রবিবার ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ইং , ১২ ফাল্গুন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৭ জমাদিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

চোরাচালান ঠেকাতে অস্ত্র নেই কাস্টমসের, আশ্বাসে বন্দি এনবিআর

ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৯ | ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ

।। শেখ জাহিদুজ্জামান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট ।।

ঢাকা: চোরাচালান রোধে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন অপারেশনে অংশ নিতে হলেও অস্ত্র নেই কাস্টমসের হাতে। ফলে চোরাচালান চক্রকে মোকাবিলা করতে গিয়ে ঝুঁকি বাড়ছে কাস্টমস কর্মকর্তাদের। অথচ কাস্টমসের বন্ধ হয়ে যাওয়া অস্ত্র ইউনিটটি চালুর জন্য দীর্ঘদিনের দাবি থাকলেও তা বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ নেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর)। এখনও আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ কাস্টমসকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার দায়িত্বে থাকা সংস্থাটি।

কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, পাকিস্তান আমলে প্রতিটি কাস্টমস কমিশনারের অধীনে ছিল ১০ থেকে ১২টি করে অস্ত্র। কমিশনাররা লাইসেন্সের মাধ্যমে কাস্টমসের প্রিভেনটিভ কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দিতেন এসব অস্ত্র। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে অস্ত্রগুলো পুরনো হয়ে যাওয়ায় জমা দেওয়া হয় মালখানায়। এদিকে, নব্বই দশকের শেষের দিকে কাস্টমস একীভূত আইন করা হয়। ওই আইনের মাধ্যমে সি কাস্টমস অ্যাক্ট, ল্যান্ড কাস্টমস অ্যাক্ট ও ট্যারিফ অ্যাক্টের আওতায় নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা একীভূত আইনের অন্তর্ভুক্ত হন। ফলে তখন থেকে কাস্টমসের কর্মকর্তারা বদলি হতে শুরু করেন। এরপর থেকেই আর অস্ত্র পাননি কাস্টমস কর্মকর্তারা।

কাস্টমস সূত্রে আরও জানা যায়, নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত কাস্টমস কর্মকর্তারা একেকজন নির্দিষ্ট একটি খাতেই কাজ করতেন। তাদের কেউ কেবল পোর্টে, কেউ কেবল ল্যান্ডে, কেউ কেবল প্রিভেনটিভ শাখায় ও কেউ কেবল শুল্কায়নে কাজ করতেন। ফলে নিজ নিজ সেক্টরে তারা দক্ষ ও অভিজ্ঞ হয়ে উঠতেন। শুধু তাই নয়, তখন কাস্টমস কমিশনার নিজেই কাস্টমসের জনবল নিয়োগ দিতেন। একীভূত আইন হওয়ার পর কাস্টমস কর্মকর্তাদের সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পদায়ন করা হয়।

বিজ্ঞাপন

কাস্টমস আরও বলছে, কাস্টমসের কাজ জনগণের নিরাপত্তা দেওয়া, রাজস্ব আদায় করা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করা। ফলে চোরাচালান প্রতিরোধে কাস্টমস কাজ করে আসছে। এ কাজে স্বাধীনতার পর থেকেই কাস্টমসের হাতে অস্ত্র ছিল। নব্বইয়ের দশকে সরকারি মালখানায় জমা দেওয়ার পর আর সেই অস্ত্র ফেরেনি কাস্টমসে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের আরও আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন অপারেশন চালাতে হচ্ছে।

কয়েকজন কাস্টমস কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললে তারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাস্টমস কর্মকর্তাদের ওপর বেশকিছু হামলার তথ্য তুলে ধরেন। এর মধ্যে ২০১৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বেনাপোলে কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার মোস্তাফিজুর রহমান হামলার শিকার হন। ২০১৭ সালের ১৫ এপ্রিল বুড়িমারী স্থলবন্দরে হামলার শিকার হন শুল্ক গোয়েন্দার তৎকালীন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা এবাদত হোসেন চৌধুরী। একই বছরের ১৬ জানুয়ারি সিঅ্যান্ডএফ কর্মীদের হাতে হামলার শিকার হন চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী কমিশনার আবু হানিফ মোহাম্মদ আবদুল আহাদ। আবার ১২ জুন লাকসামে রাজস্ব আহরণের সময় কাস্টমসের ৯ কর্মকর্তা মারধর ও দুই নারী কর্মকর্তা শ্লীলতাহানির শিকার হন। সম্প্রতি তামাবিল শুল্ক স্টেশনে কাস্টমস কার্যক্রমে বাধা ও উচ্ছৃংখল কিছু বিজিবি সদস্য কর্তৃক  হামলা ও মারধরের শিকার হন কাস্টমমের পাঁচ সদস্য। এসব ঘটনায় কাস্টমস কর্মকর্তারা কোনো বিচার পাননি বলে অভিযোগ করেন।

কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, অস্ত্র থাকলে এসব ঘটনার অনেকগুলোই প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো। কাস্টমস আরও সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করতে পারত। অস্ত্র না থাকায় অনেক সময়ই তাদের চোরাচালান চক্রের হামলার মুখে পিছু হঠতে হয়।

কাস্টমস কর্মকর্তারা আরও বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, ঘানা, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, জার্মানি, ভুটান, মালদ্বীপসহ বিভিন্ন দেশে কাস্টমস কর্মকর্তাদের জন্য রয়েছে আধুনিক সরঞ্জাম। এমনকি তাদের জন্য অস্ত্রসজ্জিত বাহিনী, হেলিকপ্টার, ডগ স্কোয়াড, স্পিড বোট, গান বোট সবই আছে। এসব দেশের কাস্টমসকে চোরাচালান প্রতিরোধে যেকোনো ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ রাখার এখতিয়ারও দেওয়া আছে। কিন্তু আমাদের দেশে কাস্টমসে এমন কোনো সুযোগ-সুবিধাও নেই, নেই বিশেষ ক্ষমতাও। এত সব সুযোগ-সুবিধা না থাকলেও বিশেষ করে কাস্টমসের জন্য অস্ত্র বাহিনীর দাবি তারা দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছেন।

কাস্টমস মনে করছে, নিজস্ব অস্ত্রসজ্জিত বাহিনী থাকলে তাদের চোরাচালান প্রতিরোধ অভিযান আরও গতিশীল হবে এবং কাস্টমস কর্মকর্তারা নির্বিঘ্নে যেকোনো অভিযান পরিচালনা করতে পারবেন। এতে রাজস্ব আহরণের পরিমাণ বাড়বে এবং চোরাচালান প্রতিরোধও অনেক সহজ হবে।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, কাস্টমসের অস্ত্র বাহিনী গঠন নিয়ে ২০১৭ সালের ১০ অক্টোবর বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করে এনবিআর। সেখানে আলাদা একটি রেভিনিউ ফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেয় সংস্থাটি। সেই আলোচনায় তৎকালীন এনবিআর চেয়ারম্যান ও বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান, সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এবং বর্তমান পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। তখন বিভিন্ন সংস্থা এনবিআরের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। এরপর এনবিআরের পক্ষ থেকে কাস্টমসের অস্ত্র বাহিনী গঠন করতে আর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে জানায় এনবিআর সূত্র।

এদিকে, কাস্টমস আইন ১৯৬৯-এ চোরাচালান রোধে কাস্টমসকে সর্বাত্মক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে এই চোরাচালান প্রতিরোধ করতে গিয়ে বা প্রতিরোধে কাস্টমস যেকোনো ব্যবস্থা গ্রহণ বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে পারবে বলেও উল্লেখ আছে। তাই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড চাইলেই কাস্টমসের জন্য অস্ত্র বাহিনী গঠন করা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে বিসিএস কাস্টমস অ্যান্ড ভ্যাট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব সৈয়দ মুশফিকুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, কাস্টমসের অস্ত্র বাহিনী নিয়ে আমরা এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে কয়েক দফায় কথা বলেছি। তিনি আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন, শিগগিরই বিষয়টি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। অন্যদিকে কাস্টমসের অস্ত্র সজ্জিত বাহিনী না থাকায় বিভিন্ন সময় কাস্টমস কর্মকর্তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। অনেক সময় কাজ করতে গিয়ে শারীরিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছে কাস্টমস কর্মকর্তাদের। বিশ্বের অন্যান্য দেশের কাস্টমসের কাছে অস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের আধুনিক সরঞ্জাম থাকলেও আমাদের তা নেই। এটা দুঃখজনক।

এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজীদ সারাবাংলাকে বলেন, কাস্টমসকে রুটিন মাফিক কাজ করতে হয়। চোরাচালান প্রতিরাধে বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। এর ভেতরে কাস্টমস সবচেয়ে বেশি কাজ করে। কাস্টমসের অস্ত্রসজ্জিত বাহিনী করতে হলে প্রয়োজন অনেক কিছু। কেননা রাজস্ব আহরণ ও চোরাচালান এখন বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে হচ্ছে। তবে আইনের বাধ্যবাধকতা থাকায় কাস্টমসের অস্ত্র ইউনিট গঠন করা কঠিন হবে। কেননা কাস্টমসের আগে অস্ত্র ইউনিট ছিল, সেটি কোনো কারণে বিলুপ্ত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কাস্টমসের যদি অস্ত্র বাহিনী থাকত, তাহলে কাস্টমসের ওপর হামলার ঘটনা অনেক কম হতো। কাস্টমস কর্মকর্তাদের জীবনের ঝুঁকিও কমত। তারা নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারতেন। চোরাচালান রোধে দ্রুত অপারেশনে যেতে পারতেন। রাজস্ব আহরণ আরও বাড়ত। সবমিলিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের কাস্টমসের যেমন অস্ত্র বাহিনী রয়েছে, তেমনিভাবে আমাদের কাস্টমসেরও একটি বাহিনী থাকা দরকার। সেটা গঠন করা গেলে রাজস্ব আহরণ কয়েকগুণ বাড়বে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া সারাবাংলাকে বলেন, অস্ত্র বাহিনীর বিষয়ে কাস্টমস কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। কাস্টমসে একটি অস্ত্র বাহিনী যুক্ত হবে, যারা রাজস্ব আহরণ ও চোরাচালান রোধে কাজ করবে। আমি দ্রুতই বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করব। আশা করি বিশ্বের অন্যান্য দেশের কাস্টমসের মতো আমরাও এগিয়ে যাব।

সারাবাংলা/এসজে/টিআর

চোরাচালান ঠেকাতে অস্ত্র নেই কাস্টমসের, আশ্বাসে বন্দি এনবিআর
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন