বৃহস্পতিবার ১৫ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং , ১লা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ৫ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী

ছাত্রলীগ কি ৯৯৯!

জানুয়ারি ২৬, ২০১৮ | ৭:৫৮ অপরাহ্ণ

আমি খুব নরম মনের মানুষ। কারো মন খারাপ দেখলে বা শুনলে আমারও খারাপ লাগে। পত্রিকায় পড়লাম, বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো সংগঠন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মন খারাপ!

‘সবচেয়ে পুরোনো’ লিখেছি বলে অবাক হবেন না। ছাত্রলীগ কিন্তু আওয়ামী লীগের চেয়ে দেড় বছরের সিনিয়র। ছাত্রলীগের চেয়ে পুরোনো হতে পারে কেবল মুসলিম লীগ। বাংলাদেশে এখনও মুসলিম লীগ নামে কোনো সংগঠন আছে কিনা জানি না। থাকলেও, তেলাপোকাকে যেমন আমি পাখির মর্যাদা দেই না, তেমনি মুসলিম লীগকেও আমি সংগঠন বলে গোণায় ধরি না। বরং মুসলিম লীগ এখন বাংলাদেশে ধ্বংসের প্রতীক।

কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের ধ্বংস অনিবার্য হলে আমরা বলি, তোর পরিণতি হবে মুসলিম লীগের মত। যেমন বলা হচ্ছে, আগামী নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপির পরিণতি হবে মুসলিম লীগের মত।

যাক বলছিলাম ছাত্রলীগের কথা। দেশের পুরোনো, সবচেয়ে জনপ্রিয়, সবচেয়ে প্রভাবশালী সংগঠনের নেতাকর্মীরা মন খারাপ করে থাকলে কার ভালো লাগে বলুন? তবে তাদের মন খারাপ করার জেনুইন কারণ আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পিতৃতুল্য! সেই পিতা যখন ‘বাম সন্ত্রাসী’দের দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে তাকে বাঁচাতে ছাত্রলীগকে ফোন করেন, তখন তাদের আসলে ছুটে না গিয়ে উপায় থাকে না! তারা গিয়ে পিতৃতুল্য উপাচার্যকে উদ্ধার করে এবং ফু দিয়ে ‘বাম সন্ত্রাসীদের হটিয়ে দেয়! তবে এই ফু দিতে গিয়ে অনেক শক্তি খরচ করতে হয় বলে তাদের কয়েকজন দুর্বল নেতাকর্মীকে হাসপাতালে পর্যন্ত যেতে হয়েছে! আর ফু’য়ের ঘায়ে কয়েকজন ‘বাম সন্ত্রাসী’কেও আহত হতে হয়েছে!

উপাচার্যকে উদ্ধারের এই বীরত্বপূর্ণ অভিযান অবশ্যই ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে! তারা ভেবেছিল, এই অভিযানে চারদিকে ধন্য ধন্য পড়ে যাবে!

কিন্তু ঘটছে উল্টো ঘটনা। সবাই ছি ছি করছে কেন, এটা তাদের মাথায়ই ঢুকছে না!

অন্ধ গণমাধ্যম, একচোখা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তো বুঝে না বুঝে ধুয়ে দিচ্ছে! যা’রা কলাপসিবলের তালা ভেঙ্গে উপাচার্যকে আটকে রাখে, পত্রিকাগুলো তাদের লিখছে বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারী! আর যারা মানববলয় তৈরি করে উপাচার্যকে উদ্ধার করলো, তাদের বলা হচ্ছে হামলাকারী। কী অন্যায়, কী অবিচার!

শুধু গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নয়; মূল দলের সিনিয়র নেতারাও ডেকে নিয়ে বকাঝকা করলেন। বলে দিলেন, সামনে নির্বাচন, যে কোনো মূল্যে বিশ্ববিদ্যালয় শান্ত রাখতে হবে।

মুরুব্বীদেন মুখের ওপর কিছু বলাও যায় না। কিন্তু ছাত্রলীগ কি বিশ্ববিদ্যালয় অশান্ত করে। এই উন্নয়নবিরোধী ‘বাম সন্ত্রাসী’গুলো কোনো একটা ছুতা পেলেই আন্দোলনের নামে বিশ্ববিদ্যালয়কে অশান্ত করে তোলে। ছাত্রলীগ তো সেই অশান্ত পরিস্থিতিকে শান্ত করতে যায়। এখন বড় ভাইদের কথা মানতে হলে, তাদের চুপ করে থাকতে হবে, অন্যায় মেনে নিতে হবে।

‘বাম সন্ত্রাসী’রা রড দিয়ে পিটিয়ে তিনটি তালা ভেঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি করলেও তাদের চুপ করে থাকতে হবে। তারা পিতৃতুল্য উপাচার্যকে হেনস্থা করলেও ছাত্রলীগকে দাঁতে দাত চেপে চুপ করে থাকতে হবে। গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম, দলের মুরুব্বীদের বকাঝকাও না হয় মানা যায়। কিন্তু যার জন্য করি চুরি, সেই যদি চোর বলে, মনের দুঃখে বনে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রব্বানী বলেছেন, রেজিস্ট্রার বিল্ডিঙে অবরুদ্ধ উপাচার্যকে উদ্ধার করতে ছাত্রলীগ যায়নি এবং সেখানে ছাত্রলীগের কেউ ছিল না। প্রক্টর তাদের এত বড় একটা কৃতিত্ব এভাবে ছিনতাই করতে চাইলে মন তো একটু খারাপ হবেই!

ছাত্রলীগ নিজেরা তো জানে উপাচার্যের ফোন পেয়েই বড় ভাই তাদের ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বলেছেন, উপাচার্যের ফোন পেয়েই ছাত্রলীগ সেখানে গিয়েছিল। এমনকি উপাচার্যকে উদ্ধৃত করে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সময়মত এসে ছাত্রলীগ উদ্ধার না করলে তার জীবনের ওপর হামলার আশঙ্কা ছিল।

ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক এস এম জাকির হোসেন তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে পিতৃতুল্য শিক্ষক তথা দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের সম্মানিত উপাচার্যের সম্মান রক্ষা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব বলে আমি বিশ্বাস করি। একজন মানুষ হিসেবে বিবেকের তাড়না থেকেই ছুটে গিয়েছিলাম।’

বিবেকের তাড়নায় করা এত বড় একটা মহৎ কাজের কৃতিত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, যার নিজের আবার আরেক শিক্ষকের সাথে মারামারি করার রেকর্ড আছে, ছিনতাই করতে চান, তাহলে তো ছাত্রলীগের মন একটু না বেশিই খারাপ হতে পারে! আমারই মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে!
প্রক্টর রব্বানী সাহেবের কথা শুনে আমার খালি ট্রাম্পের (যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প) কথা মনে পড়ছে। ট্রাম্পও এমন ডাহা মিথ্যা এমন অবলীলায় বলতে পারবেন না!

আমি ধরে নিচ্ছি, সকল গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সবার দাবি ভুল, সবাই অসত্য কথা বলছেন। একমাত্র প্রক্টর মহোদয়ই সত্যবাদী যুধিষ্ঠির! প্রক্টর মহোদয়ের কাছে আমার খালি একটা ছোট্ট প্রশ্ন, ছাত্রলীগ যদি না যায়, সেদিন উপাচার্যকে উদ্ধার করলো কারা?

আরেকটা ছোট্ট প্রশ্ন। কয়েকদিন আগে জরুরি টেলিফোন সেবা হিসেবে ‘৯৯৯’ চালু হয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে এটা একটা দারুণ পদক্ষেপ। তো সেই ‘৯৯৯’ সার্ভিস কি ছাত্রলীগের কাছে লিজ দেয়া হয়েছে? এখন কি কেউ অবরুদ্ধ হলে, বিপদে পড়লে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদককে ফোন দিয়ে বলবেন, ‘আমাকে উদ্ধার করুন’।

সারাবাংলা/এমএম

ছাত্রলীগ কি ৯৯৯!
ছাত্রলীগ কি ৯৯৯!
ছাত্রলীগ কি ৯৯৯!