রবিবার ১৯ আগস্ট, ২০১৮, ৪ ভাদ্র, ১৪২৫, ৭ জিলহজ্জ, ১৪৩৯

আলো ছড়াচ্ছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরাও

ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৮ | ৩:০৭ অপরাহ্ণ

এসএম মুন্না :

কে বললো তারা নেই। অন্য সবার মতো তারাও আছেন। বলছি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বন্ধুদের কথা। আমর একুশে গ্রন্থমেলায় তাদের জন্যও একটি স্টল আছে মেলার বাংলা একাডেমি অংশে। একাডেমি প্রাঙ্গণ থেকে বের হতে গেটের ডান পাশে চোখে পড়বে স্টলটি। তবে বই বিক্রির উদ্দেশ্য নয়, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরাও পড়তে পারেনএটা জানান দিতেই ‘স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনা’র উদ্যোগে বইমেলায় হাজির হয়েছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বন্ধুরা।

স্পর্শ এর স্টলে গিয়ে কথা হলো রিপা তাবাসসুম, তাসলিমা সুলতানা মিতু, আইরিন সুলতানা আঁখি, আসমা আমিন ও আফরোজা আক্তারের সঙ্গে। তারা সবাই দৃষ্টি প্রতিপ্রতিবন্ধী। তাদের মধ্যে কেউ জন্মান্ধ আর কেউ অল্প-সল্প দেখতে পান। কথায় কথায় তারা জানালেন তাদের অতীত এবং প্রত্যাশার গল্প।

টিউমারের কারণে দুই চোখ নষ্ট হয় রিপা তাবাসসুমের। তাই বলে তার মন নষ্ট হয়নি। পড়ার স্পৃহা জেগে আছে সেই ছোটবেলা থেকেই। মিরপুরে ব্যাপ্টিস্ট থেকে ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়া শিখেছেন তিনি। এখন ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়া ভালোভাবেই আয়ত্বে এসে গেছে তার । মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘আঁখি এবং আমরা  ক’জন’ বইটি খুব দ্রুতই পড়ছিলেন ব্রেইলের খাঁজকাটা অক্ষরগুলো স্পর্শ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অর্নাসের এই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী কাতর কণ্ঠে সারাবাংলা ডট নেট এর কাছে ইচ্ছে প্রকাশ করে বললেন ‘অন্য বন্ধুদের সহায়তায় শুনে শুনে মূলধারার উপন্যাস-গল্প-কবিতার প্রতি আগ্রহ জন্মেছে। আমাদের জন্য বছরে অন্তত একটি করে মূলধারার সাহিত্যের বই ব্রেইলে বই প্রকাশ করা দরকার।’

দেখা গেলো মেলায় আগতরা কেউ কউ ব্রেইল বই হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখছেন। আবার কেউ কেউ অনুরোধ করছেন এই বই-সেই বই থেকে খানিক পড়ে শোনাতে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বন্ধুরা সহাস্যে পড়েও শোনাচ্ছেন।

আগ্রহিদের নানা প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনার প্রতিষ্ঠাতা প্রকাশক ও লেখিকা নাজিয়া জাবীন। সারাবাংলা ডট নেটকে নাজিয়া জাবীন বলেন, ‘আমরা চাই প্রত্যেকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর অন্তত একটি করে ব্রেইল বই প্রকাশ করুক। এর মধ্য দিয়ে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা অন্য সবার মতো করে সারা বছরই আনন্দে উজ্জীবিত থাকবে। কারণ তারাও মূলধারারে সাহিত্য পছন্দ করে।’

নাজিয়া জাবীন জানান, তার কর্মজীবন শুরু ‘প্রচেষ্টা’ নামে একটি এনজিওতে কাজ করার সময় থেকে। ওই প্রতিষ্ঠানটি দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করতো। সেই থেকে তার পথ চলা।

প্রথম দিকে নিজের চেষ্টায় বই প্রকাশ শুরু করেন। সে সময় আত্মীয়-স্বজনদের সহায়তা পেয়েছেন। এরপর কিছু দাতা সংস্থা পাশে দাঁড়িয়েছে। নাজিয়া জাবীন মনে করেন সহযোগিতার পরিমাণ বাড়লে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য আরও ব্রেইল প্রকাশনা বাড়ানো সম্ভব।

‘মানুষ দৃষ্টিহীন বলেই অন্ধ নয়/ মানুষ মূলত প্রজ্ঞাহীন বলেই অন্ধ’-স্লোগান ধারন করে ২০০৮ সাল থেকে স্পর্শ-এর পদচারণা শুরু। ২০১১ সাল থেকে নিয়মিত মেলায় অংশ নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সৈয়দ আকতার হোসেনের তত্ত্বাবধানে মিলিটারি ইন্সটিটিউট সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির তিন অধ্যাপক ইমতিয়াজ, মাহবুব ও সামি-মিলে বাংলায় প্রকাশিত বইকে দ্রুত ব্রেইলে রূপান্তরের সফটওয়্যার তৈরি করেন। তাদের সহযোগিতায় বইগুলো ব্রেইলে রূপান্তর করা হয়। এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে ৩০০ পাতার বইকে ২০ সেকেন্ডে রূপান্তর করা সম্ভব।

নাজিয়া জাবীনের কাছ থেকে জানা গেলো, ২০০৯ সালে তার হাত ধরে বাংলা ভাষায় প্রথম ব্রেইল ছড়ার বই ‘‘ছড়ার তালে মনটা দোলে’’ প্রকাশ হয়। এরপর থেকে পর্যায়ক্রমে বের হয়েছে বিভিন্ন লেখকের প্রায় ৬১টি বই। তবে এসব বই বিক্রির জন্য নয়। মেলায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা এলে স্টলে বসে বই পড়তে পারবেন। আর বই পড়তে পড়তে কোনও বই যদি কারো পছন্দ হয়ে যায় তাহলে মেলার পর সেই বইটি তাকে উপহার হিসেবে দেওয়া হবে। এ জন্য অবশ্য আগে থেকে নাম নিবন্ধন করতে হবে। নির্দিষ্ট কোনও বইয়ের জন্য কমপক্ষে ২০ জন নাম নিবন্ধ করলে বইটি নতুন করে ব্রেইলে ছাপিয়ে বিনামূল্যে উপহার দেওয়া হবে।

এবারের মেলায় স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনা ১৪টি নতুন বই এনেছে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য। নতুন আসা বইগুলোর মধ্যে আছে- মুহম্মদ জাফর ইকবালের দুইটি বই ‘আঁখি এবং আমরা ক’জন’, ‘আমি তপু’, আনিসুল হকের ‘মা, লুৎফর রহমান রিটনের ‘ঝ্যাং আর প্যাং’, মালেকা বেগমের ‘ছোটদের সুফিয়া কামাল’, মোহিত কামালের ‘স্বপ্নডানা’, ফেরদৌস খানের ‘আমপারার সহজ অনুবাদ, সোনিয়া হকের ‘অনন্ত-নিদ্রা’, আলপনা হাবীবের ‘আলপনার রান্না’, লবী রহমানের ‘লবীর রান্না’, শাহরিয়ার হোসেনের ‘কলঙ্কভাগী’, আনিসা হকের ‘সুন্দরবনের সাদা পাহাড়’, নারী পক্ষের ‘স্বাস্থ্য তথ্য’ ও নাজিয়া জাবীনের ‘হাঁসের পায়ে ঘুড়ি’।

এ ছাড়া পুরনো বইয়ের মধ্যে আছে- কবীর চৌধুরী অনূদিত ‘বাংলাদেশের লোকছড়া’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘চালতা লেবু’ ও ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’, সেলিনা হোসেনের ‘আমার স্কুল’, মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘দলের নাম ব্ল্যাক ড্রাগ’, লুৎফর রহমান রিটনের ‘রসগোল্লাটা কথা বলে’, কাইজার চৌধুরীর শোভনের ‘একাত্তর’, সৈয়দ নাজিমুদ্দীন হাসেমের ‘গলদা দাদার গোয়েন্দাগিরি’, ঈশপ গল্প সমগ্র, জুল ভার্ন এর ‘৮০ দিনে বিশ্ব ভ্রমণ’, নারীপক্ষের ‘ব্রেস্ট ক্যান্সার’, জৌতিভূষণ চাকীর ‘এক ঝাঁক গল্প’, হ্যান্স ক্রিশ্চিয়েন অ্যান্ডারসনের গল্পের অনুবাদ ‘কাহিনী পঞ্চাশৎ (অনুবাদক-শামসুর রাহমান, হায়াৎ মামুদ, মফিদুল হক)’, হালিমা খাতুনের ‘পাখির ছানা’, ফেরদৌসী মজুমদারের ‘পাথরের স্যুপ’, নাজিয়া জাবীনের ‘ডাইনোসরের ডিমটা’।

সারাবাংলা/পিএম 

 

আলো ছড়াচ্ছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরাও
আলো ছড়াচ্ছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরাও