মঙ্গলবার ১৯ জুন, ২০১৮, ৫ আষাঢ়, ১৪২৫, ৪ শাওয়াল, ১৪৩৯

কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের কাছে এই প্রশ্নের জবাব চাই

মে ২৪, ২০১৮ | ৮:০৪ অপরাহ্ণ

।। ইব্রাহীম মল্লিক সুজন ।।

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে আমি সমর্থন করি। আমি চাই শুধু সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেই নয়, যাবতীয় চাকরির নিয়োগ হোক মেধার ভিত্তিতে। তবে মুক্তিযোদ্ধা, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী এবং বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের সুবিধার আওতায় রাখার বিষয়টিও সমর্থন করি। এজন্যই মনে প্রাণে চাই, সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা রেখে বিদ্যমান ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার হোক। কিন্তু এর আগে আমি আন্দোলনকারীদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখতে চাই। প্রশ্নটি করার আগে চলুন একটি ছোট্ট গল্প শুনি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে নৃশংসভাবে হত্যা এবং ক্ষমতা দখলের কারণে যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছিল, তাতে ১৯৭২ সালে ড. কুদরাত-ই-খুদা প্রণীত শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন হয়নি। এরপর বহু শাসক এসেছেন। কিন্তু কেউ ড. কুদরাত-ই-খুদা প্রণীত শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন করতে পারেননি কিংবা নতুন কোনো শিক্ষানীতি প্রণয়নও করতে পারেননি। একুশ বছর পর ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা ফের শিক্ষানীতি প্রণয়নে পদক্ষেপ নেন। ১৯৯৭ সালে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। ওই প্রতিবেদনের আলোকে প্রণয়ন করা হয় ‘শিক্ষানীতি-২০০০’। এর মাঝে আবারও ক্ষমতার পট পরিবর্তন হয়। আবারও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে থাকে। অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতো শিক্ষানীতিও গুরুত্বের তালিকা থেকে বাদ পড়ে।

২০০৮ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আগের শিক্ষানীতিকে যুগোপযোগী করার দায়িত্ব দেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের। এরপর এ বিষয়ের ওপর সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হয়। ২০০৯ সালের ৮ এপ্রিল শিক্ষানীতি প্রণয়নে জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তাদের সুপারিশ জমা দেয়। পরের বছরের মে মাসে মন্ত্রিসভায় জাতীয় ‘শিক্ষানীতি-২০১০’ অনুমোদন পায় এবং এরপর সেটি জাতীয় সংসদেও পাস হয়।

এই শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাই। সবার মতামতের প্রতিফলন ঘটায় এই শিক্ষানীতি সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়। এভাবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আমরা একটা শিক্ষানীতি পেলাম। শেখ হাসিনা শুধু শিক্ষানীতিই করেননি, শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের জন্য সঠিক নীতিমালা ও শিক্ষা উপকমিটি করে দিয়েছিলেন। নির্দেশনা ছিল, তারা দলের ঘোষণাপত্র অনুযায়ী নীতিমালা কিভাবে বাস্তবায়িত হবে তা নিয়ে কাজ করবেন। কিন্তু এরপর আর বিষয়টি আগায়নি।

বাংলাদেশ একটি অদ্ভূত দেশ। এ দেশে সবকিছু কেন জানি শেখ হাসিনাকেই শুরু করতে হয়। তিনি যখন শুরু করেন, তার ঠিক পরের দায়িত্বপ্রাপ্তদের থেকেই বিষয়টি নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতি শুরু হয়। যাই হোক, এই যে বহু সংগ্রামের পর আমরা যে শিক্ষানীতি পেলাম, খুব গুরুত্বে সঙ্গে আমাদেরকে এই বিষয়টির অনুধাবন করতে হবে, এটি কোনো দলীয় শিক্ষানীতি নয়। জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়ে তৈরি হয়েছে এই শিক্ষানীতি। তবে যেহেতু আমাদের মধ্যে শিক্ষার হার কম এবং যেহেতু আমাদের চিন্তাভাবনায় বিজ্ঞান তেমন প্রাধান্য পায় না, তাই আমাদের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার প্রতিফলনও সেরকম হবে এটিই স্বাভাবিক।

আজকে আমরা একটি শিক্ষানীতি পেয়েছি। স্বাভাবিকভাবেই কয়েক বছর পর আমাদের এখনকার আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার পরিবর্তন হবে। তখন শিক্ষানীতির পরিবর্তন ও সংশোধন হবে। কিন্তু যে শিক্ষানীতি বর্তমানে রয়েছে তার বাস্তবায়নে আমাদের কোনো চিন্তা বা ভ্রুক্ষেপ নেই। শিক্ষানীতিতে বলা আছে, এটি কোনো অপরিবর্তনীয় বিষয় নয় এবং এর পরিবর্তন ও উন্নয়নের পথ সব সময়ে উন্মুক্ত থাকবে। কোনো ভুল-ত্রুটি হলে তা সংশোধন করা যাবে। শিক্ষা একটি গতিশীল বিষয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়নের সাথে সঙ্গতি রেখে সবসময় এর পরিবর্তন বা আধুনিকীকরণ অব্যাহত থাকবে। আমিও তাই মনে করি।

আচ্ছা, গল্পটি শেষ। শিক্ষানীতি নিয়ে অনেক কথা হলো। এখন মূল কথায় আসি। শুরু করেছিলাম কোটা সংস্কারের আন্দোলন নিয়ে। কোটা সংস্কারের আন্দোলনে সমর্থন দেওয়ার সময় নিজেকে ভয়াবহ অমানবিক ও স্বার্থপর মনে হয়েছে। তবুও সমর্থন করেছি; কারণ এটি একটি যৌক্তিক আন্দোলন। কিন্তু দেশের এত উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে যেসব তরুণরা আজকে গ্র্যাজুয়েট হয়েছেন, ডিগ্রি নিয়েছেন, তাদের উদ্দেশ্যে বলছি— কোটা সংস্কার আন্দোলনের আগে আমাদের আরো একটি বড় আন্দোলন হওয়ার প্রয়োজন ছিল। সেই আন্দোলনের জন্য আমরা কবে নাগাদ মাঠে নামছি?

কোটা সংস্কারের দাবি আমাদের অন্যতম দাবি। কিন্তু যখন কেউ এই দাবিকে একটি এবং একমাত্র দাবি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে তা আদায়ের জন্য রাজপথে নামেন, তখন আমার দুঃখ হয়। এ দেশে একসময় শিক্ষানীতির জন্য আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু কোনো সরকার সত্যিকার অর্থে জাতির আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে জাতীয় শিক্ষানীতি করতে পারেননি।

একজন শিক্ষিত মানুষ মাত্রই তিনি মানবিক ও আলোকিত হবেন— এটিই সবাই ভাবেন। অন্তত মোটা দাগে শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য এটি। কিন্তু আমরা দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিত হয়ে আজকে শুধু নিজেদের স্বার্থ ও ক্ষেত্রের জন্য মাঠে নেমেছি। সামগ্রিক স্বার্থ ও ক্ষেত্রকে প্রাধান্য দেইনি। কোটার বৈষম্য যে সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার একটি ক্ষুদ্র দৃশ্য, তা জেনেও তার জন্য আমরা প্রাণ বাজি রেখেছি। কারণ একটাই, এর সঙ্গে আমাদের (যাদের বয়স ত্রিশের কম) স্বার্থ সরাসরি জড়িত। কিন্তু আমরা কেন আমাদের চিন্তায় অন্যদের স্বার্থের কথাটি আনতে পারলাম না? সে প্রশ্নকি নিজেদেরকে কখনো করেছি আমরা? যারা সরকারি চাকরিতে প্রবেশের জন্য ৩৫ বছর বয়স করার দাবিতে আন্দোলন করছেন, তাদের আন্দোলনকে আমরা অযৌক্তিক বলছি। কারণ এটি আমাদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট নয়। যখন কেউ একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলছে, তখন আমরা চুপ থাকছি। কারণ এটি আমাদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট নয়। অথচ সব সমস্যার সমাধান ছিল শিক্ষানীতিতেই। যদি শিক্ষানীতিতে সমাধান না থাকে, তবে তা সংশোধন ও পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন হতে পারত এবং তার জন্য প্রাণ বাজি রেখে রাস্তায় নামলে এই তরুণ প্রজন্মকে আমি অমানবিক ও স্বার্থপর বলতাম না।

এখানে বলে রাখি, আমার বয়সও কোটা সংস্কারের আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতাদের সমানই হবে। তার মানে এখানে আমি নিজেকেও অমানবিক ও স্বার্থপর বলছি। আমার শিক্ষার বিষয়বস্তু, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার উদ্দেশ্য আমাকে আজ এমন অমানবিক ও স্বার্থপর বানিয়েছে। যদি বর্তমানের প্রেক্ষাপট ভাষা আন্দোলনের মতো আন্দোলন হতো, আমি নিশ্চিত, আমাদের প্রজন্ম তাতে অংশ নিত না। কারণ আন্দোলন করলে চাকরির পড়ার ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে পড়তাম। যেহেতু আমি স্বার্থপর এবং আমার চিন্তাতে আমি ছাড়া আর কেউ নেই, তাই আমি সময় নষ্ট করতাম না এবং সেখানে আমার নিজের লাভ খুঁজতাম।

জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে যে শিক্ষানীতি হয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্যে লেখা আছে— এই শিক্ষানীতির মূল উদ্দেশ্য মানবতার বিকাশ ও জনমুখী উন্নয়ন এবং প্রগতিতে নেতৃত্ব দেওয়ার উপযোগী মননশীল, যুক্তিবাদী, নীতিবান, কুসংস্কারমুক্ত, পরমতসহিষ্ণু, অসাম্প্রদায়িক, দেশপ্রেমিক, নিজের এবং অন্যান্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং কর্মকুশল নাগরিক গড়ে তোলা।

এই শিক্ষানীতিতে প্রথম অধ্যায়ে শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে বলা আছে। ৭ ও ৮ নম্বর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে বলা হয়েছে— ‘৭. জাতি, ধর্ম, গোত্র নির্বিশেষে আর্থসামাজিক শ্রেণি বৈষম্য ও নারী-পুরুষ বৈষম্য দূর করা, অসাম্প্রদায়িকতা, বিশ্ব-ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য ও মানুষে মানুষে সহমর্মিতাবোধ গড়ে তোলা এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তোলা। ৮. বৈষম্যহীন সমাজ তৈরির লক্ষ্যে মেধা ও প্রবণতা অনুযায়ী স্থানিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে সবার জন্য শিক্ষা লাভের সমান সুযোগ-সুবিধা অবারিত করা। শিক্ষাকে মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে পণ্য হিসেবে ব্যবহার না করা।’ কিন্তু এই শিক্ষানীতির বাস্তবায়নে আমরা মাঠে নামিনি।

শিক্ষানীতি একটি বিশাল বিষয়। এর সব দিক নিয়ে একসঙ্গে লেখা সম্ভব নয়। শুধু আমার জানার মধ্যে দু’টি বিষয় উপস্থাপন করতে চাই। প্রথমত, উচ্চ শিক্ষা নিয়ে বলি। আমরা যারা বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাস করে বের হয়েছি, আমরা কি বুকে হাত রেখে বলতে পারব যে আমরা আমাদের উচ্চ শিক্ষা নিয়ে সন্তুষ্ট? কিংবা আমরা উচ্চ শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠানের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করি, আমাদের শিক্ষা বা প্রতিষ্ঠান সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পেরেছে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মন্তব্য হচ্ছে— তারা তাদের প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অসন্তুষ্ট। বিশেষ করে শিক্ষাক্রম, শিক্ষক, শিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে তারা দারুণ হতাশ। এখন চলুন দেখি, শেখ হাসিনার দেওয়া শিক্ষানীতিতে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে কী বলা হয়েছে।

উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে বলা হয়েছে, উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে জ্ঞান সঞ্চারণ ও নতুন জ্ঞানের উদ্ভাবন এবং সেই সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা। বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চ শিক্ষার কেন্দ্রগুলোর জন্য স্বশাসন ব্যবস্থা অপরিহার্য। তবে তা যথানিয়মে নির্ধারিত নীতিমালার আওতায় বাস্তবায়িত হবে এবং সরকার কর্তৃক প্রদত্ত অর্থ প্রস্তাবিতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা— তার জন্য সরকারি তদারকির ব্যবস্থা থাকবে। বর্তমানে জ্ঞানার্জন ও জ্ঞান সাধনায় নিযুক্ত বিশেষজ্ঞরা নিজ বিষয়ে গভীরতা অর্জনের প্রয়োজনে তাদের সাধনার ক্ষেত্রকে ক্রমাগত সংকুটিত করছেন। ফলে জ্ঞানের জগতে বিভাজন ঘটছে। অন্যদিকে একটি বিপরীত প্রক্রিয়াও চলছে। জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়ছে এবং এর ফলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সমাজবিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প, অর্থনীতি ও অন্যান্য বিষয় পরস্পর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন, বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব বিকাশ বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার ও বিশ্বজগত সম্পর্কে অভিনব উপলব্ধি। এর পরিপ্রেক্ষিতেই জ্ঞানের জগতে সব বিচ্ছিন্নবতা ও বিভক্তি অতিক্রম করে একটি সমন্বয় সাধনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। বর্তমানে প্রচলিত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা বাংলাদেশের মতো একটি স্বাধীন দেশের প্রয়োজন সম্পূর্ণভাবে মেটাতে সক্ষম নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চশিক্ষার সামগ্রিক ব্যবস্থায় পুনর্বিন্যাস আবশ্যক। মানসম্পন্ন শিক্ষা এবং ক্ষেত্রবিশেষে (যেমন— বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ব্যবসায়) বাস্তব প্রশিক্ষণ দিতে পারে, সেই আলোকে বেসরকারি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে যথাযথ নিয়ম অনুযায়ী চালিত হতে হবে।

ঠিক আমরা যেমনটা চাই, তেমনটাই বলা আছে শিক্ষানীতিতে। বিশ্ববিদ্যালয় হবে জ্ঞান সঞ্চারণ ও নতুন জ্ঞানের উদ্ভাবন এবং সেই সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার প্রতিষ্ঠান। শুধু বিসিএস বা বিদেশের ডিগ্রি নিতে যাওয়ার প্রাথমিক ক্ষেত্র নয়। আমি নিশ্চিত, আমার মতো সবাই এমনটিই চায়। তবে কেন আমরা এই শিক্ষানীতির বাস্তবায়নের দাবি জানাতে ব্যর্থ হলাম। কারণ আমরা স্বার্থপর এবং সামগ্রিক উন্নয়নের কথা আমাদের মাথায় আসেনি বা এলেও আমরা তার গুরুত্ব দেইনি।

দ্বিতীয়ত, পথশিশু ও অন্যান্য অতিবঞ্চিত শিশুদের বিষয়ে শিক্ষানীতিতে স্পষ্ট করে বলা আছে, ‘এদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আনার এবং ধরে রাখার লক্ষ্যে বিনা খরচে ভর্তির সুযোগ, বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ, দুপুরের খাবার ব্যবস্থা এবং বৃত্তিদানসহ বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিদ্যালয়ে তাদের সুরক্ষার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

একেবারে আমার মনের কথা। আমি আরও বাড়িয়ে বলতে চাই— সুবিধা বঞ্চিত বা বাবা-মা নেই এমন শিশুদের অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা রেখে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। যেসব লোক দুর্নীতি করে অর্থ আত্মসাৎ করেছে, তাদের সব অর্থ নিয়ে নেওয়া হোক। পাচার করার সময় যত সোনা আটক করা হয়েছে, সেগুলো ব্যয় করা হোক শিশুদের জন্য। এগুলো আবেগী ও যুক্তিহীন কথাবার্তা। তবু বলছি, কারণ এগুলো শুধু আমার স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, দেশের সামগ্রিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। আমরা একদিন থাকব না, কিন্তু যাদের কাছে দেশ রেখে যাচ্ছি, তারা কেমন থাকবে— সে বিষয়গুলো নিয়েও আমাদের সবার ভাবা উচিত।

এছাড়া আমাদের শিক্ষানীতিতে বিভিন্ন ধরনের এবং এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে বিদ্যমান প্রকট বৈষম্য কমিয়ে আনার কথা বলেছে। শিশুদের সৃজনশীল চিন্তা ও দক্ষতার প্রসারের জন্য সক্রিয় শিক্ষণ-পদ্ধতি অনুসরণ করে শিক্ষার্থীকে এককভাবে বা দলগতভাবে কার্য সম্পাদনের সুযোগ দেওয়ার কথা বলেছে, যা এখনও অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত।

এমন একটি শিক্ষানীতি আজও সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়নি। তাতে আমাদের তরুণ প্রজন্মের কোনো মাথা ব্যথা নেই। আজ আমাদের মাথা ব্যথা সেখানেই, যেখানে নিজেদের স্বার্থ ও লাভ রয়েছে। বাকি কোনো কিছুই আমাদের গায়ে লাগে না। এমন অমানবিক এবং আত্মকেন্দ্রিক তরুণ প্রজন্মের অংশ আমি হতে চাইনি।

লেখক: সাংবাদিক

সারাবাংলা/এমআইএস

কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের কাছে এই প্রশ্নের জবাব চাই
কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের কাছে এই প্রশ্নের জবাব চাই