বুধবার ১৯শে ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং , ৫ই পৌষ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১০ই রবিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী

তারামন বিবি – যে তারা কখনও নেভার নয়

ডিসেম্বর ১, ২০১৮ | ৭:৫৫ অপরাহ্ণ

রেহমান মোস্তাফিজ ।। 

‘চৈত্র মাসের শুরুর কথা। আমাদের বাড়ি ছিল রাজিবপুরের চর শংকর মাধবপুর ইউনিয়ন। মুক্তিযুদ্ধের সময় চৌদ্দ বছরের কিশোরী আমি। আমার মধ্যে নতুন নতুন সব স্বপ্ন। এই তো কদিন পর আমার বিয়ে হবে, সংসার হবে, সন্তান হবে। গ্রামের সাধারণ মেয়েদের যা হয়।’ সে স্বপ্ন আর পূরন হয় নি তখন। কারণ, দেশে শুরু হয়েছিল তোলপাড়।

বলছিলাম বাংলা মায়ের বীর সন্তান তারামন বিবির কথা। আরও লাখ লাখ লোকের মত মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তারামন বিবিও জান বাঁচাতে পরিবারের সাথে নিজেদের গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে রাজিবপুরের অন্য ইউনিয়ন কোদালকাঠিতে চলে গিয়েছিলেন। তাদের মতই প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ পালিয়ে আসতো এই গ্রামে। কারও পেটেই খাবার জোটে না ঠিকমত। তারামন বিবি কাজ খুঁজে ফেরেন মানুষের বাড়িতে বাড়িতে। কোনদিন কাজ জোটে কোনদিন জোটে না। যেদিন জোটে সেদিন পেটে খাবার যায় নাহয় দিন কাটে অনাহারে। এভাবেই অনাহারে আর পাকিস্তানি সৈন্যদের ভয়ে দিন কেটে যাচ্ছিল একাত্তরের কিশোরী তারামনের।

দিন তারিখের হিসেব না থাকলেও তারামন বিবির মনের মধ্যে স্মৃতিরা জ্বলন্ত অঙ্গারের মত জেগে থাকে সবসময়। বীর এই মুক্তিযোদ্ধার ভাষায়, একদিন জঙ্গলে কচুরমুখি খুঁজতে গেলে দেখেন তার দিকে একজন বয়ষ্ক লোক এগিয়ে আসছেন। ততদিনে পাকিস্তানি সৈন্যদের অত্যাচার আর রাজাকাররা কীভাবে খান সেনাদের সাহায্য করছে তা জানা হয়ে গেছে তারামন বিবির। লোকটিকে এগিয়ে আসতে দেখে ভয়ে দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।

কিন্তু পালানোর আগেই লোকটি তাকে ডাক দিয়ে বলে ‘এই মেয়ে শোন।’ প্রচন্ড ভয় পেলেও দাঁড়িয়ে যান কিশোরী তারামন। তখন লোকটি জিজ্ঞেস করেন ‘তোমার কি নাম মা?’ এই মা ডাক শুনেই নাকি তারামন বিবির মন থেকে ভয় দূর হয়। এরপর লোকটার সাথে কিছুক্ষন কথা বলার পরে ভয়টা একদমই চলে যায়।

লোকটি আর কেউ নন, তিনি মুক্তিযোদ্ধা মুহিব হালদার। তিনি তারামন বিবিকে বলেন ‘শুনেছি তুমি মানুষের বাড়িতে কাজ কর। পাশেই আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। সেখানে কি আমাদের সাথে কাজ করবে? মানে ভাত টাত রান্না করে দেয়া আর কি।’ তারামন বিবি মনে মনে রাজীই হয়ে যান। কিন্তু ক্যাম্পে যেতে হবে বলে মনে কিছুটা দ্বিধাও আসে। মুহিব হালদারকে তিনি বলেন, ‘আফনে আমরার মার লগে কথা বলেন, উনি যাইবার দিলে যাইমু।’

সেদিনই সন্ধ্যায় মুহিব হালদার অন্য আরেকজন মুক্তিযোদ্ধা আজিজ মাস্টারকে সাথে নিয়ে তারামন বিবির মায়ের সাথে দেখা করেন। তারামন বিবিকে কাজের জন্য নিতে চায় শুনেই তার মা বলে উঠে ‘ক্যাম্পে নিয়া যাবার চান, এই মেয়ের তো কোনো দিন বিয়া হইব না। মেয়ে যদি মইরা যায় তাইলে তো যন্ত্রণাই শ্যাষ, যদি না মরে তাইলে? দ্যাশ স্বাধীন হইবে তো? আমার মাইয়ারে নিয়ে যাবার চান কিন্তুক কীভাবে নিয়া যাবেন কন?’ তখন মুহিব হালদার তারামন বিবিকে ধর্ম মেয়ে বানিয়ে নিয়ে যান।

তারামন বিবির মা মুহিব হালদারের মুখের কথায় ভরসা করে মেয়েকে যেতে দেন। যাবার সময় তারামন বিবির মা আজিজ মাস্টারকে শুধু বলে ‘বাই গো দেইখ্যান আমরার মাইয়াডার ইজ্জত যেন না যায়।’

এভাবেই শুরু হয় তারামন বিবির মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের কাজ। কাজ বলতে প্রতিদিন ভাত তরকারি রান্না করা, অস্ত্রগুলো পরিষ্কার করা আর লুকিয়ে রাখা। তার ভাষায়, ‘কি ওজন এককটার’! ভালোই দিন কাটে তার এখানে।

একদিন আজিজ মাস্টার বলে নদীর ওপারের পাকিস্তানি সৈন্যদের খবর আনতে হবে। আর এ কাজে যেতে হবে তারামন বিবিকেই। যেতে হবে রাতের অন্ধকারে নদী সাঁতরে। কিছুটা ভয় পেলেও রাজি হয়ে যান কিশোরি তারামন। রাতের বেলা পরনের কাপড় যতখানি কম রাখা যায় ততখানি কম রেখে নদী সাঁতরানো শুরু হয় তারামনের।

সারারাত সাঁতার কেটে  জঙ্গলে লুকিয়ে থাকে। তারপর গায়ে কাদা ময়লা মেখে পাগল সেজে পাকিস্তানি ক্যাম্পে যায়। পাকিস্তানি সৈন্যরা তাকে বিরক্ত করে, পাগল ভেবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। ক্যাম্প থেকে অন্য মেয়েদের চিৎকার ভেসে আসে। আতঙ্ক জাগে তার মনে। তার থেকে বেশি জাগে ঘৃণা। মনে মনে ভাবে, পাকসেনাদের জোরে জোরে কুত্তারবাচ্চা বলে গালি দিতে পারত। কিন্তু তাহলে আর এখানকার খবর নিয়ে ফেরা হবে না তার । তাই মনের রাগ মনেই চেপে রাখতে বাধ্য হন তিনি। সেবারে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে হানাদারবাহিনীর সব খবর এনে দেন সফল ভাবেই। তারামন বিবির সেই খবরের উপর ভিত্তি করে পরে সফল অপারেশন করে ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধারা।

মুক্তিযোদ্ধাদের সেই ক্যাম্পের কাছেই ছিল তারামন বিবির খালার বাড়ি। একদিন খালাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল বলে রাতের অন্ধকারে গেলেন সেখানে। সকালে চলে আসার সময় খালা থেকে যেতে বলেন তাকে। তার খালু তখন কুরআন শরীফ পড়ছিল। হঠাৎ করেই মিলিটারি আসে। তারামন বিবি কোনমতে লুকোতে পারলেও তার খালু পারেননি। ওরা শুরুতেই কুরআন শরীফে এক লাথি দেয়। তারপর খালুর বুকি গুলি করে। লুকোন জায়গা থেকে এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না তারামন বিবির। সেদিনের পর থেকে তার খালাকেও আর খুঁজে পাওয়া যায় নি।

তখন বাংলা সনের শ্রাবন-ভাদ্র মাস। মুহিব হালদার তারামন বিবিকে দশগরিয়া মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে নিয়ে আসেন। এখানেই তাকে অস্ত্র চালানো শিখান মুহিব হালদার। স্টেনগান নিয়ে আলফা সিগন্যাল দেয়াও শিখানো হয় তাকে। একদিন দুপুর বেলা ঝুম বৃষ্টির মধ্যে ভাত খাচ্ছিল সবাই। তখন তারামন বিবিকে গাছের উপর উঠে নদীর দিকে নজর রাখতে বলা হয়। দূরবিনে নদীর দিকে চোখ রাখতেই দেখেন পাকিস্তানি সৈন্যরা গানবোট নিয়ে এগিয়ে আসছে। খবর দিতেই খাওয়া ছেড়ে উঠে যার যার পজিশন নিয়ে নেন মুক্তিযোদ্ধারা। দুদিক থেকেই শুরু হয় গুলি বর্ষণ।

সময়ের তাগিদে তারামন বিবিও হাতে তুলে নেন স্টেনগান। তার ছোঁড়া গুলিতে একটা করে পাকিস্তানি মারা পড়ে আর অসম্ভব খুশিতে মন ভরে ওঠে তারমন বিবির। চোখের সামনে খালুকে গুলি করে মেরে ফেলার স্মৃতি তখনও যে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। সেদিন স্টেনগান নিয়ে আলফা করতে গিয়ে তার কনুই আর হাটু ছিলে গিয়ে রক্তাক্ত হয়ে যায়। কিন্তু না, বীর হতে যার জন্ম তিনি কি সামান্য আঘাতে থেমে যাবেন? কখনোই না। থেমে জাননি তারামন বিবিও। মুক্তিকামী লাখো বাঙালির মত তারামন বিবিরও তখন একটাই পণ, দেশটা স্বাধীন করতে হবে…..

(চলবে)

 

সারাবাংলা/আরএফ 

Tags: ,

তারামন বিবি – যে তারা কখনও নেভার নয়
তারামন বিবি – যে তারা কখনও নেভার নয়
তারামন বিবি – যে তারা কখনও নেভার নয়