মঙ্গলবার ২২ মে, ২০১৮ , ৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫, ৫ রমযান, ১৪৩৯

আমার পোশাক কে তৈরি করেছে?

এপ্রিল ২৪, ২০১৮ | ৪:৫৬ অপরাহ্ণ

জান্নাতুল মাওয়া।।

সেদিন ছিলো বুধবার। দীর্ঘ একটা শীতকালের পর সেদিন রোদ উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিলো  লন্ডন, নিউইয়র্কসহ পশ্চিমের সব বড় বড় শহরগুলোতে। সেই শহরগুলোর আকাশছোঁয়া সিলিংয়ে চোখ ধাঁধানো শপিং মলগুলোতে যখন ঝুলছিলো ট্রেন্ডি সব পোশাক, ঠিক সেই সময় দক্ষিণ এশিয়ার ছোট, ঘিঞ্জি একটা দেশের আরো ঘিঞ্জি একটা শহরের একটা দালান প্রবল শব্দে ধ্বসে  পড়লো। ধ্বসে পড়া দালানের ভেঙ্গে পড়া পিলার আর ফ্লোরগুলোর  মাঝখানে তখন ঝুলতে থাকলো অগণিত মানুষ! এদের অনেকে তৎক্ষণাৎ মরে গিয়েছে, কেউ ধুকে ধুকে মরে যাচ্ছে, কেউ বাঁচবার প্রবল আকুতিতে নিজের আটকে পড়া হাত আর পা কেটে ফেলার অনুরোধ জানাচ্ছে উদ্ধারকর্মীদের। এই দালানটিতে ছিলো পাঁচটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি।

এখানেই তৈরি হত বিশ্বের  বিখ্যাত অনেক ব্র্যান্ডের পোশাক। তাই এই মৃত্যুকূপে আটকেপড়া মানুষগুলোর সাথে খুব ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে ওই ঝুলে থাকা ঝা চকচকে পোশাকগুলোর। এই মানুষদের ঘামে শ্রমেই তৈরি হয়েছে একেকটি পোশাক। এই মানুষগুলোর পচা গলা লাশ যখন ভ্যানে করে নিয়ে লাইন ধরে রাখা হচ্ছিলো অল্প দূরের স্কুল মাঠে, তখন হয়তো তাদেরই তৈরি করা পোশাকে সেজে পৃথিবীর  অন্য কোন প্রান্তের তরুন তরুণীরা উদযাপন করছিলো কোন আনন্দের দিন। ওরা যে দামে পোশাকগুলো কিনেছে সেটুকু মূল্যও পায়নি হতভাগ্য শ্রমিকদের দেহ! মৃতদেহগুলোতে যখন ভনভন করে মাছি উড়ছিলো তখন তাদেরই তৈরি করা পোশাকে আলতো হাতে ফরাসি সুগন্ধি ঢেলে দিচ্ছিলেন কোন সৌখিন তরুণ!

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজার ভয়াবহ দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন ১ হাজার ১৩৬ জন। আহত হন ২ হাজার ৪৩৮ জন শ্রমিক। এই ভয়াবহ ঘটনাটি সারা  পৃথিবীর ফ্যাশন সচেতন মানুষকে ধাক্কা দিয়ে যায়। সবাই অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন যে তারা কেউ জানেন না যে কারা তাদের  পোশাক তৈরি করেন। তারা জানেন না যে যারা তাদের পোশাক তৈরি করেন তারা কত মজুরি পায়, তাদের দিন কী করে চলে।

এই সচেতন মানুষগুলো তখন একটা ক্যাম্পেইন  শুরু করেন যার শিরোনাম হল “হু মেইড মাই ক্লোথস” অর্থাৎ “আমার পোশাক কে তৈরি করেছে”। এই প্রচারণার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন ক্যারি সোমার্স এবং অরসোলা দে কাস্ত্রো নামের দুজন ব্রিটিশ ফ্যাশন ডিজাইনার। তারা ফ্যাশন বিপ্লব নামের একটি আন্দোলন শুরু করেন যার অংশ হিসেবে তারা মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন ব্র্যান্ডগুলোকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করার জন্যে।

ধীরে ধীরে ১০০ টি দেশের মানুষ তাদের এই বিপ্লবে অংশ নেয়। এ বছর ২৩ থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে ফ্যাশন বিপ্লব সপ্তাহ। পৃথিবীকে পালটে দিতে ফ্যাশনের শক্তি ব্যবহার করছেন এই বিল্পবীরা। তাদের মূল উদ্দেশ্য জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে আরও দায়িত্বশীল একটা ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা।

আমাদের কাপড়ের তাকে নিপাট ভাঁজ করা এক একটি পোশাককে এই পর্যন্ত আসতে একটা দীর্ঘ সফরের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।  আমাদের পোশাক তৈরির পেছনে প্রায় ৭৫ মিলিয়ন মানুষ অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। এদের মধ্যে ৮০ ভাগই নারী যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। দেখা যায় ক্রেতারা অনেক দাম দিয়ে এক একটা পোশাক কেনেন। কিন্তু আমাদের পোশাক শ্রমিকরা প্রায় সবাই বাস করেন চরম দারিদ্রের মধ্যে। তাদের প্রায় কেউই নিজেদের মৌলিক চাহিদাগুলো মেটানোর মত পারিশ্রমিকও পাননা। দিনের পর দিন তাদেরকে কাজ করতে হয় পরিবেশগত এবং পেশাগত নানান ঝুঁকির মধ্যে। রানা প্লাজার দুর্ঘটনাটি এই নিরবচ্ছিন্ন অনিয়মের একটা নির্মম বহিঃপ্রকাশ মাত্র। এই অনিয়মগুলোকে চ্যালেঞ্জ করতে এগিয়ে আসতে হবে ফ্যাশন সচেতনদেরকেই!

ইতিমধ্যেই অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। সোনিয়া আলভারেজ নামের এক নারী তার পরনের হুডির বিষয়ে তার ব্র্যান্ড জারার কাছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করে জানতে চান কে তার পোশাক তৈরি করেছে। তার কিছুদিন পরেই জারার পক্ষ থেকে একটি টুইট বার্তায় সোনিয়াকে তার কেনা পণ্যটির উৎপাদন বিষয়ে পরিপূর্ণ তথ্য  জানানো হয়। এভাবেই জবাবদিহিতার জায়গাগুলো ধীরে ধীরে সামনে আসছে।

যতবার আমরা একটা ব্র্যান্ড থেকে কোনকিছু কিনছি ততবার মূলত আমরা সেই ব্র্যান্ডটিকে এগিয়ে দিচ্ছি। তাই আমাদের অধিকার আছে ব্র্যান্ডটির কাছে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা আশা করার। আমাদের প্রশ্ন, আমাদের কেনাকাটার অভ্যাস সবকিছুই ফ্যাশন শিল্পে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। তাই ভোক্তাদের উচিৎ  ক্রমাগত ব্র্যান্ডগুলোর কাছে প্রশ্ন করা “কে আমার পোশাক তৈরি করেছে”। এই প্রশ্নের মাধ্যমে জানতে হবে ব্র্যান্ডগুলো  তাদের শ্রমিকদের সাথে কেমন ব্যবহার করছে। মূলত প্রতিটি মানুষই এই পোশাক শিল্পের এক একটি অংশ। যারা ভোক্তা তারাই বাঁচিয়ে রেখেছে ফ্যাশন শিল্পকে। তাই প্রতিটি ভোক্তার জানার অধিকার রয়েছে সে যে পোশাক পরেছে তার শ্রমিককে ঠিক মূল্য দেয়া হচ্ছে কি না। শুধু অধিকার নয় এটা জানা থাকা প্রতিটি ভোক্তার কর্তব্য।

শুধু সঠিক মাপের সঠিক রঙের আর সঠিক ডিজাইনের পোশাক পরাই ফ্যাশন সচেতনতা নয়; নিজের পোশাকটির শ্রমমূল্য জানাও ফ্যাশন সচেতনতার অংশ। ফ্যাশন সচেতনদের ক্রমাগত প্রশ্নের মুখেই ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিগুলো তাদের শ্রমিকদের সঠিক কাজের পরিবেশ দিতে বাধ্য হবে। তারা বাধ্য হবে শ্রমিকদেরকে সঠিক মজুরি পরিশোধ করতে।

 

 

সারাবাংলা/জেএম/এসএস

 

আরও পড়ুন