শুক্রবার ২০ জুলাই, ২০১৮, ৫ শ্রাবণ, ১৪২৫, ৬ জিলক্বদ, ১৪৩৯

একযুগ ধরে ‘ধর্মের লেবাসে’ ইয়াবা পাচার

এপ্রিল ১৬, ২০১৮ | ৮:২৩ অপরাহ্ণ

।। স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট ।।

চট্টগ্রাম ব্যুরো: একযুগ ধরে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম নগরীতে ইয়াবা পাচার করছেন ষাট বছর বয়সী বৃদ্ধ রশিদ আহম্মদ। ইয়াবা পাচারের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিতে তার প্রধান কৌশল হচ্ছে ধর্মীয় পোশাক। কাজেও লেগেছে এই কৌশল। ধর্মের লেবাসে ইয়াবা পাচার করতে গিয়ে রশিদ ১২ বছরে এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ধরা পড়েছেন।

রশিদ আহম্মদ এবং ফরিদ আহম্মদ (৫২) নামে দুজনকে সোমবার (১৬ এপ্রিল) ভোরে চট্টগ্রাম নগরীর কোতয়ালী থানার ফিরিঙ্গিবাজার ব্রিজঘাট এলাকা থেকে গ্রেফতার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। ধর্মের লেবাস ধারণ করে দুজনের ইয়াবা পাচার আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (মেট্রো) শামীম আহমেদ সারাবাংলাকে জানিয়েছেন, আটকের পর দুজনের কাছে ধর্মীয় পেশাক পরার কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যাতে সন্দেহ না করে সে জন্য তারা এই বেশ নিয়েছেন।

রশিদ আহম্মদ কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার নোয়াখালী পাড়ার ইলিয়াস কোবরা মার্কেটের মৃত আমির হামজার ছেলে। ফরিদ একই এলাকার মৃত আব্দুস শুক্কুরের ছেলে।

সূত্রমতে, জিজ্ঞাসাবাদে রশিদ আহম্মদ জানান, তিনি আগে টেকনাফে টমটম চালাতেন। ২০০৬ সালের দিকে তিনি ইয়াবা পাচারে জড়িয়ে পড়েন। মিয়ানমার থেকে জাহাঙ্গীর নামে একজন তাকে ইয়াবা এনে দেন। তিনি সেই ইয়াবা চট্টগ্রাম নগরীতে এনে বিক্রেতাদের কাছে দিতেন। গত ৫-৬ বছর ধরে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন ফরিদ।

রশিদ জিজ্ঞাসাবাদে জানান, তিনি নিয়মিত ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করলেও আগে ধর্মীয় পোশাক পরতেন না। দুই-তিনবার ইয়াবা নিয়ে চট্টগ্রাম নগরীতে আসার সময় পুলিশের তল্লাশির মুখে পড়ে গ্রেফতার এড়াতে পারলেও তার মধ্যে ভয় ঢুকে যায়। তিনি দেখতে পান, যেসব নারী বোরখা পরা আছেন তাদের পুলিশ তল্লাশি করছে না। যেসব পুরুষ ভালো পোশাক, বিশেষ করে ধর্মীয় পোশাক পরে আছেন তাদেরও পুলিশ তল্লাশি করছে না। এরপর তিনিও ধর্মীয় পোশাক পরা শুরু করেন।

জিজ্ঞাসাবাদে ফরিদ জানান, ইয়াবা পাচারে যুক্ত হওয়ার পর তিনি রশিদের পরামর্শে ধর্মীয় পোশাক পরছেন। ফরিদের এক ছেলেও ইয়াবা পাচারে যুক্ত আছেন।

শামীম আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, গত বছর কক্সবাজারে ইয়াবাসহ রশিদ ও ফরিদ ধরা পড়েছিলেন। প্রায় এক বছর জেল খেটে বের হয়ে তারা আবারও ইয়াবা পাচারে জড়িয়ে পড়েছেন। তবে কৌশল আগের মতোই।

তিনি বলেন, মাথায় টুপি। গলায় হাজী চাদর দেখে কেউ বলবে না যে তারা কোনো খারাপ কাজের সঙ্গে যুক্ত। এমন পরিপাটি পোশাকের ইয়াবা পাচারকারী আমরা আগে পায়নি। আমরা তো সাধারণত এই ধরনের পোশাক পরা লোকজনকে সন্দেহের আওতায় রাখি না।

তবে চার মাস আগে প্রায় ৭০ বছর বয়সী এক ইয়াবা পাচারকারীকে আটক করেছিল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। ওই পাচারকারীও ধর্মের লেবাসে নিজের অপরাধ আড়াল করার কৌশল নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন শামীম আহমেদ।

সূত্রমতে, সম্প্রতি চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ একটি মোটর সাইকেলের ভেতর থেকে ৩৫ হাজার ইয়াবাসহ একজনকে আটক করেছিল। জিজ্ঞাসাবাদে ওই পাচারকারী পুলিশকে জানিয়েছিল, টেকনাফের একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ইয়াবাগুলো নগরীতে পাঠিয়েছেন।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (বন্দর) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ সারাবাংলাকে বলেন, ধর্মকর্মের ধারেকাছে নেই। কিন্তু লেবাসটা নিচ্ছেন ধর্মীয়। কারণ এই লেবাসের লোকজনকে সাধারণত মানুষ সম্মান করে। আসলে খারাপ মানুষগুলো ধর্ম কিংবা ভালো মানুষের লেবাস ধরছেন খারাপ কাজ করে পার পাবার জন্য।

তিনি বলেন, ইয়াবা বিক্রেতা কিংবা পাচারকারীদের নানা রকমের কৌশল আছে। কেউ পায়ূপথে নিয়ে আসেন। কেউ গাড়ির ভেতরে গোপন কুঠুরি বানিয়ে নিয়ে আসেন। কেউ সুপারি-নারকেলের ভেতরে করে নিয়ে আসেন। আর কেউ ভালো মানুষ সেজে নিয়ে আসেন। ইয়াবা পাচারকারীদের এতো কৌশল মোকাবেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।

সারাবাংলা/আরডি/এমআই

একযুগ ধরে ‘ধর্মের লেবাসে’ ইয়াবা পাচার
একযুগ ধরে ‘ধর্মের লেবাসে’ ইয়াবা পাচার