যেই প্রক্রিয়াতেই হোক ধরা হয়েছে।

এবার বসে কথা হচ্ছিল গ্রামের চায়ের দোকানে। জানতে চাইলাম এলাকার অবস্থা কী? সবাই জানালেন ঠাণ্ডা। বললাম, কেমন ঠাণ্ডা? বলল, নেশাখোররা কেউ আর প্রকাশ্যে নাই। জানতে চাইলাম কোথায় গেছে? সবাই বলল, কে জানে এখন কই থাকে কেউ বলতে পারে না। অথচ এই নেশাখোরদের দাপটে এলাকার লোকজন তটস্থ থাকত। তারাই যেন পুরো এলাকার সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। কিন্তু মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর পর থেকে তারা আর প্রকাশ্যে নেই। ক্রসফায়ারে ওই এলাকায় এক নারীসহ দুজন মারা গেছে বলে তারাই জানাল। জানতে চাইলাম তারা আসল, না সাধারণ মানুষ? বললো জেনুইন মাদক ব্যবসায়ী। এইসব ক্রসফায়ার নিয়ে তাদের বরং খুশিই মনে হলো।

সাধারণ মানুষ এখন অনেক সচেতন। তারা দুনিয়ার অনেক কিছুর খোঁজ-খবর রখেন। তাদেরকে বললাম, এভাবে মানুষ মারা তো কোনো সমাধান না। আর এটা মানবাধিকারেরও লঙ্ঘন। তাদের উল্টো প্রশ্ন, যখন একজন নেশাখোরের কারণে দশজন মানুষ বিপদে থাকে, একটা পরিবারের ঘুম-হারাম হয়ে যায়, মান সম্মান থাকেনা তখন মানবাধিকার দিয়ে তারা কী করবেন?

বোধ করি এটাই মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে সাধারণ মানুষের ভাবনা। উপরের দুটি ঘটনা খুব পরিস্কার ইঙ্গিত দেয় প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীদের ধরলে সাধারণ মানুষের কোনো আপত্তি তো নেই বরং তারা খুশি হন। কিন্তু এ অভিযানের নামে কেউ যেন হয়নরানির শিকার না হন। কোনো নিরীহ মানুষকে যেন হয়রানি করা না হয় সেটি তাদের দাবি।

 প্রসঙ্গক্রমে আরেকটি বিষয় পাঠকদের সাথে শেয়ার না করে পারছি না। আমি যেখন ঢাকায় ফিরছিলাম,তখন বাসের ভেতর খেয়াল করলাম কেউ তাদের লাগেজ ও সাধারণ বড় ব্যাগগুলো বাসের বক্সে দিতে চাইছেন না।  বাসের ভেতরে বড় লাগেজ দেখে জিজ্ঞেস করলাম, এতবড় ব্যাগ কেন বাসের ভেতরে তুলেছেন? বললো ভাই, রাস্তায় চেকিং হয়, তাই ভয় লাগে যদি কেউ ব্যাগে কিছু ঢুকিয়ে দিয়ে ফাঁসিয়ে দেয় তাহলে কী করব। তার ইঙ্গিতটা বুঝতে পারলাম। আর কথা বাড়ালাম না। সত্যি কথা বলতে কী আমার ভেতরেও এই ভয়টা কাজ করে।

মানুষের সঙ্গে কথা বলতে বলতে এই যে অভিজ্ঞতা তা আমার কাছে খুবই বাস্তব বলে মনে হয়েছে। কারণ একরামের ঘটনার অডিও ফাঁস হওয়ার পর পুরো অভিযানটিই কিন্তু এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে। যদিও আসল মাদক ব্যবসায়ীদের শাস্তিই চান সাধারণ মানুষ। সে কারণে ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমগুলোতে অভিযান শুরুর পর থেকে কাউকেই বলতে শোনা যায়নি মাদক ব্যবসায়ীদের এভাবে মারবেন না। সবার কথা একটাই কোন নিরপরাধ মানুষ যেন ঘটনার শিকার না হন। আর মাদকের গডফাদারদের রেখে শুধু খুচরা ব্যবসায়ীদেরই যেন ক্রসফায়ার দেওয়া না হয়। সেক্ষেত্রে  কক্সবাজারের আলাচিত এমপি আব্দুর রহমান বদির নামটি সবার আলোচনাতেই আসছে। অর্থাৎ সধারণ মানুষের ধারণায় দেশের সবচেযে বড় মাদক তথা ইয়াবা ব্যবসায়ী হলেন বদি। সাধারণ মানুষের এই পারসেপশন ভুল প্রমাণ করা দায়িত্ব এখন বদির নিজের এবং সরকারের। এই পারসেপশনটা ভুল প্রমাণিত না করতে পারলে অথবা বদির মত আলোচিতদের শাস্তির আওতায় আনতে না পারলে প্রশ্ন উঠতেই থাকবে।

গত এক দশক ধরে উচ্চ আদালত বিটে কাজ করতে করতে আর অসংখ্য বড় বড় মামলার কাভার করতে গিয়ে আইনজীবীদের যে উপস্থাপনা আদালতে দেখেছি তাতে দুনিয়ার কোনো আইনই বলে না যে দশজন অপরাধীকে ধরতে গিয়ে একজন নিরীহ মানুষকে শাস্তি দেওয়া যাবে বা দশজনের বিচার করতে গিয়ে একজনতে ভুলক্রমে শাস্তি দেওয়া যাবে।

একরাম হত্যার ঘটনার পর সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক ও প্রভাবশালী মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘এ ধরনের অভিযানে দুই-একটা ভুল হতেই পারে।’ এই ধরনের মন্তব্য খুবই আপত্তিকর। কোনোভাবেই নেওয়ার মতো না।

শেষ করব আমার এলাকার ইউপি চেয়ারম্যানের একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে। আমার কাছে তার প্রশ্ন ছিল আপনি এই ধরনের ক্রসফায়ারে সমর্থন করেন কি না? একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে ক্রসফাযারে হত্যা সমর্থন করা যায় না। কিন্তু আমাদের বিচার ব্যবস্থা ও  সামাজিক বাস্তবতার কারণেই মানুষ এটাকে সাধুবাদ জানাচ্ছে। সেই বাস্তবতাটা বুঝাতে হাইকোর্টেরে একটি মন্তব্য আপনাদের জানাতে চাই।

বেসিক ব্যাংক ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় রাষ্ট্রের সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাত হয়ে গেল। কিন্তু এই ঘটনায় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের একজনকেও আসামি করা হলো না।

হাইকোর্ট ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, আজকে যদি একজন কৃষক ১০ হাজার ঋণ সময়মত পরিশোধ করতে না পারতো আপনারা তার কোমরে রশি বেঁধে ধরে নিযে আসতেন। অথচ রাষ্ট্রের এতবড় ক্ষতি যারা করল তাদের আসামি পর্যন্ত করলেন না। কথাগুলো বলেছেন, দুদকের তদন্ত কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে।

অর্থাৎ বর্তমান রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়ায় বিত্তশালীদের বিচার করে শাস্তি দেওয়া যে দুরূহ কাজ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সে কারণেই বোধ হয় ক্রসফায়ারের মত বিকল্প ব্যবস্থা। সেখানেও পিক অ্যান্ড চুজ।  কিন্তু এই বিকল্পে কী মিলবে স্থায়ী সমাধান কিংবা নিরাপদ সমাজের নিশ্চয়তা?

সাইদুল ইসলাম, সিনিয়র রিপোর্টার, জিটিভি

অভিযানে খুশি সাধারণ মানুষ, তবে…?
অভিযানে খুশি সাধারণ মানুষ, তবে…?