শনিবার ২০ জানুয়ারি, ২০১৮, ৭ মাঘ, ১৪২৪, ২ জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৩৯

Live Score

জ্যোৎস্নায় মোড়া মেঘরাজ্য সাজেক

ডিসেম্বর ১৩, ২০১৭ | ১২:৫৭ অপরাহ্ণ

মনিরা বেগম

যদি আপনার একটা কবি মন থাকে,  তবে সাজেকে আপনি যে কোন সময় হারিয়ে যেতে পারেন। হারিয়ে যেতে পারেন পূর্ণিমার আলোয়। আর বিশাল আকাশের ক্যানভাসে নানান রঙের রঙ তুলিতে আঁকা পাহাড়ের রূপ আর মধ্যরাতে সাজেকের আকাশে উড়ে যাওয়া ছোট বড় আলোর ফানুসের সাথে আপনার মনও উড়াল দেবে।

শত চিন্তা আর আয়োজন না করে হালকা ব্যাগ, কিছু ফার্স্ট এইড আর অল্প কিছু কাপড় নিয়ে কয়েকজন বন্ধু মিলে বের হয়ে পড়ুন পাহাড়ের দেশে স্মৃতির ঘর বাঁধতে, মিতালী করতে মেঘের সাথে। মেঘ আপনাকে ছুঁয়ে দেখতে হবে না, মেঘই আপনাকে ছুঁয়ে যাবে ক্ষণে ক্ষণে।

মেঘ ছুঁয়ে দেখার অসীম বাসনা নিয়ে ছুটে চলুন খাগড়াছড়ির পথে। খাগড়াছড়ি সকালের নাস্তাতেই আপনাকে পাহাড়ি খাবারের প্রথম স্বাদ দেবে। তারপর ছুটে চলুন ‘চান্দের গাড়ি’তে করে। মাত্র তিন ঘন্টার পথ। ‘চান্দের গাড়ি’র ছাদে করে গেলে আঁকা বাকা পথ আর উঁচু নিচু সর্পিল পথরেখার তালময় ছন্দ সাজেক পৌঁছানোর তৃষ্ণা আরো বাড়িয়ে দেবে । তবে সাথে করে পাহাড়ি আখ, কলা, কমলা নিয়ে যেতে পারেন পুরো পথে। আর বন্ধুরা মিলে চিৎকার করে গান গেয়ে পুরো রাস্তা পাড়ি দিতে পারলে রোলার কোস্টারের মতো পথের ভয় একটু কমতে পারে বৈকি।
সাজেক যাওয়ার মাঝ পথে পেয়ে যাবেন হাজাছড়া ঝর্ণা। মূল পথ থেকে দশ মিনিটেরও কম দূরত্বের এই ঝর্ণা আপনাকে মুগ্ধ করবেই।

হাজাছড়া ঝর্ণা

চান্দের গাড়িতে করে শেষে দুপুর হতেই পৌঁছাবেন সাজেকে। এ যেন অন্য পাড়া। মোটামুটি পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হবে রুইলুই পাড়াকে।  চারদিকে পাহাড়। অনেক উপরে পৌছে গেছেন আপনি। উপরে চেয়ে দেখুন আকাশ কত কাছে চলে এসেছে আপনার।

কি নেই এই পাড়ায়? প্রাথমিক বিদ্যালয় আর মাধ্যমিক বিদ্যালয়। বই হাতে করে যেতে দেখবেন ছোট ছেলেমেয়েদের। কথা বলতে চাইলে তারা হাসিমুখেই আপনার সাথে ভাব জমাবে। আছে সাজেকের মানুষের হাতের বুননে ট্র্যাডিশনাল ড্রেস আর আসবাব যা আপনাকে মুগ্ধ করবে। আছে নানান রঙের নানান ধরনের রিসোর্ট যার কাঠামো আর রঙে রয়েছে ট্র্যাডিশনাল ছোঁয়া। নেই তাতে ইট কাঠ আর শহরের ছোঁয়া।

মোবাইল ফোনটা সুইচ অফ করে ফেলুন দুদিনের জন্য। নিজেকে সময় দেন সাজেকের সময়ে। সাজেকের খাবারের দোকানে ঢুঁ মেরে দেখুন। পাহাড়িদের খাবার পরিবেশনা আর আন্তরিকায় আপনার মন ভরে যাবে। পানি রাখার মাটির পাত্র, প্লেট আর গ্লাসে পাবেন ্ছোঐতিহ্যের ছোঁয়া। আর পুরো খাবারের ঘর সাজানো নানান রঙের আলো আর আসবাব দিয়ে। ভাগ্য ভালো হলে পাহাড়ি বনমোরগ আর বাঁশের সবজি আপনাকে খাবারে ভিন্ন স্বাদ দেবে। সাজেকের খাবার লোভনীয়, যদিও একটু দাম বেশি।

বিকেলে হ্যালিপ্যাডে গিয়ে দেখুন মেঘের খেলা। সাদা মেঘ এর বিস্ফোরণ ধীরে ধীরে চারদিকের পাহাড় আর পুরো সাজেক ঘিরে ফেলতে থাকবে, ঘিরে ফেলবে আপনাকেও। এবার হাঁটুন পুরো সাজেকে, মেঘের মধ্যে। বিকেল গড়াতেই সন্ধ্যা। একদিকে সূর্য অস্ত আর অন্য দিকে পূর্ণিমার চাঁদের আগমন। রক্ত লাল সূর্য ডুবে গেল আর অপূর্ব সন্ধ্যা নিয়ে সাজেকে এল পূর্ণিমার চাঁদ।

হ্যালিপ্যাডে পূর্ণিমা

চাঁদ মানুষকে কতটা ভুলোমনা করে দিতে পারে সাজেকে এসে বুঝবেন। অন্ধকার কেটে গিয়ে চাঁদের আলোর মায়াবী মুগ্ধতা ছড়িয়ে যাবে পুরো সাজেকে। তাকিয়ে থাকুন চাঁদের দিকে। কতটা শান্ত করে দেবে আপনার মন, হয়ত এই  মুগ্ধতা আপনার চোখের কোন ভিজিয়ে দেবে। হ্যালিপ্যাডে বসে পূর্ণিমার চাঁদের আলো গায়ে মাখতে মাঝরাত্রিতে চলে যান। পুরো আকাশটাকে মনে হবে ক্যানভাস, তার মধ্যে পাহড়ের সারি আর একটু উপরে বিশাল এক চাঁদ। খুব কাছে মনে হবে সবকিছু। ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করবে।

হ্যালিপ্যাড থেকে শুয়ে চাঁদের সৌন্দর্য দেখুন। অন্ধকারের আকাশে দেখবেন আপনার মনের সব সুখ দুঃখ বাসনার ছুটাছুটি। আর চাঁদ সেই অবিরাম ছুটাছুটিকে কেমন শান্ত করে দিচ্ছে।

এই রাত কে আরো স্মৃতিময় করে রাখতে পারেন ফানুস উড়িয়ে। মনের সুপ্ত ইচ্ছাটিকে ফানুসের সাথে উড়িয়ে দিন সাজেকের হ্যালিপ্যাড থেকে পূর্ণিমার আলোয় মাখানো নীল আকাশে। একসময় কুয়াশা আর ঠান্ডা মেঘের ঝাপটা কাঁপন ধরিয়ে দেবে। কাঠের রিসোর্টে জোর করে হলেও খানিক ঘুমাতে হবে কারণ পরের দিন আপনার জন্য অপেক্ষা করছে নতুন সূর্য ওঠার অপূর্ব সৌন্দর্য।

কংলাক পাড়া

সাজেকের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় থেকে সূর্যোদয় দেখার জন্য খুব ভোরে উঠেই যেতে হবে হ্যালিপ্যাড থেকে একটু দূরে। হাঁটার পথ। তবে পাহাড়ে ওঠার জন্য ছোট ছোট বাঁশের কঞ্চি পাওয়া যায়। সেটি দিয়ে সামান্য খাঁড়া পাহাড় উঠতে হবে। পাহাড়ি ফুল আপনাকে স্বাগত জানাবে পুরো কংলাকে। এইবার সত্যিই আপনি অনেক উঁচুতে। প্রায় ৩৬০০ ফুট উঁচুতে। নিজেকে একজন সাহসী মানুষই মনে হবে। তবে পাহাড়ে উঠে আপনার শুকনো গলা ভেজাতে পাহাড়ি কমলা নিয়ে বসে থাকে স্থানীয় আদিবাসীরা। গলা ভেজাতে ভেজাতে একপাশে চলে আসুন আর আদিবাসীদের তৈরি মাচায় বসে পড়ুন সূর্যোদয় দেখতে।

চারদিকে শো শো বাতাসের শব্দ পাবেন। সামনের পাহাড়গুলো সাদা মেঘে ডুবে যাচ্ছে খুব দ্রুত। মেঘগুলোকে তুলোর পাহাড় মনে হবে। সূর্য উঠছে এবার। খুব আয়োজন করে। সাদা মেঘের ভেতর দিয়ে। আলোর রেখায় সাদা মেঘগুলো চিক চিক করছে। সূর্য মেঘের উপরে উঠে গেল। আর পুরো মেঘ ছড়িয়ে গেল আপনার চারপাশে। এত সৌন্দর্য! বিশ্বাস করতে পারবেন না, না দেখলে। পুরো সময়টা চুপ করে বসে দেখা ছাড়া আর কোন কথা আপনার মুখে আসবে না।

সূর্য উঠে গেলে আপনাকে ফিরে আসতে হবে রিসোর্টে। নাস্তা করেই ফিরতে হবে। সকাল ১০টার মধ্যেই চান্দের গাড়ি ছাড়বে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে। ব্যাগ গুছিয়ে চান্দের গাড়িতে উঠতে আপনার একটু হলেও কষ্ট হবে। সাজেকের দুপুর, সাজেকের বিকেল, সাজেকের পূর্ণিমার রাত আর কংলাকের সকালের স্মৃতি আপনার ফিরে যাওয়ার পুরো সময়টাতে আপনাকে বিষন্ন করে তুলবে।

 

সারাবাংলা/ এসএস

 

Tags: , , ,