সোমবার ২২শে অক্টোবর, ২০১৮ ইং , ৭ই কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১১ই সফর, ১৪৪০ হিজরী

গুলতি মেরে বুলেট বুকে ‘অমর’ এক আবু সালাহ

মে ১৫, ২০১৮ | ৯:৪২ অপরাহ্ণ

। সন্দীপন বসু।

ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করার সময়ে ১০ বছর আগে বিমান হামলায় পা হারিয়েছিলেন তিনি। তখন তার বয়স মাত্র ১৯। এরপর তার সারাক্ষণের সঙ্গী হুইলচেয়ার। এই চেয়ারে ঘুরেই নিত্যকার কাজ করতেন তিনি। সঙ্গে জারি ছিল প্রতিরোধও।

দখলদার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সকল আন্দোলন সংগ্রামে তিনি ছিলেন অগ্রসেনানী। হুইল চেয়ারে চড়ে হাতে বানানো গুলতি নিয়ে থাকতেন সবার অগে।  দেশমাতৃকার পক্ষে স্লোগান দিতেন। টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেটের প্রতিরোধে হাতে বানানো গুলতি দিয়ে ছুঁড়তেন পাথর। মাতৃভুমি ফিলিস্তিনের মাটিতে দখলদারদের হঠাতে আজীবনের এই যোদ্ধা প্রাণ দিলেন গতকাল সোমবার। শেষ সময়েও হাতে ছিল গুলতি, পাশে ছিল হুইল চেয়ার।

গুলতি মেরে বুলেট বুকে অমর হয়ে গেলেন ফাদি আবু সালাহ। তার মৃত্যুর পর এমনটাই বলছেন কাছের মানুষরা। দখলকৃত পশ্চিম তীরের জেনিন শহরের কাছেই আরাবাহ নামক গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন আবু সালাহ। তাঁর মৃত্যুর পর গণমাধ্যমের আগ্রহে সেখানকার মানুষরা জানিয়েছেন, ২৯ বছর বয়সী আবু সালাহ ফিলিস্তিনি তরুণদের প্রতি সবসময় আহবান করতেন, প্রতিমুহূর্তে আমাদের প্রতিরোধ জারি রাখতে হবে।

সবশেষ গতকাল ১৪ মে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফাদির একটি ছবি প্রকাশ পায়। সেখানে দেখা যায়, হুইল চেয়ারে বসেই হাতে গুলতি নিয়ে ইসরায়েলি অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের প্রতিরোধ করছেন ফাদি আবু সালেহ। মুহুর্তে ভাইরাল হয় সেসব ছবি। এরপর সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, ফাদির ভাইরাল হওয়া সেই ছবিটিই মৃত্যুর আগ মুহূর্তের ছবি। পিকেটিং করার সময়েই গুলিতে নিহত হয়েছেন তিনি। তার নিথর দেহের পাশে পড়ে ছিল স্টিল আর কাঠের হুইল চেয়ারটি।

মধ্যপ্রাচ্যে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে ইসরায়েল পূর্ব জেরুসালেম দখল করে সেখানে গড়ে তুলেছে দু’লাখ ইহুদিদের জন্য বসতি। আন্তর্জাতিক আইনে এসব বসতি অবৈধ।  অথচ সেই অবৈধ বসতি গড়া ইসরায়েলি সরকারের পক্ষেই বারবার অবস্থান নিয়েছিল বিশ্বরাজনীতির দণ্ডমুন্ডের কর্তা যুক্তরাষ্ট্র। ইসরাইলে মার্কিন দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তরের ঘোষণা দেয় দেশটি। এতেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে ফিলিস্তিনিরা।  কারণ তারা মনে করে, এই দূতাবাস খোলার অর্থ পুরো জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ নিতে ইসরায়েলকে ওয়াশিংটনের স্বীকৃতি দেয়া।

১৪ মে জেরুজালেমে দূতাবাস খোলার আনুষ্ঠানিকতার দিনটি ছিল ঐতিহাসিক।  কারণ এর পরের দিন ১৯৪৮ সালের ১৫ মে ইহুদিবাদী ইসরাইল সাড়ে সাত লাখের বেশি ফিলিস্তিনিকে তাদের বাড়ি-ঘর থেকে উচ্ছেদ করে তা দখল করে নেয়। এদিনটি নাকবা (মহাবিষাদ)  দিবস হিসেবে গত ৭০ বছর ধরে পালন করে আসছে ফিলিস্তিনিরা। আর তাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি আগ্রাসন এবং ফিলিস্তিনি উচ্ছেদের নাকবা দিবস উপলক্ষে গত এক সপ্তাহ ধরে গাজায় জড়ো হতে থাকেন ফিলিস্তিনিরা।

ফিলিস্তিনিদের ১৯৪৮ সালে জোর করে যেসব এলাকা থেকে উৎখাত করা হয়েছিলো সেখানে আবার ফিরে যাওয়ার জন্য আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলো। গাজা ইসরায়েল সীমান্তে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সেই আন্দোলন কর্মসূচির নাম ছিলো ‘গ্রেট রির্টান মার্চ’ বা ‘ফিরে চলার মহান মিছিল’। এই বিক্ষোভ চলা অবস্থাতেই জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস খোলার প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে গাজা।

জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থাপনকে কেন্দ্র করে চলমান বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন ফাদিও।  আর দিনশেষে সেই বিক্ষোভে ইসরায়েলিদের গুলিতে অর্ধশতাধিক নিহতের তালিকায় প্রকাশ পেলো তার নামটিও।

রয়টার্স জানায়, অল্প বয়সেই বিয়ে করা ফাদি আবু সালেহ একটা সময়ে ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি ছিলেন বেশ কয়েক বছর। পরবর্তীতে এক মার্কিন সমঝোতায় ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের প্রচেষ্টায় ইসরাইলি কারাগার থেকে মুক্তি পান আবু সালাহ। তার সাথে আরও ৮৯ জন ফিলিস্তিনি বেরিয়ে আসে দখলদারদের কারাগার থেকে।

এরপর ২০০৮ সালে গাজায় তিন সপ্তাহ ব্যাপী ইসরাইলি সেনা ও হামাসের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক যুদ্ধে প্রাণ হারায় বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনি। পরবর্তীতে ছয় মাস ধরে চলা এক ইসরাইলে আগ্রাসানে এক হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হন। সে সময় ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে পা হারান ফাদি আবু সালেহ।

যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, কয়েকমাস ধরে চলমান বিক্ষোভে স্ত্রী-সন্তান ও পরিবার নিয়ে অংশগ্রহণ করেন তিনি। পশ্চিম তীর থেকে এসে গাজাতেই আশ্রয় নেন তাঁবু গেড়ে। চার শিশু সন্তানকে নিয়ে সেখানেই অস্থায়ীভাবে সংসার গাড়েন তিনি।

গতকাল জড়ো হওয়া প্রায় ৫০ হাজার ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভে সকাল থেকেই হুইল চেয়ারে করে নেমে পড়েন সালাহ। একটা পর্যায়ে শান্তিপূর্ণ এ বিক্ষোভে ইসরাইলি সেনারা নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে নিহত হন অন্তত ৫৮ ফিলিস্তিনি নাগরিক। আহত হয় ২৭০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নাগরিক। নিহতদের মধ্যে ছিলেন আবু সালাহও। দুপুরের পরেই ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে নিহত হন এ লড়াকু ফিলিস্তিনি।

মার্কিন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক এ্যালেক্স কেইন বেশ কিছুদিন ধরেই ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করছেন।  ফাদি নিহতের ছবি তিনি টুইট করেন, ‘আজ ইসরায়েলি স্নাইপারের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে ফাদি আবু সালাহ। সে এর আগে বিক্ষোভ করতে গিয়ে তার পা হারিয়েছিলো। তবুও থেমে যাননি। হুইল চেয়ারে করে চালিয়ে গেছেন প্রতিবাদ।’

অ্যালেক্স কেইনের টুইটটির নিচে রিটুইট করেছেন অনেকেই। একজন লিখেছেন, ‘মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও ফাদি নামের এই পঙ্গু যুবক শিখিয়ে গেলো দাসত্ব নয় স্পর্ধাই জীবন। দালালি নয় প্রতিরোধেই মুক্তি। মানুষ মানে মর্যাদার সাথে বাঁচা। মানুষ মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত না করা।’

আরেকজন লিখেছেন, ‘নিজের প্রাণের বিনিময়ে লাখো ফিলিস্তিনের মনে জ্বেলে দিয়ে গেছেন স্বাধীনতার সংগ্রামের লাল সূর্য। অত্যাচারী শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আবু সালাহ এখন লাখ লাখ ফিলিস্তিনি তরুণদের এক সঞ্জীবনী শক্তির নাম।’

 

সারাবাংলা/ এসবি

গুলতি মেরে বুলেট বুকে ‘অমর’ এক আবু সালাহ
গুলতি মেরে বুলেট বুকে ‘অমর’ এক আবু সালাহ
গুলতি মেরে বুলেট বুকে ‘অমর’ এক আবু সালাহ