সোমবার ২৮ মে, ২০১৮ , ১৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫, ১১ রমযান, ১৪৩৯

‘কুমিল্লাকে লাশের স্তুপে পরিণত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল’

ডিসেম্বর ১২, ২০১৭ | ৯:১৭ অপরাহ্ণ

জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

`৭০-এর নির্বাচনের পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন থেকেই পাকিস্তানিরা বাঙালি সন্দেহের চোখে দেখতে থাকে। বিমাতাসুলভ আচরণ শুরু করে। আমি সে সময় ২০ বছরের তরুণ, সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট। কুমিল্লা সেনানিবাসে ছিলাম। ওই সেনানিবাসে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অধ্যুষিত পাঞ্জাবি ও পাঠানদের মেজরিটি সৈনিকদের দ্বারা একটি ইউনিট ছিল,  যেখানে আমরা মাত্র তিন বাঙালি ছিলাম। সেখানেও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা আমাদের সন্দেহের চোখে দেখতে লাগল। এবং বাঙালি ও পাকিস্তানিদের মধ্যে পরিষ্কার বিভাজন সৃষ্টি হলো। তখন থেকেই বুঝতে পারলাম, কিছু একটা হতে চলেছে। আমি ২৫ জানুয়ারি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওই ইউনিটে ডিউটি অফিসার ছিলাম। আমি দায়িত্বরত অবস্থায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে একটি ফ্যাক্স বার্তা পেলাম । সেখানে লেখা ছিল, আসন্ন সংঘর্ষে যেসব পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হবে তাদেরকে আপাতত পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে দাফন করা হবে।’

—বলছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) ইমামুজ্জামান, বীর বিক্রম। বিজয়ের ৪৬ বছরের প্রান্তে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ হওয়ার শুরুর কথা, মুক্তিযুদ্ধের কথা সারাবাংলাকে বললেন। বললেন  মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সাধারণ মানুষের সাহায্য-সহযোগিতার কথা। বললের বহু বীরের কথা, যাঁদের বীরত্বগাথা ও বিষয়টি আজো আমাদের কাছে রয়েছে অজানা-অচেনা।

২৫ মার্চের আগেই পাকিস্তান থেকে আসা এই ফ্যাক্স তাঁর মনে সন্দেহের উদ্রেক করে। ইমামুজ্জামান বলেন, ‘তখনতো কেবল মাত্র জানুয়ারি। তখনই আমার সন্দেহ হয়েছিল, কী কারণে এমন ফ্যাক্স এল?  সংষর্ঘ হতে যাচ্ছে? এবং এমন কী সংঘর্ষ হবে যে, পাকিস্তানি সেনারা নিহত হবে? এসব দেখেই আমাদের সন্দেহ হতে থাকল, পাকিস্তানিরা আমাদের হামলা করবে এবং তারই পাল্টা হামলাতে উভয় পক্ষের মানুষ মারা যাবে। এইসব দেখেই আমাদের মনে হলো, একটা যুদ্ধ পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ।’

২৫ মার্চ তিনি নিজেও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অত্যাচারের শিকার হয়েছিলেন। তবে ভাগ্যের জোরে সেদিন তিনি বেঁচে যান। আর তারপর, শরীরে তিনটি গুলি নিয়ে কোনোমতে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।  মেজর জেনারেল (অব.) ইমামুজ্জামান সে সম্পর্কে বলেন, “আমি নিজেই ২৫ মার্চের নির্যাতনের শিকার। আমাদের অফিস শেষ হয়ে যাই দুপুরেই, কিন্তু সেদিন রাতে আমাদের অধিনায়কের অফিসে ডাকা হলো; বাঙালি-পাকিস্তানি অফিসারদের। সেখানে আমাদেরকে বলা হয়, ‘ভুট্টো অ্যান্ড মুজিব বোথ আর আন্ডার অ্যারেস্ট। হোল কান্ট্রি আন্ডার কারফিউ, নট অনলি ইস্ট পাকিস্তান বাট অলসো ওয়েস্ট পাকিস্তান।’কিন্তু পরে বুঝেছিলাম, মিথ্যা কথা বলা হয়েছে আমাদেরকে। গ্রেফতার করা হয়েছে কেবল বঙ্গবন্ধুকে কিন্তু যাতে আমাদের সন্দেহ না হয় তাই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ভুট্টোর কথাও বলা হলো ।”

তিনি জানালেন, “সেদিন পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃপক্ষ কুমিল্লা শহরকে লাশের স্তুপে পরিণত করতে নির্দেশ  দিয়েছিল । সেখানে অধিনায়ক পাকিস্তানি অফিসারদের নির্দেশ দিলেন,  ‘সব অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সৈন্যদের নিয়ে সেনানিবাসের বাইরে চলে যেতে। বাইরে যাকেই দেখবা তাকেই গুলি করবা এবং সকালের মধ্যে কুমিল্লা শহরকে লাশের স্তুপে পরিণত হয়ে। আমি দেখতে চাই, কুমিল্লা শহর যেন লাশ দিয়ে ভরে যায়, তাহলে হয়তো পুরো দেশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে কাল দুপুরের মধ্যে।’ তারপর আমার, ক্যাপ্টেন নূরুল ইসলাম ও ক্যাপ্টেন সিদ্দিকীর দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘তোমরা যারা তিনজন বাঙালি অফিসার আছ, তোমরা পাশের রুমে গিয়ে বসো পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত।’ আমরা তিনজন পাশের রুমে বসা মাত্রই দরোজা আটকিয়ে লক করে প্রহরী বসিয়ে দেওয়া হলো। তখনই বুঝলাম আমাদের গৃহবন্দী করা হয়েছে— তখন বাজে রাত ১১ টা।”

‘নির্দেশ পেয়ে পাকিস্তানি অফিসাররা গোলাবারুদ, অস্ত্র আর সৈনিকদের নিয়ে গণহত্যা চালাতে বেরিয়ে পড়ল। আমাদের ঘরের ছিল কাচের জানালা। সকালে বন্দী অবস্থায় ঘর থেকে দেখতে পেলাম, কুমিল্লার জেলা প্রশাসক শামসুল ইসলাম এবং পুলিশ সুপার কবীর উদ্দীনকে ধরে আনা হয়েছে। তাদেরকে আমাদের পাশের ঘরে বন্দী করা হলো, বুঝতে পারছিলাম পাশের ঘর থেকেও…।’বলেন ইমামুজ্জামান।

এ বীরযোদ্ধা আমাদের জানালেন, কীভাবে কুমিল্লা শহর থেকে সাধারণ মানুষকে ধরে আনা হয়েছে, তাদের ওপর অত্যাচার করতে হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘২৬ মার্চ সকালে দেখলাম, কুমিল্লার বুদ্ধিজীবী অনেক মানুষকে তারা ধরে এনে মোটরগ্যারেজে বন্ধী করে রেখেছে, কাউকে বেত দিয়ে নির্মমভাবে পেটানো হচ্ছে। সকালে বলা হলো, ‘আগামী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তোমদেরকে এইভাবেই থাকতে হবে, তোমাদের খাট আনা হচ্ছে, তিনবেলা খাবারও এখানেই দেওয়া হবে।’আমরা বুঝতে পারছি, আমাদের আটক করা হয়েছে, কিন্তু কিছু করার নেই, মাঝে মাঝে অফিসাররা আসে আমাদের দেখতে।”

“পাঁচদিন পর ৩০ মার্চ বিকাল ৪টার দিকে হঠাৎ কুমিল্লা ক্যান্টেনমেন্টে গোলাগুলি শুনতে পেলাম, কিন্তু কে কাকে কোথায় গুলি করছে কিছুই বুঝতে পারছি না। এমন সময় পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন আওসাফ এ হাতে পিস্তল নিয়ে আমাদের রুমের সামনে দিয়ে পাশের রুমে ছুটে গেল, যেখানে ডিসি এবং এসপি সাহেবকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। পরক্ষণেই শুনতে পেলাম দুটি গুলির আওয়াজ। তখন ক্যাপ্টেন নূরুল ইসলাম আমার হাত ধরে বললেন, ‘ইমাম…! ডিসি আর এসপি সাহেবকে মেরে ফেলা হয়েছে।’ তাকে বললাম, ‘ডিসি-এসপি সাহেবকে মেরে ফেললে আমাদেরও মেরে ফেলবে। তাই এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, রুমের ভেতরে কে কোথায় কীভাবে পজিশন নেবেন…’ এ কথা বলতে না বলতেই পাকিস্তানি সুবেদার ফয়েজ সুলতান স্ট্যানগান নিয়ে কাচের দরোজা ভেঙে গানের নল ঠুকিয়ে গুলি করে। কিন্তু আমি প্রথম গুলি বের হবার আগেই মাটিতে শুয়ে পড়ি বুক এবং পেট মাটিতে আর পিঠ ওপর দিকে দিয়ে। আর বাকি দুজন হাতজোড় করে প্রাণভিক্ষা করলেও সুবেদার তোয়াক্কা করলেন না, মারা গেলেন দুজনই। তারপর আমার দিকে গুলি করলেন তিনি। কিন্তু যেহেতু পিঠ ওপর দিকে দিয়ে ছিলাম তাই হাতের কব্জিতে, চোখের হাড়ে একটা পিঠে তিনটা গুলি লাগলেও বুঝতে পারছিলাম আমি মারা যাইনি। প্রচুর রক্তক্ষরণ হলেও  সচেতন ছিলাম,পরে রইলাম সেভাবেই। পাঁচ থেকে দশ মিনিট পর আবার সেই ক্যাপ্টেন আওসাফ এসে একজন সিপাহীকে বললেন, আমাদের চেক করতে। সিপাহী চেক করে তাকে বলে, `সাব, তিনও খতম হো গ্যায়া…।’”

কিছুটা যেন শূন্য দৃষ্টি নিয়ে ছাদের দিকে তাকালেন ইমামুজ্জামান। এরপর ফের বলতে থাকেন, “কিছুক্ষণ পর ব্রিগেড মেজর সুলতান আমাদের কক্ষের সামনে এসে সঙ্গে থাকা পাকিস্তানি সৈন্যদের জানতে চাইলেন, আমার যারা ইউনিটে ছিলাম সেই কর্নেল ইয়াকুব আমাদের তিনজনের এ অবস্থা দেখেছেন কিনা? অন্যরা তাকে দেখেছেন জানালে তিনি হাততালি দিয়ে বলেন, ‘সারা বাঙালি খতম হো গ্যায়া…।’ তারা দরোজা লক করে তারা চলে গেল।”

তবে ভাগ্য সহায় ছিল এই বীর সেনানীর। জানালেন, গুলি লাগার পরও তিনি সচেতন ছিলেন। আর তারপরই তিনি পালানোর চিন্তা করেন। সে কথা জানা যাক তাঁর ভাষাতেই, ‘তখন সন্ধ্যা হচ্ছিল। সন্ধ্যার পর গোলাগুলি বন্ধ হয়ে গেল। তখনো আমি সেভাবে শুয়ে আছি। চিন্তা করলাম, আমাকে পালাতে হবে, নয়তো লাশ ফেলতে যখন আসবে তখন বুঝে যাবে আমি মারা যাইনি। পরিকল্পনা করলাম, গভীর রাত হলে জানালার ওপর প্রান্তে থাকা প্রহরী ঘুমাবে, সেই সুযোগটাই নেব আমি। কারণ, ঘরের ভেতর থাকলে তো আমি এমনি মারা যাব।’

‘আমাদের অফিস ছিল একটা ছোট পাহাড়ের উপর। রাত একটা-দেড়টার দিকে জানালা খুলে পাহাড় থেকে লাফ দিয়ে দৌড় দিলাম, নিচে নেমে যেতে লাগলাম। আর প্রহরী গুলি করতে লাগল। কিন্তু ভাগ্যক্রমে সে গুলি আমার গায়ে লাগল না। আমি কোনো মতে দৌড়ে ক্যান্টনমেন্টের মাঠ পেরিয়ে কুমিল্লা ব্রাহ্মণবাড়িয়া রাস্তা পার হয়ে গোমতী নদী পার হলাম সাঁতরিয়ে।  আর তারপরই সাধারণ মানুষ আমাকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে। ফজরের নামাজের দিকে গ্রামে পৌঁছাই— সেটা ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আওতার বাইরে। সেখানে মানুষ তখন নামাজ পড়ার জন্য ঘরের বাইরে এসে আমাকে দেখল। আমি তখনো সামরিক পোশাক পরিহিত, তারাই আমার কাছে জানতে চায়, আমি কুমিল্লা ক্যান্টেনমেন্ট থেকে পালিয়ে এসেছি কিনা? তাদেরকে সব জানালে ওনারাই আমার পোশাক বদলে খাবার খেতে দিলেন, তারপর নিয়ে গেলেন গ্রামের একটি চিকিৎসাকেন্দ্র নিয়ে যাবার পর হাতের গুলি বের করা হয়। গ্রামের স্কুলের একটি রুমে থাকার ব্যবস্থা হলো আমার। জানতে পারলাম মুক্তিবাহিনী গঠন হচ্ছে। ওই গ্রামে চারদিন থাকার পর আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, ‘আমাকে চিকিৎসার জন্য তারা ভারতে যেতে। ওখানকার আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রশীদ ইঞ্জিনিয়ারসহ কয়েকজন আমাকে নিয়ে যান বিএসএফ ক্যাম্পে। সেখানে যাবার পর ক্যাপ্টেন আড়ইয়া আমাকে জানান, আমার একজন সহকর্মীও সেখানে আছেন। একটু পর দেখলাম তিনি মেজর খালেদ মোশাররফ। জানলাম, মেজর খালেদ মোশাররফ বিএসএফ ক্যাম্পে ওই সময়ে গিয়েছিলেন, অপারেশন পরিকল্পনা করার জন্য। তিনি আমার কাছে কুমিল্লার পরিস্থিতি জানতে চাইলেন। পরে তিনি তাঁর গাড়িতে করেই আগরতলা জিবি হাসপাাতালে নিয়ে যান। সেখানে ভর্তি করা হলো আমাকে এবং সাতদিন থাকলাম ওই হাসপাতালে। আর এরপরই তাঁর যুদ্ধে যাবার ডাক আসে। জেনারেল ওসমানী তখন শ্রীমঙ্গলের তেলিয়াপাড়া চা বাগানে মুক্তিবাহিনীর অস্থায়ী সদর দফতরে ছিলেন। তিনি খবর পাঠালেন, আর চিকিৎসার দরকার নেই, তিনি যেন মুক্তিবাহিনীতি যোগ দেন।’

ইমামুজ্জামানকে নিয়ে মেজর হায়দার জিবি হাসপাতাল থেকে নিয়ে গেলেন শ্রীমঙ্গলে, সঙ্গে খালেদ মোশাররফ। তাঁর ভাষায়, ‘জেনারেল ওসমানী তাঁর তাৎক্ষণিক ইন্টারভিউ করেন এবং বলেন, কুমিল্লার ওপারে ভারতের অধীনে সোনামুড়াতে নতুন কোম্পানি গঠন করা হয়েছে এবং আমাকে ওই কোম্পানির অধিনায়কত্ব নিতে। এরপর আবার খালেদ মোশাররফ। খালেদ মোশাররফ আবার তাঁকে নিজের গাড়িতে করে সোনামুড়া ক্যাম্পে নিয়ে এলেন ১৫ এপ্রিল। সেখান থেকে দুইটা ইপিআর প্লাটুন, বিডিআর প্লাটুন আর একটি বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্লাটুন মিলিয়ে একটি কোম্পানি গঠন করে আমাকে বিএসএফের গাড়িতে করে পৌঁছে দেওয়া হলো বর্ডার পর্যন্ত।’

“তারপর কুমিল্লা পার হয়ে লাকসাম এসে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলাম’ মুখে হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বলেন এই বীর। জানালেন, ‘তখন পাকিস্তানি একটি মোটর কনভয় চাঁদপুর থেকে ঢাকার দিকে আসছিল, তাদের আক্রমণ করি এবং সেখানে পুরো তিন মাস যুদ্ধ করেছি। তারপর চৌদ্দগ্রামে যুদ্ধ করি ১৪ মে পর্যন্ত। সেদিন রাতেই মেজর খালেদ মোশাররফ আবার আসেন আমার ক্যাম্পে। তিনি আমাকে বলেন, ‘যেকোনোভাবেই চৌদ্দগ্রাম রক্ষা করতে হবে।’ তাঁর কাছে একটি মোটর প্লাটুন চাইলাম। কয়েকদিন পর বর্ডার ক্রস করে ভারতের রাঁধানগর ক্যাম্পে আশ্রয় নেই। কিন্তু বিএসএফ ক্যাম্পে মুক্তিবাহিনী থাকা বিপদজনক বলে পাশেই রাঙ্গামুড়াতে ক্যাম্প বানাই। ওখান থেকে অপারেশন করতাম। পরে আবার খালেদ মোশাররফ নির্দেশ দেন বেলুনিয়া মুক্ত করতে। আমার সঙ্গে তখন ১৬০জন মুক্তিযোদ্ধা। অথচ পাকিস্তানি বাহিনীর রয়েছে হাজারের ওপরে। ওখানে পুরো জুন মাস বেলুনিয়া মুক্ত রাখি, কিন্তু হাজারের উপরে পাকিস্তানিরা সেখানে হেলিকপ্টার নিয়ে  সামনে এবং পেছন দিয়ে দুমুখো আক্রমণ করে। সেখানে টিকতে না পেরে আবার আমরা রাঙ্গামুড়োতে ব্যাক করি।”

“এরপর ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর অনেক যুদ্ধ হয় এবং সেখানে  আমরা একটি ব্রিজ  উড়িয়ে দিই। সেদিন ছিল আগস্টের ১৭ তারিখে পাকিস্তানি সৈন্যদের নিয়ে সড়ক ও জনপদ বিভাগের একটি ট্রাক আসে ব্রিজটি রিপেয়ার করার জন্য অথচ ট্রাকটির ড্রাইভার ছিল বাঙালি। কিন্তু সেই ট্রাক ড্রাইভার ব্রিজ মেরামতের আগের দিন সুযোগ বুঝে গ্রামের ভেতর ঢুকে গ্রামবাসীদের জানিয়ে যায়, ‘পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ব্রিজ মেরামত করতে আসবে কাল, আপনার মুক্তিবাহিনী ক্যাম্পে খবর দিয়ে দেবেন যেন আমাদের ওপর হামলা করে’—  এটা একটি বিশেষ ঘটনা, আমার সব-সময়ে মনে পড়ে।”কিছুটা আপ্লুত হয়ে বলেন ইমামুজ্জামান।

“আমরা মুক্তিবাহিনী খবর পেয়ে পরের দিন সকালে ওত পেতে থাকি। ওই ট্রাক আসা মাত্র গোলাগুলি শুরু করি, তাতে ১৭ জন পাকিস্তানি নিহত হয় আর ২০ থেকে ২৫ জন আহত হয়। পায়ের উরুতে তিন গুলি নিয়ে আহত হন ট্রাক ড্রাইভার এবং কোনোরকমে গ্রামের ভেতর লুকিয়ে পড়েন তিনি। সন্ধ্যার পর ওই বাঙালি ট্রাক ড্রাইভারকে আমাদের ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়। আমি সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে নিয়ে আমার জিপে করে আগরতলা হাসপাতালে পাঠিয়ে দিই এবং তিনমাস পর তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসে। এই যে আত্মত্যাগ— যে ড্রাইভার ওই ট্রাকে থাকবে, তিনি নিজেই এসে গ্রামবাসীকে জানিয়ে যান— তাদের কথা! ট্রাক ড্রাইভারের কথা ছিল, ‘আমি একা মরি মরি, কিন্তু তার বদলে যদি অনেকগুলো পাকিস্তানি মারা যায় তাহলে আমার মৃত্যু হবে অর্থবহ’।”

ইমামুজ্জামান বলেন,  ‘এ রকম বহু বীর রয়েছে অজানা-অচেনা, যাদের কথা আমরা জানি না।’  একটু থেমে তিনি ফের বলতে থাকেন, “অপারেশন চলতে থাকে এরপর থেকে। আবার আমাদের ডাক পরে ৩১ অক্টোবর বেলুনিয়ার বর্ডার মুক্ত করার জন্য। সাত নভেম্বর ‘বেলুনিয়া পকেট’ মুক্ত হয় ভারতীয় বাহিনীর সহায়তা নিয়ে। তারপর থেকেই আমরা এগোতে থাকি ফেনীর কাছাকাছি এবং ৩ ডিসেম্বর ফেনী দখল করি। আমার রাঙ্গামুড়া সাবসেক্টরটি ছিল কে ফোর্স, অর্থাৎ মেজর খালেদ মোশাররফের অধীনে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে খালেদ মোশাররফ তখন কপালে গুলি লেগে ভারতের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মেজর সালেক তখন কে ফোর্স কমান্ডার। ফেনী দখল করে নোয়াখালীর চরাঞ্চল হয়ে পাকিস্তানিদের ধাওয়া করি, তারা পালিয়ে যায়। এরপর আমাকে বলা হয়, চট্টগ্রামের দিকে অগ্রসর হতে। আমরা রেকি করে ৮ ও ৯ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের দিকে এগোতে থাকি। কিন্তু সঙ্গে থাকা মিত্রবাহিনীর সদস্যরা বলল, তারা সরাসরি চট্টগ্রামের দিকে আগাবে, আর আমাদের বলা হয়, পাহাড়ের ভেতর দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছন দিকে ঘাঁটি করতে। ১৫ ডিসেম্বর আমার অধিনায়ক কর্নেল জাফর ইমাম বলেন, ‘আগামীকাল সন্ধ্যার পর তুমি বিশ্ববিদ্যালয় আর হাটহাজারী থানার মধ্যে রোড ব্লক লাগাবা যেন পাকিস্তানিরা  রাঙামাটি থেকে চট্টগ্রামের দিকে না আসতে পারে।’ ১৬ তারিখ দিনের বেলায় আমরা রেকি করে পরিকল্পনা করলাম এবং সৈনিকদের বললাম, ‘সন্ধ্যার মধ্যেই রাতের খাবার খেয়ে নিতে।’ সাড়ে পাঁচটার দিকে আবার অধিনায়ক ওয়ারলেস করলেন, তিনি বললেন, ‘তোমাকে আর রোড ব্লক লাগাতে হবে না, ওরা সারেন্ডার করেছে, দেশ স্বাধীন হয়ে গিয়েছে।’”

সারাবাংলা/জেএ/আইজেকে

আরও পড়ুন