সোমবার ২৮ মে, ২০১৮ , ১৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫, ১১ রমযান, ১৪৩৯

ইতিহাস গড়েই ফাইনালে বাংলাদেশ

জানুয়ারি ১৯, ২০১৮ | ৬:১৬ অপরাহ্ণ

মোসতাকিম হোসেন, মিরপুর থেকে

রুবেল হোসেনের ওই ইয়র্কারটাই কি ম্যাচের প্রতীকী ছবি হয়ে থাকল? দুর্দান্ত এক ইনসুইঙ্গিং ইয়র্কারে উড়িয়ে দিলেন সুরাঙ্গা লাকমলের স্টাম্প। শ্রীলঙ্কাও আজ মাটিতে লুটিয়ে পড়া উইকেটের মতোই উড়ে গেল। ১৬৩ রানের জয় শ্রীলঙ্কার সঙ্গে তো বটেই, যে কোনো দলের সঙ্গেই বাংলাদেশের রানের ব্যবধানে সবচেয়ে বড় ব্যবধানের জয়! দুই ম্যাচেই বোনাস পয়েন্টসহ দুই জয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশ উঠে গেল ফাইনালেও।

দেশের মাটিতে বাংলাদেশ গত তিন বছর ধরেই বদলে যাওয়া এক দল। কিন্তু এমন দাপুটে বাংলাদেশকেও তো আগে দেখেনি মিরপুর। শ্রীলঙ্কার ইনিংসের শুরু থেকেই আসলে ম্যাচের ফল নিয়ে খুব একটা সংশয় ছিল না। একেকটি উইকেটের সঙ্গে সেই নিশ্চিত পরিণতির দিকেই এগিয়েছে শুধু।

কুশল পেরেরাকে ফিরিয়ে দিয়ে নাসির হোসেন শুরুটা করেছিলেন। ২ রানেই শ্রীলঙ্কা হারাল প্রথম উইকেট। উপুল থারাঙ্গা এলবিডব্লু হয়েও একবার রিভিউ নিয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই মাশরাফি বিন মুর্তজার বলেই ক্যাচ দিয়ে ফিরে গেলেন ৪৩ রানে। মিরপুরের গ্যালারিতে তখন উৎসবের কোরাস।

নাসির হোসেনের উইকেট নেওয়ার ভিডিও

Nasir Takes Kushal Perera

Nasir Takes Kusal Perera SL: 3/1 Overs 2.3

Posted by Rabbitholebd.com on Friday, 19 January 2018

এরপর একটু একটু করে এগিয়েছে, আর জয়ের সূর্যটা আরেকটু কাছে এসেছে বাংলাদেশের। কুশল মেন্ডিসও বোকা বনলেন মাশরাফির আরেকটি স্লোয়ারে, ৬২ রানে শ্রীলঙ্কা হারাল তৃতীয় উইকেট। অধিনায়ক অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস না আসায় ওপরে উঠে এসেছিলেন নিরোশান ডিকওয়েলা। মোস্তাফিজের ইনসুইংয়ে স্টাম্প উপড়ে যায় তার।

শ্রীলঙ্কার ভরসা হয়ে ছিলেন এরপর শুধু অধিনায়ক দীনেশ চান্দিমাল। কিন্তু ৩৯ বলে ২৮ রান করে সাকিবের দুর্দান্ত এক থ্রোতে যখন রান আউট হয়ে গেলেন, শ্রীলঙ্কার হুড়মুড় করে ভেঙে যাওয়ার সেটি কেবল শুরু। পরের ওভারেই দুই উইকেট পেয়েছেন সাকিব আল হাসান। প্রথমে গুনারত্নেকে ফেরানোর পরের বলেই ফিরিয়ে দিয়েছেন ওয়ানিদু হাসারাঙ্গাকে।

মাশরাফির উইকেট শিকারের ভিডিও:

Tharanga got OUT by Mashrafe Mortuza

Tharanga got OUT by Mashrafe MortazaSL 43/2 Overs: 9.4Watch Live at https://www.youtube.com/watch?v=d9iPHzLF8yM

Posted by Rabbitholebd.com on Friday, 19 January 2018

প্রায় নিভে যাওয়া শ্রীলঙ্কার আশার প্রদীপটা ওই সময়েই জ্বলে উঠল একটু দপ করে। থিসারা পেরেরা সাকিবের এক ওভারের প্রথম চার বলে নিলেন ২০ রান। কিন্তু এর পরের বলটা মারতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দিলেন লং অফে। ১৪ বলে ২৯ রান করে তার আউটেই একেবারে নিভে গেল আশার শেষ প্রদীপ।

১৫০ রানে অষ্টম উইকেট হারানোর পর বাকি ছিল শুধু আনুষ্ঠানিকতা। শেষ দুই উইকেট নিয়ে রুবেল সেটি সেরেছেন। দশে মিলেই এসেছে কাজটা, সাইফ উদ্দিন ছাড়া সবাই পেয়েছেন উইকেট। তিন উইকেট নিয়ে তার মধ্যে উজ্জ্বলতম সাকিব আল হাসান।

অথচ এই ম্যাচের আগে মিরপুরে ত্রিদেশীয় সিরিজে ঠিক যেন সেই উৎসবের আবহটা আসছিল না। মাঠে দর্শক নেই, শততম ওয়ানডে গ্যালারি ফাঁকা… ঠিক যেন মিরপুরের সঙ্গে যায় না। ছুটির দিনে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচে সেই চেনা রূপে ফিরল মিরপুর। বাণিজ্যমেলার ভিড় ছাপিয়ে গেল স্টেডিয়ামমুখী জনস্রোত।

অন্তত বাংলাদেশের ইনিংসে সেই অপেক্ষাটা বিফলে যায়নি। তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম সাড়ে তিন ঘণ্টায় অনেকবারই আনন্দের উপলক্ষ দিয়ে গেছেন। দিনের শেষে যে পূর্ণতা দিয়েছেন বোলাররা।

ভিডিওতে দেখুন টাইগারদের জয়ের মুহূর্ত:

বাংলাদেশের রান হয় ৫০ ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে ৩২০, কিন্তু তা অনায়াসেই হতে পারত আরও বেশি। সাকিব যখন আউট হলেন, ৩৭.৫ ওভারে বাংলাদেশের রান তখন ২২৭। শেষ ১২ ওভারে অন্তত ১০০ হলেও রান ৩২০ পার হয়ে যায়। মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ শুরুতে একটু স্লথ থাকলেও পরে তা পুষিয়ে দেবেন বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু যখনই দুজন মাত্র রানের চাকাটা আরও বেশি সচল করতে শুরু করেছেন, তখনই আউট হয়ে গেলেন।

৪০ ওভার শেষেও রান ছিল ২৪৩। হাতে তখনো সাত উইকেট। মুশফিক তখন উইকেটে থিতু হয়ে গেছেন, খানিক পর ৪২ বলে পেয়ে গেলেন ফিফটি। মাহমুদউল্লাহ দুই অঙ্ক ছোঁয়ার জন্য সময় নিলেও পরে ছয়-চারে বড় কিছুর আভাস দিচ্ছিলেন। কিন্তু ২৩ বলে ২৪ রান করে মাহমুদউল্লাহ আউট হয়ে গেলেন প্রদীপের বলে, পরের ওভারে থিসারা পেরেরার দুর্দান্ত এক ইয়র্কারে ৫২ বলে ৬২ রান করে বোল্ড মুশফিক। নাসির আসলেন, প্রথম বলেই ফিরলেন এলবিডব্লু হয়ে।

বাংলাদেশ যে শেষ পর্যন্ত ৩২০ করতে পেরেছে তার বড় অবদান সাব্বিরের। ১২ বলে ২৪ রানে অপরাজিত থেকে ইনিংস শেষ করেছেন, লাকমলের শেষ ওভারেই নিয়েছেন ১৯ রান।

অথচ দুই ওপেনার আরও বড় কিছুর ভিত এনে দিয়েছেন। সকালে টসে জিতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মাশরাফি। শুরুতে উইকেটে বল একটু ধরছিল। বিজয় শুরু থেকেই ছিলেন আগ্রাসী, অবশ্য বেশ কয়েকটা জীবনও পেয়েছেন। এর মধ্যেই ওয়ানডেতে বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে কম ইনিংসে এক হাজারও রানও পেয়ে গেছেন। কিন্তু এত সুযোগ পেয়েও ৩৫ রানের বেশি করতে পারেননি। উদ্বোধনী জুটিতে তখন উঠে গেছে ৭১ রান।

তামিম তখনও বেশ সতর্ক, ফিফটির জন্য খেলতে হয়েছিল ৭২ বল। কিন্তু এর পরেই যেন জাদুমন্ত্রের মতো জেগে উঠলেন। গুনারত্নেকে পর পর দুই ছয়ে পৌঁছে গেলেন সত্তরে, ফিফটির পরের ৩০ রান করতে খেলতে হয়েছিল মাত্র ১৬ বল। আরেকটি সেঞ্চুরি যখন দৃষ্টিসীমায়, তখনই স্বপ্নভঙ্গ। আকিলা ধনাঞ্জয়ার বলটা শুরুতে আউট দেননি আম্পায়ার, কিন্তু ডিকওয়েলা অধিনায়কের জন্য অপেক্ষা না করে নিজেই রিভিউ নিয়ে নিলেন। রিপ্লেতে দেখা গেল, বল ব্যাটের কানা ছুঁয়ে উইকেটরক্ষকের গ্লাভসে জমেছে। ৮৪ রানে আউট তামিম, টানা দুই ইনিংসে কাটা পড়লেন আশির ঘরে।

তবে সাকিব আল হাসান শুরু থেকেই ছিলেন দারুণ সপ্রতিভ। তিনের পজিশনটা যেন আজও নিজের করে নিয়েছেন, বোঝাচ্ছিলেন তা। প্রায় ১০০ স্ট্রাইকরেটে পেলেন ফিফটি, তামিম চলে গেলেও মুশফিককে নিয়ে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ভালো খেলতে খেলতেই আবারও অঘটন। গুনারত্নের নির্বিষ স্লোয়ারটা চাইলে মাঠের যে কোনো জায়গাতেই পাঠাতে পারতেন, কিন্তু সাকিব পাঠালেন বোলারের হাতে। ২২৭ রানে বাংলাদেশ হারায় তৃতীয় উইকেট। সাকিব-তামিম জুটিতে এসেছিল ৯৯ রান।

তামিম, সাকিব সেঞ্চুরি না পাওয়ায় অবশ্য আফসোস থাকতেই পারে। কিন্তু দিন শেষে এমন জয়ের পর সব ধুয়েমুছেই যাওয়ার কথা!

সংক্ষিপ্ত স্কোর:
বাংলাদেশ: ৩২০/৭ (৫০ ওভার) (তামিম ৮৪, সাকিব ৬৭, মুশফিক ৬২, বিজয় ৩৫; থিসারা পেরেরা ৬০/৩, প্রদীপ ৬৬/২)
শ্রীলঙ্কা: ১৫৭/১০ (৩২.২ ওভার) (থিসারা পেরেরা ২৯, চান্দিমাল ২৮, উপুল থারাঙ্গা ২৫; সাকিব ৪৭/৩, রুবেল ২০/২, মাশরাফি ৩০/২)

সারাবাংলা/এএম/এমআরপি/এসএন

আরও পড়ুন