রবিবার ২২ এপ্রিল, ২০১৮ , ৯ বৈশাখ, ১৪২৫, ৫ শাবান, ১৪৩৯

‘কোটা পদ্ধতি বাতিল, এটা আমার পরিষ্কার কথা’

এপ্রিল ১১, ২০১৮ | ৫:৪৭ অপরাহ্ণ

।। সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট।।

ঢাকা: ‘কোটা পদ্ধতি বাতিল, এটা আমার পরিষ্কার কথা। যাতে কারো কোনও সমস্যা না হয়, বার বার যেনো রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন না হয়, বারবার যাতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ না হয়, সেটা বন্ধ করতে আমি এই কোটা পদ্ধতি বাতিল করে দিতে চাই।’

এভাবেই বললেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বুধবার (১১ এপ্রিল) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে দেওয়া বক্তৃতায় এসব কথা বলেন তিনি।

তবে সরকারি চাকরিতে নিয়োগে কোটা সংস্কারে কি করা যায়, তা নিয়ে কাজ করতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সে কাজ চালিয়ে যেতে বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখি কি সুপারিশ আসে।’

এ সময় কোটা সংস্কার নিয়ে চলমান আন্দোলনের তীব্র সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের নামে যা হচ্ছে তা কোনওভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়।’

‘কেউ যদি কোটা না-ই চায়, তাহলে কোটা আমরা বন্ধ করেই দেবো। কিন্তু সহিংসতা কোনওভাবেই সহ্য করবো না,’ বলেন শেখ হাসিনা।

স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে কে উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আশা করি এতে আপনার আপত্তি থাকার কথা নয় মাননীয় স্পিকার।’

আন্দোলনের নামে ভাঙচুর নৈরাজ্যে বিরক্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘যারা শিক্ষকের বাড়িতে হামলা চালাতে পারে, যারা আঘাত করতে পারে তারা আর যাই হোক ছাত্র হতে পারে না।’

ভিসির বাসায় হামলা ও ভাঙচুরকারীদের কঠোর বিচার করা হবে, ঘোষণা দেন তিনি।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার নিয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতি ক্ষুব্ধ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জেলা কোটা আছে। জেলায় জেলায় যে ইউনিভার্সিটি সেখানেও তারা রাস্তায় নেমে গেছে। তারা যখন নেমে গেছে। জেলায় যারা তারাও চায় না, এরাও চায় না। কেউই চায় না। তো মাননীয় স্পিকার আমি ওদের (ছাত্রলীগ) বলে দিয়েছি, কোনো কোটাই থাকবে না।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘কোনো কোটারই দরকার নেই। কোটা-টোটার দরকার নাই। ঠিক আছে বিসিএস যেভাবে পরীক্ষা হবে মেধার মাধ্যমে সব নিয়োগ হবে। এতে কারও আপত্তি থাকার কথা না।’

সরকার প্রধান শেখ হাসিনা বলেন, ‘সমাজের কোনো শ্রেণী যাতে বঞ্চিত না হয়, সেই দিকেই লক্ষ্য রেখেই আমাদের সংবিধানেই আছে, যারা অনগ্রসর তারা যেন বঞ্চিত না হয়। সেই দিকেই লক্ষ্য রেখে আমাদের যারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী তাদের জন্য একটা কোটা, মহিলাও। তাদের জন্য কোটার ব্যবস্থা করেছি।’

আন্দোলনে সংহতি জানানো নারী শিক্ষার্থীদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের মহিলারা। আগে তাদের কী অবস্থা ছিল? আমি ১৯৯৬ সালে যখন ক্ষমতায় এসেছি তখন কি একটা মহিলা সচিব ছিল? সরকারের কোন উচ্চ পদে চাকরি পেত? পুলিশের কোনো উচ্চ পদে চাকরি পেত? একজন মহিলাও কি হাইকোর্টের জর্জ ছিল? কোথাও কেউ ছিল না? এখন দেখি আমার মেয়েরা নেমে গেছে রাস্তায়। এটাকে তাহলে ধরে নেব তারা কোটা চায় না।’

তিনি বলেন, ‘যখন আলোচনা হয়েছে, আমাদের সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সাথে তখন মহিলা প্রতিনিধিও ছিল। তারা স্পষ্ট বলে দিয়েছে তারা কোটা চায় না। তারা পরীক্ষা দিয়ে চলে আসবে। খুব ভালো কথা। আমি তো খুব খুশি। আমি নারীর ক্ষমতায়নে সব থেকে বেশি কাজ করেছি। আজকে সব জায়গায় নারী। তাদের অবস্থানটা আছে। প্রত্যেকটি জায়গায় আমি বেছে বেছে দিয়েছি।’

এ বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারা যখন চায় না, তখন আর দরকারটা কী? তাহলে কোটা পদ্ধতিরই দরকার নেই। আর যারা প্রতিবন্ধী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, তাদেরকে আমরা অন্যভাবে চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে পারব। তারাও জয়েন করতে পারবে।’

‘এই কোটা নিয়ে তারা তাদের আন্দোলন যথেষ্ট করেছে।’ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের এখন ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা আরও বলেন, ছাত্রদের বলব তারা তাদের ক্লাসে ফিরে যাক, বিসিএস যেভাবে পরীক্ষা হবে, মেধার মাধ্যমে সকলের নিয়োগ হবে, এতে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়’ বলেন তিনি।

ভিসির বাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনায় তিনি বলেন, ‘ভিসির বাড়ি কারা ভেঙেছে, লুটপাট কারা করেছে। লুটের মাল কোথায় আছে। কার কাছে আছে। এই ছাত্রদেরকেই তা খুঁজে বের করে দিতে হবে। সেই সঙ্গে যারা এই ভাঙচুর-লুটপাটের সঙ্গে জড়িত, অবশ্যই তাদের বিচার হতে হবে। এরইমধ্যে গোয়েন্দা সংস্থাকে জানিয়েছি-এটা তদন্ত করে বের করতে হবে।’

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, ‘এত বড় অন্যায় আমরা কোনোভাবে মেনে নিতে পারি না। এখনো আমাদের শিক্ষক, যারা এখনো বেঁচে আছেন তখন তাদের দেখি। আমরা তাদেরকে সম্মান করি। আমি প্রধানমন্ত্রী যাই হই, যখন আমি শিক্ষকের কাছে যাই, মনে হয় আমি তার ছাত্রী। সেইভাবেই তাদের সঙ্গে আচরণ করি। গুরুজনকে অপমান করে শিক্ষা লাভ করা যায় না। সেটা কোনো প্রকৃত শিক্ষা হয় না। হয়ত একটা ডিগ্রি নিতে পারে। প্রত্যেকেই অন্তত শালীনতা বজায় রাখতে হবে। নিয়ম মেনে চলতে হবে। আইন মেনে চলতে হবে।’

রাষ্ট্র পরিচালনা কতগুলো নীতিমালার ভিত্তিতে চলে উল্লেখ করে শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাগুলো তুলে ধরে সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেন, ‘নতুন নতুন হল এবং যত ডেভলপমেন্ট হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে কে করে দিয়েছে, আমাদের সরকার করে দিয়েছে। আমরা করেছি। ছাত্রছাত্রীদের জন্য শিক্ষার একটা সুযোগ সৃষ্টি করা সবই করে দিয়েছি। তারপরও তাদের সঙ্গে আলোচনা হলো, নির্দিষ্ট-সুনির্দিষ্ট তারিখ দিল। আমি কেবিনেট সেক্রেটারিকে দায়িত্ব দিলাম। তারা ওই সময়টাও দিল না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘খুব ভালো কথা, সংস্কার সংস্কার করতে গেলে কয়েকদিন পর তো আবার একদল এসে বলবে, আবার সংস্কার চাই। তা কোটা থাকলেই হলো সংস্কার? আর না থাকলে সংস্কারের কোনো ঝামেলাই নাই। কাজেই কোটা পদ্ধতি থাকারই দরকার নাই। আর যদি দরকার হয়, দেখবে আমাদের কেবিনেট সেক্রেটারি। তাকে আমি বলেই দিয়েছি। সংশ্লিষ্টদের নিয়ে পুরো কমিটি বসে তারা কাজ করবে এবং সেখান থেকে তারা দেখবে।’

‘কিন্তু আমি মনে যে, এই রকম আন্দোলন বারবার হবে। বারবার শিক্ষার সময় নষ্ট হবে। যেখানে আজ পর্যন্ত একটা সেশন জট ছিল না। অল্প সময়ের মধ্যে তারা পাস করে তারা চাকরি পেত। বেসরকারি খাত উন্মুক্ত করে দিয়েছি। সে কারণে চাকরির সুযোগ আছে। অথচ এই কয়েকদিন ধরে সমস্ত ইউনিভাসিটিতে ক্লাশ বন্ধ। পড়াশোনা বন্ধ। তারপর ভিসির বাড়িতে আক্রমণ। রাস্তাঘাটে যানজট। সাধারণ মানুষের ভীষণ কষ্ট। এই সাধারণ মানুষ বারবার কষ্ট পাবে কেন? এই বারবার কষ্ট বন্ধ করার জন্য, বারবার আন্দোলন-ঝামেলা মেটাবার জন্য কোটা পদ্ধতিই বাতিল। পরিষ্কার কথা, আমি এটাই মনে; সেটা হলেই ভাল।’

সারাবাংলা/এনআর/একে/এমএম

আরও পড়ুন