শনিবার ২০ জানুয়ারি, ২০১৮, ৭ মাঘ, ১৪২৪, ২ জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৩৯

Live Score

চার কারণে রাজধানীতে গ্যাস সংকট

জানুয়ারি ১৩, ২০১৮ | ৪:৩২ অপরাহ্ণ

হাসান আজাদ, স্পেশাল করসপন্ডেন্ট

ঢাকা: চার কারণে রাজধানীতে গ্যাস সংকট হচ্ছে। এগুলো হল— চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতি, বিতরণ পাইপ লাইনে সীমাবদ্ধতা, বসতি বেড়ে যাওয়া ও অবৈধ সংযোগ। আর এই চার কারণের সঙ্গে শীত মৌসুমের বাড়তি চাহিদা যোগ হওয়ায় রাজধানীতে তীব্র গ্যাসের সংকট তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

রাজধানীর প্রায় সব এলাকার বাসাবাড়িতে এই গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। ভোর ৫টায় গ্যাস যায়। আর আসে রাত ৯টায়। এর ফলে বিপাকে পড়ছেন মহানগরবাসী। বিশেষ করে চাকুরীজীবী স্বল্প আয়ের মানুষেরা চরম বিপাকে পড়েছেন। গ্যাস না থাকার কারণে দৈনিক খাবারের পেছনে তাদের অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। বাসা-বাড়ির পাশাপাশি ঢাকার আশপাশ এলাকার শিল্প-কারখানাতেও গত ১৫দিনে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

রাজধানীসহ আশপাশ এলাকায় গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে থাকা তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মসিউর রহমান গ্যাস সংকট নিয়ে সারাবাংলাকে বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতিই সমস্যার মূল কারণ। রাজধানীতে গ্রাহকের চাহিদা দুই হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ১৫০০ থেকে ১৭০০ ঘনফুট গ্যাস। আগে থেকেই প্রতিদিন ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সংকট রয়েছে। এর সঙ্গে শীতে গ্যাসের চাহিদা বেশি থাকে। ফলে গ্যাসের সংকট বেড়েছে। কিছু কিছু এলাকায় বিতরণ লাইনগুলো অনেক সরু। ফলে লাইনের শেষ প্রান্তে যারা বাস করেন, তাদের গ্যাস পেতে সমস্যা হয়।’

অবৈধ সংযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা অভিযান চালাচ্ছি। অনেকটা কমে এসেছে।’

রাজাধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মোহাম্মদপুর, বসিলা, আদাবর, পশ্চিম আগারগাঁও, মিরপুরের শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, কাফরুল, পশ্চিম ধানমণ্ডি, লালবাগ, সোবহানবাগ, পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার, কামরাঙ্গীরচর, উত্তরা, দক্ষিণখান, উত্তরখান, যাত্রাবাড়ীর একাংশ, দক্ষিণ বনশ্রী, মগবাজার এলাকায় গ্যাসের ভয়াবহ সমস্যা হচ্ছে। এসব এলাকায় সারাদিন চুলা জ্বলে না। গ্যাস পাওয়া যায় রাত ১১টার পর থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত। এ ছাড়া অন্যান্য এলাকায় গ্যাস থাকলে তার চাপ থাকে না।

রাজধানীর বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা রিনা ইসলাম। প্রতিদিনের মতো শনিবারও সকালে সারাদিনের খাদ্যের সংস্থান করতে রান্না ঘরে গেলেন তিনি। কিন্তু রান্না আর করা হলো না তার, কারণ ভোর থেকেই তার চুলায় গ্যাস নেই। নিরুপায় হয়ে এই গৃহিণী পরিবারের সস্যদের জন্য দোকানের শুকনো খাবার কিনতে হল। একই অবস্থা দুপুরেও। দোকানের শুকনো খাবার খাইয়ে ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গ্যাস না থাকার কারণে বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। এতে করে আমাদের মতো নির্দিষ্ট আয়ের মানুষদের ব্যাপক সমস্যা হচ্ছে।’

রিনা ইসলাম জানান, গ্যাসের এ সংকট চলছে কয়েকদিন ধরেই। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তার রান্নাঘরে চুলা জ্বলছে টিমটিম করে। কারণ গ্যাসের চাপ নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে অল্প-স্বল্প রান্না-বান্না সেরে নিতে হয়। কখনো কখনো গভীর রাতে জেগে সারতে হয় রান্নার কাজ।

আগারগাঁ এলাকার বাসিন্দা রবিউল ইসলাম তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘গ্যাস সংকটে গত এক সপ্তাহ ধরে বাসায় রান্না হচ্ছে না। হোটেল থেকে খাবার কিনে খাচ্ছি। হোটেলগুলোতেও বেশ ভিড়।’

মগবাজার এলাকার বাসিন্দা সাহেদা বেগমও গ্যাস সংকটে ভোগান্তিতে পড়েছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মাস গেলে টাকা ঠিকই দিতে হবে। এভাবে চলা যায় না।গ্যাস সংকটে গৃহবাসীদের কষ্ট বাড়লেও পোয়াবারো খাবারের দোকানগুলোর। গ্যাস না থাকায় তাদের ব্যবসা একদম ফুলে ফেঁপে উঠেছে!’

বাড্ডা এলাকার একটি মুদি দোকানের কর্মচারী খোরশেদ আলম বলেন, ‘ইদানীং দোকানে পাউরুটি, বিস্কুট ও কলা বেশি করে রাখি, এসব দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়। কারণ গ্যাসের অভাবে বেশিরভাগ বাসায় রান্না হচ্ছে না, এই কারণে অনেককেই রাতে পাউরুটি, বিস্কুট, কলা খেয়ে থাকেন। এ দোকানের মতো প্রতিটি এলাকার প্রায় প্রত্যেকটি হোটেলে বেড়েছে বেচা-কেনা। নির্ধারিত সময়ের আগেই বিক্রি হয়ে যায় সব খাবার।’

এদিকে পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন গ্যাস ক্ষেত্রের বিভিন্ন কূপ সংস্কার করা হচ্ছে। কূপের সংস্কারের কারণে বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গড়ে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম উৎপাদন হচ্ছে। দেশে এখন গড়ে প্রতিদিন গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে তিতাসের প্রতিদিনের চাহিদা ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু সংস্থাটি পাচ্ছে গড়ে এক হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। ফলে দৈনিক ঘাটতি ৪২০ মিলিয়ন ঘনফুট। শীতে গ্যাসের বাড়তি চাহিদা তৈরি হয় ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। সব মিলিয়ে দৈনিক ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ৬৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।

সমস্যা সমাধানে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার গ্যাসের স্বল্প চাপ সমস্যা নিরসনে এক ইঞ্চি হতে ৪ ইঞ্চি ব্যাসের ৫০ পিএসআইজি গ্যাস পাইপলাইন প্রতিস্থাপন ও সংশ্লিষ্ট সার্ভিস লাইন নির্মাণ এবং লিকেজযুক্ত ৮ ইঞ্চি ব্যাসের ৫০ পিএসআইজি গ্যাস পাইপলাইন স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানায় ঐ কর্মকর্তা। এরই মধ্যে মিরপুর, রামপুরা, পুরান ঢাকার কয়েকটি এলাকায় কাজ শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।

সারাবাংলা/এইচএ/আইজেকে