বুধবার ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ৪ আশ্বিন, ১৪২৫, ৮ মুহররম, ১৪৪০

ওয়েলকাম টু কানাডা। বরফের দেশে, ভ্যাবদা’র বেশে. . .

সেপ্টেম্বর ৪, ২০১৮ | ৪:৩৭ অপরাহ্ণ

তানভীর নাওয়াজ।।

টরেন্টো পিয়ারসন এয়ারপোর্টে লাগেজ নিয়ে বের হয়েই স্যুটের পকেট থেকে সিগারেট বের করলাম। আমার মতো চেইন স্মোকারের জন্য প্রায় বারো ঘন্টা সিগারেট না খেয়ে থাকা বিরাট বিরক্তিকর এবং কঠিন ব্যাপার। সিগারেটের প্যাকেট বের করে আশেপাশে দেখলাম, কেউ স্মোক করছে কিনা, ঢাকা এয়ারপোর্টে লাইটার রেখে দেয়। দেখি কোনায় দাড়িয়ে একটা ছেলে স্মোক করছে।

ক্যান আই হ্যাভ ইওর লাইটার প্লিজ?
ছেলেটা হাতে ধরা ম্যাচবক্সটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো।
লাগেজ এর ওপর হ্যান্ডব্যাগ রেখে আমি সিগারেট ধরালাম। লম্বা একটা টান! আহ্! শান্তি! ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে মুখ ঘুরিয়েছি দেখি আমার থেকে একটু দূরে এক বয়স্ক ভদ্র মহিলা দাড়িয়ে আছেন। চোখাচোখি হওয়াতে আমি হালকা একটা হাসি দিয়ে বললাম-
ওহ আই ওয়াজ ডাইং ফর এ স্মোক! ইট ওয়াজ এ লং এ্যান্ড টায়ারিং ফ্লাইট ইউ নো?
উনি আমার থেকেও প্রসারিত হাসি দিয়ে উত্তর দিলেন, ইফ ইউ স্মোক, ইউ উইল ডাই ইভেন সুনার ইয়াং ম্যান। ওয়েলকাম টু ক্যানাডা। টেইক অফ ইওর জ্যাকেট, ইউ আর সোয়েটিং।
ভদ্র মহিলার কথায় আমি খানিকটা ভ্যাবদা মেরে গেলাম। জুন মাসের সকাল। ১০ টার মতো বাজে। বেশ গরম। উনি বলার পর আমি খেয়াল করলাম আমার কপাল থেকে টপটপ করে ঘাম বেয়ে পড়ছে। বাইশ ঘন্টার একটা জার্নি তাও আবার জুন মাসে, কাফলিং দেয়া শার্ট আর স্যুট পড়ে করার কোনো মানেই হয় না। নিজেকে হৃষ্টপুষ্ট ভদ্রলোক প্রমাণ করার জন্য আমি নিজেই স্যুট পড়েছি। এর আগের বার জিন্স আর টিশার্ট পড়ে এসেছিলাম, ইমিগ্রেশান এর হোয়াইট লেডি অফিসার আমার ক্লান্ত চেহারা আর বেশভুষা দেখে রীতিমতো বিষ্ময়ের সাথে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি কেনো মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে দুবার কানাডা এসেছি? পরে অবশ্য ছেড়েও দিয়েছিলো কিন্তু তার চোখে মুখে দেখা অবিশ্বাস আমার এখনো মনে আছে! তাই এবার ফ্লাই করার কদিন আগে গুগলে সার্চ করেছি, ‘হাউ টু ইমপ্রেস এ কানাডিয়ান ইমিগ্রেশান অফিসার’, অনেক সাজেশান এর মধ্যে একটা ছিলো, ‘ড্রেস নাইসলি এ্যান্ড বিয়ার এ স্মাইল অন ইওর ফেইস’।
আমার মতো ভ্যাবদা বাঙালির কাছে ড্রেস নাইসলি মানে, স্যুট পড়ে ফেলা। আমার একটাই স্যুট ঠিকঠাক পড়নে লাগে, বাকিগুলো সব টাইট। শ্বশুড়বাড়ি থেকে পাওয়া ওটা। কি মনে করে যেনো টেইলর মাষ্টার আমার থেকে দু সাইজ বড়ো বানিয়েছিলো। তিন বছরে আমিও দুই সাইজ মোটা হয়েছি, এখন লাগে ঠিকঠাক তবে আশপাশ দিয়ে এখনো একটু ঢিলেঢালা হয় আমার ধারণা। আমি সেটা পড়েই প্লেনে চড়ে বসেছি। সিনেমায় দেখা স্টাইলে সিটে বসার সময় স্যুটটা খুলে সামনে দাঁড়ানো কেবিন ক্রু’র দিকে বাড়িয়ে দিলাম প্লেনের এয়ারহুক কোট হ্যাঙ্গারে রাখার জন্য। ‘ইতিহাদ’ এর কেবিন ক্রু আমার দিকে দুঃখ দুঃখ চেহারা নিয়ে তাকিয়ে ধরা গলায় বললো, সরি স্যার, উই ডোন্ট হ্যাভ স্পেস ফর দি ইকোনোমি ক্লাস! ইউ ক্যান কিপ ইট ইন দি ওভারহেড ইফ ইউ ওয়ান্ট।
আমি আমার ইকোনোমিক স্ট্যাটাসে অভিমানী হয়ে গেলাম। ওভারহেডে স্যুট রাখলে ইস্ত্রি নষ্ট হয়ে যাবে। কানাডিয়ান ইমিগ্রেশান অফিসারকে কুঁচকানো স্যুট দিয়ে ইমপ্রেস করা সহজ হবে না। আমার পাশের লোকটা মিটমিট করে হাসছে। কেবিন ক্রু আমার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছে। আমি স্যুটটা আবার গায়ে চাপাতে চাপাতে বেশ গম্ভীর ভাবে বললাম, আই থিংক আই এ্যাম ফিলিং কোল্ড। বলেই স্যুটের বাটন লাগিয়ে বসে পড়লাম। পুরো বাইশ ঘন্টা আমি স্যুট পড়ে জার্নি করে টরেন্টো চলে আসলাম।
এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশানে যাওয়ার আগে বাথরুমে গিয়ে আয়নায় স্যুট দেখে হতভম্ব হয়ে গেলাম। মনে হচ্ছে এই স্যুট কোনদিন ইস্ত্রি কি জিনিস দেখে নাই। ডান কাধেঁর দিকে আবার খানিকটা ‘মানবলালা’র দাগ লেগে আছে। আবুধাবী থেকে তিন সিটের মাঝেরটায় ছিলাম আমি। আমার ডানপাশে এক কবি ছিলেন। উগান্ডার কবি। সারাটা পথ মোটামুটি কাব্যচর্চা আর পানীয় পানে ব্যস্ত ছিলেন। মাঝে মাঝে ঝিমুতে ঝিমুতে আমার ডান কাঁধে ওনার মাথা এলিয়ে দিয়ে বিড়বিড় করে ‘দিজ প্লেন উইল ক্র্যাশ’ বলতে বলতে ঘুমিয়ে যেতেন। আমি আবার মায়া করে ওনার ঘুম ভাঙাইনি, উনিও মায়া করে একগাল লালা আমার স্যুটে লাগিয়ে দিয়ে গেছেন।
শ্বশুরবাড়ির স্যুট, উগান্ডার মানবলালা, একটা এ্যাটাচি আর একটা হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে পিয়ারসন এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশানের লাইনে দাঁড়িয়ে আমি দূর থেকে মায়া মায়া চেহারার ইমিগ্রেশান অফিসার খুঁজতে থাকি। আমি যে লাইনে দাঁড়ানো তার থেকে তিন সারি পর একটা বুথে একটা মঙ্গোলিয়ান মেয়ে ইমিগ্রেশান অফিসার হাসি হাসি মুখ করে বসে আছে। তার সামনে কেউ নেই। আমি তার হাসি মুখ দেখে লাফ দিয়ে ওইদিকে চলে যাই। মেয়েটাও আমাকে দেখে হেসে দিয়ে গুড মনিং বলে। আমি হাসি দেখে আস্বস্ত হই।
গুড মর্নিং মাই ডিয়ার বলে হলুদ দাতেঁর পাটি বের করে হাসি দিয়ে পাসপোর্ট আর ইমিগ্রেশান ডকুমেন্ট এগিয়ে দেই। মেয়েটা হাসি বন্ধ করে দিয়ে গম্ভীর হয়ে আমার পাসপোর্ট উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখে। তারপর তার হাসি ফিরে আসে। আমিও ভ্যাবলা মার্কা হাসি দিয়ে থাকি।
ডু ইউ হ্যাভ সিগ্রেট উইথ ইউ স্যার?
ইয়েস। ওয়ান কার্টুন। আই অলরেডি হ্যাভ ডিক্লেয়ারড দ্যাট।
ডু ইউ হ্যাভ মোর দেন হোয়াট ইউ হ্যাভ ডিক্লেয়ারড স্যার?
নো।
ওকে থ্যাংকস। ওয়েলকাম টু কানাডা। ইনজয় ইওর স্টে।
কুচঁকানো থ্যাবড়ানো স্যুটে কাজ হয়েছে। ‘থ্যাংক ইউ সো মাচ’ বলেই আমি পাসপোর্ট নিয়ে একরকম দৌড়ে বের হয়ে লাগেজ বেল্টে চলে আসলাম। বাংলাদেশ থেকে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার আর বাংলাদেশ প্রতিদিন পেচিঁয়ে ছয় কার্টুন আর আবুধাবী থেকে আরও এক, টোটাল সাত কার্টুন সিগারেট নিয়ে এসে ডিক্লেয়ার করেছি এক কার্টুন। ধরা পরার ভয়ে আর সিগারেট ধরানোর তাড়নায় আমি কুচকানো স্যুট খুলতে ভুলে গেছি।
আর ইউ ফ্রম এনডেয়া?
মহিলা’র প্রশ্নে আমি ঘুরে তাকাই।
নো।
ওহ, ইউ লুক লাইক এন এনডিয়ান টামিল (তামিল)। আই হ্যাভ এ টামিল নেইবার, ইউ লুক এ লট লাইক হিম। অল দা টামিল’স লুক সেইম!
আমি না শোনার ভান করে সিগারেটে বড়ো বড়ো টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে থাকি। ঘনো ধোয়ায় পরিবেশ ধোয়াচ্ছন্ন। নিজেকে এনডিয়ান টামিল শুনতে আমার ভালো লাগেনি, হাতের আধ খাওয়া সিগারেটটা পাশের বিনে ফেলে দিয়ে আমি ভদ্রমহিলার দিকে এগিয়ে যাই, গিয়ে ওনার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলি- হাই, আই এ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ। নট ফ্রম ইন্ডিয়া। উই আর নেইবরিং কান্ট্রি বাই দা ওয়ে।
ভদ্রমহিলা আলতো করে আমার হাত ধরে হ্যান্ডশেক করতে করতে বলেন, ও রিয়েলি? আই হার্ড দ্যাটস এ বিউটিফুল কান্ট্রি! ইউ হ্যাভ দা লংগেষ্ট সি বীচ অফ দা ওয়ার্ল্ড!
সাথে সাথে আমার মন ভালো হয়ে গেলো। আমি ভদ্র মহিলার দিকে তাকিয়ে হাসলাম। এরমধ্যে এক বয়স্ক ভদ্রলোক তার দিকে এগিয়ে আসলেন। দুজন দুজনকে দেখে হাসছেন, আমি তাদেরকে দেখে হাসছি। ভদ্রমহিলা আমাকে হাত নেড়ে বিদায় দিয়ে ভদ্রলোকের সাথে সামনে এগিয়ে গেলেন। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের চলে যাওয়া দেখছি। হঠাৎ ভদ্র মহিলা ঘুরে আমার দিকে তাকিয়ে ইশারায় আমার সুট্যের দিকে দেখালেন। সম্ভবত খুলতে বললেন। আমি চমকে উঠলাম। একটা মধুর সুরের মতো ওনার কন্ঠস্বরটা আমার কানে বাজতে লাগলো। ‘ওয়েলকাম টু কানাডা’।
আমি পরনের স্যুটটা খুলে ব্যাগের উপর রাখলাম। বিদেশ আমার কখনোই ভালো লাগেনা, আপন মনে হয় না, আজ কেনো জানি কানাডা আমার খুব ভালো লাগলো। আমি বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলাম।
রাসেল ভাই আমাকে পিক করতে আসার কথা। ওনার গাড়ি দেখা যাচ্ছে। গাড়ির ভেতর থেকে রাসেল ভাই হাত নেড়ে আমাকে ইশারা করলেন। আমি আমার বাক্স পেটরা নিয়ে নতুন জীবনের খোঁজে হাঁপাতে হাঁপাতে ওনার গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম। শুধু মনে মনে নিজেকে বললাম; ওয়েলকাম টু কানাডা। বরফের দেশে, ভ্যাবদা’র বেশে. . .

[ধুমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর]
টরেন্টো, কানাডা থেকে।

সারাবাংলা/পিএম

ওয়েলকাম টু কানাডা। বরফের দেশে, ভ্যাবদা’র বেশে. . .
ওয়েলকাম টু কানাডা। বরফের দেশে, ভ্যাবদা’র বেশে. . .