মঙ্গলবার ১৩ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং , ২৯শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী

‘চিকিৎসকের গাফিলতিতে রোগী মারা গেলে কষ্ট পাই’

ডিসেম্বর ১৮, ২০১৭ | ৯:৪৩ পূর্বাহ্ণ

জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ইচ্ছে ছিল তিনি নামকরা প্লাস্টিক সার্জন হবেন, মানুষের চেহারা সুন্দর করবেন। অনেক অনেক টাকা হবে তার, ধনী একজন মানুষ হবেন, বাড়ি-গাড়ি থাকবে অনেকগুলো। প্লাস্টিক সার্জন হবার লক্ষ্যে কাজও শুরু করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পুড়ে যাওয়া রোগীদের নিয়ে।

কিন্তু সেখানেই ঘটল বিপত্তি। পুড়ে যাওয়া রোগীদের কষ্ট, তাদের নিয়ে অবহেলা তার ধনী হবার স্বপ্নকে টেক্কা দিল, তার বড় লোক হবার স্বপ্ন উড়ে গেল পালকের মতো। ধনী হবার বদলে পোড়া রোগীদের নিয়ে নতুন করে যুদ্ধ করলেন তিনি। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে শুরু ৫ বেডে, এরপর ঢাকা মেডিকেলে ৬ বেড, এরপর ৫০, ১০০, ৩০০ থেকে এখন বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারির রোগীদের জন্য তৈরি হচ্ছে ৫০০ বেডের পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান। যেটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বার্ন ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, রোগীদের জন্য থাকবে আধুনিক সব সুযোগ এবং যন্ত্রপাতি।  ডাক্তার সামন্ত লাল সেন  সারাবাংলাকে জানালেন কীভাবে  ধীরে ধীরে  বার্ন ইউনিট  এই বিশাল ইনস্টিটিউটে পরিণত হতে চলেছে। জানালেন চিকিৎসাসেবায় তার  আনন্দ ও দেশের চিকিৎসাসেবায় অন্য এক স্তরে নিয়ে যাওয়ার তার আপ্রাণ চেষ্টার কথা।

তার কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল, বৃক্ষমানবখ্যাত আবুল বাজানদার, মুক্তা-মণি কিংবা জোড়া মাথার শিশু রাবেয়া ও রোকাইয়া— দেশের নানাপ্রান্ত থেকে আসা যেকোনো জটিল রোগীকেই এখন পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে। এসব রোগীদের কেন  এই ইউনিটে পাঠানো হচ্ছে বলে মনে করেন?

ডা. সামন্ত লাল সেন বললেন, ‘আবুল বাজানদার, মুক্তা-মণিকে দিয়ে আমাদের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে এসেছে। মুক্তা-মণিকে সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকরা ফিরিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু আমরা তার হাত অক্ষত রেখেই অস্ত্রোপচার করেছি, সে এখনো ভালো আছে, বাজানদার সম্পূর্ণ সুস্থ। কিন্তু এরা তো আমাদের রোগী, ওদের চিকিৎসা যদি আমরা না করি তাহলে যাবে কোথায়?  সুতরাং, আমাদেরকে চেষ্টা করতে হবে।’

একটু থেমে তিনি ফের বলেন, ‘এই বিষয়টি আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে যখন দেখতে পাই, চিকিৎসকদের গাফিলতিতে রোগী মারা যাচ্ছেন, অপারেশন ঠিকমতো হচ্ছে না— তখন খুব কষ্ট পাই। একজন সুস্থ চিকিৎসক কোনোদিন ভুল করতে পারে না।’

সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের চিকিৎসকদের মেধা, ইচ্ছা ও আন্তরিকতা আছে, কিন্তু তারা সুযোগ পাচ্ছে না। এসব চিকিৎসকরা যদি সঠিক সুযোগ ও সময় পেলে  অনেক ভালো করবেন। তাই আমি চাই, দক্ষ চিকিৎসক প্রজন্ম তৈরি করতে। আমাদের বয়স হয়েছে, আমরা চলে যাব। কিন্তু পরবর্তী চিকিৎসক প্রজন্ম যদি তৈরি না হয় তাহলে কাদের হাতে মানুষকে রেখে যাব। সুতরাং সে প্রজন্ম তৈরি করতে হবে। তাই তরুণ চিকিৎসকদের সব কিছুতে আমি যুক্ত রাখি, যেন তারা উৎসাহ পায়, কাজে আন্তরিক হয়। ’

সামন্ত লাল অতীত আর ভবিষ্যতের মিশ্র-ভাবনায় বলতে থাকেন, ‘আমি এখন আর চিকিৎসার সঙ্গে খুব বেশি জড়িত নই। কিন্তু একটা সময় ছিল যখন সারাদিন অপারেশন থিয়েটারে থেকেছি, অনেক অপারেশন করেছি জীবনে। তখন ভেবেছি, আমার একার পক্ষে সব-সময় সব কিছু সম্ভব হবে না। একদিন আমার বয়স হবে, থামতে হবে আমাকে। কিন্তু যদি কিছু একটা তৈরি করে দিয়ে যাই তাহলে সেটা যুগ যুগ ধরে টিকে থাকবে, চিকিৎসকরা কাজ করবে সেখানে। সে ভাবনা থেকেই বর্তমান ভবন তৈরি হয়। এখানে বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন, বর্তমান পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম, অধ্যাপক সাজ্জাদ খোন্দকার, অধ্যাপক রায়হানা আউয়ালদের নেতৃত্বে তরুণ চিকিৎসকরা দিন রাত করে চলছেন। প্রতিটি রোগীকে তারা সমান গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা দিচ্ছেন দেখে স্বস্তি আর শান্তি।’

দেশপ্রেমটা সবার আগে

বার্ন ইউনিটে সব-সময়ই পুড়ে যাওয়া রোগীদের নিয়ে কাজ করতে হয়, যেটা স্বাভাবিকভাবেই অন্য রোগীদের নিয়ে কাজ করার চাইতে একেবারেই ভিন্ন অভিজ্ঞতা। কিন্তু এর ভেতরে কোন ঘটনা মনে দাগ কেটে গিয়েছিল জানতে চাইলে প্রবীণ এ চিকিৎসক বলেন, ‘নিমতলীর ঘটনায় সারারাত আমরা চিকিৎসকরা ছিলাম। সেদিন চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র কে না-এসেছিল, সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বার্ন ইউনিট-দুই বিল্ডিংয়ের সবাই সেদিন একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের যেকোনো জাতীয় দুর্যোগে যে সাধারণ মানুষ একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঝাঁপিয়ে পরে সেটা সেদিন আবার প্রমাণিত হয়েছিল।’

‘এর থেকে বড় ইতিবাচক বিষয় আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু এই পজিটিভ মানসিকতাকে ধরে রাখতে হবে’ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের এ মানসিকতা ধরে রাখলে দেশটা এগিয়ে যাবে, যেমনটি গিয়েছে অনেকখানি। দেশপ্রেম-মানবপ্রেমটা যদি আমাদের থাকে তাহলেই এ দেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে। ’

বিদেশ থেকে এই দেশে মানুষ একদিন চিকিৎসা নিতে আসবে

নির্মাণাধীন শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি হাসপাতাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদান আর তার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বপ্ন উল্লেখ  বলেন, ‘নিমতলীর ঘটনার পরদিন বার্ন ইউনিটে প্রধানমন্ত্রী এলেন। সেদিনই তিনি আমাকে সারাদেশে যেন বার্ন ইউনিট করা যায় সে বিষয়ে নির্দেশ দেন। আমি তাঁকে বলেছিলাম, তাহলে একটি ইনস্টিটিউট  করতে হবে, চিকিৎসক গড়ে তুলতে হবে পুরো দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। কারণ এমনিতেই আমাদের দেশে বার্ন বিষয়ে দেশে প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা খুবই কম। তখন তিনি ইন্সটিটিউটের জন্য জায়গা খুঁজতে বলেন, কিন্তু কোথাও জায়গা পাচ্ছিলাম না। অনেক খুঁজে এখনকার জায়গাটা পেয়েছিলাম। প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনীকে কাজ দিলেন, এক বছর এখনো হয়নি। কিন্তু ১৮তলা ভবনের সাততলা পর্যন্ত হয়ে গিয়েছে, যেখানে বার্নের চিকিৎসা আর প্লাস্টিক সার্জারি হবে। এই  নতুন ভবনে  চিকিৎসার পাশাপাশি গবেষণার কাজও চলবে।’

সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘এখানে সেবা-চিকিৎসা-গবেষণা এবং শিক্ষা এ চারটি বিষয়কে মাথায় রেখে নতুন ভবনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিশ্বের যত আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এসব কিছুর চেষ্টা করছি এখানে রাখার জন্য। আগামী প্রজন্মের কাছে অনুরোধ, আন্তরিকতা আর দায়িত্বের সাথে কাজ করলে  জীবনে সব পাওয়া যায়। ক্রিকেটে যদি আমাদের ছেলেরা বিশ্বে সেরা হতে পারে তাহলে চিকিৎসায় কেন পারব না? আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সামনের দিনে চিকিৎসকরা এ দেশের চিকিৎসাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাবে যেদিন বাংলাদেশের মানুষ আর চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাবে না। বরং বিশ্বের নানা দেশ থেকে বাংলাদেশে মানুষ আসবে সেবা নিতে।’

আস্থা অর্জন করেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বার্ন

দেশের মানুষ এখন পোড়া রোগীদের চিকিৎসা বলতেই এই বার্ন ইউনিটকে বোঝায়।  অথচ ঢাকার আরও কয়েকটি হাসপাতালে এই ই্উনিট আছে। কিন্তু তাতে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর চাপ বেশি পরে কিনা পাল্টা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘পোড়ে গরিব মানুষ। বড়লোক পোড়ে না। আর পুড়ে যাওয়ার প্রথম ২৪ ঘণ্টাকে বলা হয় গোল্ডেন আওয়ার। এই গোল্ডেন আওয়ারে যদি ভালো চিকিৎসা না দেওয়া যায় তাহলে সারভাইভ করা খুব কঠিন। কিন্তু দেশের প্রথম সারি শহরগুলোতে যদি ভালো বার্ন ইউনিট থাকে তাহলে তাদেরকে প্রাথমিক অবস্থায় ঢাকায় আসতে হবে না। এতে করে রোগী যেমন তার প্রাথমিক চিকিৎসা পাবে তেমনি এই বার্নের চিকিৎসকরাও বেশি সময় নিয়ে এখানকার রোগীদের দেখতে পারবে তাতে সবারই উপকার হয়।’

সামন্ত লাল বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বার্ন ইউনিট দেশের মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। তা ছাড়া দেশের কোথাও কোথাও বার্ন থাকলেও সেখানে পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা না থাকার কারণেও ঢাকার ওপর চাপ পড়ছে। এ অবস্থা থেকে বেরুতে হবে আমাদের, ঢাকা মেডিকেল কলেজ বার্ন থেকে চাপ কমাতে হবে আর সে লক্ষ্যেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোর কর্তৃপক্ষকে আস্থা অর্জন করতে হবে যে, এসব হাসপাতালেও বার্নের চিকিৎসা হয়, কিছু হলেই ঢাকায় যেতে হবে না।’

সাদা অ্যাপ্রোন পরার অধিকার কেবল চিকিৎসকেরই

‘চিকিৎসকরা সৃষ্টিকর্তার আর্শীবাদ। আমরা টাকাও রোজগার করতে পারি আবার মানুষের ভালোবাসাও আমরা পাই। সবাই চিকিৎসক না, সাদা অ্যাপ্রোন পড়ার অধিকার কেবল চিকিৎসকেরই রয়েছে। সেই সাদা অ্যাপ্রোনের মর্যাদা যেকোনো মূল্যে রক্ষা করার দায়িত্ব চিকিৎসকেরই’ বলে মন্তব্য করেন ডা. বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন।

তিনি বলেন, ‘একজন চিকিৎসক যখন সাদা অ্যাপ্রোন পরে রাস্তায় হাঁটেন তখন মানুষ তাকে শ্রদ্ধা করে, সম্মান করে। আর একজন চিকিৎসক যখন রোগীর পাশে গিয়ে বসেন, তার গায়ে হাত রেখে কথা বলেন, তখন রোগীর অর্ধেক রোগ ভালো হয়ে যায়। নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকদের প্রতি আমার অনুরোধ, তোমরা প্লিজ চিকিৎসক হয়ে ওঠো, সৃষ্টিকর্তার এবং মানুষের আর্শীবাদ নাও।’

সারাবাংলা/জেএ/আইজেকে/জেডএফ

‘চিকিৎসকের গাফিলতিতে রোগী মারা গেলে কষ্ট পাই’
‘চিকিৎসকের গাফিলতিতে রোগী মারা গেলে কষ্ট পাই’
‘চিকিৎসকের গাফিলতিতে রোগী মারা গেলে কষ্ট পাই’