রবিবার ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ইং , ১২ ফাল্গুন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৭ জমাদিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

জামায়াত প্রেমে সর্বনাশ

জানুয়ারি ২৯, ২০১৯ | ২:২৪ পূর্বাহ্ণ

।। কবির য়াহমদ ।।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে নির্বাচিত সাংসদদের অধিকাংশই শপথ নিয়েছেন। নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে। সংসদের প্রথম অধিবেশনের তারিখও নির্ধারণ হয়ে গেছে। মন্ত্রিসভার সদস্যরা দায়িত্ব গ্রহণ শেষে নানামুখী উদ্যোগের কথা জানাচ্ছেন, আশা দেখাচ্ছেন। নবগঠিত সরকারকে উন্নয়ন সহযোগী বিভিন্ন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানেরা অভিনন্দন জানাচ্ছেন। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখও জানিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। অর্থাৎ সরকারের কার্যক্রম পরিস্থিতি প্রায় স্বাভাবিক।

বিপরীতে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বিজয়ীরা শপথ নেননি। তারা শপথ নেবেন না বলে দল ও জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ইসি কর্তৃক নির্বাচনের ফলের গেজেট প্রকাশের তিনদিনের মধ্যে শপথ নেওয়ার প্রাথমিক বাধ্যবাধকতা শেষে শপথ গ্রহণের বাড়তি সুযোগের দিনক্ষণের হিসাবও শুরুর অপেক্ষায়। গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান অনুযায়ী প্রথম অধিবেশন শুরুর পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচিত সাংসদরা শপথ গ্রহণ না করলে তাদের আসন শূন্য হয়ে যাবে- এমন দিনক্ষণ শুরু হবে ৩০ জানুয়ারি থেকে। অর্থাৎ এই তারিখের পরের তিন মাসের মধ্যে নির্বাচিতরা শপথ না নিলে ওই সব আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আসনের হিসাবে এই সংখ্যা মাত্র ৮।

সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যেই বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিতদের শপথ গ্রহণের আহবান জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় প্রধান নেতা ওবায়দুল কাদেরের আহ্বানও একই। শপথ না নেওয়া নির্বাচিত ৮ সাংসদ যদি নিয়মের ব্যত্যয় করেন তবে নির্বাচন কমিশনকে ওইসব আসনে উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা ও ভোটগ্রহণের পথে যাবে। এছাড়া তাদের আর উপায় নাই।

বিজ্ঞাপন

এদিকে দেশ যখন এমন পরিস্থিতিতে তখন বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে এই নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে। কিন্তু তাদের দাবির স্বর এতখানি ক্ষীণ যে সেটাকে সরকার পাত্তা দিচ্ছে বলে মনে হয় না। ইত্যবসরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকার সংলাপের বিষয়টিকে ইতিবাচক ভাবে দেখতে শুরু করেছে। তবে এই সংলাপ যে ‘শুভেচ্ছা বিনিময়’-পর্বের মত হয়ে ওঠবে সেটা অনুমান করা যায়। নির্বাচনপূর্ব সংলাপের পর নির্বাচন-উত্তর সংলাপ হবে সেটা। এবং আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে কেবল বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক অপরাপর দলগুলোই কেবল নয় নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সংলাপ করে আসা সবগুলো দল এবারও আমন্ত্রণ পাবে। ফলে ধারনা করা যায় এই সংলাপ থেকে বিএনপির খাতায় কোন প্রাপ্তি যোগ হবে না।

সরকারব্যবস্থার সকল কিছু ঠিকঠাক মত চললেও বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ নিয়ে দেশে-বিদেশে খুব বেশি আলোচনা হচ্ছিল না। তবে সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদন প্রকাশের পর এই আলোচনা ওঠেও থেমে গেছে। এর কারণ মূলত টিআইবির পর্যবেক্ষণ সূত্র যেখানে তারা নিজেরাই জানিয়েছে এই তথ্য প্রাপ্তির উৎস যা মূলত অভিযোগ থেকেই উদ্ভূত। অর্থাৎ টিআইবি নিজেরা মাঠে থেকে তথ্য সংগ্রহ করেনি। তথ্যসূত্রের এই দুর্বলতায় টিআইবির প্রতিবেদনকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। ফলে নির্বাচনের পর যে আলোরেখা দেখেছিল বিএনপি সেটা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়েছে।

নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবি, কারচুপির অভিযোগ, টিআইবির প্রতিবেদন এগুলো প্রতিষ্ঠা না পাওয়ার অন্য অনেক কারণের মধ্যে বড় কারণ হচ্ছে বিএনপির সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াতের সংযোগ। দেশের বেশিরভাগ নাগরিকই ঐতিহ্যগতভাবে জামায়াতবিরোধী। এই জামায়াত বিরোধিতার অন্যতম প্রধান কারণ একাত্তরে দলটির ভূমিকা, ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ। জামায়াতের প্রতি মানুষের এই মনোভাব জানা সত্ত্বেও দলটিকে পরম মমতায় আগলে রেখেছে বিএনপি। প্রবল গণদাবি থাকার পরেও তাদেরকে বর্জন করেনি তারা, উলটো নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন না থাকা এই দলটির অন্তত ২৫ নেতাকে দলীয় প্রতীকে মনোনয়ন ও সমর্থন দিয়েছিল তারা সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে। অথচ জামায়াত নেতাদের প্রতি বিএনপি এমন দরদ না দেখালে তাদের বেশিরভাগই নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারতেন না।

বিএনপির এই জামায়াতপ্রেমের বিষয়টি প্রায় একপাক্ষিক। জনগণের কাছে বারবার প্রত্যাখ্যাত এই দলটিকে বিএনপি আগলে রাখলেও বিএনপির দুর্দিনে জামায়াত তাদের সঙ্গ দেয়নি। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় কারাগারে যাওয়ার পর দলটি বিক্ষিপ্তভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করলেও একবারের জন্যেও মাঠে নামেনি জামায়াত। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েক মাস আগে দেশের কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও বিএনপির সঙ্গে থাকেনি জামায়াতে ইসলামি; তবু জামায়াতকে ছাড়েনি বিএনপি।

বিএনপির এই জামায়াতপ্রেমের বিষয়টি দেশের মানুষের চোখ এড়ায়নি। নির্বাচন পরবর্তী বিএনপির দুর্দিনে তাদের সমব্যথী মানুষের সংখ্যাও তাই হাতেগোনা। সদস্যসমাপ্ত নির্বাচনে ফলাফল বিস্ময় জাগানিয়া ঠিক, তবে এই ফলের কার্যকারণ নিরূপণ ও বিএনপির অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানে আগ্রহী মানুষও তাই খুব কম। নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন আছে অনেকের কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে এর মাধ্যমে জামায়াতে লাভবান হয়ে যাওয়ার বিষয়টি সামনে আসতে পারে ভেবে অনেকেই কিছু বলতেও আগ্রহী না। এই বিষয়টি যে বিএনপির জামায়াতপ্রেমের খেসারত তা বলাই বাহুল্য।

২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তী বা স্বর্ণ জয়ন্তী। জাতির এই আনন্দঘন মুহূর্তের বছর দুয়েক আগে স্বাধীনতাবিরোধী ও একাত্তরের গণহত্যার প্রত্যক্ষ সহযোগী জামায়াতে ইসলামির রাজনৈতিক পুনর্বাসনের উদ্যোগকে দেশের জনগণ ভালো চোখে দেখেনি। একাত্তরকে ঘিরে ইতিহাসের এই মাইলফলকের সামনে এসে নির্বাচনের সময়ে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে বিএনপি ও ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। জামায়াত নেতাদের যেখানে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ সঙ্কুচিত হয়ে গিয়েছিল ইসিতে নিবন্ধন হারিয়ে, একাত্তরে তাদের ভূমিকা প্রকাশ্য হয়ে আছে এই প্রজন্মের কাছে সেখানে বিএনপি তাদেরকে ‘লাইফ সাপোর্ট’ দিয়েছে দলের প্রতীকে নির্বাচনের সুযোগ দিয়ে। জামায়াত নেতারা বিএনপির প্রতীকে তাদের মনোনয়নে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি ড. কামাল হোসেনসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা জানতেন, কিন্তু তারা এ থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। উপরন্তু এ নিয়ে কেউ কিছু বলতে চাইলে ধমক দিয়েছেন, চিনে রাখার কথা বলেছেন, ভবিষ্যতে দেখে নেবেন বলেও হুমকি দিয়েছেন। বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের এই জামায়াতপ্রেমের বিষয়টি নির্বাচনের সময়ে ভোটারেরা যেমন ভালোভাবে নেয়নি, নির্বাচনের পরেও প্রতিক্রিয়া প্রকাশে বেশিরভাগ তাই নীরব।

জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির এই জোট ও সম্পর্ক এখন অনেকটাই আদর্শিক। বিএনপির অনেক নেতা এখন জামায়াতের চোখে বাংলাদেশকে দেখে, রাজনীতিকে দেখে। জামায়াত তাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে এই দেশের জনগণকে তাদের আদর্শিক অনুসারী করতে না পারলেও গত কয়েক দশকে তারা বিএনপির নেতাদের ক্ষেত্রে সক্ষম হয়েছে। বিএনপির দুর্দিনে জামায়াত লাপাত্তা হলেও জামায়াতের দুর্দিনে নিজেদের ধ্বংস করে দিয়ে হলেও বিএনপি এগিয়ে আসছে। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে খোদ বিএনপিই। ফলে নির্বাচনের অব্যবহিত পর থেকে নির্বাচন বিষয়ক তাদের কোন বক্তব্যই বেশিরভাগ লোকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে না; এটা যতটা না রাজনৈতিক তারচেয়ে বেশি জামায়াতে ইসলামির মত দেশবিরোধী শক্তির বিরোধিতা।

এছাড়াও আছে পশ্চিমা দেশগুলোর জামায়াত বিষয়ক সতর্কতা। জামায়াত সন্ত্রাসী দল হিসেবে দেশে-বিদেশে স্বীকৃত হলেও এনিয়ে বিএনপির ভাবান্তর নেই। নির্বাচনের আগে বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম জামায়াত নিয়ে সতর্ক থাকার আহবান জানালেও এটাকে গুরুত্ব দেয়নি বিএনপি। এদিকে, বিএনপির এই জামায়াতপ্রেমের বিষয়টি জেনেও অস্বীকার করে গেছেন ড. কামাল হোসেন। এগুলো নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারকারী প্রপঞ্চ হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। একই সঙ্গে নির্বাচন পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায়ও বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে জামায়াত-যোগের বিষয়টি মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে করে দেশে-বিদেশে ক্রমে বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে বিএনপি। ড. কামাল হোসেনসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের রাজনৈতিক চরিত্রেও পড়েছে জামায়াত পুনর্বাসনের চেষ্টাকারী হিসেবে কলঙ্কের কালি।

জামায়াতকে সঙ্গে রেখে কী পেল বিএনপি, জামায়াত পুনর্বাসনের অপ্রত্যক্ষ দায়িত্ব নিয়ে কী পেলেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা- এই হিসাব মেলানোর সময় তাদের এসেছে। তবে তারা এ হিসাবে নেই। ড. কামাল হোসেন যদিও ভুল ‘বুঝতে পেরে’ জামায়াত ছাড়তে বিএনপিকে ‘অনুরোধ করা যেতে পারে’ বলছেন তবে তার এই বক্তব্যে কতখানি আন্তরিকতা আর কতখানি সততা রয়েছে এনিয়ে ঘোর সন্দেহ। কারণ ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে জামায়াত নেতারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে এই তথ্য দেশের সকলে জানলেও কামাল হোসেন বরাবরই অস্বীকার করে গেছেন। জামায়াত নেতাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বৈধতা নিয়ে হাই কোর্টে রিট হলেও এনিয়ে কিছু জানতেন না কামাল হোসেনরা- এরচেয়ে বড় মিথ্যা আর কিছু হতে পারে না।

জামায়াতকে রাজনৈতিক ভাবে পুনর্বাসিত করার যে উদ্যোগ নিয়েছিল বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সেটা ব্যর্থ হয়েছে। বিএনপি এই ব্যর্থতার দায় চোকাল নির্বাচনী ফলাফলে মহাবিপর্যয়ের মাধ্যমে। তাদের জামায়াত-প্রেমের এই রাজনীতি দলটির সামগ্রিক রাজনীতিকেই হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। এমন অবস্থায় তারা কি কিছু শিখছে? সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে মনে হয় শেখার চাইতে হারের অজুহাত খুঁজতে মরিয়া তারা। নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে তারা ফল প্রত্যাখ্যান করেছে তবে এই প্রত্যাখ্যানের সমর্থনে জোর আলোচনার অভাবের যে লক্ষণ দেশে-বিদেশে সে কারণের মধ্যে ওই একই জামায়াত।

বিএনপির জামায়াত-প্রেমের নজির নির্বাচনের আগে থেকে শুরু করে নির্বাচনের পরের সময় পর্যন্ত চলমান। জামায়াতের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্ধকার; জামায়াতপ্রেমে অন্ধ বিএনপি সেই অন্ধকার আর সর্বনাশা পথের দিকেই ধাবমান।

লেখক: সাংবাদিক

সারাবাংলা/এমও

জামায়াত প্রেমে সর্বনাশ
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন