বুধবার ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ৪ আশ্বিন, ১৪২৫, ৭ মুহররম, ১৪৪০

চট্টগ্রামের হাইব্রিড এলিট এখন কেন্দ্রীয় আ.লীগ নেতা  

এপ্রিল ১০, ২০১৮ | ৫:২৭ অপরাহ্ণ

।। রমেন দাশগুপ্ত, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট ।।

চট্টগ্রাম ব্যুরো: শিল্পপতি মনিরুল ইসলাম ইউসুফ ধনাঢ্য বিএনপি নেতা। আগামী সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের মিরসরাই আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী। তার ছেলে নিয়াজ মোরশেদ এলিটও ব্যবসায়ী, কিন্তু রাজনীতিতে উত্থানের ক্ষেত্রে বাবাকে ছাড়িয়ে গেছেন তিনি। তা-ও বাবার বিপরীত আদর্শের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগে। জীবনে কোনদিন ছাত্রলীগ, যুবলীগ কিংবা আওয়ামী লীগের রাজনীতি না করলেও তিনি হঠাৎ করেই পদ পেয়ে গেছেন একেবারে কেন্দ্রীয় উপ-কমিটিতে।

বিএনপি নেতার ছেলে এলিটের এই হঠাৎ উত্থানে বিস্মিত চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতারা। দলের ব্যানার ব্যবহার করে এলিটের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ব্রিবত হয়ে গত ১৫ মার্চ চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ একটি বিবৃতি দিয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল, এলিট আওয়ামী লীগের কেউ নন। তৃণমূলের নেতারা যাকে নিয়ে বিব্রত, তাকে কেন্দ্রীয় উপ-কমিটিতে পদ দেওয়া নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

গত ৮ মার্চ আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়, যাতে সদস্য হিসেবে যোগ দেন এলিট। সভায় দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও ছিলেন। সেই সভার ছবি প্রথমে নিজেই ফেসবুকে দেন তিনি। পরে অবশ্য সেই ছবি টাইমলাইন থেকে সরিয়ে ফেলেন। কিন্তু সেই ছবির সূত্র ধরেই শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এম এ সালাম সারাবাংলাকে বলেন, বিভিন্ন পত্রিকায় এলিট আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাচ্ছেন কিংবা তাকে আওয়ামী লীগের নেতা পরিচয়ে বিভিন্ন খবর প্রকাশিত হয়েছে। এতে দলের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। মিরসরাই থেকে নেতাকর্মীরা আমাদের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে আমরা বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছি, এলিট আওয়ামী লীগের কোন পদ-পদবিতে নেই। এরপর দুইদিন আগে কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সদস্যপদ পাবার বিষয়টি জেনেছি। বিষয়ে আরও জেনে তারপর আমরা বক্তব্য দেব।

এলিটকে পদ দেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন সারাবাংলাকে বলেন, দলে অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট সতর্কবার্তা আছে। দলে এই ধরনের নবাগতদের অনুপ্রবেশ করিয়ে তাদের পদ দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর বার্তাকে উপেক্ষা করার শামিল। হঠাৎ করে দলে ঢুকে পদ বাগিয়ে নেওয়ার ঘটনায় চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা স্তম্ভিত এবং হতবাক।

নিয়াজ মোরশেদ এলিট সারাবাংলাকে জানান, ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগেই তাকে চিঠি দিয়ে উপ-কমিটির সদস্য করার বিষয়টি জানানো হয়েছে।

প্রচার রয়েছে এলিট চট্টগ্রামের মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিনের ঘনিষ্ঠজন। সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন প্রোগ্রামেও এলিটকে মেয়রের পাশে দেখা যায়।

এলিটের দাবি, তিনি স্কুলজীবনে ছাত্রলীগ করতেন। কমার্স কলেজেও ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরে যখন বেশিমাত্রায় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছিলেন, তখন তার বাবা তাকে ইস্পাহানি কলেজে নিয়ে ভর্তি করেন।

মেয়রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ দিয়ে তিনি বলেন, নাছির ভাই (মেয়র) আমাকে কমার্স কলেজে নিয়ে ভর্তি করেছিলেন। তখন আমি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ি। পরে ইস্পাহানি কলেজে ভর্তি হই। এরপর ঢাকায় নর্থ সাউথে পড়লেখা করি।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ইউনূস গণি সারাবাংলাকে বলেন, আমি ওয়ার্ড ছাত্রলীগ থেকে জেলা ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট হয়েছি। এখন জেলা আওয়ামী লীগের জয়েন সেক্রেটারি। এই পর্যন্ত আসতে আমাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে! কত জেলজুলুম সহ্য করতে হয়েছে! অথচ যার বাবা কখনও জাতীয় পার্টি, কখনও বিএনপি, কখনও জামায়াত করেছে, তাকে দলে নিয়ে কেন্দ্রে পদ দেওয়া হচ্ছে। দলের রাজনীতিতে হাইব্রিডদের উত্থানের নমুনা হচ্ছে এলিটের পদ পাওয়া।

তবে এলিট দাবি করেছেন, তার বাবা সারাজীবন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছেন। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর তিনি বিএনপিতে যোগ দেন।

এলিট এই দাবি করলেও তারা বাবা কখনও আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছেন এমন দাবি করেননি। বরং বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন, তিনি একসময় জাতীয় পার্টির রাজনীতি করতেন। পরে বিএনপিতে যোগ দেন।

এলিট চট্টগ্রাম বন্দরে যন্ত্রপাতি সরবরাহ ব্যবসায় যুক্ত আছেন। তার বাবা জাতীয়বাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও শিল্প প্রতিষ্ঠান বড়তাকিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান। এলিট কয়েক বছর আগে চট্টগ্রামে ‘খুলশী ক্লাব’ নামে একটি অভিজাত ক্লাব এবং জুনিয়র চেম্বার নামে একটি ব্যবসায়ী সংগঠন তৈরি করে মূলত নিজের পরিচিতি গড়ে তুলেন। এরপর থেকেই বিভিন্ন মহলের সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি হয়।

গত দুই বছর ধরে এলিট মিরসরাই উপজেলায় বিভিন্ন ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছেন, যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার পাচ্ছে। সারাবাংলাকে এলিট জানান, তিনি মিরসরাই আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী।

একই আসনে বাবা বিএনপি থেকে, ছেলে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাওয়া নিয়ে জানতে চাইলে এলিট সারাবাংলাকে বলেন, বাবার রাজনীতি আমার বাবা করবে। আমার রাজনীতি আমি করব। বাবার কারণে তো আমি আমার আদর্শ বিসর্জন দিতে পারি না। বাবার পরিচয়ে নয়, আমি আমার পরিচয়ে পরিচিত।

মিরসরাই আসনে আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, যিনি ১৯৭০ সাল থেকে ওই আসনে নির্বাচন করে আসছেন। হেভিওয়েট এই প্রার্থীর বিরুদ্ধে এলিটের এই কর্মকাণ্ড নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ আছে। দলের নেতাদের মধ্যে আলোচনা আছে, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের দূরত্ব আছে। এজন্য মেয়রই এলিটকে মোশাররফের বিরুদ্ধে মাঠে নামিয়েছেন।

তবে বিষয়ে বক্তব্য জানতে মেয়রের মোবাইলে একাধিকবার কল করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক বেদারুল আলম চৌধুরী বেদার সারাবাংলাকে বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাজনীতি করা নেতাদের আমরা একে একে হারিয়ে ফেলছি। যে কয়জন আমাদের শ্রদ্ধেয় নেতা এখনও আছেন তাদের মধ্যে মোশাররফ ভাই একজন। নিয়াজ মোরশেদ এলিট, যার বা বাবা বিএনপি নেতা, যার পুরো পরিবার বিএনপি করে তাকে দলের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটিতে পদ দেয়ায় আমরা বিস্মিত এবং ক্ষুব্ধ। মোশারফ ভাইয়ের আসনে নমিনেশন চাওয়ার মতো ধৃষ্টতা ইতোমধ্যে দেখিয়েছে এলিট। তাকে দিয়ে চট্টগ্রামের আওয়ামী রাজনীতির অভিভাবক মোশাররফ ভাইয়ের বিরুদ্ধে সুগভীর ষড়যন্ত্র চলছে বলে আমরা মনে করি।

সারাবাংলা/আরডি/এমএস

 

 

চট্টগ্রামের হাইব্রিড এলিট এখন কেন্দ্রীয় আ.লীগ নেতা   
চট্টগ্রামের হাইব্রিড এলিট এখন কেন্দ্রীয় আ.লীগ নেতা