রবিবার ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ইং , ১২ ফাল্গুন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৭ জমাদিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

আউটসোর্সিংয়ে বাংলাদেশে মোটিভেশনটা অনেক বেশি

জানুয়ারি ২৩, ২০১৯ | ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ

আউটসোর্সিং। বাংলাদেশে ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে বিষয়টি। কিন্তু এখনও রয়েছে অনেক ধোঁয়াশা। কীভাবে ঘরে বসে একটামাত্র কম্পিউটার নিয়ে একজন মানুষ দেশ বিদেশের কাজ করে অর্থ উপার্জন করে আর চমৎকার জীবন যাপন করে? এমন প্রশ্ন এখনও আছে অনেকের মনে। অথচ ইন্টারনেট ব্যবহার করে দেশ বিদেশের কত কাজই করে ফেলা যায়, একা ঘরে বসে বা একটা অফিস নিয়ে। আর হচ্ছেও। সে কারণে বলা হচ্ছে- আউটসোর্সিং বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় খাত। বাংলাদেশের বিশাল জনসংখ্যা এবং অপ্রতুল কর্মসংস্থানের সমস্যায় আউটসোর্সিং হতে পারে একটি ভালো সমাধান। এই খাতটিকে উন্নয়নের বিষয়ে সরকারেরও রয়েছে নানান পরিকল্পনা। ২০২১ সালকে লক্ষ্য ধরে এ খাতে রপ্তানি আয় পাঁচশ কোটি ডলারে উন্নীত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে সরকার। প্রায় ২০ লক্ষ্য শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে এই শ্রম বাজারকে ধরার জন্য। আউটসোর্সিং-এর কর্মসংস্থানের বাজারটা এত বড় যে এই বাজারের ভবিষ্যত শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের কাজটাও একটা বড় ব্যবসার সুযোগ। এই সুযোগটাই নিচ্ছে দেশি বিদেশি প্রতিষ্ঠান। কোডারস ট্রাস্ট এমনই একটি প্রতিষ্ঠান। শুধু প্রশিক্ষণ না, নতুন এই বাজারের সুযোগ তুলে আনা, কাজের সঙ্গে কর্মীর সংযোগ করে দেয়া এবং আয় করা অর্থের নিরাপত্তা এই তিন প্রতিজ্ঞা নিয়ে কাজ করা নরওয়েভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানের শাখা আছে ভারতে, কেনিয়াতে এবং বাংলাদেশে। শুধু তাই না, বিশের প্রায় ২২টি দেশের শিক্ষার্থীরা আউটসোর্সিং বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করে তাদের কাছ থেকে। আউটসোর্সিং এর বিশাল বাজারে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের ভালো পারিশ্রমিক আয় করার মতো প্রশিক্ষিত করার চেষ্টা করা এই প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান কার্সটন হেলড সম্প্রতি ঘুরে গেলেন বাংলাদেশে। কর্মব্যস্ততার মাঝে সারাবাংলা.নেট’র সঙ্গে অংশ নেন সাক্ষাৎকার পর্বে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছে, সারাবাংলার অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর মাকসুদা আজীজ

বিশ্ব আউটসোর্সিং বাজারের বিশাল সমুদ্রে বাংলাদেশের সুযোগ, এদেশের আউটসোর্সিং বাজারের সংকট, তরুণদের সার্বিক অবস্থা নিয়ে কার্সটন হেলড কথা বলেন সারাবাংলার সঙ্গে। সে আলাপচারিতার কিছু অংশ থাকলো সারাবাংলার পাঠকদের জন্য।

সারাবাংলা: ফ্রিল্যান্সারদের প্রশিক্ষণ দেয়ার এই কাজটির করার কথা কেন ভাবলেন?
কার্সটন হেলড: আমার বাড়ি নরওয়েতে, সেখানে স্কুল শেষ করার পরে কাজ করার ভালো সুযোগ রয়েছে। আমাদের দেশে অনেক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান আছে। আমরা বিনিয়োগের নতুন সুযোগ খুঁজি। তো আমাদের মনে হয়েছে, শিক্ষায় বিনিয়োগ একটি ভালো সুযোগ। এর মধ্য দিয়ে মানুষের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা যায়। এখানে শিক্ষা বলতে দক্ষতার উন্নয়কে বোঝাচ্ছি- যেটা খুবই জরুরি। আর কোডারসট্রাস্টে আমরা ঠিক এ কাজটাই করি। সাধারণ মানুষকে শিক্ষিত করে তুলি। বিশেষভাবে দক্ষ করার চেষ্টা করি। তাদের পর্যবেক্ষণ করি, তাদের ফ্রিল্যান্সিং এর কাজকে একটা সিস্টেমের মধ্যে আনার চেষ্টা করি।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই কাজটা খুবই জরুরি। কারণ কর্মশক্তির দিক থেকে বাংলাদেশ দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় দেশ যেখানে ফ্রিল্যান্সিং খুব চলে। এখানকার মানুষের এই ক্ষেত্রে কাজ করার বিশাল সম্ভবনা আছে যা থেকে এখানকার মানুষ আয় করতে পারে। তো আমরাও এ সুযোগটা নিয়েছি এবং এখানে ব্যবসা করছি।

সারাবাংলা: তো এই মুহূর্তে আউটসোর্সিং-এর বিশ্ব বাজারের কী অবস্থা?
কার্সটন হেলড: এখানে এটা জানা খুবই জরুরি যে ফ্রিল্যান্সিং কাজের অনেকগুলো স্তর আছে। এখানে অনেকেই খুব নিচের দিকের স্তরে কাজ করছে। যেখানে খুব বেশি দক্ষতার প্রয়োজন নেই। কিন্তু তাদের একই কাজ বার বার করতে হয়। আবার বাজারটা খুব বিস্তৃতও। যে কেউ করতে পারে। ফলে আপনি একজন আইনজীবী বা আর্কিটেক্টকেও এই বাজারে পেয়ে যাবেন। তো সুযোগটা অনেক বড়। আপনি যে কোনো কাজে নিজেকে নিয়োগ করতে পারেন। সেটা হতে পারে কোডিং, হতে পারে প্রোগ্রামিং। এর মধ্যেই মানুষ ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করা শুরু করেছেন এবং তাদের আয়ও বাড়ছে। তাদের এখানে অভিজ্ঞতার লোকে নিজেকে উন্নত করার সুযোগ আছে। তবে আমাদের মূল কাজ কোডিং অংশে।

সারাবাংলা: আপনি বললেন বাংলাদেশ আউটসোর্সিং-এর বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশ কর্মীর দিক থেকে দ্বিতীয়, কিন্তু বাংলাদেশ এর কোন স্তরে রয়েছে?
কার্সটন হেলড: এটা খুবই ভালো প্রশ্ন, কারণ এখানে স্তরের উন্নয়ন সম্ভব। তবে এখানে বাংলাদেশের একটা বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে তাদের যোগাযোগ করার ধরণ। কোনো দেশের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করার পদ্ধতি জানার একমাত্র উপায় হচ্ছে তাদের সঙ্গে ব্যবসা করা। এ কারণে বাংলাদেশ অন্য দেশগুলোর চেয়ে কম আয় করতে পারছে। আবার এই ইন্ডাস্ট্রিটাও নবীন, তো যখন এখানে আরও লোক যোগ দিবে হয়তো আয়টা বাড়বে। একই সাথে কাজের খুঁতগুলো ধরা পরবে এবং এটা নিয়ে আলোচনা হবে।

সারাবাংলা: আপনি দুদিন ধরে বাংলাদেশে আছেন, এখানে আপনি ফ্রিল্যান্সারদের সঙ্গে কাজ করেছে, আপনার কী মনে হয় তারা কেমন করছে?
কার্সটন হেলড: আমার মনে হয়েছে লেখাপড়ার ভিত্তিটা এখানে ভালো, তাদের মোটিভেশন অনেক বেশি, অনেকেই এই কাজটা করতে খুব আগ্রহী, তারা অনেক বিনয়ীও। ফলে এ বাজারে ভালো কর্মী হওয়ার সব যোগ্যতা তাদের আছে।

কেউ যদি প্রথমবারের মতো এই কাজ করতে চায় এটা একটু জটিল, লেগে থাকার বিষয় আছে। এই স্বাধীন পেশার স্বাধীনভাবে ব্যবসা করার মতো ঝুঁকিও আছে। প্রথম পর্যায়ে এগুলো ভোগায়, তবে লেগে থাকতে হবে এবং নিজেকে উন্নত করতে হবে, এভাবেই সাফল্য আসবে।

সারাবাংলা: আপনি বললেন আমাদের ফ্রিল্যান্সাররা যথেষ্ট ভালো, অথচ আমরা এখনও কম আয় করছি, তাহলে আমাদের ঘাটতিটা কোথায়?
কার্সটন হেলড: কোডারস ট্রাস্ট আসলে এই ঘাটতিটাই পূরণের চেষ্টা করছে। কিন্তু দেখুন একটি কাজ যদি জার্মানিতে থাকে সেই কাজটা পাওয়ার সম্ভাবনা একজন জার্মানের বেশি থাকে। তাই একটা দেশের কাজ পেতে হলে সেই দেশের সংস্কৃতি বোঝা জরুরি। আমিও যখন কাজ করেছি আমি এটা বুঝতে পেরেছি তাই আমার সেসব দেশের সঙ্গে কাজ করা পরে সহজ হয়েছে।

সারাবাংলা: ঢাকায় কোডারস ট্রাস্টের তিনটা ক্যাম্পাস। সবখানেই কি সমান সুযোগ সুবিধা আছে?
কার্সটন হেলড: না আমাদের মূল ক্যাম্পাসেই আসলে সব সুযোগ সুবিধা আছে। আমরা মাত্র কিছুদিন আগে বাকি দুটো ক্যাম্পাস শুরু করেছি। যেহেতু ঢাকা শহরে চলাচল করা একটি কঠিন কাজ। আমরা নতুন দুটো ক্যাম্পাস শুরু করেছি। আমরা চেষ্টা করছি সেখানে অন্য সুযোগগুলোও তৈরি করার।

সারাবাংলা: এদেশে আপনারা ২০১৪ থেকে কাজ করছে, কী ধরণের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন?
কার্সটন হেলড: দেখুন এখানে নানা ধরণের চ্যালেঞ্জ আছে। যখন আপনারা নতুন কিছু করার চেষ্টা করবেন তখন সেটাকে স্থাপন করা একটু সমস্যাই, আমরা এখন সেগুলো কিছু কিছু কাটিয়ে উঠেছি। আমাদের এখন ভালো মেন্টর আছে যারা নিজেরাই এই কাজে অভিজ্ঞ, তারা শিক্ষার্থীদের ভালো মতো শিক্ষা দিচ্ছে। তবে শুরুতে আমাদের শিখানর পদ্ধতিটাই ধরতে ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। আমরা এরকম অনেকগুলো দেশেই কাজ করেছি। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা সবচেয়ে সফল। তাইয়া মরা শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চাই কীভাবে আমরা নিজেদের আরও উন্নত করতে পারব এবং সেভাবেই কাজ করি।

সারাবাংলা: কিন্তু বাংলাদেশের নিজস্ব কিছু সমস্যা আছে যেমন এখনও আমাদের দেশে পে-প্যাল আসেনি, আমাদের ব্যান্ডউইথের দাম বেশি, ইন্টারনেটের স্পিড কম।
কার্সটন হেলড: কিছু সমস্যা সিস্টেমের যা নিজে থেকেই সমাধান হবে। এমনও না যে সব সমস্যা আমরা সমাধানও করতে পারব। তবে আমাদের ইতিবাচক দিক হচ্ছে আমাদের মানুষ, ব্যাংকিং সিস্টেম এবং অন্য বিষয়গুলো এরমধ্যে সমাধান হবে বলে আশা করি, এরমধ্যে কিছু সফটওয়ার সলিউশন এসেছে, যার ফলে যোগাযগ করার ব্যাপারটা অনেক সমজ হয়েছে, এভাবেই সমস্যাগুলোর সমাধান আসবে যা আমাদের কাজ সহজ করে দিবে।

সারাবাংলা: আপনাদের এই ফ্রিল্যান্সারদের প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজটা বাংলাদেশ সরকারও করছে, অন্যরাও করছে, এটাকে কি আপনারা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন?
কার্সটন হেলড: একদম নয়, আমরা বরং এটাকে একটা সুযোগ হিসেবে দেখছি। এটা উভয়পক্ষকেই লাভবান করছে। আমরাও তৈরি শিক্ষার্থী পাচ্ছি। আমার অনেক লোক এখানে কাজ করলে এই ক্ষেত্রটাও উন্নতি হবে।
আমাদের এখানে যারা শিক্ষা নিচ্ছে তারা ভালো কাজ পাচ্ছে এই বিষয়টা আমরা নিশ্চিত করছি। এখানে যারা আসছে তাদের দক্ষতা বাড়ছে। এটাকে যদি আমরা গার্মেন্টসের উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে চাই তাহলে, গার্মেন্টসে এখন বাংলাদেশ ভালো করছে, কর্মীদের বেতনও বাড়ছে এতে অনেকেই হয়তো বাংলাদেশে এসে ব্যবসা করবে না তবে যারা করবে তারা ভালো কাজ নিবে এবং ভালো পরিমাণ অর্থ দিবে যেটা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ভালো।

সারাবাংলা: বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সারদের কাজটা কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই শুরু হয়েছে। এখন আপনারা অর্থের বিনিময় এই প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন আপনাদের কেন মনে হয় এটা আপনারা করতে পারবেন?
কার্সটন হেলড: দেখুন আমরা এখানে শুধু প্রশিক্ষণ দেই না। আমরা এখানে তাদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দেই, মেন্টর দেই, কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেই, যোগাযোগের কাজ সহজ করে দেই। এখানে যারা প্রশিক্ষণ নিচ্ছে তাদের জিজ্ঞেস করলে জানতে পারবেন আমাদের একটা সম্মান আছে যেটা আসলে দামী তবে আপনারা যদি এই দামের প্রশ্ন প্রশিক্ষণার্থীদের কাছে করেন যে এই দামটা আসলে যৌক্তিক কি না তবে আপনি এওটা ইতিবাচক জবাব পাবেন।

সারাবাংলা: কার্সটন আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
কার্সটন হেলড: আপনাদেরকেও অনেক ধন্যবাদ, জয় বাংলা।

সারাবাংলা/এমএ

বিজ্ঞাপন

Tags: , , , ,

আউটসোর্সিংয়ে বাংলাদেশে মোটিভেশনটা অনেক বেশি
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন