সোমবার ২৮ মে, ২০১৮ , ১৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫, ১১ রমযান, ১৪৩৯

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো: দ্য বেস্ট

ডিসেম্বর ১১, ২০১৭ | ৭:০৬ অপরাহ্ণ

এক.

সময়টা ২০১৩ সালের নভেম্বর মাস।

হাসপাতালে শুয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিল পোলিশ কিশোর ডেভিড পাওলাকজিক। সাইক্লিং করতে গিয়ে এক্সিডেন্টে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে কোমায় চলে গিয়েছিল সে। আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন ডাক্তাররা, কারণ কোমা থেকে ফিরে আসার হার খুবই কম।

কিশোর ডেভিড ছিল এক ফুটবলারের অন্ধভক্ত। সেই ফুটবলারের নাম ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। সৌভাগ্যক্রমে রোনালদো সেদিন পর্তুগালকে বিশ্বকাপে নিয়ে যাওয়ার জন্য লড়ছিলেন প্লে-অফ ম্যাচে, সুইডেনের সাথে।

ডেভিডের বাবা-মা শেষ একটা চেষ্টা করবেন ঠিক করলেন। ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে ছেলের কানে লাগিয়ে দিলেন হেডফোন। পর্তুগাল বনাম সুইডেনের খেলার ধারাভাষ্য হেডফোনের মাধ্যমে পৌঁছে যেতে থাকল ডেভিডের কানে। সেই ম্যাচে হ্যাট্রিক করে সুইডেনকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলেছিলেন রোনালদো একাই।

তারপর?

তারপর সবাইকে অবাক করে কোমা থেকে বেরিয়ে এল ডেভিড। এখন ভালো আছে সে। এইতো কদিন আগে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সাথে দেখাও হয়েছে তার।

কী বলবেন একে?
মিরাকল?
উঁহু, এটা আসলে ম্যাজিক।
ক্রিস্টিয়ানো ম্যাজিক।

দুই.

ইউরো ফাইনালের ৭৯ মিনিটে রেনাটো সানচেজের বদলি হিসেবে এডার যখন মাঠে নামলেন তখন সাইডলাইন থেকে ইঞ্জুরড ক্যাপ্টেন তার কানে মন্ত্র জপে দিলেন, “তুমিই আজ গোল করবে।”

বাকিটা তো সবারই জানা।

সোয়ানসি সিটির হয়ে এডারের আগের ১৩ ম্যাচে গোলের সংখ্যা ছিল ০ । কিন্তু ক্যাপ্টেন ক্রিসের কথা যেন এক তালিসমান, যেন এক সঞ্জিবনী সুধা যা চরম গোলখরায় ভোগা একজন ফুটবলারকেও মুহূর্তের মধ্যে বানিয়ে দিল একজন গোলস্কোরার।

কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন বিষয়টা? ক্রিসের জহুরীর চোখ নাকি ম্যাজিক?

অবশ্যই ম্যাজিক।

ক্রিস্টিয়ানো ম্যাজিক।

তিন.

ইউরো ফাইনালের পর পেপে তার অধিনায়ককে কাপ উৎসর্গ করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘রোনালদোর জন্যই আমাদের জিততে হতো।’ পঁচিশ গজের দুর্দান্ত শটে গোল করা এডার বলেছেন, ‘এ রকম ক্যাপ্টেন থাকলে আপনাআপনি চার্জড আপ লাগে।’ তবে আসল কাজটা বোধহয় করেছিলেন কোচ ফার্নান্দো সান্তোস। হাফটাইমে তিনি শিষ্যদেরকে বলেছিলেন, ‘চলো, আজ রোনালদোর জন্য শিরোপাটা জিতি।’

সবসময় জেনে এসেছি, ব্যক্তির আগে দল, দলের আগের দেশ। কিন্তু যখন দেশের আগে, দলের আগে একজন নেতার জন্য সতীর্থরা নিজেদের উজাড় করে দেন তখন সেই নেতা সম্পর্কে অনেক কিছুই বলা যায়, আবার কিছু না বললেও হয়।

কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায় একে? ক্রিসের ব্যক্তিত্ব নাকি নেতা ক্রিসের নেতৃত্ব? কীসের প্রভাবে চোখে পানি নিয়ে মাঠ ছাড়া নেতার জন্য শেষপর্যন্ত জান লড়িয়ে দেন নানি, কোয়ারেসমা, পেপেরা?

কে জানে! তবে এটুকু জানি, যদি কখনও নেতা হই তবে ক্রিসের মতো নেতা হতে চাই।

ইস্পাত কঠিন মনোবলের এক দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। মাঠে না থেকেও একজন দুর্দান্ত নেতা, পিছিয়ে পড়েও হার না মানা মানসিকতার এক অদম্য গ্ল্যাডিয়েটর।

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো!

চার.

২০১৬’র ফেব্রুয়ারি মাসে মালাগার সাথে ড্র করার পরে রিয়াল মাদ্রিদের টেবিল টপারদের সাথে পয়েন্ট ব্যাবধান দাড়িয়েছিল ১০। অত্যন্ত বাজে ফর্মে থাকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ছবি ছাপিয়ে তখন কাতালান পত্রিকা ‘স্পোর্টস’ ক্যাপশন দিয়েছিল দ্য এন্ড। এরপরে রিয়াল মাদ্রিদ ১ পয়েন্টের গ্যাপে সিজন শেষ করে, চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতে, রোনালদো ইউরো জেতেন এবং উয়েফা প্লেয়ার অফ দ্য সিজন নির্বাচিত হন।

আসলেই দ্য এন্ড!

অথবা ২০১৬/১৭ সিজনের কথা ভাবুন। চ্যাম্পিয়নস লিগের গ্রুপপর্ব শেষ হয়ে গেল, ক্রিস্টিয়ানোর গোল মাত্র দুটো। সেই নিয়ে কত ট্রল। রোনালদোর সাথে তুলনা করা হলো পাকো, তুরান এমনকি বার্সার গোলকিপার স্টেগানের।
সিজন শেষে কী হলো তা সবারই জানা। রোনালদো ফর্মে ফিরলেন বড় মোক্ষম সময়ে, যে সময়ে দলের সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল তাকে। বায়ার্নের মাঠে কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম লেগে ২ গোল, দ্বিতীয় লেগে ঘরের মাঠে হ্যাট্রিক। সেই হ্যাট্রিকের রেশ গেল সেমিফাইনালেও, অ্যাটলেটিকোকে জাস্ট একাই হারিয়ে দিলেন যেন। আর ফাইনাল? সে তো বলাই বাহুল্য।

জুভেন্টাসের সাথে ফাইনালে করলেন ২ গোল। সেই জুভেন্টাস, যাদের বিবিসি নামক ডিফেন্সত্রয়ীর সামনে আটকে যাচ্ছিল সকল বড় দল, বুফন নামের এক অতিমানব যাদের গোলকিপার হয়ে গোল আটকে দিচ্ছিলেন প্রতিমুহূর্তে, যারা সারা টুর্নামেন্টে খেয়েছিল মাত্র ২ গোল, সেই দলের সাথে ১ ম্যাচে ২ গোল দিলেন রোনালদো। রিয়ালের হয়ে জিতলেন ব্যাক টু ব্যাক ইউসিএল, লা লিগা, উয়েফা সুপার কাপ এবং স্প্যানিশ সুপার কাপ। সামনেই ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপ আছে। আশা করা যায়, সেটা জিতে নিজের অর্জনের পাল্লাকে আরেকটু ভারী করবেন তিনি।

তার এই দুর্দান্ত ফর্ম তাকে এনে দিল এই বছরের ফিফা বেস্ট প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ারের সম্মান। আর সম্প্রতি নিজের পঞ্চম ব্যালন ডি’অর জিতে পূর্ণ করলেন ষোলকলা।

ষোলকলা? নাহ, ভুল বললাম বোধহয়। ক্রিসকে যদি চিনে থাকি, তবে তার কাছে ষোলকলা বলে কিছু নেই। তিনি যত পান, তত চান।

এ জন্যই আজ তিনি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো!

চ্যাম্পিয়নরা এরকমই হন। যখন সবাই তাদের শেষ দেখে ফেলে, লিখে ফেলে ক্যারিয়ারের এপিটাফ, ঠিক তখনই তারা জ্বলে ওঠেন।

অনেকেই প্রশ্ন করেন আমি ক্রিসকে কেন এত পছন্দ করি। প্রধানত, তার খেলার জন্য। কিন্তু আমার সবচেয়ে বেশি পছন্দ তার হাল না ছাড়ার গুণটা। ‘নেভার, নেভার, নেভার গিভ আপ,’ এটাই ক্রিসের জীবনের মূলমন্ত্র। এবং সত্যি কথা হলো, এই গুণটাই আজ তাকে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বানিয়েছে।

নশ্বর মানুষের প্রতীক হয়ে প্রতিনিয়ত লড়ে যান ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আর আমাদের মনে করিয়ে দেন মানুষের অসাধ্য কিছু নেই।

ক্রিস্টিয়ানো কখনও জানবেও না নিজের অজান্তেই সুদূর বাংলাদেশের এক ছেলেকে সে কতটা প্রভাবিত করেছে। যে কিনা আগে অল্পতেই হাল ছেড়ে দিত সে এখন কোনওভাবেই হাল ছাড়তে চায় না। ক্রিস্টিয়ানো আমাকে শিখিয়েছে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাল ছেড়ো না।

বাদ দেন। আসেন জীবনানন্দ দাসের কবিতার দুই লাইন আবৃত্তি করি।

“আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিলো পর্তুগাল ও রিয়াল মাদ্রিদের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো সেন।”

পাঁচ.

একদিন আমার বয়স হবে।
চামড়া জড়িয়ে যাবে।
হাতে থাকবে লাঠি।
চোখে থাকবে ভারী কাচের চশমা।
সেদিনও ফুটবল হবে।
সেদিন কেউ পায়ে রেশমী রুমাল জড়িয়ে চর্মগোলককে দিয়ে বলাবেন নিজের কথা।
সবুজ গালিচায় কেউ বুলিয়ে যাবেন ড্রিবলিঙের মায়াবী আবেশ।
কেউ ডি-বক্সের বাইরে থেকে বুলেটগতির শটে গোলকিপারকে করবেন পর্যদুস্ত।
এসব দেখে মুগ্ধ হবো আমি। হয়তো মনেও হবে, ‘আরে এই ছেলেটা ক্রিসের মতো খেলে না?’
তারপরে নিজেই হেসে ফেলব। অনেক আগে দেখা এক সিনেমার কথা মনে পড়ে যাবে আমার। যে সিনেমায় চঞ্চল চৌধুরীর ডায়লগ ছিল, ‘আয়না একজনই!’
আমি বিড়বিড় করব, ‘ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ছিল একজনই!’
আমার সৌভাগ্য।
আমার পরম সৌভাগ্য।
কারণ আমি বেঁচে ছিলাম ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো’র সময়ে।

সারাবাংলা/এমএম

আরও পড়ুন