বুধবার ২০ জুন, ২০১৮, ৬ আষাঢ়, ১৪২৫, ৫ শাওয়াল, ১৪৩৯

কটেশ্বরের দমকা পাহাড়ি হাওয়া কেড়ে নিলো ৫১ প্রাণ!

মার্চ ১৩, ২০১৮ | ১১:৪৬ অপরাহ্ণ

মাহমুদ মেনন, নির্বাহী সম্পাদক

ঢাকা: কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তজার্তিক বিমানবন্দর (টিয়া)র রানওয়ে একটাই। এই রানওয়েকে উড়োজাহাজ ওঠানামার সুবিধার্ধে দুটি জোনে ভাগ করা হয়েছে। সেটি মূলত কোনও আলাদা রানওয়ে বা স্থান নয়, একই রানওয়ের স্রেফ দুটি আলাদা দিক। যার একটিকে ‘২০’ আরেকটিকে ‘০২’ দিয়ে কোডেড কিংবা নামকরণ করা। গ্রাউন্ডে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি) থেকে যখন যেটি যে ফ্লাইটের জন্য সুবিধাজনক কিংবা সঠিক মনে করে সেটিকেই গ্রিন সিগন্যাল দেয়। আর সে অনুযায়ী সেটি নামে কিংবা ওঠে।

তবে ত্রিভুবনে যারা নিয়মিত যাতায়ত করেন, তারা একটু খেয়াল করলে দেখতে পাবেন অধিকাংশ সময়ই অবতরণে বাঘমতি করিডোর কিংবা কাঠমাণ্ডু ভ্যালির দিকটি দিয়ে উড়োজাহাজ গুলো নামে। এটি ‘রানওয়ে ২০’ কোডে চিহ্নিত।

আর যেদিকটা কটেশ্বর মহাদেবস্থান মন্দিরের ওপর দিয়ে সেটি ‘রানওয়ে ০২’ নামে চিহ্নিত। এদিকটা ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। তার প্রধান কারণই হচ্ছে এই অংশটি খাড়া খাড়া পাহাড়ে ঘেরা। সুতরাং উড়োজাহাজগুলো ওঠা নামায় চূড়ান্ত সতর্কতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রকৃতির সহযোগিতাও খুব দরকার। যেমন শীতকালে কুয়াশার, কিংবা ঘণ বর্ষার দিনগুলোতে এই রানওয়ে ব্যবহার করা কোনওভাবেই সম্ভব হয় না। গ্রীস্মে এই রানওয়ে ব্যবহার করা যায়, তার একটাই কারণ ভিজিবিলিটি।

এ দিক দিয়ে অবতরণে উড়োজাহাজগুলো মেলে দেওয়া আকাশটা পায় না। ফলে আল্টিটিউড থেকে অনেকখানি খাড়া হয়ে নিচে নেমে আসতে হয়। তারপরে ল্যান্ডিং অ্যাপ্রোচে যেতে হয়। যা ঝুঁকির, তা মানতে দ্বিধা থাকার কথা নয় কোনও বিশেষজ্ঞেরই।

আমরা দেখেছি ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজটি এই রানওয়ে ০২ তে নামতে গিয়েই বিধ্বস্ত হয়েছে।

তবে গ্রীষ্মে উড়োজাহাজ অবতরণের ক্ষেত্রে টেলউইন্ড একটা বড় ফ্যাক্টর। টেলউইন্ড যদি বেশি থাকে তাহলে এই অংশ দিয়ে অবতরণ হয় পুরোটাই ঝুঁকিপূর্ণ সেক্ষেত্রে অনেক সময়ই দিক পাল্টে বাতাসের চাপের বিপরীতে অবতরণ করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এই টেলউইন্ডেরও রয়েছে মাত্রার হিসাব। ‘নট (Knot)’ যার পরিমাপের একক।

মঙ্গলবার এটিসি ও বিএস-২১১ এর ক্যাপ্টেনের মধ্যে কথপোকথনের যে টেপ এরই মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে তাতে এই কটি শব্দই বার বার শোনা গেছে- ‘রানওয়ে ২০, ০২, ভিজিবিলিটি, টেলউইন্ড, ডাউনউইন্ড, নট’

ইউএস-বাংলার বোম্বারডিয়ার কিউ-৪০০ এর পাইলটের সঙ্গে এটিসির কথপোকথনকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা অস্বাভাবিক বলেই উল্লেখ করেছেন। ফ্লাইট গ্লোবাল নামের একটি প্রতিষ্ঠান এমন মত দিয়ে কথপোকথনের পূর্ণ বিবরণ তুলে ধরেছে।

তাতে বলা হয়েছে- কিউ-৪০০ (ফ্লাইট নং বিএস-২১১) কে প্রথমে ০২ রানওয়েও অবতরণের জন্য বলা হয়। বলা বলা হয় ২২০ ডিগ্রি কৌনিক থেকে ৭ নট বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। আর টেলউইন্ড ৬ নটে রয়েছে। ততক্ষণে কন্ট্রোল রুম থেকে অপর একজন বিএস-২১১ কে রানওয়ে ২০তে অবতরণের জন্য ক্লিয়ার করা হয়েছে বলে জানায়। কিন্তু তার এক মিনিটের মধ্যেই আরেকটি এয়ারক্র্যাফট অবতরণের অ্যাপ্রোচে চলে আসে। তখন টাওয়ার থেকে বিএস-২১১ কে জানতে চাওয়া হয় কোন রানওয়েটি ব্যবহার করতে চান ০২ নাকি ২০। এতে পাইলট বিভ্রান্ত হন। বিভ্রান্তি আরও বাড়ে যখন তাকে প্রথমে ডাউনউন্ড প্যাটার্নে রানওয়ে ২০’র জন্য নামতে বলে পরক্ষণেই তা আবার পাল্টে ডাউনউইন্ড প্যাটার্নে ০২ রানওয়েতে নামার জন্য বলা হয়। একই সাথে অপর যে ফ্লাইটটি ছিলো তাকেও ০২ রানওয়েতে নামার জন্য ক্লিয়ার করা হয়।

পরপরই বিএস-২১১কে ল্যান্ডিং না করে রানওয়ে ২০’র জন্য স্থিত অবস্থায় থাকতে বলা হয়। কিন্তু পাইলট তার উত্তরে জানান, তিনি রানওয়ে ০২ এর দিকে যাচ্ছেন।

এরপর একটু উত্তেজিত কণ্ঠে কন্ট্রোলার যখন আবারও ডান দিকের ডাউনউন্ডে নেমে রানওয়ে ০২তে যেতে বলেন, পাইলট সেটা মেনে নেন। অন্য এয়ারক্র্যাফটিও তখন ০২ রানওয়ে ব্যবহারের জন্য ল্যান্ডিং ক্লিয়ারেন্স চায়।

তখন কন্ট্রোলার বিএস-২১১ কে বলতে থাকেন, আমি বলছি রানওয়ে ২০’র দিকে যাবেন না। পাইলট তার উত্তরে জানান তিনি রাইট-হ্যান্ড অরবিটে রানওয়ে ০২ ধরে রাখছেন।

এতে কন্ট্রোলার সায় দিয়ে বলেন, ওকে ঠিক আছে। তবে এখনই ল্যান্ড করবেন না।

মিনিট খানেক পর কন্ট্রোলার বিএস-২১১’র কাছে জানতে চান কোন রানওয়েটি পাইলট ব্যবহার করতে চান। পাইলট জানান তিনি রানওয়ে ২০ ব্যবহার করতে চান। কন্ট্রোলার তখন রানওয়ে ২০-তে ল্যান্ড করার জন্য বিএস-২১১ কে ক্লিয়ারেন্স দেন এবং জানান ২৭০ ডিগ্রি কৌনিকে ৬ নট বাতাস বইছে। পাইলট এ পর্যায়ে আরেকবার জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হয়ে নেন যে, তাকে ল্যান্ডিংয়ের জন্য ক্লিয়ার করা হয়েছে।

তখনই কন্ট্রোলার তার কাছে ভিজিবিলিটির বিষয়ে জানতে চান। পাইলট ‘নেগেটিভ’ জবাব দিলে তিনি উড়োজাহাজটি ডান দিকে ঘুরিয়ে নিতে বলেন। আর আবারও জানতে চান, তখনও পাইলট চোখে রানওয়ে দেখতে পাচ্ছেন কি না।

কিন্তু তখন পাইলট সে বিষয়ে জবাব না দিয়ে ল্যান্ডিং ক্লিয়ারেন্স চান, এবং কন্ট্রোলার তাতে অনুমতি দেন। ঠিক ওই সময়ে দুই জনের কেউই মুখে উচ্চারণ করেন নি, ঠিক কোন রানওয়েটির কথা তারা বলছেন।

পাইলট একটু পর ফের যখন তার ল্যান্ডিংয়ের ঘোষণা দেন, তখন তিনি বলেন রানওয়ে ০২ এ ল্যান্ড করছেন, ২০ এ নয়। কন্ট্রোলার তখন সাথে সাথে উচ্চারণ করেন, রজার, রানওয়ে টু ক্লিয়ারড টু ল্যান্ড’।

উড়োজাহাজটি ততক্ষণে ০২ রানওয়ের ল্যান্ডিং অ্যাপ্রোচে চলে আসে। ঠিক তখনই কন্ট্রোলার উত্তেজিত কণ্ঠে বাংলাস্টার ২১১ আমি আবারও বলছি ঘুরে যান। কিন্তু পাইলটের তরফ থেকে তার কোনও উত্তর আসে আসে না।

এরপর ২টা ১৮ মিনিটে উড়োজাহাজটি রানওয়ে ০২ এ নামে ও পরপরই বিধ্বস্ত হয়।

কথপোকথন থেকে এটা নিশ্চিত যে, এটিসির সঙ্গে ক্যাপ্টেনের যোগাযোগে বিভ্রান্ত হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত মূল ভিলেন কি ওই টেলউইন্ড? যার মাত্রা ছিলো ৬ ‘নট’।  আর ওই ভিজিবিলিটি প্রসঙ্গ। সেটিও প্রশ্নবিদ্ধ।

রানওয়ে ০২ একেই ছিলো বিপজ্জনক, তায় আবার টেলউইন্ড বেশি ছিলো, ফলে সেই পথে নামতে গিয়ে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে বলেই ধারণা করা যায়।

তাহলে জেনে নেওয়া যাক দুর্ঘটনার সময়ে আবহাওয়ার খবর:

ফ্লাইট গ্লোবাল কাঠমাণ্ডু আবহাওয়া দফতরের বরাতে বলেছে- ঠিক যখন বোম্বার্ডিয়ার কিউ-৪০০ ক্র্যাশ করে তখন হিমালয়ে ঝড়-বৃষ্টি চলছিলো। আর বাতাসটিও বইছিলো এলোমেলোভাবে। পশ্চিম দিক থেকে আসা দমকা হাওয়াকে এভিয়েশনের ভাষায় ক্রসউইন্ড নামে ডাকা হয়। আকাশে মেঘ ছিলো, আর ছিলো বর্জ্যবিদ্যুৎ। এতে ভিজিবিলিটি কমে প্রায় ছয় কিলোমিটারে নেমে এসেছিলো।

প্রতিটি পাইলট জানেন, টেলউইন্ড একটি উড়োজাহাজের অবতরণের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির। বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে রানওয়ে অনেক বেশি দীর্ঘ নয় সেখানে সমূহ বিপদ। পেছনে বাতাসের চাপ নিয়ে অবতরণ করলে তা উড়োজাহাজটিকে তার স্বাভাবিক গতির চেয়েও অনেক দ্রুত সামনে এগিয়ে দেয়। এ অবস্থায় দুর্ঘটনা এড়ানোর স্রেফ দুটি উপায় বলে আন্তর্জাতিক পর্যাযের বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন- এক. অভিজ্ঞতা দুই. নিয়ন্ত্রণক্ষমতা।

আমরা কথপোকথনে শুনেছি টেলউইন্ডের মাত্রা ছিলো ৬ নট। আর সাধারণ হিসাব মতে প্রতি ২ নট টেল উইন্ডে অবতরণকালে ফ্লাইটের গতিবেগ বেড়ে যায় ১০ শতাংশ। তার মানে ৬ নট টেল উইন্ডে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিএস-২১১ ফ্লাইটটি অবতরণকালে তা রানওয়েতে টাচ ডাউনে উড়োজাহাজটির গতি স্বাভাবিক গতির চেয়ে ৩০ শতাংশ বেশি ছিলো। আবহাওয়া দফতর জানাচ্ছে বাতাস বইছিলো এলোমেলোভাবে। ধরেই নেওয়া যায়, যা পাইলটের পক্ষে সামলানো সম্ভব হয়নি। আর তাতে যা হবার তাই হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিশেজ্ঞদের মতে টেল উইন্ড ৫ নটের বেশি হলে যে কোনও ল্যান্ডিংই হবে ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের পরামর্শও থাকে এ অবস্থায় টেলউইন্ডে অবতরণ না করে ফ্লাইট ঘুরিয়ে নিয়ে হেডউইন্ডে অবতরণ করা।

যে ঘুরিয়ে নেওয়ার কথা শেষ মূহূর্তে হলেও আমরা এটিসি থেকে চিৎকার করে বলতে শুনেছি।

তবে ত্রিভুবনের এই ০২ রানওয়েতে ল্যান্ডিং অ্যাপ্রোচ থেকে ঘুরিয়ে নিতে গেলে তার জন্য যতটা প্রশস্ত আকাশ প্রয়োজন তা নেই। ফলে তাতেও বিপদ ঘটতেই পারতো।

কটেশ্বর মহাদেবস্থান মন্দিরের এ দিকটা খাড়া খাড়া পাহাড়ে ঘেরা। ফলে ওই সব পাহাড়ের একটিতেও আঘাত লাগতে পাড়তো উড়োজাহাজটির।

সম্ভবত শেষ মূহূর্তে সে ঝুঁকিটি না নিয়ে বরং টেলউইন্ড আর ক্রস উইন্ডকেই সামলাতে চেয়েছিলেন দক্ষ বলে সুপরিচিত ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতান। যাকে বলাই হতো ‘মাস্টার অব ল্যান্ডিং’।

কিন্তু কটেশ্বরের দমকা পাহাড়ি হাওয়া সে সুযোগ তাকে দেয়নি, সেটাই শেষ কথা। যার পরিণতি ৫১ প্রাণ।

সারাবাংলা/এমএম

কটেশ্বরের দমকা পাহাড়ি হাওয়া কেড়ে নিলো ৫১ প্রাণ!
কটেশ্বরের দমকা পাহাড়ি হাওয়া কেড়ে নিলো ৫১ প্রাণ!