বুধবার ২৫ এপ্রিল, ২০১৮ , ১২ বৈশাখ, ১৪২৫, ৮ শাবান, ১৪৩৯

জনবিচ্ছিন্ন হলেও বিএনপিবিচ্ছিন্ন হচ্ছে না জামায়াত

জানুয়ারি ১৩, ২০১৮ | ১২:০৫ অপরাহ্ণ

আসাদ জামান, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: রাষ্ট্রবিরোধী নানা তৎপরতার কারণে কার্যত জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এখনও পাশে পাচ্ছে বিএনপিকে। রাজনীতিতে পুনর্বাসনের হাতিয়ার ও অন্যতম মিত্র এই দলটিই জামায়াতের ভরসার স্থল হয়ে রয়েছে।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শীর্ষ নেতাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়ার পর জামায়াতের সাংগঠনিক সক্ষমতাও এখন অনেকটা ভঙ্গুর। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার ও রায়ে যেসব পর্যবেক্ষণ এসেছে তাতে নতুন প্রজন্মের কাছেও দলটির স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থান এখন স্পষ্ট। এছাড়াও ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশের জনগণ ও জনসম্পদের ওপর নানা ধরনের নাশকতা চালানোর ঘটনায় আটক হয়ে যায় দলটির বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মী। এসব কারণেই এখন অনেকটা জনবিচ্ছিন্ন ও দুর্বল হয়ে পড়েছে জামায়াত।

এর পাশাপাশি আদালতের রায়ে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন স্থগিত রয়েছে জামায়াতের, দলীয় প্রতীক ও নাম ব্যবহার করে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না তারা। এছাড়াও জামায়াত নেতাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণসহ নানামুখী চাপ থাকায় ‘মাঠ গরমের’ রাজনীতিতেও সরব হওয়ার সুযোগ আর পাচ্ছে না দলটি— এমনটিই ধারণা সংশ্লিষ্টদের।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বিজয়নগর ও কাকরাইলে ‘সহিংস’ কর্মসূচি পালনের পর প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পথ বন্ধ হয়ে যায় জামায়াতের। ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দলের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায়কে কেন্দ্র করে সারাদেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এছাড়া ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ভোটবর্জন ও প্রতিরোধের নামে জ্বালাও পোড়াও আন্দোলন এবং ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত হরতাল-অবরোধের সময় দেশব্যাপী নজিরবিহীন সহিংসতার পর সরকারের কঠোর অবস্থান ও জনপ্রতিরোধের মুখে একেবারেই জনবিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে জামায়াত।

গত বছরের ৯ অক্টোবর রাজধানীর উত্তরার একটি বাসায় গোপন বৈঠকের সময় দলের বর্তমান আমির মকবুল আহমাদ, সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান, নায়েবে আমির মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ ৯ শীর্ষ নেতা আটক, ২৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কদমতলীতে গোপন বৈঠককালে ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) জামায়াতের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল, সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদসহ আরো ১০ শীর্ষ নেতাকে আটক করায় খর্ব শক্তির জামায়াত শক্তিহীন সংগঠনে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, সরকারের ‘জিরোটলারেন্স’ অবস্থানের কারণে প্রকাশ্যে তো দূরের কথা গোপন কর্মকাণ্ডও চালাতে পারছে না জামায়াত। আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে জামায়াতের তৃণমূল অংশ স্থানীয় আওয়ামী লীগের বশ্যতা স্বীকার অথবা সমঝোতার পথ বেছে নিয়েছে। ফলে জামায়াতের সাংগঠনিক দুর্বলতা এখন দৃশ্যমান।

গত ২২ ডিসেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতা ও গাইবান্ধার সাবেক সংসদ সদস্য আবু সালেহ মুহাম্মদ আব্দুল আজিজ মিয়া ওরফে ঘোড়ামারা আজিজসহ ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সাজা পাওয়া অন্য ৫  আসামি মো. রুহুল আমিন, মো. আব্দুল লতিফ, আবু মুসলিম মোহাম্মদ আলী, মো. নাজমুল হুদা, ও মো. আব্দুর রহিম মিয়াও জামায়াতের তৃণমূল পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতা।

দলের গুরুত্বপূর্ণ ৬ নেতার মৃত্যদণ্ডাদেশের পরও কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করেনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক সময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী জামায়াত। রায়ের পর অজ্ঞাত স্থান থেকে দলীয় প্যাডে নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে স্বাধীনতাবিরোধী এই দলটিকে। অথচ ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত যতগুলো রায় হয়েছে তার প্রতিটিতে হরতাল ও বিক্ষোভ কর্মসূচি দিয়েছে জামায়াত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সরকারের টানা দুই মেয়াদে যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে জামায়াতের বিরুদ্ধে নেওয়া আইনানুগ ব্যবস্থা, মানবতাবিরোধী অপরাধে দলটির শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি, তরুণ প্রজন্মের কাছে জামায়াতের অপরাধের ফিরিস্তি তুলে ধরাসহ নানামুখী উদ্যোগের কারণে জনগণের কাছে দলটির গ্রহণযোগ্যতা এখন শূন্যের কোঠায়। মূলত দলটি এখন সম্পূর্ণরূপে জনবিচ্ছিন্ন দলে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু এত কিছুর পরও বিএনপিবিচ্ছিন্ন হচ্ছে না জামায়াত। দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতের ওপরই ভরসা রাখছে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি। নানা মহলের সমালোচনা ও  শুভাকাঙ্ক্ষীদের পরামর্শ— কোনো কিছুইতে রাঁ করছে না দলটি। জামায়াতকে অবলম্বন করেই সামনের কঠিন পথ পাড়ি দিতে চায় তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, আগামী নির্বাচনেও জোট শরিকদের মধ্যে কেবল জামায়াতের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি নিয়ে কথা বলতে প্রস্তুত বিএনপি। কয়টি আসন দিয়ে জামায়াতকে সন্তুষ্ট রাখা যায়— সে বিষয়টি নিয়ে গভীর ভাবনায় মগ্ন দলটির হাইকমান্ড। বিএনপির এই দুর্বলতার সুযোগে জামায়াতও ষোলআনা উসুল করার পাঁয়তারা করছে।

ঢাকা উত্তর সিটির করপোরেশন (ডিএনসিসি) নির্বাচনে তফসিল ঘোষণার আগেই বিএনপিকে পাশ কাটিয়ে মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঢাকা মহানগরের (উত্তর) আমির সেলিম উদ্দিনের নাম ঘোষণা করে রেখেছে জামায়াত। ৮ জানুয়ারি রাতে খালেদা জিয়ার সঙ্গে জোট নেতাদের বৈঠকে দলটির কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আবদুল হালিম ধৃষ্টতার সঙ্গে বলেন, ‘এটা দলের সিদ্ধান্ত। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইলে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বসতে পারেন।’

জানা গেছে, এমন আচরণের পরও জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কথা চিন্তা করছে না বিএনপি। বরং সম্পর্ক আগের জায়গা রেখে স্বাধীনতাবিরোধী দলটির সঙ্গে সব ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে চায় তারা। জনাকাঙ্ক্ষার বিপরীতে দাঁড়িয়ে বিতর্কিত রাজনৈতিক দল জামায়াতকে সঙ্গে নিয়েই চলতে চায় রাজনীতির পিচ্ছিল পথ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সারাবাংলাকে বলেন, ‘জামায়াত-বিএনপির সম্পর্ক আগের জায়াগায়ই আছে। সম্পর্কের কোনো অবনতি হয়নি। অবনতি হওয়ার মতো কোনো ঘটনাও ঘটেনি।’

এদিকে স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে দীর্ঘকালের বন্ধুত্ব নিয়ে নানামহল থেকে ওঠা নানা প্রশ্নের জবাবে বিএনপির শীর্ষ নেতারা বরাবরই বলে আসছেন, জামায়াতের সঙ্গে তাদের জোটবদ্ধতা কেবল আন্দোলন ইস্যুতে। নির্বাচন বা সরকার গঠনের ব্যাপারে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির কোনো চুক্তি নেই। জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক আদর্শিক নয়, রাজনৈতিক।

তবে ২০ দলীয় জোটের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০১ সালে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোটের সমন্বয়ে গঠিত চার দলীয় জোটের ঘোষণাপত্রে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল— ‘আন্দোলন, নির্বাচন ও সরকার গঠনের জন্য চার দলীয় জোট গঠন করা হলো।’

২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল  চার দলীয় জোট সম্প্রসারণের মাধ্যমে ১৮ দলীয় জোটে রূপান্তরিত করার সময়ও ঘোষণাপত্রে ‘আন্দোলন, নির্বাচন ও সরকার গঠনের জন্য ১৮ দলীয় জোট গঠন করার’ বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এই ১৮ দলীয় জোটই এখন ২০ দলীয় জোট হিসেবে পরিচিত।

বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক অব্যহত রাখা বিএনপি বিব্রতকর প্রশ্নের জবাব এড়াতেই বারবার বলার চেষ্টা করে জামায়াতের সঙ্গে তাদের কেবল আন্দোলনের সম্পর্ক। অথচ ১৯৯১ সালে ১৪৬ আসন পেয়ে সরকার গঠনের সময় প্রয়োজনীয় সংখ্যক আসন জামায়াতের কাছ থেকে ধার নিয়েছিল বিএনপি। ২০০১ সালের জামায়াতের সঙ্গে আসন ভাগা-ভাগি করে নির্বাচনে অংশ নেয় তারা। ওই নির্বাচনে ‘অভাবনীয়’ বিজয় অর্জনের পর জামায়াতের সঙ্গে মন্ত্রিত্বও ভাগাভাগি করে বিএনপি। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও জামায়াতের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করতে হয় তাদের।

এত সব উদাহরণ থাকার পরও সম্প্রতি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সারাবাংলাকে বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেবল আন্দোলনের। নির্বাচন বা সরকার গঠনের ব্যাপারে তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো চুক্তি নেই।’

সারাবাংলা/এজেড/একে

আরও পড়ুন