সোমবার ২২শে অক্টোবর, ২০১৮ ইং , ৭ই কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১২ই সফর, ১৪৪০ হিজরী

জীবনে যা কিছু করি, হৃদয় থেকেই করি

সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৮ | ৬:৩১ অপরাহ্ণ

লুবনা মারিয়াম। তাকে চিনলে এমন একজনকে চেনা হয়ে যায় যিনি বাংলার সংস্কৃতির গতি-প্রকৃতি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন। নৃত্যকে মূল মাধ্যম হিসেবে নিয়েছেন বটে তবে তার পাশাপাশি বাংলার সংস্কৃতিকে অধ্যয়ন করে নিয়েছেন আনুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিক সব মাত্রায়। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে জন্ম ও বড় হওয়া। সুতরাং অস্থি-মজ্জায়ও ধারণ করেন বাংলার সংস্কৃতি। সংস্কৃত পড়তে ভারত ছুটেছেন, আর পাশ্চাত্য থেকে নিয়েছেন সমসাময়িক সংস্কৃতির পাঠ। এখন করছেন গবেষণা। গ্রাম-বাংলার সংস্কৃতিকে বুঝতে সেখানেও ছুটে বেড়িয়েছেন। ফলে লুবনা মারিয়াম বাংলার জন্য বাংলাদেশের জন্য এখন নিজেই হয়ে উঠেছেন পাঠের কিংবা অধ্যায়নের ক্ষেত্র। সারাবাংলা.নেট’র সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি বলেছেন এই এগিয়ে চলার গল্প। কথা বলছিলেন সারাবাংলার স্পেশাল ফটো করেসপন্ডেন্ট আশীষ সেনগুপ্ত’র সাথে। প্রিয় পাঠক এই পাঠে আপনারা পাবেন একজন লুবনা মারিয়ামের আদ্যোপান্ত। আসুন জেনে নেওয়া যাক কেমন ছিল সেই আলাপচারিতা-

গান এবং নাচ একসঙ্গে …
ছোটবেলায় আমি ভীষণ লাজুক এবং পড়ুয়া ছিলাম। সারাক্ষণ বই পড়তাম, এখনও পড়ি। তখন আমার মায়ের একটু দুশ্চিন্তা হল, যে এই বাচ্চাটা কারো সাথে খেলাধুলা করেনা, সারাক্ষণ শুধু বই-ই পড়ে। তিনি ছিলেন ভীষণ বুদ্ধিমতি। আমরা দুই বোন ও এক ভাই, উনি আমাদের তিনজনকেই বাফা’তে ভর্তি করিয়ে দিলেন। আমরা দুই বোন গান নাচ দুটোই শিখছি, ভাই তবলা। আমার বড় বোন নায়লার গলা ছিলো অসম্ভব সুন্দর, ধীরে ধীরে ও গানে চলে গেলো। আমার একেবারেই গানের গলা নেই, আর নাচটা আমার আশ্চর্যজনক ভাবে ভালো লাগতো। নাচটাকে আপন করে নিলাম। এই জন্য আমি সবসময় বলি বাচ্চাদের যে কোন নাচ গান শেখানো উচিৎ। সম্পুর্ণ বিকাশ হওয়ার জন্য।

মূল শেখাটা মায়ের কাছে …
আমার মা (ড. সুলতানা সারওয়াত আরা জামান) মানুষ হয়েছেন কলকাতায়। রোকেয়া সাখাওয়াতের গড়া সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে পড়াশুনা করেছেন। সেখানে রবীন্দ্রনাথের প্রভাবে স্কুলে মেয়েদের নাচ শেখানো হতো। মজার বিষয় হচ্ছে সেখানে পরিবেশটা ছিল ভীষণ পর্দানশীল। রিক্সায়, বাসে পর্দা লাগিয়ে তারা স্কুলে আসতো। আর এসেই তারা নাচ শিখতো। সেজন্য আমার মা আমরা একটু বড় হতেই আমাদের নাচ শেখানো শুরু করলেন। আমরা চট্টগ্রামে থাকতাম। বলা যায় মায়ের কাছ থেকেই নাচ গান সবকিছু শেখা। একটা সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলেই বড় হয়েছি আমরা।
শুরু ১৯৬০ সালে, তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপট …
আমার বাবা-মা দুজনেই কলকাতায় মানুষ হয়েছেন। আমার দাদা ছিলেন নদীয়া চাকদাহ’র। কিন্তু থাকতেন কলকাতায়, আর আমার নানা চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের জুডিশিয়াল সেক্রেটারি। কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং-এ তার অফিস ছিল, ওখানেই মানুষ হয়েছেন। যার ফলে আমার বাবা-মার দুই পরিবারেই তৎকালীন কলকাতার সাংস্কৃতিক প্রভাব ছিলো। তখন রবীন্দ্রনাথ বেঁচে ছিলেন এবং তাঁর প্রভাবে তখন ঘরে ঘরে নাচ গান বাজনা চর্চা হচ্ছে। আমাদের দুই পরিবারেও তখন রবীন্দ্র চর্চা হতো। তাছাড়া তৎকালীন সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের ছেলেমেয়েরা যারা বাংলাদেশে চলে আসেন, তাদের মধ্যেও এই চর্চাটা সবসময় ছিল। শান্তিনিকেতনের প্রধান নৃত্যশিল্পী ছিলেন নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের মা অমিতা সেন। উনিও বিয়ের পরে ঢাকায় চলে আসেন এবং নাচ শেখানো শুরু করেন। তো সবকিছু মিলিয়ে আমি তৎকালীন সময়ে চমৎকার একটা পরিবেশ পেয়েছি। তাছাড়া আমি নিজেও একজন রবীন্দ্রানুরাগী। রবীন্দ্রনাথ আমার কাছে শুধু একজন কবি নন, একটি জীবন ধারা।

ওপরে বামে- ১৯৬০ সালে বাফায়, ডানে- ১৯৬২ সালে বাফায়, নিচে বামে – ১৯৬৩ সালে বাফায়, ডানে– ১৯৭২ সালে কলকাতায় আশ্রমিক সংঘের চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যে

পারিবারিক প্রভাব …
আমাদের দু’ধরণের প্রভাব। বাবার কাছ থেকে প্রভাবটা চিন্তনের ক্ষেত্রে। বাবা (কাজী নুরুজ্জামান) পড়ুয়া মানুষ ছিলেন, বামপন্থী আন্দোলনে বিশ্বাসী। আর মায়ের কাছ থেকে তৃণমূল পর্যায়ে। উনাকে সামাজিক প্রচুর কাজ করতে দেখেছি। আমরা অনেক সৌভাগ্যবান যে এরকম বাবা-মা পেয়েছি। একজন শিখিয়েছেন সমাজসেবা, অন্যজন উন্মোচন করে দিয়েছেন চিন্তার জগতের দ্বার।

গুরু পরম্পরা …
বাফায় তখন যে নাচ শেখানো হতো, সেটা খুব যে একটা কাঠামোর মধ্যে ছিল তা নয়। কারণ বুলবুল চৌধুরীর প্রভাব অনেক বেশি। আর উনি ছিলেন উদয়শংকর দ্বারা প্রভাবিত। তখন বাফাতে কোন শাস্ত্রীয় নৃত্য শেখানো হতো না। আমরা বাফাতে তখন অনেক আনন্দ করেছি, তবে নাচের প্রশিক্ষণটা ছিল কিছুটা জগাখিচুড়ি। অনেক পরে গিয়ে আমরা শাস্ত্রীয় নৃত্যে প্রশিক্ষণ পেয়েছি। প্রশিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন ঝুনু আপা, ডালিয়া নিলুফার, রোজী আপা, রামসিং বাবু এবং বিশেষ করে দুলাল তালুকদার এদের কাছ থেকেই নাচ শেখা। আমার মধ্যে যে কিছু একটা রসদ আছে, এটা আমার অন্তর্গত বিশ্বাস। আমি বুঝতে পারি কিছু একটা ঘটছে। ১৯৭১-এ বাবা যখন মুক্তিযুদ্ধে, আমরা তখন প্রথমে আগরতলায় গেলাম। সেখানে আমাদের থাকার কোন ব্যবস্থা ছিলনা। তাই আমরা আবার কলকাতায় গেলাম। সেখানে মায়ের মামা রবীন্দ্র সাহিত্যবিদ আবু সাঈদ আইয়ুব, মামি গৌরি আইয়ুব, তাদের বাড়ীতে উঠলাম। তখন সেখানে ছিলেন সাহিত্যিক মৈত্রেয়ী দেবী। তিনি আমাদেরকে কল্যানী উদ্বাস্তু শিবিরে কাজ করার জন্য বললেন। আমরা কল্যানীতে আরতি সেনের বাসায় থেকে উদ্বাস্তু শিবিরে কাজ করতে লাগলাম। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এই তিনমাস আমরা কোলকাতায় না থেকে কল্যানীতে থাকলাম। বাবা তখন মুক্তিযুদ্ধে ৭নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার। ছোট ভাই নাদিমও তখন মুক্তিযুদ্ধে। যাহোক সে সময় আবু সাঈদ আইয়ুব ও গৌরি আইয়ুব’র সংগে সখ্যতা ছিল রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী কনিকা বন্দোপাধ্যায়ের, যাকে সবাই ‘মোহরদি’ নামেই সম্বোধন করতেন। তাঁর সঙ্গে আমাদেরও হৃদ্যতা হলো। এই মোহরদিই আমাদেরকে নিয়ে গেলেন আশ্রমিক সংঘে। আশ্রমিক সংঘ হল বিশ্বভারতীর প্রাক্তন ছাত্রদের সংগঠন। অমর্ত্য সেনের মামা ক্ষেমেন্দ্রমোহন সেন এটা চালাতেন। মোহরদি কংকরদার কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন, এই মেয়েগুলো এসছে ওপার থেকে, সারাক্ষণই মন খারাপ করে থাকে। ওদের বাবা মুক্তিযুদ্ধে। এই মেয়েকে আশ্রমিক সংঘে নাচ শেখাও। শুরু হলো পুর্নিমা ঘোষের কাছে নাচ শেখা। বাফা’য় তো ছোটবেলা থেকেই শিখছি, কিন্তু সেটা পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণ নয়। অনেক সুন্দর অনেক প্রাণবন্ত। এই প্রথম দেখলাম যে মনিপুরী বলে কিছু আছে, ভরতনট্যম আছে। দেশ স্বাধীনের পরে ’৭২ সালে আমি আর আমার এক বন্ধু নীনা (বিবি রাসেলের ছোট বোন), আমাদের খুব ইচ্ছা হলো যে ভারতের চেন্নাইতে রুক্মিণী দেবীর যে কলাক্ষেত্র আছে, সেখানে যাবো। যা ভাবা তাই, ট্রেনে করে গেলাম চেন্নাই। চেন্নাই থেকে কেরালা, কলাক্ষেত্রে, বাসে করে গেলাম কলামন্ডলমে। এই প্রথম মাঠে বসে কথাকলি, ভরতনট্যম দেখলাম।

ওপরে বামে– ২০১১ সালে তাসের দেশ, ডানে– শ্রীমতি অমলা শংকরের সাথে এক আড্ডায়, নিচে বামে– ২০০০ সালে শান্তিনিকেতনে দোল উৎসবে, ডানে– চন্ডালিকা নৃত্যনাট্যে

বুয়েটে ভর্তি হয়েছিলেন …
তখনকার দিনে কেউ ভাবতোনা যে, নাচও একটা পেশা হতে পারে। যেখানে ছোট্ট থেকেই ভাবছি, ডাক্তারি পড়বো বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বো। আইএসসি পাশ করার পর বাচ্চু মাসী বলেছিলেন, তুমি শান্তিনিকেতনে আসো নাচ করতে। সেটা শুনে আমিও লাফাচ্ছিলাম শান্তিনিকেতনে যাবো নাচ শিখতে। কিন্তু আমার মা রাজী ছিলেন না। উনি আমাকে বুয়েটে পরীক্ষা দেয়ালেন, পাশ করে গেলাম, ভর্তি করিয়ে দিলেন। কিন্তু বছর দুয়েক পড়ার পর মনে হলো এটা আমার জন্য নয়। আমি ছেড়ে দিয়ে কলাক্ষেত্রে চলে গেলাম। আসলে আমার জীবনটা একটা সরল রেখার মতো যায়নি। কখনো এটা করেছি, কখনো ওটা করেছি। কারণ ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ছোট্ট থেকেই ভেবেছি ডাক্তারি পড়বো। মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্যাম্পে কাজ করার সময় বুঝলাম ডাক্তারিটা আমার জন্য নয়। ক্যাম্পে ডাঃ মোয়াজ্জেমের সাথে এডভান্স ড্রেসিং সেন্টারে কাজ করেছি। ব্যন্ডেজ করা, ইঞ্জেকশান দেওয়া, আমি সহ্য করতে পারতাম না। আমার বোন নায়লা পারতো। পরে ও ডাক্তারি পড়তে গেলো। আমি ক’দিন আর্কিটেকচার হয়ে নাচে। আমাদের দেশে তো ক্যরিয়ার কাউন্সেলিং হয় না। আজকে আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, আমি ঠিক সেখানেই থাকতে চেয়েছিলাম। এখানেই এসে পৌঁছাতে চেয়েছিলাম। তবে এটা ঠিক যে, অনেক কম বয়সে অনেক সাহস করে যেটা আমি করতে চাইনি, সেটা ছাড়তে পেরেছিলাম। ভাবো, আর্কিটেকচার পড়ে যদি আর্কিটেক্ট হতাম, তবে কি এই জায়গায় পৌঁছাতে পারতাম?

অস্থিরতা …
আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না যে, কোন বিষয়টা নিয়ে লেখাপড়া করলে আমার মনমতো জায়গায় আমি কাজ করতে পারবো। একটা সময় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করেছি, সাংসারিক তাগিদের জন্য। তারপর যখন আমার স্বামী জামাল আহমেদ সূফী আর্থিকভাবে একটা স্থিতিশীল অবস্থানে পৌছালো, তখন আমার মনে হলো আমি যা করতে চাই, সেটা নিয়েই লেখাপড়া করবো।
সংস্কৃত নিয়ে পড়াশুনা …
আমি ভীষণ প্রভাবিত রবীন্দ্রনাথ দ্বারা। অনেকে তাঁর গান, কবিতা, গল্প, সাহিত্য ভালোবাসেন। আমি তাঁর প্রবন্ধের ভক্ত। প্রচুর প্রবন্ধ পড়ি, আর রবীন্দ্র প্রবন্ধ যেই পড়েছে, সে জানবে, রবীন্দ্রনাথ উপনিষদ থেকে প্রচুর উদ্ধৃতি দিয়েছেন। আমার ভীষণ কৌতুহল হল, এই উপনিষদ ব্যাপারটা কি? যেখানে এতো সুন্দর সুন্দর কথা আছে, দর্শন আছে, এগুলো যদি মূল ভাষায় পড়তে পারতাম। মূল ভাষায় পড়তে হলে কি করতে হবে? প্রথমে শান্তিনিকেতনে গেলাম। একদম অ আ ক খ থেকে আরম্ভ করে সংস্কৃত ভাষা শিখলাম। কিন্তু শান্তিনিকেতন কর্তৃপক্ষ আমাকে গ্রাজুয়েশনে নিলনা। কারণ আমার ক্লাস এইট-নাইনে সংস্কৃত ছিলনা। অত্যন্ত ছেলেমানুষি একটা সিদ্ধান্ত। যাহোক আমার সাথে তখন ভাগ্যক্রমে কপিলা বাৎস্যায়নের সংগে দেখা। উনি ছিলেন সাংস্কৃতিক জগতের একজন কর্ণধার, তুখোড় একাডেমিক। উনি বললেন, তোমার কপাল ভালো যে শান্তিনিকেতন তোমাকে নেয়নি। উনি আমাকে পাঠিয়ে দিলেন মধ্যপ্রদেশের রাধাবল্লভ ত্রিপাঠির কাছে। আমার সামনে আরেকটা জগত খুলে গেলো। সংস্কৃত লেখাপড়ার নিয়ম হচ্ছে শুধু মুল গ্রন্থ পড়লে হয়না। প্রত্যেকটা গ্রন্থের কয়েকটা করে টীকা থাকে। আর নাট্যশাস্ত্রের মুল টীকাকার হলেন অভিনব গুপ্ত। তিনি একজন দার্শনিকই নন, মানব সভ্যতার অনেক বড় মাপের একজন চিন্তাবিদ। উনি আমাকে কাশ্মীরি শৈববাদের সংগে পরিচয় করিয়ে দিলেন। কাশ্মীরি শৈববাদ হচ্ছে একটা তান্ত্রিক দর্শন। মজার বিষয় হচ্ছে, এই তান্ত্রিক দর্শন পড়তে গিয়ে আমার মনে হলো, বাংলায় তন্ত্র ছিলো কি? খুঁজতে গিয়ে দেখলাম অনেক সমৃদ্ধ। বৌদ্ধতন্ত্র, যেখানে মহাযান। আর এই মহাযান তন্ত্রের মূল বিষয় হচ্ছে, হে বজ্রতন্ত্র। সেটা নিয়ে আমি এখনো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এই যে আমরা সহজিয়া দর্শন বলি, এতো আকাশছোঁয়া যে দর্শন, বাউলদের দর্শন, এই সহজিয়া দর্শনের বীজ বপন হয় বজ্রতন্ত্রে।

• এখন আবার এমফিল করছেন …
লেখাপড়ার জগতটা ভীষণ আনন্দদায়ক। কিন্তু আমি মনে করি যে একাডেমিকস – এটা একটা সেলফিস এন্টারপ্রাইজ। কারণ আমি নিজেরটাই করছি। আমি যখন ৯৯-তে প্রথম বিশ্বভারতীতে যাই, ২০০৫ পর্যন্ত প্রায় সাত বছর লেখাপড়া করে আমি আসলাম, দেখলাম আমার প্রাণপ্রিয় যে নাচের জগত, সেখানে স্থবিরতা। আমি যেটা চাইছি সেটা হচ্ছে না। আমার মনে হলো, না শুধু লেখাপড়া করলে হবে না। এখানকার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কাজ করতে হবে। এইটা করতে গিয়ে লেখাপড়াটা কিছু বছর বন্ধ থাকলো। আমি ২৫/৩০ জন নৃত্যশিল্পীর সংগে কাজ করি, সেটাও এক্সাইটিং, কিন্তু নানান ধরণের সমস্যা। আমি ওদেরকে ফেলে রেখে নিজেরটাই শুধু করবো, সেটা আমি পারিনি। কারণ শুধু লেখাপড়া করতে গেলে সেটা একাকিত্বের কাজ। ২৬ বছর সাধনা চালিয়ে যাবার পর আমার মনে হলো আমি আবার একাডেমিক্সে ফিরে যাই। কারণ আমার অনেক লেখা বাকি আছে। টুকরো টুকরো করে প্রবন্ধ লিখেছি। এই লেখাগুলো রেখে যাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। এখন যে বিষয়টা নিয়ে পড়তে চাই সেটা হল ‘কালচারাল স্টাডিজ’। এটা নিয়ে সারা বিশ্বে কতো ধরণের কাজ হচ্ছে। কালচারাল স্টাডিজের আরেকটা বিষয় হল ‘ডান্স স্টাডিজ’। বাংলাদেশে ডান্স স্টাডিজ নিয়ে কাজ করার মতো কোন ছেলে মেয়েকে আমি এখনো পাইনি। এটা খুবই প্রয়োজন। আমি যদি লেখালেখি করি, সেটা পড়ে হয়তো ছেলে মেয়েরা প্রভাবিত হবে। কেউ একজন ডান্স স্টাডিজ করতে চাইবে। বাংলাদেশে অনেক বিষয় আছে, যেটা নিয়ে গবেষণা করা বাকী আছে। লেখালেখি করা বাকী আছে।
• নিজের নৃত্যচর্চা …
আমি মনিপুরী নাচ শিখেছি শান্তিদির কাছে। কিন্তু কোনটাই সেভাবে চর্চা করিনি। আমার মুল কাজ যেটা আমি করতে চাচ্ছি, সেটা লেখাপড়ার জগত। এই কাজটাই আমি শেষ অবধি করে যেতে চাই। সমস্ত নাচ আমি ভালোবাসি। সেটা ভরতনট্যম হোক বা মনিপুরী। দক্ষিণ এশিয়ার যত নাচের আঙ্গিক আছে, প্রত্যেকটাই অনেক সুন্দর। আমি ওয়ার্ল্ড ডান্স অ্যালায়েন্সের এশিয়া প্যাসিফিকের ভাইস প্রেসিডেন্ট। সেখানেও দেখেছি, নানান ধরণের সমসাময়িক নাচ নিয়ে কাজ হচ্ছে। আমাদের আবার শক্তি নামে একটা প্রকল্প আছে, যেখানে আমরা ফেমিনিস্ট ডান্স থিয়েটার করি। মঞ্চে তো পঞ্চাশ বছর ধরে আছি, কিন্তু একটা জিনিষ আমার মনে হলো যে রবীন্দ্রনৃত্য করলাম, মনিপুরী, ভরতনট্যম করলাম, কিন্তু আমার শরীর নিয়ে আমি মঞ্চে পঞ্চাশ বছর ধরে আছি আমার গল্প তো বলি নাই … একজন লেখক যখন লিখে তখন তো সে তার গল্পটা বলে, তাই না, তো আমার শরীর নিয়ে আমি মঞ্চে নানানরকম আঙ্গিকে নানানরকম নৃত্য পরিবেশন করছি, আমার গল্পটা বলা দরকার নাচের মাধ্যমে। এটা একটা ভীষণ শক্তিশালী মাধ্যম। তো এই ব্যাপারটা নিয়েও আমরা সাধনা থেকে অনেক কাজ করেছি। আমার গল্প বলতে যে সমসাময়িক গল্প, সেজন্য আমাদের শক্তি নামে যে প্রকল্প সেটার মাধ্যমে আমরা নানানরকম কাজ করেছি। একটা ডান্স থিয়েটার, সেটার উদ্দেশ্যটা কি? সেটা আমাদের নৃত্যশিল্পীদেরকে জানতে হবে। আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায় নাচটা ভীষণ গুরুমুখী। আর গুরুমুখী হওয়াতে এখানে একটু আমরা নাচের যারা শিক্ষার্থী তাদেরকে খুব বেশি একটা নিরীক্ষামূলক কাজ করতে উৎসাহিত করিনা। কারণ গুরু যেটা বলছে ঠিক সেটা, তার বাইরে এসে নিজের সৃজনশীলতা মঞ্চে নিয়ে আসবে সেটা আমরা খুব পছন্দও করিনা। কিন্তু সেটা ঠিক নয়। সেজন্য আমি ওয়ার্ল্ড ডান্স অ্যালায়েন্সের সাথে কাজ করতে ভালোবাসি। আর এই প্রভাবটা যদি এখানে আনতে পারি, গুরুকে আমরা নিঃসন্দেহে অনেক মানী শ্রদ্ধা করি, কিন্তু আমার মধ্যে মনে হচ্ছে যেটাকে বলে প্যাডাগজি অফ ডান্সিং পদ্ধতি, প্রশিক্ষণের পদ্ধতিতে কোথাও একটা পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। এটা নিয়ে অনেক রকম গবেষণা সারা বিশ্বে হয়েছে। আমাদের দেশে এটা নিয়ে আমরা খুব একটা চিন্তা করিনি। কারণ দক্ষিণ এশিয়ায় গুরুমুখী বিদ্যা এটা। গুরু যেটা বলছে তাঁর বাইরে আমি কিছু করবোনা। কিন্তু যদি আমি নাচ দিয়ে সমসাময়িক সমস্যা গল্প সমাধান এগুলো তুলে ধরতে পারি, নাটকের মধ্যে যদি তুলে ধরতে পারি, তাহলে নাচের মাধ্যমে কেন পারবোনা। সারা বিশ্বের নৃত্যশিল্পীরা তো করছেন।

• যারা গুরু নির্দেশণা থেকে সরে এসে নিজে কিছু করছেন তারা কি সফল …
না, কারণ প্রশিক্ষণ পদ্ধতিটাই তো আমাদের সৃজনশীল কাজ করতে প্রেরণা যোগায় না। সৃজনশীল অর্থাৎ সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আমরা বিশেষ করে যারা শাস্ত্রীয় নৃত্যে প্রশিক্ষণ নিচ্ছি, আমরা প্রথম থেকেই তো একটা বাচ্চার প্রবণতাটা তৈরি করছিনা, আমরা একেকটা নাচ শিখাচ্ছি তার মধ্যে কোন সৃজনশীলতা নেই। এইযে সদ্য যাচ্ছি নিউইয়র্কে পড়তে, আমার থিসিস হচ্ছে ,ইন্ট্রিডিউসিং ক্রিটিক্যাল প্যাডাগজি ইনটু পারফর্মিং আর্টস অব বাংলাদেশ’। ক্রিটিক্যাল প্যাডাগজি মানে চিন্তাটা কিভাবে বাচ্চাটাকে ছোট থেকে শেখানো যায়। তাদের মধ্যে সঠিক পদ্ধতিতে বীজ বপন করা যায়। এই উপমহাদেশে এই কাজটা শুরু করেছিলেন উদয় শংকর। উনি ছিলেন উনার সময় থেকেও অনেক এগিয়ে থাকা একজন শিল্পী। অনেক ক্রিয়েটিভ একজন নৃত্যশিল্পী। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে বেশ কয়েক দশক ধরে ভারত তাকে সাইডলাইনও করে রেখেছে।
• নাচের বর্তমান প্রেক্ষাপট …
যেটাকে আমরা বলছি যে ছোট থেকে আমরা একটা জগাখিচুড়ি মতো শিখে এসছি। কিন্তু তার মধ্যে একটা প্রাণশক্তি ছিলো, আমাদেরকে যে কোন বিষয়ে নাচ করতে বলা হতো, আমরা করে ফেলছি। সে প্রতিবাদ হোক বা উৎসব হোক, নাচ তৈরি করে ফেলছি। এই নাচ চট করে তৈরি করার ব্যাপারটা শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথ আর উদয়শংকর আমাদেরকে উপহার দিয়ে গেছেন। কিন্তু পদ্ধতিগত শাস্ত্রীয় নৃত্য প্রশিক্ষণ আমরা পাইনি। সেজন্য চট করে নাচ তৈরি করছি, খুব আনন্দ সহকারে করছি, কিন্তু সেটা সেই মানের হচ্ছে না। তারপরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শাস্ত্রীয় নৃত্যের পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণটা বাংলাদেশে আসলো। কিন্তু ওই পদ্ধতিগত আর গুরুমুখী প্রশিক্ষণ করতে গিয়ে আমরা যেটা লাভান্বিত হয়েছিলাম যে চট করে যে কোন একটা নাচ তৈরি করে ফেলতাম, সেটা ধীরে ধীরে কমে গেলো। যেটা কিন্তু সারা বাংলাদেশে আবার যারা শাস্ত্রীয় নৃত্য শিখছেনা তারা যে কোন নাচ করে ফেলছে। বাংলাদেশের যে কোন স্কুলেই যাও না কেন দেখবে এই অবস্থা। তাদের নাচটা হচ্ছে কিন্তু মানটা হচ্ছে না। এদিক থেকে আমাদের নাচের স্কুলে নাচের মান ভীষণ উন্নত, কিন্তু ওই প্রাণবন্ত ব্যাপারটা হারিয়ে যাচ্ছে। এই দুইটার কোথাও কি একটা সম্মিলন হতে পারে, সেটা নিয়েই হল আমার থিসিস। এই যে আমরা যে কোন বিষয়ে নাচ তৈরি করতে পারছি, কিন্তু যেই আমরা শাস্ত্রীয় নৃত্য শিখছি, তখন আমাদের এই সৃজনশীলতাটা হারিয়ে ফেলছি। এই দুইটার একটা সম্মিলন হলে তবেই আমার মনে হয় সফলতা। নাচ যে কেবল বিনোদন নয়, সেটা যে মঞ্চ পরিবেশনার একটি শক্তিশালী মাধ্যম, সেটাও আমাদেরকে বুঝতে হবে।

• স্বাধীনতার সাথে সম্পৃক্ততা …
স্বাধীনতার সাথে তো নিশ্চয় যুক্ত। কারণ আমরা তো আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলাম। আর তখন খুব বেশি যে মেয়েরা নাচ করতো তা নয়। আর আমরা তখন স্কুল কলেজে পড়ি, কিন্তু আমাদের বড় ভাইয়েরা তখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে নানান রকম প্রতিবাদী আয়োজন হচ্ছে তার সাথে একটা সাংস্কৃতিক আয়োজন থাকতো। তখন তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলন খুবই প্রাণবন্ত। আমরা সেই ছাত্র আন্দোলনের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। আমার পরিবারের যে সব ভাইয়েরা এর সাথে যুক্ত ছিলেন তারা সবাই রাশেদ খান মেনন ভাইয়ের সাথে ছিলেন। যখন তাদের অনুষ্ঠান হতো, তখনই আমাদের ডাক পড়তো। অনুষ্ঠান শেষে আমরাও নেমে যেতাম র‍্যালী করতে। ওইখানে নাচটা ছিলো প্রতিবাদের একটি মাধ্যম। তবে এটাও ঠিক যে আমাদের নাচের আঙ্গিকটা তখন ততোটা শক্তিশালী ছিলোনা। জগাখিচুড়ি নাচ দিয়ে যেমন তেমন একটা পরিবেশনা করে ফেলেছি। কিন্তু যেটা হারালাম ৭২’র পরে যে মনিপুরী, ভরতনট্যম, কত্থক শিখে আগের যে একটা ক্ষমতা ছিলো সেটা ধীরে ধীরে হারিয়ে গেলো।
• ‘সাধনা’র ইতিবৃত্ত …
সাধনার কাজের আগে বলতে হবে যে, আলিমুর রহমান খান, তৌফিক নেওয়াজ উনারা ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক সার্কেল নামে ছোট্ট একটা দল গড়েছিলেন। সেখান থেকে তাঁরা নানারকম শাস্ত্রীয় গানের অনুষ্ঠান করতেন। তখন ভারতের সাথে সদ্য একটা সম্পর্ক হচ্ছে। তার আগে পাকিস্তান আমলে ভারত থেকে তো আমরা একেবারে বিচ্ছিন্ন ছিলাম। ওখানে এতো বড় বড় শিল্পী ছিলেন তাঁদেরকে আমরা দেখতে পারিনি। তো ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক সার্কেল ভাবলো যে এখনো যারা বেঁচে আছেন এবং ভালো গাইছেন তাঁদেরকে ডেকে এনে আমরা অন্তত গান শুনতে পারবো। কিন্তু সেটা সেভাবে হয়নি। তখন আলিম ভাইকে সাথে নিয়ে আমরা ভাবলাম যে ঘরোয়া ভাবে এইটা করতে পারি। আমরা শুরু করলাম। ভাবতেও ভালো লাগে যে, এই ঘরে [নিজের ঘরটি দেখিয়ে] বসে কে না গান করেছেন, পন্ডিত যশরাজ, ইমরত খান সাহেব, তাঁর চার পুত্র, কনিকা বন্দোপাধ্যায়, সালামত আলী খান সাহেব, রামকুমার চট্টোপাধ্যায়, অজয় চক্রবর্তী, ওস্তাদ জাকির হোসেন, নিশাত সহ আরো অনেক গুণীজন। পন্ডিত যশরাজ বলেছিলেন, আপ কা ঘর বহুত সুরেলা হ্যয়। সারারাত ধরে গান হতো। তখন আমার মেয়ের ১০ কি ১২ বছর, সে গান শিখতে চাইলো। তার জন্য সগীরউদ্দিন খাঁ সাহেবকে আনতে শুরু করলাম। তখন ভাবলাম যে সগীরউদ্দিন খাঁ সাহেবকে শুধু আমার মেয়ের গানের জন্য আনবো, অন্যকেউ উপকৃত হবে না, সেটাতো হতে পারে না। সেজন্য সবাইকে জানালাম যে, সগীরউদ্দিন খাঁ সাহেবের মতো একজন গুরু আসছেন গান শেখাতে। বেশ সাড়া পেলাম। অনেকেই আসলো। ইফফাত আরা আপা, শাহিন সামাদ, খায়রুল আনাম শাকিল, ডালিয়া নওশিন সবাই এখানে বসে গান শিখেছে। এটা এরশাদের আমলে। তখন আমি আবার চাকরি করি একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। দেখলাম দুদিন পরপরই গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন এসে বিরক্ত করে যে তোমার বাড়িতে এতো ভারতীয় আসে কেন। ওদের তো বুঝাতে পারিনা যে এরা শিল্পী, এদের কোন দেশ নেই, সীমানা নেই। এই যন্ত্রণা থেকেই আমরা চিন্তা করলাম যে এটার একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেই। এই চিন্তা ভাবনা থেকেই ১৯৯২তে আমরা ‘সাধনা’ নামে একটা প্রতিষ্ঠান গড়লাম। আর আমি যেহেতু নাচ করি, আলিম ভাইরা তো সারাক্ষণ শুধু গান, তবলা, সেতারিয়া নিয়েই থাকতেন, তখন আমি বললাম না তা শুধু সংগীত নয়, নাচের শিল্পীদেরও আনতে হবে। বাংলাদেশে প্রথম সম্পূর্ণ শাস্ত্রীয় নৃত্যের পরিবেশনা করেছেন লীলা স্যামসন। তার আগ পর্যন্ত ঢাকায় কোন শাস্ত্রীয় নৃত্যের পরিবেশনা হয়নি। সেটা ১৯৯২তে, জাদুঘরে, ৩দিন ব্যাপী। এটা শুধু সাধনারই অর্জন। আর যেহেতু আমি নাচ করতাম, ধীরে ধীরে নাচটাই বেশি প্রাধান্য পেলো। এখন নানান ধরণের অনুষ্ঠান করছি, এমন কি নৃত্য প্রযোজনাও করছি। যার প্রথমটা ছিলো নারী পক্ষের জন্য ‘নহি দেবী নহি সামান্যা নারী’। তখন শর্মিলা বন্দোপাধ্যায় আমাদের সাথে যুক্ত হলো। যেহেতু একটা দল মোটামুটি খাড়া হয়ে গেলো তখন নানান ধরণের কর্পোরেট শো করতে থাকলাম আমরা। এরপর ১৯৯৭তে আমরা ১০দিন ব্যাপী একটা উৎসব করলাম। সেখানে আমরা ‘চন্ডালিকা’ করলাম। তখন কিন্তু আমার ছেলেমেয়ে বড় হয়ে গেছে। আমার সেই লেখাপড়ার ইচ্ছাটা আবার চাড়া দিয়ে উঠলো। ৯৯তে আমি আবার চলে গেলাম সাত বছরের জন্য লেখাপড়া করতে। তারপর যখন ফিরে আসলাম ২০০৫-এ, তখন সবাই বলতে থাকলো যে একটা নাচের স্কুল করা উচিৎ। আমার মনে হতো যেমন তেমন করে কিছু করবোনা। যদি নাচের স্কুল করতেই হয় তাহলে এখানে যারা প্রশিক্ষণ পাচ্ছে, তারা যেন দাপটে ভারতের যে কোন নাচের স্কুলের শিক্ষার্থীর সাথে সহ অবস্থান করতে পারে। ২০০৮-এ আমি ‘কল্পতরু’ আরম্ভ করলাম। আমার যেটা মনে হলো যে, গুরুমুখী বিদ্যা, এখানে যারা প্রশিক্ষণ দেন, তারা নিঃসন্দেহে ভালো শিখে এসছেন, ভালো কাজ করছেন। কিন্তু সম্পূর্ণ আমি যেটাকে বলবো, গুরুবিদ্যা তাদের আয়ত্তে নেই। সেজন্য আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমরা মাঝেমাঝেই ভারত থেকে প্রশিক্ষক আমন্ত্রণ করবো। আমার এই চিন্তাটা সফল হলো। আনন্দের বিষয় হচ্ছে এখন আমাদের ছেলেমেয়েরা ভারতের খাজুরাহো থেকে শুরু করে বড় বড় উৎসব গুলোতে অংশ নিচ্ছে।

ওয়ার্ল্ড ডান্স অ্যালায়েন্স সম্পর্কে …
ওয়ার্ল্ড ডান্স অ্যালায়েন্স আবার একটু ভিন্ন। আমাদের নাচের স্কুলে আমরা শাস্ত্রীয় নৃত্য শিখাই। ওয়ার্ল্ড ডান্স এলায়েন্স আবার কনটেম্প্রোরারি বা সমসাময়িক চিন্তাটা মঞ্চে আনতে চেষ্টা করে নাচের মাধ্যমে। সেটা নিয়ে এখনো কাজ চলছে। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। এখন পর্যন্ত আমরা ঠিক সফল হতে পেরেছি এটা বলবোনা, যতবার আমরা ওয়ার্ল্ড ডান্স অ্যালায়েন্সের কাছে নাচের জন্য প্রপোজাল পাঠাই, সব আমাদের নাকচ হয়ে যায়। আমার একটা জেদ ধরে গেলো, কেন আমাদের নাচ সিলেক্টেড হচ্ছে না। দেখলাম, ওদের চিন্তাটা অন্যরকম। তখন আমরা আমেরিকান সেন্টারের সহায়তায় ৪/৫ মাসের একটা রেসিডেন্সি প্রশিক্ষণ করলাম, একজন আমেরিকান ডান্সার আমাদের সঙ্গে কাজ করলো, আরো অনেককে নিয়ে পুরো মাথা খাটিয়ে কাজ করলাম। এরপর ২০১৭তে আমাদের ৬টা নাচ ওরা অ্যাক্সেপ্ট করে নিলো। আমি মনে করি আমার দেশের যে শাস্ত্রীয় নৃত্যধারা বা লোকনৃত্য যাই হোক না কেন, সবকিছুই শিখতে হবে, আমাদের আয়ত্তে আনতে হবে। কিন্তু চিন্তাটা, যেটা প্রকাশিত বা পরিবেশিত হবে মঞ্চে, সেটা সমসাময়িক হতে হবে।
প্রান্তিক পর্যায়ে কাজ করা …
আমার জীবনে এটা পুরোপুরি সায়মন জাকারিয়ার অবদান। সে আমার জীবনে একটা নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। একদিন এসে বললো, আপা আমি আপনাকে গ্রাম বাংলার নাচ দেখাবো। তখনো আমি ৪০ বছর ধরে নাচ করি, কিন্তু আমার কোন ধারনাই নাই গ্রাম-বাংলায় কি নাচ হয়। আমি খুব একটা উৎসাহ দেখালাম না, কিন্তু সে আমাকে বেশ অনুরোধ করে নিয়ে গেলো, সেটা ২০০৮ সালের দিকে। এই প্রথম আমি জানলাম বেহুলার লাচারি, পদ্মার নাচন, লাঠি খেলা। আমি তো দেখে অভিভূত! এতো প্রাণবন্ত সব নৃত্যনাট্যধারা আমাদের দেশে আছে। তখন আমি আলাদা করে লাঠিখেলা নিয়ে কাজ করতে লাগলাম। এখন প্রায় ১০/১২টা দলের সাথে কাজ করি। তারপর মনসার যতরকম পরিবেশনা, পদ্মার নাচন আর বেহুলার লাচারি নিয়ে কাজ করছি। আর ধ্রুমেলের ব্যাপারটা হলো আমি সিলেটের যারা আছেন তাদের নাচ দেখেছি। আমার মনে হলো তাদের ভীষণ সমৃদ্ধ একটা গানের ভান্ডার রয়েছে। কিন্তু নাচটা, যেহেতু ওরা মনিপুর থেকে বহুবছর ধরে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে, তাই নাচটা একটু শিথিল। তাই ভাবলাম, আমরা শহরের ছেলেমেয়েরা গুরু বিপিন সিংহের ধারায় নাচ শিখে মনিপুরীটাকে মঞ্চে নিয়ে আসছি, তাহলে বাংলাদেশের মনিপুরী সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরা কেন ওই নাচ নিয়ে মঞ্চে আসতে পারবেনা। তখন নৃত্যশিল্পী সুইটি দাশ চৌধুরীকে নিয়ে সিলেটে গিয়ে কাজ শুরু করলাম। ভাবতেই ভালো লাগে যে, ওখানকার ছেলেমেয়েরা এতো ভালো কাজ করছে। মনিপুরী নাচ আমরা ঢাকায় কল্পতরুতেও শেখাই, কিন্তু অবাক লাগে, যে নাচ একটা বাচ্চার তুলতে ৬মাস লাগে, সেখানে ঘোড়ামারা, শ্রীমঙ্গল, মৌলবীবাজারের মনিপুরী ছেলেমেয়েদের লাগে ১ সপ্তাহ। কারণ ওদের রক্তে সেই সংস্কৃতিটা আছে। অদেরকে নিয়ে গতবছর দিল্লী এনএসডি’তে গেলাম, ভীষণ ভালো নাচ করেছে। আমি মনে করি আমাদের এই প্রকল্পটা বেশ সফল। এখন মনিপুরীরাই তাদের নাচ ঢাকার মঞ্চে বেশ দাপটের সাথে করছে।

• মেয়েদের লাঠিখেলা প্রসঙ্গে …
লাঠিখেলা যখন কাজ করছি তখন দেখলাম যে, মেয়েরা মোটেও লাঠি খেলে না। তখন রবি’র সহযোগিতায় কাজ শুরু করলাম। প্রথমেই একটা প্রাইজ ডিক্লেয়ার করলাম, যারা মেয়েদের লাঠিখেলার দল তৈরি করতে পারবে তাদেরকে আমরা পুরস্কৃত করবো। নেত্রকোনাতে হেলিম বয়াতি একটা দল করলেন আর নড়াইলের বাচ্চু একটা দল করলেন। নেত্রকোনার দলটা আর টিকলোনা, কিন্তু নড়াইলের বাচ্চু এখনো ধরে রেখেছে। তারা এবছরই স্টেডিয়ামে প্রধানমন্ত্রীর সামনে লাঠিখেলা করলো। দুঃখজনক হচ্ছে সেটা টিভিতে দেখানোর পরে তাদের গ্রামে অসহযোগিতা শুরু হয়ে গেলো। গ্রামবাসীরা তাদের পরিবারকে চাপ দিতে লাগলো লাঠিখেলা বন্ধ করে তাদের বিয়ে দিয়ে দেয়ার জন্য। তখন বাচ্চু আর আমি ঠিক করলাম যে মেয়েগুলোকে স্কুলে যাওয়ার মতো ছোট্ট একটা বৃত্তি দেয়ার, যাতে বাবা-মা’রা মেয়েগুলোকে বিয়ে না দিয়ে অন্তত স্কুলে যেন পাঠায়। এখনো এই সমঝোতায় চলছে, জানিনা টিকিয়ে রাখতে পারবো কিনা। আমার একটা ক্ষোভ আছে, বহুবার আমি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে বলেছি, এই যে গ্রাম-বাংলার এতো চর্চা, এগুলোকে যদি কোনোরকম আর্থিক সহায়তা দেয়া যায়। কিন্তু পারিনি, হয়তো আমার বিফলতা, আমি তাদের বুঝাতে পারছিনা। এই যে শুধু লাঠি খেলা নয়, এতোবছর ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছি যে বেহুলা লাচারি, এটা এতো সুন্দর একটা সাংস্কৃতিক চর্চা, এটাও স্বীকৃতি পাচ্ছেনা। এটা আমাদের একটা ঐতিহ্য। কয়েকশত বছর ধরে পরিবেশিত হচ্ছে, কিন্তু কোন রকম সহায়তা পাচ্ছে না। আমার ইচ্ছা ফিরে এসে এটা নিয়ে আবারো উঠেপড়ে লাগবো।

কমার্শিয়াল নাচের প্রসংগে …
যে কোন শৈল্পিক চর্চা প্রাণ থেকে আসতে হয়। মেধা আর মস্তিষ্ক প্রয়োজন, কিন্তু সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ভালোবাসা। ভালো না বাসলে ওই চর্চা কখনো প্রাণবন্ত হতে পারেনা। আমি সবসময় বলি যে নানান ধরণের পথ আছে, আমি কোনটাকেই বিচার করবো না। পথ সবার ভিন্ন, কোনটাকেই আমি উপেক্ষা করবো না। যে যার জায়গায় আছে সেটা যদি নিষ্ঠার সাথে করে, তাহলে ভালো হবেই। তাছাড়া আমরাও তো কমার্সিয়াল নাচ করি। কারণ শুধু প্রযোজনা করে টিকে থাকা যায়না। আর যে টিকে থাকতে পারছেনা, সে অন্য পেশায় চাকরি নিয়ে নিচ্ছে, যার ফলে নাচকে আর সময় দিতে পারছে না। নাচের শিল্পীদেরকেও তো বাড়িভাড়া দিতে হয়, সংসার চালাতে হয়। যদি আমরা সম্পুর্ণ নাচ করতে চাই বা নাচে থাকতে চাই, তাহলে একটা আয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। তাই আমরাও কর্পোরেট শো করি। সেখান থেকে যে টাকাটা আসে সেটা আমরা শিল্পীদেরকে সম্মানী দেই, কিছুটা সংগঠনের জন্য রাখি। আর আমাদের প্রযোজনা যখন হয় তখন আমরা প্রত্যেককে সম্মানী দেই। নাচের মধ্যে থেকেই পেশাদারিত্ব টিকিয়ে রাখতে হবে।

ওপরে বামে– মুক্তির গান সিনেমার দৃশ্য, ডানে– তারেক মাসুদের সঙ্গে, নিচে বামে– ১৯৭৭-এ বিটিভির পুরষ্কার প্রাপ্তি, ডানে – ১৯৭৯ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রা’র প্রচ্ছদে

নাচকে এককভাবে পেশা হিসেবে …
হচ্ছে, অনেকেই নিচ্ছে। বিশেষ করে সোহাগ, লিখন এরা এদের দল নিয়ে বেশ ভালো ভাবেই কাজ করছে। যদিও তারা প্রযোজনা করছে না, কিন্তু কমার্শিয়াল শো করছে নিয়মিত। এই কাজটা সারা বিশ্বেই হয়। কেই এটাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। ইউরোপিয়ান দেশগুলোতে অনেক শিল্পী দিনে শুদ্ধ চর্চা করছে, আবার রাতে ক্যাবারে নাচ করছে, সংসার চালানোর জন্য। আমি মনে করি আমাদের দেশেও যে যেভাবেই পারুক নাচ করুক। কারণ একটা মুসলমান প্রধান দেশের গ্রামে গঞ্জে যে ছেলেমেয়েরা এখনো নাচ করছে, এটাই তো বিশাল ব্যাপার। এটা নিয়ে তো আমাদের গর্ব করা উচিত।
• প্রত্যাশা …
আমার অনেক প্রত্যাশা। এই যে আমরা নাচের বৃত্তি দেই। এখন পর্যন্ত ছয়জনকে দেয়া হয়েছে। বাইরে পাঠানো তো শেখার জন্য নয়, তারা বাইরে গিয়ে তাদের দৃষ্টিকোণ প্রসারিত করে। এরপর দেশে এসে এতো ভালো কাজ করছে যে মুগ্ধ হই।

• মজার ঘটনা …
ভারতের মধ্য প্রদেশে উজ্জয়নে কালিদাস একাডেমিতে এক মাসের একটা ব্যাখ্যান ছিল কাশ্মিরী শৈববাদের উপর। সেখানে আমরা রাতে সবাই বসে আড্ডা দিতাম। তখন সেখানে খুব গরম। একদিন রাতে সবাই বললো আমাকে একটা গান করতে। আমি ভাবলাম একটা বর্ষার গান করি। যদি একটু বৃষ্টি হয়। যেই গান শুরু করলাম অমনি বৃষ্টি পড়া শুরু হলো। আমি এ জীবনে এটা ভুলবোনা।

• জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি …
উপনিষদে বলা হয়েছে “ঈশ্বর দ্বারা জড়-জীব সমস্ত কিছুই ব্যাপিত। যা কিছু আমাদের আশেপাশে আছে, তা সবকিছু ত্যাগ করে আনন্দ গ্রহণ করো।’’ কিন্তু আমরা সেটা বিস্মৃত হয়ে যাচ্ছি। ত্যাগ করে কিভাবে আনন্দ গ্রহণ করা যায়, তা আমরা বুঝতে চাইনা। রবীন্দ্রনাথের খুব সুন্দর একটা বিশ্লেষণ আছে – “ক্ষণিককে ত্যাগ করো বৃহত্তরের জন্য, ক্ষুদ্র ইচ্ছাকে ত্যাগ করো বৃহত্তরের জন্য।’’ ছোট ছোট আমাদের যে চাহিদা গুলো আছে সেটা ত্যাগ করতে হবে বৃহত্তর আনন্দ পাবার জন্য। কারো ধনের প্রতি লোভ যাতে না থাকে। এটুকুই যদি করতে পারি, আমরা জীবনে অনেক কিছুই করতে পারবো।
সারাবাংলা/এএসজি/এমএম/পিএম

Tags:

জীবনে যা কিছু করি, হৃদয় থেকেই করি
জীবনে যা কিছু করি, হৃদয় থেকেই করি
জীবনে যা কিছু করি, হৃদয় থেকেই করি