শুক্রবার ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ১১ ফাল্গুন, ১৪২৪, ৬ জমাদিউস-সানি, ১৪৩৯

‘আপনি ভুয়া ডাক্তার… অ্যারেস্ট হিম’

ডিসেম্বর ১২, ২০১৭ | ১০:১৬ পূর্বাহ্ণ

প্রতিদিনের মতোই সোমবার সকাল ন’টায় সুপ্রিমকোর্টের দিনের মামলা কাভারেজের অ্যাসাইনমেন্টে ছিলাম। তবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হাইকোর্ট মাজার এলাকায় কম্বল বিতরণে যাওয়ায় সেটাও আমাকেই কাভার করতে হয়। সকাল থেকে নাস্তা করা হয়নি ,ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছিল। কিন্তু উপায় নেই কারণ সাড়ে ১০টার মধ্যে ভুয়া এক চিকিৎসক আদালতে হাজির হওয়ার কথা। রোববার ওই আসামিকে হাজির হতে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।

আদালতে পৌঁছনোর আগেই দেখলাম টিভি সাংবাদিকরা রাজন দাস নামের ওই ভুয়া চিকিৎসকের ছবি নেওয়ার জন্য আইনজীবী সমিতি আর আদালতের সংযোগ বারান্দাতে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এত মানুষের ভিড়ে তাকে আর খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি।

যখন এজলাসে পৌঁছলাম তখন ঘড়ির কাটা সাড়ে দশটার ঘরে। এজলাসে তখন আইনজীবী,বাদী-বিবাদী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আর সাংবাদিকদের ভিড়। বসা তো দূরের কথা দাঁড়াবার উপায় নেই। এখানেও খুঁজে পেলাম না ওই ভুয়া চিকিৎসককে।

ঠিক সাড়ে দশটায় আদালত বসার কথা থাকলে বিচারকাজ শুরু হয় এগারটায়। আদালতের বিচারিক কাজ শুরু হলে প্রথমেই জ্যেষ্ঠ বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী জানতে চান সেই লোক কোথায় (ভুয়া ডাক্তার রাজন দাস)?

তখন আইনজীবী গোলাম নবী আদালতে উপস্থিত থাকা ভূয়া চিকিৎসক রাজন দাস নামধারী অর্জুন চক্রবর্তীকে দেখিয়ে বলেন, ‘হি ইজ দ্য পারসন (এই সেই ব্যক্তি)।’ সবার চোখ তখন বসা থেকে উঠে দাঁড়ানো ব্যক্তির ওপর।

আদালত বলেন, ‘আমরা তাকে অ্যারেস্ট ( গ্রেফতার) করে আনতে বলেছি, এএজি (সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল) সাহেব কই?’

তখন আদালতে থাকা ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শশাঙ্ক শেখর সরকার বলেন, ‘অন্য কোর্টে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করেছি। পুলিশ চেষ্টা করেছে। তাকে গ্রেফতার করতে পারিনি। তার আসল নাম হচ্ছে অর্জুন চক্রবর্তী। বাড়ি চাঁদুপরের মতলবে।’

তখন আদালত ভুয়া ডাক্তারকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কে?’ জবাবে ভুয়া ডাক্তার বলেন, ‘আমার নাম অর্জুন চক্রবর্তী।’

আদালত বলেন, ‘তাহলে রাজন কে?’ আদালতের এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে সে নিশ্চুপ থাকে। এরপর আদালত বলেন, ‘আপনি কি ডাক্তার?’ জবাবে রাজন বলেন, না। অল্টারনেটিভ মেডিসিন!’

এ সময় ভুয়া ডাক্তারের পক্ষে আইনজীবী নূরুল ইসলাম সুজন দাঁড়াতে চাইলে আদালত বলেন, ‘হি ইজ ফেইক ডক্টর ( সে ভূয়া ডাক্তার)। মি. ইসলাম ছবিগুলো দেখেন। (ক্ষতিগ্রস্ত নারীর অপারেশনের বীভৎসব ছবি)।’

আদালত তখন রাজনকে উদ্দেশ্যে করে আরও বলেন, ‘আপনি ডাক্তার না হয়ে মহিলার পেট কেটেছেন। মানুষের কোনো দাম নেই? কসাইরাও এ রকম করে না। ওদেরও একটি নিয়ম আছে। ভুয়া ডাক্তার আপনি। অ্যারেস্ট হিম। এখুনি তাকে অ্যারেস্ট করেন। পুলিশ কই? সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারকে দিয়ে দেন। শাহবাগ থানায় তুলে দেওয়ার জন্য।’

এ সময় সিভিল সার্জনের আইনজীবী শামসুদ্দিন বাবুল আদালতে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘সে তো রাজন না। ছবি পরিবর্তন করে এগুলো করছে।’

আদালত বলেন, ‘মালিক কোথায়?’ এ সময় মালিক এগিয়ে আসেন। তখন আদালত বলেন, ‘এর সার্টিফিকেট আছে? উনি কি ডাক্তার? আপনারা কি জানেন?’

জবাবে ক্লিনিক মালিক বলেন, ‘সার্টিফিকেটের ফটোকপি দিয়েছিল।’

আদালত বলেন, ‘শুধু পেট কেটে সেলাই করলে ডাক্তার হয়ে যায়। ওটা কি ক্লিনিক নাকি কসাইখানা? এখন কি করছেন? এ রকম করে সে সব করেছে আপনার ক্লিনিকে?’

জবাবে বলেন, ‘আমরা রোগীর চিকিৎসার জন্য ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা দিয়েছি।’

আদালত বলেন, ‘এতে সব হয়ে গেছে?’ মালিক বলেন, ‘না। লাগল আরও দেব।’

এ সময় ওই ‘ডাক্তারে’র সহকারী তোফায়েল সিকদার ওরফে মিশু সিকদারকে সামনে ডেকে আদালত বলেন, ‘আপনি কি তার সহকারী?’ জবাবে বলেন, ‘হ্যাঁ। আমি মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট।’

আদালত বলেন, ‘তার সঙ্গী ছিলেন আপনি। আপনি জানেন না যে সে ভুয়া ডাক্তার?’ সহকারীর ‘না’ জবাব। সহকারী বলেন, ‘আমাকে যে ডাক্তার দিবে আমি তার সঙ্গেই কাজ করব। আমি কীভাবে বুঝব। এটা তো প্রতিষ্ঠান দেয়।’

এ সময় আদালত ভিকটিমের কাটাছেঁড়ার ছবি দেখে বলেন, ‘আমরা কোন যুগে বাস করছি। এটা খুবই ভয়ানক। মার্ডারের মতোই কাজ।’

এ সময় ভিকটিমের আইনজীবী ইমরান সিদ্দিক বলেন, ‘তার এ ক্ষত অনেকদিন বয়ে বেড়াতে হবে।’

আদালত বলেন, ‘তার (ভিকটিমের) লাইফ তো শেষ। হোমরা-চোমড়ারা সিজার করে।’

তখন আইনজীবী শামসুদ্দিন বাবুল বলেন, ‘ও তো (ভুয়া ডাক্তার) মিথ্যা তথ্য দিয়েছে। এখন এ মিথ্যা তথ্য দেওয়ার জন্য ভূয়া ডাক্তারের বিরুদ্ধে সুয়োমোটো রুল জারি করা উচিত।’

তখন আদালত বলেন, ‘আগে পুলিশের কাছে সোপর্দ হোক তারপরে দেখা যাবে।’

পরে আদালত তার বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশনা দিয়ে ক্ষতিপূরণ ও অন্যান্য বিষয়ে পরবর্তী আদেশের জন্য  ১৩ ডিসেম্বর দিন ঠিক করে দেন।

পত্রিকার খবর দেখে আদালতের হস্তক্ষেপ : সার্জিক্যাল ডিগ্রি তো দূরের কথা কোনো মেডিকেল কলেজের বারান্দায় না গিয়েও অপারেশনের অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছেন এক ভুয়া ডাক্তার। এরপর এক প্রসূতির মায়ের পেটে গজ রেখে অস্ত্রোপচারের ঘটনায় জানা গেল তার শুধু সার্টিফিকেটই ভুয়া না, তার নামটিও ভূয়া। এ যেন চোরের ওপর বাটপারি।

চাঁদপুরের মতলব থানার বাসিন্দা তপন চক্রাবর্তীর ছেলে অর্জুন চক্রবর্তী ভুয়া ডাক্তার সেজে কাজ করেছেন পটুয়াখালীর একটি ক্লিনিকে।

‘সাড়ে তিন মাস পর পেট থেকে বের হল গজ!’ এমন শিরোনামে একটি জাতীয় দৈনিকে গত ২২ জুলাই খবর প্রকাশ হয়।

পরদিন ২৩ জুলাই প্রতিবেদনটি আদালতের নজরে আনেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. শহীদ উল্লাহ। ওই প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আদালত তাৎক্ষণিক রুল জারি করেন বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ।

এরপর ওই চিকিৎসকের সনদ ভুয়া প্রমাণিত হওয়ায় গত ৬ নভেম্বর গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ১৫ নভেম্বরের মধ্যে তাকে গ্রেফতার করে হাইকোর্টে হাজির করতে বাউফল থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। পরে ১৫ নভেম্বর বাউফল থানার ওসি আদালতকে জানায়, চেষ্টা করেও তারা ভুয়া চিকিৎসক রাজন দাসকে গ্রেফতার করতে পারেনি। ওইদিন আদালত রাজন দাসকে গ্রেফতারে ওসিকে প্রয়োজনে র‌্যাবের সহযোগিতা নেওয়ার কথা বলে ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে হাজির করতে বলা হয়।

শুনানিতে পটুয়াখালীর সিভিল সার্জনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী শামসুদ্দিন বাবুল। ভুল অস্ত্রোপাচারের শিকার বরিশালে মাকসুদা বেগমের পক্ষে শুনানি করেন ইমরান এ সিদ্দিক ও সৈয়দ মো. রায়হান উদ্দীন। ক্লিনিকের পরিচালক ও নার্সের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. নজরুল ইসলাম।

চিকিৎসকের সহকারী তোফায়েল সিকদারের (মিশু সিকদার) পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. আইলাদ হোসেন। আর ভুয়া চিকিৎসক রাজন দাসের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন নূরুল ইসলাম সুজন ও গোলাম নবী।

শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শশাঙ্ক শেখর সরকার ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল জেসমিন সামসাদ।

কিন্তু ১০ ডিসেম্বরও আসামিকে হাজির করতে ব্যর্থ হয়। পরে আদালত ১১ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার মধ্যে ভুয়া ওই চিকিৎসককে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন।

আদালতের নির্দেশেই অবশেষে কথিত ডাক্তার রাজন দাস আদালতে হাজির হন।

সারাবাংলা/একে/জেডএফ

 

Tags: