রবিবার ২৭ মে, ২০১৮ , ১৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫, ১০ রমযান, ১৪৩৯

ঘরেই থাকতে চায় মুক্তামনি

ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৮ | ৯:৫৫ পূর্বাহ্ণ

জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

গত ২২ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের নির্ধারিত কেবিনটি ছেড়ে যায় মুক্তামনিসহ তার পরিবার। চিকিৎসকরা বলেছিলেন, এক মাস পর তাদের আবার আসতে। কিন্তু হতাশায় ডুবে গেছে পরিবারটি, ঢাকায় কষ্ট করে আসতে আর রাজি নয় মুক্তামনি।

‘যাবো না ঢাকায়, আমি তো থেকিছি (থেকেছি) সেখানে, আমার তো কোনো উপকার হয় নাই। বরং, বাড়ি থেকে ঢাকা যাওয়ার সময় ঝাঁকি লাগলে আমার জীবন বাইর হইয়া যায়। আম্মু, আমি মরি গেলিও আমারি (আমাকে) ঘর থেকে বাইর কইরো না, আমারি আর কষ্ট দিও না’- কথাগুলো মুক্তামনির।

আর তাই মাকে অনুরোধ জানানো এ সব কথা কাঁদিয়েছে মুক্তামনির মাকে, বাবাকে আর বোনকেও। সাতক্ষীরা থেকে টেলিফোনে এসব কথা বলেন মুক্তামনির বাবা মো. ইব্রাহীম হোসেন।

কথা বলতে বলতে একসময় তার বাকরুদ্ধ হয়ে আসে। ধরা গলায় ইব্রাহীম হোসেন বলেন, মেয়েটাকে যে ঘর থেকে, বাড়ি থেকে বাইর করব, গাড়িতে করে ঢাকা নেব; সে অবস্থায় আমার আম্মুজান নেই। আর মুক্তামনি জানায়, হাতে খুব ব্যাথা। খুব যন্ত্রণা হয় মাঝে মাঝে। হাত ভারি হয়ে ফুলে গেছে। খুব কষ্ট হয় তার।

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি মুক্তামনি ও তার বাবা ইব্রাহীম হোসেনের কথা হয়। দুজনই জানান, চিকিৎসকদের এত চেষ্টার পরও সেই হেমানজিওমাতে আক্রান্ত হাতটি ভালো হয়নি মুক্তামনির। অথচ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি  ইউনিটের দেশসেরা চিকিৎসকরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছে আক্রান্ত হাতটি ভালো করার, অস্ত্রোপচার হয়েছে কয়েকটি। আক্রান্ত হাত থেকে সাড়ে তিন কেজির মতো অতিরিক্ত মাংসপিণ্ড ফেলে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন চিকিৎসকরা। কিন্তু তারপরও মুক্তি মেলেনি মুক্তমনির। অসুখটি যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে ১২ বছরের ছোট মেয়েটিকে।

আর এ কারণেই ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিট ছাড়ার সময়ে চিকিৎসকরা তাদের এক মাস পর আবার আসতে বললেও তারা আসেননি। তবে মেয়েকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন বাবা-মা। বাবা ইব্রাহীম হোসেন বলেন, ‘ঢাকায় যেতে আমার আম্মুরে যেন একটু বোঝাতে পারি-আম্মুরে যেন রাজি করাতে পারি। আর একটাবার তাকে নিয়ে আমি ঢাকায় যেতে চাই।’

এদিকে ঢাকা মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন সারাবাংলাকে বলেন, গত পরশুও মুক্তামনি এবং ওর বাবার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, আমরা আরও কয়েকদিন পর ওদেরকে আসতে বলব। কিন্তু মুক্তার হাত আবার ফুলে যাচ্ছে, ব্যাথা এবং যন্ত্রণা হচ্ছে জানালে ডা. সেন বলেন, আমি সবই শুনেছি। ওরা আসুক, তখন আরও চিন্তা ভাবনা করে যা করতে হয় তাই করব।

এদিকে, মুক্তামনির বাবা ইব্রাহীম হোসেন বলেন, যত দিন যাচ্ছে, হাত ততোই ফুলে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে নানা জটিলতা। তিনি বলেন, হাতের ব্যান্ডেজ পরায়ে রাখলে বুকের আক্রান্ত অংশ ফুলে যায় আবার ব্যান্ডেজ খুলে রাখলে হাতে এতো ভারি হয় যে সেটা মেয়ের পক্ষে সেই ভার বহন করা সম্ভব হয় না।

সামান্য ঝাঁকি লাগলেও মেয়ের দিকে তাকানো যায় না, মেয়েটা চিৎকার করে ওঠে। আমার মেয়ের এ কষ্ট আমার সহ্য হয় না, কিন্তু কিছু তো করারও নেই।

ইব্রাহীম হোসেন বলেন, সংসার ধর্ম সব ছেড়ে তো গত ছয়মাস ঢাকায় থাকলাম। প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কতো কিছু করলেন তিনি, হাসপাতালের চিকিৎসক থেকে শুরু করে প্রতিটা মানুষ আমার আম্মুজানের জন্য কী করছেন, সেটা নিজের চোখে দেখেছি। চিকিৎসকরা চেষ্টার কোনও ত্রুটি করেনি।  এতদিন তো চিকিৎসকরা এতকিছু করলেন, কিন্তু সুবিধা তো হলো না মেয়েটার।

এরপরও যদি আম্মুজানের হাতটা সামান্যতম ভালোর দিকে যেত, তাহলেও সবকিছু ছেড়ে হলেও আমি ঢাকায় গিয়ে থাকতাম, চিকিৎসা করাতাম। কিন্তু মনে হয় কিছু করার নেই।

আমার মেয়েও আর ঢাকায় যেতে চায় না। তাকে প্রতিদিন বোঝাতে থাকি- মাগো, চলো! আর একটাবার যাই। কিন্তু মেয়েকে রাজি করাতে পারি না, সে কোনোভাবেই ঢাকা যেতে রাজি না।

মেয়ে তার মাকে বলেছে, ‘আম্মু, আমি মরি গেলিও আমারি (আমাকে) ঘর থেকে বাইর কইরো না, আমারি আর কষ্ট দিও না।’

মেয়ে তার মাকে বলে, ‘আব্বু আমারে বারবার যেতে বলতেছে, ডাক্তারাও যথেষ্ট চেষ্টা করিছে, কিন্তু হাত তো ভালো হয় নাই। আমি তো সেখানে থাকলাম, কিন্তু আমার তো সামান্যতম উপকারও হয়নাই। তাইলে সেখানে গিয়ে আমার কী হবে’।

ইব্রাহীম হোসেন বলেন, ‘মেয়েটা খেতে পারে না, মেয়েটার দিকে তাকানো যায় না আপা।’

এদিকে, মুক্তামনি জানায়, হাতের অবস্থা আগের মতোই আছে। ব্যথা হয়, যন্ত্রণা হয়। কখনও কখনও সেটা অনেক বেশি বেড়ে যায়।

মুক্তামনি জানায়, বাড়িতে তার সময় কাটে টেলিভিশন দেখে আর বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলে।

ঢাকায় কবে আসবে জানতে চাইলে সে বলে, গত পরশু কথা হয়েছে সেন স্যারের (ডা. সামন্ত লাল সেন) সঙ্গে। তিনিও বলেছেন, আর কয়েকটা দিন যাক, তারপর তারা ফোন দেবেন। কিন্তু মনে হয় আমার হাত আর ভালো হবে না। কিছুটা অন্যরকম কণ্ঠে বলে মুক্তামনি।

গত বছরের ১২ জুলাই ঢামেক হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তির পর জানা যায়, সাতক্ষীরার মুক্তামনি হেমানজিওমাতে আক্রান্ত। দেশীয় চিকিৎসকরা সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা মুক্তার চিকিৎসা করতে অপারগতা প্রকাশ করে। পরে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের চিকিৎসকরাই মুক্তার আক্রান্ত হাত থেকে ফেলে দেন সাড়ে তিনকেজি ওজনের অতিরিক্ত মাংসপিন্ড। মুক্তার চিকিৎসার যাবতীয় দায়িত্ব নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সারাবাংলা/জেএ/এমআই

Tags: ,

আরও পড়ুন