মঙ্গলবার ২৩শে অক্টোবর, ২০১৮ ইং , ৮ই কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১২ই সফর, ১৪৪০ হিজরী

উড়াও শতাবতী (৫) মূল: জর্জ অরওয়েল, অনুবাদ: মাহমুদ মেনন

ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৮ | ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ

<<শুরু থেকে পড়তে

‘নিশ্চয়ই মিসেস উইভার। এই পুরো এক তাক ভরা এথেল এম ডেলের বই। দ্য ডিজায়ার অব হিজ লাইফ নিতে পারেন, নাকি ওটা পড়ে ফেলেছেন? তাহলে, দ্য অলটার অব অনার দেই।’

‘আচ্ছা! তোমার কাছে হাফ ওয়ালপোলের লেটেস্ট বইটা আছে নাকি? ওদিক থেকে বলে উঠলেন মিসেস পেন। ‘এ সপ্তায় বড় কিছু একটা, বলতে পারো কোনো মহাকাব্য পড়ে ফেলার মুডে আছি। আর তুমিতো জানো, ওয়ালপোল আমার কাছে এক মহান লেখক। গ্লাসওয়র্দির পরে আমি তাকেই সর্বাগ্রে স্থান দেই। ওর লেখার মধ্যে বিশাল কিছু একটা আছে। আর মানবতায় ভরা।’
‘ইংরেজিটাও অসাধারণ,’ বললো গর্ডন।
‘হ্যাঁ, সেতো বটেই, অবধারিতভাবে ইরেজিটাও অসাধারণ!’
‘আমার মনে হয়, আরও একবার দ্য ওয়ে অফ অ্যান ঈগল নিতে পারি,’ ওপাশটা থেকে বললেন মিসেস উইভার। ‘এই বইটা তুমি যতবার পড়বে, ভালো লাগবে।’
‘নিঃসন্দেহে! অদ্ভুতরকম ভীষণ জনপ্রিয় এই বই,’ বললো গর্ডন, আর এক চোখে ঠেরে ঠেরে মিসেস পেনের দিকে তাকালো।
‘হ্যা অদ্ভুতই বটে, প্রতিধ্বনি তুললেন মিসেস পেন, তার চোখও তখন গর্ডনের দৃষ্টিতে নিবদ্ধ।
দুই জনের কাছ থেকে দুই পেনি করে রাখলো গর্ডন। ওরা দুজনই খুশিতে বাকবাকুম করতে করতে বেরিয়ে গেলো। মিসেস পেনের হাতে ওয়ালপোলের রগ হেরিজ আর মিসেস উইভারের হাতে দ্য ওয়ে অব অ্যান ঈগল।

দ্রুত পেছন ঘুরে অন্য রুমটিতে ঢুকে পড়লো গর্ডন আর এগিয়ে গেলো কবিতার বইয়ের তাকের দিকে। তার প্রতি এই তাকগুলোরও এক বেদনার্ত আকর্ষণ। নিজের অপাংক্তেয় বইটিরও সেখানেই অবস্থান। উচ্চমার্গীয়, অবিক্রিতদের তালিকায়।

মাইস, বাই গর্ডন কমস্টক, পাতলা ফুলস্কাপ ষোল পাতার বই। দাম তিন দশমিক ছয় পেন্স তবে এখন ছাড়কৃত মূল্যে আরও কম। এ পর্যন্ত তেরজন এই বইয়ের রিভিউ করেছেন। দ্য টাইমসের সাহিত্য সাময়িকীতে- বইটিতে ‘ভিন্নধর্মী এক অঙ্গীকারের’ প্রকাশ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই সমালোচকদের কেউই এর শিরোনামে যে সুক্ষ্ম সামান্য কৌতুকটা রয়েছে তাও ধরতে পারেননি। ম্যাকেচনির বইয়ের দোকানে গত দুই বছর সে নিজেই চাকরি করছে, এই সময়ের মধ্যে একজন ক্রেতাও একটি বারের জন্যও তাক থেকে মাইস’র কোনো একটি কপি হাতে নেয়নি। পনেরো থেকে বিশ তাক ভরা কবিতার বই। ওগুলোর দিকে অম্বলের টক টক দৃষ্টিতেই তাকায় গর্ডন। অধিকাংশই ব্যর্থ কবিদের বই। চোখের স্তরের একটু উপরে যাদেরগুলো তারা এরই মধ্যে স্বর্গের পথ ধরেছেন, আর তারা এখন অতীতের কবি, অথচ এরাই ছিলেন তার তারুণ্যের তারকা কবি। ইয়েটস, ড্যাভিস, হসম্যান, টমাস, ডে লা মারে, হার্ডি। সকলেই আজ নিভে যাওয়া তারা। তাদের নিচে ঠিক চোখ বরাবর এই সময়ের কবিতার বই। এলিয়ট, পাউন্ড, অডেন, ক্যাম্পবেল, ডে লুইস, স্পেন্ডারদের অবস্থান। ফালতু ব্যঙ্গ, আর তা সংখ্যায় অনেক। মৃত তারকারা উপরে, নিচে ফালতু রঙ্গব্যঙ্গ। আমরা কি আর কভু পড়ার মতো ভালো কোনো লেখক পাবো না? তবে লরেন্স ঠিক আছে, জয়েসের লেখা আগের চেয়ে এখন ভালোই হয়। আর যদি আমরা ভালো কোনো লেখক পেয়েও যাই তাকে কি আমরা তাদের জীবদ্দশায় চিনতে পারবো? রদ্দি, বস্তাপচা লেখার মাঝে আমরা যেভাবে বুদ হয়ে আছি তাতে সেটা কি আদৌ সম্ভব?

পিং! দরজায় ঘণ্টি বাজলো। ঘুরলো গর্ডন। দরজায় আরেকজন খদ্দের। বিংশতির তরুণ, চেরীরঙা ঠোঁট, চকচকে চুল, লুতুপুতু ভঙ্গি নিয়ে ভেতরে ঢুকলো। পয়সাওয়ালা নিঃসন্দেহে। মুদ্রার সোনালি সুঘ্রাণই যেন সে নাকে পেলো। এর আগেও দোকানে এসেছে এক-দুবার। তারপরেও নতুন ক্রেতার জন্য তুলে রাখা ভদ্রোচিত অভিব্যক্তিটাই দেখালো গর্ডন। আর সাধারণ ফর্মুলাটিই কাজে খাটালো:
শুভ অপরাহ্ন। কিছু কি করতে পারি আপনার জন্য? কোনো বিশেষ বই খুঁজছেন?
নাহ! তেমন কিশু না! (ছ কে শ উচ্চারণ)। একটু নাড়াচাড়া কড়ে দেখবো আড়কি! দরশাটা দেখেই মনে হলো ঢুকি। বইয়ের দোকান আমার ভিশশশন পশন্দ। তাই দেখেই ঢুকে পড়লাম! হি হি!
যেমন ঢুকেছো তেমনি বেরিয়ে যাও, ব্যাটা লুতুপুতু! মনে মনে বললো গর্ডন। আর বাস্তবে মুখে একটা সংস্কৃতিমনা হাসি ছড়িয়ে দিলো, ঠিক যেমনটা একজন বইপ্রেমী আরেকজন বইপ্রেমীর দিকে দেয়।

আরে এসো এসো… দেখো না। বই দেখতে যারা আসে আমরা তাদের খুব কদর করি। তোমার কি কবিতায় আগ্রহ আছে?

‘অবশশশ্যই! কবিতা আমার খু্উউব ভালো লাগে!’

সেতো বটেই, ব্যাটা ফালতু! ফের মনে মনে উচ্চারণ গর্ডনের। ছেলেটির পোশাকে অবশ্য একটা আধা শিল্পী ভাব আছে। কবিতার তাক থেকে লাল রঙা মলাটের একটা পাতলাগোছের বই বের করে আনলো গর্ডন। ‘এইটা দ্যাখো। তোমার ভালো লাগতে পারে। অনুবাদের বই। অন্যগুলোর চেয়ে একটু ভিন্নরকম। বুলগেরীয় কবির অনুবাদ।’

পরক্ষণেই বুঝলো ফালতু প্যাঁচাল পেরে ফায়দা নেই। ব্যাটাকে বরং নিজের মতো ঘাঁটাঘাঁটি করতে দেওয়াই ভালো। ক্রেতার সঙ্গে এই আচরণটিই সর্বোত্তম। ওদের ঘাঁটিও না। মিনিট বিশেক বই নাড়াচাড়া করবে কিংবা তারও বেশি। এরপর লজ্জায় পড়ে কিছু না কিছু কিনে নেবে। এই ভেবে গর্ডন বরং দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। নিজে একদিকে একটু হেলে গায়ের ঘষা এড়িয়ে এগুলো সে, ব্যাটাকে তার জায়গায় থাকতে দিলো। তখনও এক হাত প্যান্টের পকেটে। তাও ভদ্রোচিত আচরণটাই দেখালো গর্ডন।

পর্ব- ৬

উড়াও শতাবতী (৫) মূল: জর্জ অরওয়েল, অনুবাদ: মাহমুদ মেনন
উড়াও শতাবতী (৫) মূল: জর্জ অরওয়েল, অনুবাদ: মাহমুদ মেনন
উড়াও শতাবতী (৫) মূল: জর্জ অরওয়েল, অনুবাদ: মাহমুদ মেনন