রবিবার ১৯ আগস্ট, ২০১৮, ৪ ভাদ্র, ১৪২৫, ৭ জিলহজ্জ, ১৪৩৯

টোটকা নীতি ও শিক্ষাবাণিজ্যে বিফল অবৈতনিক ‘নারী শিক্ষা’র প্রয়াস

মে ২২, ২০১৮ | ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ

।। মাকসুদা আজীজ, অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর ।।

চলতি বছরের ২৭ মার্চ। রাজধানীর লক্ষ্মীবাজারে সুভাষ বোস অ্যাভেনিউ অবরোধ করে রাস্তায় বসেন মহানগর মহিলা কলেজের ছাত্রীরা। তাদের অভিযোগ, এইচএসসি পরীক্ষার প্রবেশপত্র দেওয়ার সময় টাকা দাবি করেছে কলেজটি। সারাদিন সড়ক অবরোধের পরে অবশেষে কলেজ কর্তৃপক্ষ টাকা ছাড়াই প্রবেশপত্র দিতে বাধ্য হয়।

২ এপ্রিল এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিন। সরকারি কবি নজরুল কলেজের সামনে কথা হয় মহানগর মহিলা কলেজের জন দশেক অভিভাবকের সঙ্গে। সরকারি কবি নজরুল কলেজ ছিল মহানগর মহিলা কলেজের পরীক্ষাকেন্দ্র। অভিভাবকরা জানান, এইচএসসির ফরম ফিলাপের জন্য কলেজটি শিক্ষার্থী প্রতি ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়েছে। অথচ বোর্ড নির্ধারিত সর্বোচ্চ খরচ ছিল মাত্র ১৭৬০ টাকা।

তথ্য সূত্র: বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো

নারী শিক্ষা ১৯৯৬ সাল থেকে অবৈতনিক করা হয়। শিক্ষা থেকে মেয়েরা যেন কোনোভাবেই ঝরে না পড়ে তাই বিনামূল্য পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, উপবৃত্তি দেওয়াসহ আরও অনেক পরিকল্পনা করেছে সরকার।  বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইজের) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের শিক্ষা বাজেটের প্রায় ৫শ ৮১ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে শুধু মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের মেয়েদের উপবৃত্তিতে। তবে নিত্য নতুন শিক্ষানীতি ও অবাধ শিক্ষা বাণিজ্যের আগ্রাসনে বিফলে যাচ্ছে এই সব প্রয়াস। মেয়েদের শিক্ষা থেকে ঝরে যাওয়া এখনও ‍ অব্যাহত।

সারাবাংলার অনুসন্ধানে উঠে আসে অবৈতনিক নারী শিক্ষার অন্য এক দিক। জানা যায় কেন সরকারি পরিসংখ্যানে মাধ্যমিকে শতকরা ৩৮.৪৪ জন মেয়ে ঝরে যায়, কেনই বা তাদের ঝরার হার ছেলেদের চেয়ে ২.৪২ শতাংশ বেশি?

কেস স্টাডি-১

বাকচর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, শ্যামপুর। ঢাকার উপকণ্ঠে শিল্প এলাকার এই স্কুলটির খুব কাছে আর কোনো স্কুল নেই। স্কুলের শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই বাস করে কারখানার আশপাশের বস্তিতে। এই পরিবারগুলোর মাসিক আয় পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। আর প্রায় সব পরিবারেই রয়েছে একাধিক সন্তান।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক সাব্বির আহমেদ জানান, তাদের স্কুলে ছাত্রী ঝরে পরার হার অনেক বেশি। এসএসসির দুয়ার পর্যন্ত গিয়েও পরীক্ষা দিতে পারে না অনেক ছাত্রী। পড়া বন্ধ করে বাড়ি বসে থাকে, কারখানায় কাজে লেগে যায় অথবা বিয়ে হয়ে যায়।
‘অভিভাবক অশিক্ষিত, তারা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বুঝেন না’- বলেন সাব্বির আহমেদ।

সরেজমিনে পাওয়া যায় ভিন্ন চিত্র। ঝরে পরা প্রায় ১৭জন শিক্ষার্থীকে সহজেই খুঁজে পাওয়া যায় আশপাশের বস্তিতে। শিক্ষার্থী এবং তাদের বাবা মায়ের অভিযোগ- শিক্ষায় অনীহা নয়, ঝরে পড়ার কারণ শিক্ষাবাণিজ্য।

আমেনা (ছদ্মনাম), বয়স ১৪ বছর। মাত্র নয়-দশমাস আগেও স্কুলে যেত সে। তারও ছিল বই খাতা, স্কুলের একটা ব্যাগও ছিল। এখন সেই ব্যাগটা নিয়ে আমেনা কারখানায় যায়।

আমেনার স্কুলের মাসিক বেতন ছিল দেড়শ টাকা। তিন সন্তানের পরিবারে এ টাকা কোনোক্রমে ব্যবস্থা করছিলেন আমেনা বাবা। কিন্তু স্কুল থেকে নির্দেশ, স্কুলে কোচিং করতেই হবে। কোচিং বাবদ প্রতিমাসে ব্যয় বাড়ে আরও ৮শ টাকা, এর উপরে গাইড বই কেনা, স্কুলের আনুষঙ্গিক খরচ কুলাতে পারেনি ওর পরিবারে।

“মায়াডার পড়নের মাথা আছিলো, কোচিংয়ের পয়সা নাই, তাই পড়া হয় নাই,” বলেন আমেনার মা। ঠিক একইভাবে একদিন স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়েছিল ওই মায়েরও।

আমেনার গল্প শুধু আমেনার না, এই গল্প ঐ বস্তির প্রায় সব মেয়ের। কেউ পঞ্চম শ্রেণিতে সমাপনী পরীক্ষার আগে পড়া ছেড়েছে, কেউ অষ্টম শ্রেণিতে। দুই-একজন নবম শ্রেণি পর্যন্ত উঠেছিলেন। কিন্তু যত বড় ক্লাসে ওঠা যায় বাড়ে কোচিং করার চাপ আর ব্যয়ও। কোচিং না করলে পাস নিয়ে টানাটানি হয়, এতে এমনিই বন্ধ হয়ে যায় স্কুলে যাওয়া।

“সরকার মাগনা বই দিলে কী অইব? স্যারেরা পড়ায় গাইড থিকা। প্রতি সাবজেক্টের আলাদা গাইড বই কিনতে হয়। একেকটা দাম ২০০ থিকা ৬০০ টাকা। ৯টা সাবজেক্ট, এত টেকা কই পামু?” বলেন আরেকজন অভিভাবক।

কোচিং এর বিষয়টি কেন বাধ্যতামূলক? প্রশ্ন রাখা হয় স্কুলের প্রধান শিক্ষক সাব্বির আহমেদের কাছে। অভিযোগ থাকলেও তিনি কোচিং বাধ্যতামূলক এটি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। তবে তার শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে মত দেন তিনি।

“এই স্কুলের ছাত্র ছাত্রীদের বাস বস্তি এলাকায়, বাবা মা-ও অশিক্ষিত। সকাল থেকে তারা কারখানায় কাজ করে। ফলে স্কুল শেষে বাচ্চাগুলো এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়, বখে যায়। বাড়িতেও লেখাপড়া দেখানোর কেউ নেই। তাই আমরা স্কুলের পরে তাদের আলাদা করে পড়াই।” বলেন সাব্বির আহমেদ।

কেস স্টাডি-২

মিরপুরের বাউনিয়া বাঁধ এলাকা। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ড। তবে ঢাকা মহানগরীর ঈর্ষণীয় উন্নয়নের কোনো ছোঁয়াই নেই এখানে। ভাঙ্গা রাস্তা, অপরিচ্ছন্ন সড়ক আর ঘিঞ্জি বস্তি মনে করিয়ে দেয় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত উক্তি, “ঈশ্বর থাকেন ঐ গ্রামে, ভদ্রপল্লীতে।”

এই এলাকায় অনেকগুলো স্কুল আছে। পথে যেতে যেতে কিছুদূর পরপরই স্কুল চোখ পড়ে। কথা হয় এই এলাকার ঝরে পড়া মেয়েদের সঙ্গে। তাদের একজন তামান্না (ছদ্মনাম)।

“আমি গার্লস ইসলামিয়া হাই স্কুলে পড়তাম। এ বছর আমার এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। স্কুল পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন ফি ধরে ছয় হাজার টাকা, সঙ্গে আরও তিন হাজার বেতন ও আনুষঙ্গিক খরচ। আমার নির্বাচনী পরীক্ষায় দুই বিষয়ে কম নম্বর ছিল ওই অপরাধে আরও তিন হাজার। সব মিলিয়ে ১২ হাজার টাকার পরেও পরীক্ষার আগের আড়াই মাস কোচিং বাবদ ৮০০ টাকা করে বেতন নেওয়া হয়। বাবা আমাকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে আনেন। বলেন, এত টাকা দেওয়া সম্ভব নয়।”

তামান্নার বন্ধু রাহেলার (ছদ্মনাম) গল্পটাও প্রায় একই। সে পড়ত ঢাকা আইডিয়াল স্কুলে। জেএসসি পরীক্ষার আগে স্কুল পরীক্ষার ফি ধার্য করে সাত হাজার টাকা। ব্যাস, এরপর সেই একই অনেক শোনা ঝরে যাওয়ার গল্প।

মেয়েগুলো এখন বসে আছে একটা চাকরির খোঁজে। বিয়ের খরচও তো উঠানো চাই!

এমন গল্প শুধু একটি বা দুটি স্কুলের নয়। এ এলাকার প্রায় সবগুলো স্কুলে দুপুর থেকে বসে কোচিং ক্লাস। শিক্ষার্থী প্রতি চার  শ’ থেকে হাজার টাকাও নেওয়া হয় মাসে। অথচ তাদের কারও পারিবারিক মাসিক গড় আয় আট হাজারের বেশি নয়।

সাংবাদিকের পরিচয় সম্পর্কে ভীষণ সচেতন থাকা সত্ত্বেও একজন শিক্ষক মুখ ফসকে বলে দেন, কোচিং এসব স্কুলের বাধ্যতামূলক। অজুহাতও সেই একই। কোচিং বাধ্যতামূলক না করলে বস্তির বাচ্চারা বখে যাবে…।

শিক্ষাবাণিজ্য কি শুধুই কেস স্টাডি?

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরি বলেন,

“গণসাক্ষরতা অভিযান ২০১৪ সালে ‘প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা কোন পথে?’ শিরোনামে একটি গবেষণা করে। এতে দেখা যায়, ৮৬ শতাংশের বেশি বিদ্যালয় সাধারণ ক্লাস কার্যক্রম বাদ দিয়ে কোচিং করাচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এদের মধ্যে ৭৩ শতাংশ বিদ্যালয়ে কোচিং বাধ্যতামূলক। বাধ্যতামূলক কোচিংয়ের হার শহরের চেয়ে গ্রামের বিদ্যালয়ে বেশি।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন সারাবাংলাকে জানান, শিক্ষাবাণিজ্য বর্তমানে একটি সার্বজনীন বিষয়।

“দৈব চয়নে শহর বা গ্রামের যে কোনো স্কুলে কাছাকাছি চিত্র পাওয়া যাবে” বলেন তিনি।

বিল্লাল হোসেন আরও বলেন, ’’আমরা আমাদের বিভিন্ন গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছি সরকার যতই শিক্ষাকে বিনামূল্যে করার চেষ্টা করুক না কেন শিক্ষাটা অবৈতনিক না। দুর্বল শিক্ষার্থীদের পাঠদানের নামে শিক্ষা স্কুল থেকে কোচিংয়ে চলে গেছে।’’

ষষ্ঠ থেকে দশম পর্যন্ত দুইবার বোর্ড পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। মাধ্যমিকে তাই মেয়েদের ঝরে যাওয়ার পরিমাণ বেশি” বলেন তিনি।

কেন বাড়ছে শিক্ষাবাণিজ্য?

শিক্ষাবাণিজ্য বাড়ার বিষয়ে সারাবাংলার সঙ্গে কথা হয় অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী হোসেন জিল্লুর রহমানের। তিনি বলেন, শিক্ষাবাণিজ্য সৃষ্টি হওয়ার পেছনে একটা বড় কারণ শিক্ষা পদ্ধতি এবং পাঠ্যপুস্তকের মান।

“প্রতিবছর নতুন কিছু নীতি প্রণয়ণ হয়, বদল আসে পরীক্ষা পদ্ধতিতে, সিলেবাসে ও পরীক্ষা নীতিতে। এভাবে শিক্ষার্থী, অভিভাবকরা বিভ্রান্ত হন। ফলে তাদের পক্ষ থেকেও শিক্ষাবাণিজ্য কোনো প্রকার বাধা আসে না”- বলেন হোসেন জিল্লুর।

শিক্ষাবাণিজ্যের প্রভাব কতদূর?

শিক্ষা সমীক্ষা-২০১৭ অনুযায়ী, ২০১৬-২০১৭ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিকে ৫৫ লাখ ৮০ হাজার ৩৮৭ জন মেয়ে ভর্তি হয়েছিল। শতকরা ৩৮.৪৪ জন ঝরে পড়া (ড্রপ আউট) হিসেবে, মোট ২১ লাখ ৪৫ হাজার১০১ জন মেয়ে শিক্ষা সমাপ্ত করতে পারেনি। টাকার অংকে তাদের পেছনে সরকারের ব্যয় ছিল ১৭শ ২৭ কোটি টাকা (মাধ্যমিক পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে সরকারের গড় বার্ষিক ব্যয় ছিল ৮,০৪৮টাকা হিসেবে) যা ঐ বছর শিক্ষা বাজেটে ২.৬৩ শতাংশ। এটা শুধু মাধ্যমিকের খরচ। প্রাথমিক ও উচ্চমাধ্যমিক গণনা করলে খরচের খতিয়ান আরও বড়।

২০১১ সালে ব্যানবেইজ মাধ্যমিক স্কুলে ঝরে পড়ার কারণ নিরূপণে একটা গবেষণা চালায়। সে গবেষণায় দেখা যায়, এর মূল কারণ বাবা মায়ের দরিদ্রতা ও অশিক্ষা।

তথ্য সূত্র: বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো

মোহাম্মদ বিল্লাল বলেন,” বাবা-মার অর্থনৈতিক অবস্থা যাই হোক না কেন ছেলে সন্তানের জন্য কোচিংয়ে অতিরিক্ত অর্থ দিতে যতটা আগ্রহী হন মেয়ে সন্তানের বিষয়ে ততটা না। ফলে মেয়েদের লেখাপড়া সহসাই বন্ধ হয়ে যায়। লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে বাড়িতে যেহেতু তাদের করার আর কিছু থাকে না, তাই তাদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে শিক্ষাবাণিজ্য বাল্যবিবাহের হার বৃদ্ধিতেও প্রভাব রাখে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গবেষণা ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, দরিদ্র-অশিক্ষিত বাবা-মা শিক্ষায় বিনিয়োগ করতে পারেন না। ফলে তাদের সন্তানেরা জীবনে খুব বড় কিছু করতে পারে না। এভাবে তাদের সন্তানরা যখন বাবা-মা হয় তারাও দরিদ্র-অশিক্ষিত অভিভাবক হয় এবং শিক্ষা ক্ষেত্রটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম এভাবেই অশিক্ষার চক্রে আটকে থাকে। আর এর শিকার প্রথমে হয় কন্যা সন্তানেরা।

 

শিক্ষাবাণিজ্য বন্ধে সরকার কী করছে?

ড. মজিবর রহমান বলেন, শিক্ষাবাণিজ্য বন্ধে সরকারের “শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের কোচিং বন্ধ নীতিমালা-২০১২” নামে একটি নীতিমালা আছে। এ নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা আলাদা করে ক্লাস নিলে তা অভিভাবকের আবেদনের প্রেক্ষিতে হতে হবে। এছাড়াও মাসে সর্বোচ্চ কত টাকা নিতে পারবে (প্রতি বিষয়ে সর্বোচ্চ ৪০০ টাকা) এবং এর ব্যত্যয় হলে তা দেখার জন্য একটি পর্যবেক্ষণ কমিটির কথা বলা হয়েছে।

যদি পর্যবেক্ষণ কমিটিতে কোনো শিক্ষকের শিক্ষাবাণিজ্যের অপরাধ প্রমাণিত হয়, তবে তার এমপিও (সরকার থেকে আসা মাসিক ভাতা) বাতিল, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বাতিল, বেতন একধাপ অবনতকরণ, সাময়িক বরখাস্ত, চূড়ান্ত বরখাস্তের কথা বলা আছে।

“যেটা বলা নেই তা হচ্ছে, পর্যবেক্ষণ কমিটির দৃষ্টি গোচরে বিষয়টি আনবে কে?” বলেন ড. মজিবর।

শিক্ষাবাণিজ্যের ফলে শিক্ষা ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং এর কারণে মেয়েদের ঝরে পড়ার বিষয়ে সারাবাংলা কথা বলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহা-পরিচালক প্রফেসর মো. মাহাবুবুর রহমানের সঙ্গে।

তিনি বলেন, “কিছুদিন আগেও আমি প্রায় পঞ্চাশটি স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের কাছে জানতে চেয়েছি তাদের স্কুলে কোচিং করানো হচ্ছে কি না? তারা আমাকে জানিয়েছেন, কোচিং করাচ্ছেন না। যদি তারা কোচিং করান তবে আমরা স্কুলের এমপিও বাতিল করে দেব।”

তবুও কেন বন্ধ হয় না শিক্ষাবাণিজ্য?

নাম না প্রকাশের শর্তে রাজধানীর শ্যামপুরের একজন উন্নয়নকর্মী জানান, সরকারের শিক্ষা বাণিজ্য নীতিমালায় যে অভিযোগ জানানোর কথা বলা আছে, সেটার জন্য কোথায় যেতে হবে তাই জানেন না অধিকাংশ শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক।

যদি তারা অভিযোগ জানানও তবু এটা বন্ধ হবে না, কেননা স্কুলগুলোর সঙ্গে জড়িত থাকে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা এবং প্রভাবশালী মহল। তাদের ভয়ে মুখ খোলে না কেউ-ই। ফলে নিরাপদে চলে শিক্ষাবাণিজ্য আর তার বলি হয় দরিদ্র পরিবারের মেয়েগুলো।

“শিক্ষাবাণিজ্যের দায় শুধু শিক্ষকদের উপরে আসে, আমরা যখন বোর্ডে খাতা আনতে যাই, প্রবেশপত্র তুলতে যাই, আমাদেরও ঘুষ দিতে হয়”- বলেন বেসরকারি কলেজের এক শিক্ষক।

এ শিক্ষক আরও জানান, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থী প্রতি ২০০ টাকা বোর্ডকে দেয় প্রবেশপত্র নেওয়ার সময়। তিনি প্রশ্ন রাখেন, এই টাকা কোন খাতে যায়?

হোসেন জিল্লুর রহমানের বলেন, শিক্ষা বাণিজ্য বন্ধে সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়।
তার মতে, সরকার শিক্ষা ব্যবস্থায় একটার পর একটা টোটকা নীতি চালাচ্ছে। ফলে কোনো সমস্যার একক প্রশ্ন তোলাও বিপজ্জনক। এমন একটা সমাধান আসবে যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না জেনেই একটা নীতি প্রণয়ন করা হবে।

“সরকার কোচিং বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণের যে নীতিমালা করেছে, সেটা শুধু শিক্ষকদের দিকে দায় দেওয়া হচ্ছে। অথচ, সরকার ও মাউশির কাছে যথেষ্ট উপায় আছে তৃণমূল পর্যায় থেকে সমস্যা অনুধাবন করার এবংসমাধান করার। তা না করে তারা শুধু একটি নীতিমালা ‘ঘোষণা’ করে দায় সেরে দেয়”- বলেন হোসেন জিল্লুর।

“শিক্ষা শুধু অবৈতনিক করলে হবে না, শিক্ষা মানসম্মত করতে হবে। বই শুধু বিনামূল্যে করলে হবে না, তা সহজবোধ্য হতে হবে। তবেই শিক্ষাবাণিজ্য বন্ধ হবে এবং সরকারি বিনিয়োগ সফলতার মুখ দেখবে”- মত এ সমাজ বিজ্ঞানীর।

সারাবাংলা/এমএ/ এসবি

টোটকা নীতি ও শিক্ষাবাণিজ্যে বিফল অবৈতনিক ‘নারী শিক্ষা’র প্রয়াস
টোটকা নীতি ও শিক্ষাবাণিজ্যে বিফল অবৈতনিক ‘নারী শিক্ষা’র প্রয়াস