মঙ্গলবার ১৩ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং , ২৯শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী

উড়াও শতাবতী (১৩) মূল: জর্জ অরওয়েল, অনুবাদ: মাহমুদ মেনন

সেপ্টেম্বর ১, ২০১৮ | ৭:০৩ অপরাহ্ণ

<<শুরু থেকে পড়তে

শতাবতী গাছটির সাথে যেন এক গোপন শত্রুতা গর্ডনের। অনেকবারই সে এটিকে মেরে ফেলতে উদ্যত হয়েছে। অনেকদিন পানি দেয়নি, পাতায় ডলে দিয়েছে জ্বলন্ত সিগারেটের গোড়া, এমনকি মাটিতে লবন ঢেলেও দিয়েছে। কিন্তু নোংরা জিনিষগুলো বাস্তবে অবিনশ্বর। সর্বোচ্চ অবহেলাতেও সেগুলো টিকে থাকে। উঠে দাঁড়ালো গর্ডন। কেরোসিন লেগে যাওয়া আঙুলগুলো শতাবতীর পাতায় ঘঁষে ঘঁষে মুছলো। ঠিক তখনই সিড়ি পথ থেকে কানে এলো মিসেস উইসবিচের কণ্ঠ।

‘মিস্টার কম-স্টক!’

দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেলো গর্ডন, মাথাটি গলিয়ে দিয়ে বললো- ‘জ্বী’

‘তোমার রাতের খাবার দশ মিনিট ধরে অপেক্ষায়। ধোয়াধুয়ির জন্য আমাকে বসিয়ে না রেখে নিচে নেমে একটু খেয়ে নেয়া কেন যাচ্ছে না- বলোতো?’
কথা না বাড়িয়ে গর্ডন নিচে নেমে গেলো।

হিম ঠাণ্ডা, গুমোট-গন্ধে ভরা একটি কামরা। মধ্যদুপুরেও এখানে আলো অতি ক্ষীণ। গাদাখানেক শতাবতী গাছ। কতগুলো তা কখনোই গুনে দেখেনি গর্ডন। মেঝেতে, দেয়াল ঘেঁষে, টেবিলের ওপর এখানে ওখানে সবখানে গাছগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে। জানালায় কারুকাজ করা টবেও একটি বাইরে থেকে আলোর পথ আটকে গ্যাট হয়ে বসে আছে।

এই আলো-আঁধারি, আর শতাবতীর সমারোহে মনে হবে আপনি কোনো অসূর্য্যের দেশে অ্যাকুরিয়ামের ভেতর অসংখ্যা জলজ-ফুলের মাঝে বসে আছেন। গর্ডনের রাতের খাবার প্রস্তুত হয়ে তার অপেক্ষায়। ওপরের গ্যাস-বাতির ভাঙা অংশ দিয়ে যে সাদা আলোর বৃত্ত টেবিল ক্লথের মাঝ বরাবর পড়ে আছে সেখানটাতেই সাজানো খাবারগুলো। ফায়ারপ্লেসের দিকে পীঠ রেখে বসলো গর্ডন। (ওই চুলোয় আর আগুন নেই বরং সেখানেও স্থান করে নিয়েছে এক শতাবতী)। ঠাণ্ডা গোমাংস, দুই টুকরো শুটকা সাদা রুটি, য‍তসামান্য কানাডিয়ান বাটার, ইঁদুর ধরতেও এর চেয়ে বড় টুকরো লাগে এমন সাইজের এক টুকরো পনির আর স্রেফ ঠাণ্ডা পানি, এই যা বরাদ্দ, তা-ই দ্রুত গিলে নিলো গর্ডন। রুমে যখন ফিরলো, তেলের কুপি ততক্ষণে নিভু নিভু। তাতে কেতলিতে সামান্য পানি গরম হয়ে যাবে বলেই মনে হলো।

তবে তাই হোক, তার সান্ধঃকালীন সেরা বিলাসিতার এক কাপ চা হয়ে যাক।

সর্বোচ্চ গোপনীয়তায় গর্ডন প্রতিরোজ সন্ধ্যায় এক কাপ চা নিজ হাতে বানিয়ে খায় বড্ড আয়েশ করে। পানি গরম করার বাড়তি ঝামেলা এড়াতেই মিসেস উইসবিচ তার বাড়ির বাসিন্দাদের বলে দিয়েছেন নৈশ আহারে চা মিলবে না, আর ঘরে চা করে খাওয়াও এক্কেবারে মানা। মহাবিরক্তি নিয়ে টেবিলে পড়ে থাকা কাগজের স্তুপে চোখ ফেললো গর্ডন। ঠিক করলো আজ রাতে আর কোনো কাজে হাতই দেবে না। চা খাবে, বাকি সিগারেট ক’টি ফুঁকে শেষ করবে আর কিং লিয়ার কিংবা শার্লক হোমস পড়ে কাটিয়ে দেবে।

অ্যালার্ম ক্লকের পাশে অগ্নিচুল্লির ওপর রাখা বইগুলো। এভরিম্যান সংস্করণের শেক্সপিয়র, শার্লক হোমস, ভিলনের কবিতা, রড্রিক র্যানডম, ল্য ফ্লেয়ার দ্য মল ছাড়াও এক গাদা ফরাসি উপন্যাস। তবে আজকাল শেক্সপিয়র ও শার্লক হোমস ছাড়া আর কিছুই সে পড়ে না। চা চড়ানোর আগেই দরজার দিকটা একটু দেখে নিলো গর্ডন। ঠেলে সামান্য খুলে কান পাতলো। মিসেস উইসবিচের কোনো সাড়াশব্দ নেই। সতর্ক থাকতেই হয়, নিঃশব্দে উপরে উঠে আড়ি পেতে হাতেনাতে ধরে ফেলার ফন্দি বুড়ি বেশ রপ্ত করেছে। চুপেচাপে চা বানানো এক মস্ত অপরাধ, অপরাধকুলে ঘরে মেয়েমানুষ নিয়ে আসার ঠিক পরেই এর অবস্থান। নিঃশব্দেই দরজা ভেজিয়ে খিল এঁটে দিলো সে। বিছানার নিচ থেকে সস্তাদরের স্যুটকেসেটি টেনে বের করলো, আর তালা খুললো। ছয়পেনি দরের উলওয়র্থের কেতলি, লিয়ন্সের এক প্যাকেট চা, একটিন কনডেন্সড মিল্ক, একটি টি-পট ও একটি কাপ। সবগুলোই খবরের কাগজে আলাদা করে পেঁচিয়ে রাখা, নড়াচড়ায় যেন সামান্য শব্দটুকুও না হয়।

চা বানানোরও একটি অতিরপ্ত প্রক্রিয়া রয়েছে তার। জগ থেকে পানি ঢেলে আধা করে ভরে নেয় কেতলিটি। এরপর হাঁটুগেড়ে বসে খবরের কাগজের একটি পাতা বিছিয়ে নেয়। গতরাতের চা-পাতাগুলো এখনো কেতলির ভেতর। ওগুলো ঝাঁকিয়ে ফেললো পেপারের উপর। বুড়ো আঙ্গুলে পুরো কেতলি পরিষ্কার করে, পেপারটি গুটিয়ে দলা পাকিয়ে নিলো। এবার আসল যুদ্ধ। ওগুলো ফেলতে যেতে হবে নিচ তলায়। ব্যবহৃত চা-পাতা থেকে মুক্তি মেলাই সবচেয়ে ঝুঁকির কাজ। কাউকে হত্যার পর মরদেহে সরিয়ে ফেলার মতোই কঠিন। কাপ অবশ্য প্রতি ভোরে হাত ধোয়ার বেসিনে ধুয়ে ফেলা যায়।

নোংরামি, স্রেফ নোংরামি। এসব মেনে নিতে মাঝে মধ্যেই বেশ হাপিয়ে ওঠে সে। নিজেই বিষ্মিত হয়ে যায় এই ভেবে যে, এতকিছুর পরেও কী করেই সে টিকে রয়েছে মিসেস উইসবিচের এই বাড়িতে। সারাক্ষণই মনে হয় বুড়ির দুটি চোখ পড়ে আছে তার উপর। মনে হবে কেনো, বুড়ির কাজই হচ্ছে বুড়ো আঙ্গুল টিপে টিপে সিঁড়ি বেয়ে উপর-নিচ করা, আর তক্কে তক্কে থাকা কোন বাসিন্দা কখন কোন অপকর্ম করছে তা হাতেনাতে ধরে ফেলা। এই বাড়িতে নির্বিঘ্নে টয়লেটেও যাওয়া দায়, কারণ মনে হবে, পাছে কেউ দেখে ফেলে! দরজার খিলটা ফের নিঃশব্দে খুললো গর্ডন, কান পাতলো, আর নিশ্চিত হলো এদিকটায় কেউ নেই। আরও নিচের তলায় থালা বাসনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। মিসেস উইসবিচ নিশ্চয়ই রাতের বাসন-কোসন ধুইছেন। তাহলে নিচে নামাটা এখন নিরাপদ। চা-পাতার মোচাটি বুকে আগলে বুড়ো আঙ্গুল টিপে টিপে নিচে নামলো সে। টয়লেটটি দ্বিতীয় তলায়। সিঁড়ির কোনায় একটু থামলো, শুনে নিলো কোনো শব্দ আসে কি-না। বাহ! একই থালা-বাসনের টুংটাং। সব ঠিক আছে গর্ডন কমস্টক, কবি (‘ভিন্ন মাত্রার প্রতিশ্রুতির এক কবি’ টাইমস লিট’র সাপ্লিমেন্টারিতে তেমনটাই লেখা হয়েছে) দ্রুতই নিজেকে গলিয়ে দিলো টয়লেটের দরজা ঠেলে। চায়ের পাতাগুলো ঝেড়ে ফেললো ময়লার পাইপে আর প্লাগটা টেনে দিলো। একই দ্রুততায় ঘরে ফিরলো, সকল সতর্কতায় ফের লকটে দিলো ঘরের খিল, আর নিজেকে চাঙ্গা করে নিলো এক কাপ তাজা চায়ে।

পরের পর্ব>>

সারাবাংলা/এমএম

উড়াও শতাবতী (১৩) মূল: জর্জ অরওয়েল, অনুবাদ: মাহমুদ মেনন
উড়াও শতাবতী (১৩) মূল: জর্জ অরওয়েল, অনুবাদ: মাহমুদ মেনন
উড়াও শতাবতী (১৩) মূল: জর্জ অরওয়েল, অনুবাদ: মাহমুদ মেনন