রবিবার ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ইং , ১২ ফাল্গুন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৭ জমাদিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

চা, সিঙ্গারা, সমুচা

জানুয়ারি ২৯, ২০১৯ | ২:৪৫ অপরাহ্ণ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা ।।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের একটি বক্তব্য এখন সামাজিক মাধ্যমে ঘুরছে। আঞ্চলিক উচ্চারণে ছাত্র-ছাত্রীদের বলছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে কোথাও পাওয়া যাবেনা – মাত্র দশ টাকায় এক কাপ চা, সিঙ্গারা, সমুচা, চপ। শুধুমাত্র পাওয়া যাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রে। বিশ্ববাসী জানলে এটি গিনেস বুকে উঠে যাবে এবং এটি এই বিদ্যা প্রতিষ্ঠানের গর্ব এবং ঐতিহ্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্ব আর ঐতিহ্য যে দশ টাকার চা, সিঙ্গারায় উন্নীত হয়েছে, তা আমার মতো অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থীসহ দেশের অনেকেরই জানা ছিলনা। আমাদের কেমন কেমন লাগলেও উপাচার্য মহোদয়ের নিশ্চয়ই অনেক সহকর্মী ও শুভাকাঙ্খি আছেন যারা তাকে বাহবা দেবেন, প্রত্যুষে নিদ্রাভঙ্গমাত্র তার মুখপটের উদ্দেশ্যে অজস্র ফুলচন্দন নিক্ষেপ করবেন। এমন এক ঐতিহাসিক বক্তব্য দিয়ে তিনিও খুশি, তার সভাসদরাও খুশি।

সস্তায় চা বা সমুচা-সিঙ্গারা পাওয়া গেলেই যদি গিনেস বুকে নাম ওঠে, তবে বহু আগেই ওঠা উচিত ছিল তাদের শিক্ষক রাজনীতি। এই বর্ণিল রাজনীতি (নীল, সাদা, গোলাপী) তাদের কত কি বানায়। রং-এর ভেতরেও কত রং আছে সেটাও মাঝে মাঝে অনুভূত হয়। যেমন গাড় নীল বা হাল্কা নীল।

নানা জনে নানা কথা বলবে। কিন্তু কতজনতো নিশ্চয়ই খুশিও হয় এমন অর্জনের কথা শুনলে। এটাকে বলে শিক্ষাক্ষেত্রে খুশি-রাজনীতি। এর ফাঁক গলে যদি উচ্চশিক্ষা নামক বেচারি ক্ষেত্রটি দূরে কোথাও নিক্ষিপ্ত হয়, তাহলে মন খারাপের কিছু নেই। মানতেই হবে খুশির পাল্লা কাজের পাল্লার বিপরীতেই চলে।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন কি এসব নিয়ে কথা বললেই ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভূ্থ্যান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ বা ১৯৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলেন প্রসঙ্গ আনা হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় বাঙালি জাতির প্রতিটি গণ-আন্দোলনে সর্বোচ্চ অবদান রেখেছে। এখানকার ছাত্র, শিক্ষক আর কর্মচারীদের আত্মত্যাগ নিয়ে আমরা গর্ব করি। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক অর্জন কী, এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর আসেনা। আজ দক্ষিণ এশিয়া, এশিয়া এবং বিশ্বপর্যায়ে যে রেটিং হয়, সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা দেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালযের নাম খুঁজে পাওয়া যায়না।

মানে-মর্যাদায় একদা দেশের সেরা ছিল ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বলা হতো প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। সেই অবস্থা আজ আর নেই। এখনও দেশের প্রধানতম উচ্চ বিদ্যাপীঠ, কিন্তু প্রশ্ন আছে এর মান নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নেমে যাওয়ার জন্য ছাত্র রাজনীতিকে দায়ী করেন অনেকে। কিন্তু রাজনীতির নামে শিক্ষকদের নিজেদের ভেতরকার ঝগড়া-বিবাদের কাজিয়ার কথা কতজন জানে? এই গোষ্ঠী-দ্বন্দ্বের কারণে একটা গোলমাল লেগেই থাকে শিক্ষকদের একটা বড় অংশে। এসবরই প্রভাব পড়ছে পড়াশোনা আর গবেষণার উপরে।

শিক্ষক আছেন, শিক্ষকতা আছে, বড় বড় ভবন, লাউঞ্জ আর অবকাঠামো আছে। সবই উন্নত হচ্ছে, কিন্তু শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশের উন্নতি নিয়ে বিশেষ মাথাব্যথা লক্ষ্য করা যায়না। কম পরিশ্রমে রাজনীতি করে পদ-পদবী পাওয়ার দুর্নিবার আকর্ষণে শিক্ষার নিম্নাভিমুখী মডেলটির রমরমা দেখতে হচ্ছে এখন।

গত বছর জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালযের শিক্ষক ড. এ কে এম শাহনাওয়াজের একটি প্রবন্ধ পড়েছিলাম। বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের রেটিং তালিকায় পিছিয়ে কেন বাংলাদেশ? শিরোনামের প্রবন্ধে তিনি কিছু যৌক্তিক প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলছেন, ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতির নেতিবাচক দিক এখন সবার সামনে স্পষ্ট। কতগুলো প্রশ্ন, যেমন ১. ছাত্র রাজনীতিতে মেধাবীদের অংশগ্রহণ শূন্যের কোঠায় চলে যাচ্ছে কেন? ২. মেধাবী দুই-চারজন ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর মেধাচর্চার বদলে পেশিচর্চায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে কেন? ৩. রাজনীতির বিবেচনায় অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী প্রার্থী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান কেন? ৪. নিয়মিত ক্লাস পরীক্ষা না হলেও এরজন্য কোনো জবাবদিহিতা থাকে না কেন? ৫. বিভিন্ন সংঘাতে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্ধারিত বন্ধ হয়ে যায় কেন?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বড় প্রয়োজন আজ। উচ্চশিক্ষায় পঠন-পাঠনের রীতিনীতির পরিবর্তনের কথা বলছেন অনেকে। রাজনীতি বেশি হলে সেসব নিয়ে ভাবনার সুযোগ কোথায়? উচ্চশিক্ষার মান কী করে উন্নত করা যায়, এ অঙ্ক সত্যিই কঠিন। মানোন্নয়নের লক্ষ্যে, সবার আগে যেটা করতে হবে ক্যাম্পাসে মোসাহেবি প্রথা দূর করতে হবে। শিক্ষক আর শিক্ষার্থীরা যাতে কোনও রকম ভয় না করে ভালোকে ভালো আর খারাপকে খারাপ বলার অভ্যেস করতে পারে সেই পরিবেশ আনতে হবে।

একটা কথা কিন্তু সত্য যে প্রকৃত শিক্ষাবিদ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনও আছেন। নিজের ইচ্ছায় উচ্চশিক্ষিত এসব বিজ্ঞানী-গবেষক উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন বোঝেন, তাদের হাতে শিক্ষার গুণগত মান কখনওই নষ্ট হয়না।

আমাদের আর আছেটা কী? সবই নিম্নমুখী। তবুও আরেকবার জেগে উঠুক দেশের প্রধান এই বিদ্যায়তন। শিক্ষাকে প্রাণপণে ধরে রাখার চেষ্টা করুক। আমাদের বাঁচতে হলে শিক্ষাকে বাঁচানোর বিকল্প নেই।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা : এডিটর ইন চিফ, সারাবাংলা ডটনেট, দৈনিক সারাবাংলা ও জিটিভি।

Tags: , , , , , , , ,

চা, সিঙ্গারা, সমুচা
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন