সোমবার ১৮ জুন, ২০১৮, ৪ আষাঢ়, ১৪২৫, ২ শাওয়াল, ১৪৩৯

কালিদাস কর্মকারের সঙ্গে এক ঝলক

ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৮ | ১:৫৬ অপরাহ্ণ

তুহিন সাইফুল ও মেহেদী হাসান

কালিদাস কর্মকারের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যায় শহীদ মিনার চত্ত্বরে। বেদিতে ফুল দিয়ে একা খালি পায়ে হেঁটে আসছিলেন। মাত্র একদিন আগেই তিনি নিয়েছেন একুশে পদক। দেশে তার পরিচিতি ইউরোপীয় আধুনিকতার নিরীক্ষাধর্মী চিত্রশিল্পী হিসেবে। অতীন্দ্রিয়বাদী হিসেবেও যথেষ্ঠ সুনাম রয়েছে তার। ফরিদপুর শহরের নিলটুলিতে জন্ম নেয়া এই শিল্পী দেশে-বিদেশে কমপক্ষে ৭১টি চিত্রপ্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। সেসব অবদানের ও অর্জনের জন্যই তিনি ভূষিত হয়েছেন বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদকে। প্রভাতফেরিতে এসে সারাবাংলা নিউজ টিমের সঙ্গে বলছিলেন ভাষা সংস্কৃতি নিয়ে কিছু কথা। সঙ্গে ছিল একুশে পদক প্রাপ্তির অনুভূতিও।

আমাদের জাতীয় জীবনে একুশের প্রভাবকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

যেকোন দেশের মুক্তি আন্দোলন বা স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে আমাদের দেশের মুক্তির আন্দোলন অনেক ভিন্ন। আমরা ভাষার জন্য সংগ্রাম করেছি, রক্ত দিয়েছি। সেই ভাষাকে আমরা রাষ্ট্রভাষা করতে পেরেছি, এবং তার বীজেই অঙ্কুরিত হয়েছিলো স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল বীজ, মূলমন্ত্র। এর প্রভাব আমাদের যাপিত জীবনে রয়েছে। বিশেষ করে, তরুণদের জীবনে বায়ান্নর একটা বিরাট প্রভাব রয়েছে। আজকের যে তরুণ সমাজ, যারা স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে জন্মগ্রহণ করেছে, তারা দেশকে আমাদের চেয়েও বেশী ভালোবাসে। তাদের কর্মে মননে সৃজনশীলতায় দেশকে তারা নিয়ে আসছে। আমি অত্যন্ত আশাবাদী আমাদের দেশের এই তরুণ সমাজের প্রতি যারা দেশকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে।

অনেক তরুণ বিপথগামী হচ্ছে, অনেকে আবার ভুল রাজনীতির শিকার হচ্ছে…

ভুলপথে পরিচালিত তরুণ সংখ্যায় কম। এর জন্য দায়ী কিন্তু তরুণ সমাজ নয়। এরজন্য দায়ী পরিবার, এর জন্য দায়ী সমাজ, বর্তমান রাজনীতি, আমাদের সুশীল সমাজ। এই তরুণ প্রজন্মের ক্ষুদ্র অংশ বিপথগামী হচ্ছে তার কারণ তাদেরকে আমরা স্বাধীনতার চেতনায়, স্বাধীনতার মননে, দেশের প্রতি ভালবাসায় উদ্বুদ্ধ করতে পারছিনা। এটা তরুণদের ব্যর্থতা নয়, এটা আমাদের ব্যর্থতা। আমরা যারা ছবি আঁকি, সাহিত্য করি, যারা রাজনীতি করি তাদের উচিৎ তরুণদের মননের দিকে আরো একটু সময় দেওয়া। তারা কি ভালবাসে, কি চায় তারা, তাদের এই চেতনার উন্মেষ ঘটানোর দায়িত্ব আমাদেরই।

এই দায়িত্ব কতটুকু পালন করা হচ্ছে?

হয়তো সম্পূর্ণভাবে পালন হচ্ছে না। কিন্তু আমি আশাবাদী। স্বাধীনতার পর আমাদের দেশে একগজ কাপড় বানানো যেতো না, একটা অ্যালুমুনিয়ামের বাটি তৈরি করা যেতো না, সেই দেশ আজ গার্মেন্টস উৎপাদনে দ্বিতীয় বৃহত্তম, আমাদের জীবনযাত্রার মান, আয়ু বেড়ে গেছে। আজকে পৃথিবীর এমন কোন দেশ নেই যেখানে বাংলাদেশিরা থাকেনা, কাজ করে না। তাদের প্রেরিত রেমিট্যান্সে দেশের, বিশেষত গ্রামের অনেক উন্নতি হয়েছে। আমি মনে করি যতটুকো দূর্যোগ আছে তা কেটে যাবে যদি আমাদের দেশে স্থায়ী সরকার থাকে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার থাকে। তাহলে তরুণদের বিপথগামীতা অচিরেই দূর হয়ে যাবে।

একুশে পদক পেয়েছেন, কেমন লাগছে?

যারা সৃষ্টিশীল কাজ করেন, ছবি আঁকেন, গান করেন, সাহিত্য রচনা করেন, তাদেরকে যেকোন সম্মান অনুপ্রেরণা দেয়। যে পদক রাষ্ট্র আমাকে দিয়েছে, তা আমাকে অনুপ্রাণিত করবে, আমার শিল্পকর্মকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, মননশীলতায় দেশের কথা বলতে চেষ্টা করবে।

তরুণ শিল্পীদের জন্য একুশে পদক পাওয়া কালিদাস কর্মকারের কি কিছু বলার রয়েছে?

বাংলাদেশের তরুণ শিল্পীরা আমাদের চেয়েও বেশি মেধাবী। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কাজকর্ম দেখে তারা নিজেদের ঋদ্ধ করেছেন, তাদের চেতনাকে সমৃদ্ধ করেছেন, আমি বাংলাদেশের তরুণ শিল্পীদের শিল্পকর্ম দিয়ে নিজে প্রভাবিত। আমি মনে করি বাংলাদেশের তরুণ শিল্পীদের মান আন্তর্জাতিক মানের। কিন্তু আমাদের আন্তর্জাতিক মানের প্রচার এবং প্রসার নেই। এর জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। একটা জাতীয় চিত্রশালা করতে হবে, বাংলাদেশ ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট করতে হবে। শিল্পীদের একটা স্থায়ী প্লাটফর্ম দিতে হবে। তাহলেই তরুণরা আরো এগিয়ে যাবে।

সারাবাংলা/টিএস/এমএম

কালিদাস কর্মকারের সঙ্গে এক ঝলক
কালিদাস কর্মকারের সঙ্গে এক ঝলক