শনিবার ১৮ আগস্ট, ২০১৮, ৩ ভাদ্র, ১৪২৫, ৬ জিলহজ্জ, ১৪৩৯

তালাকের সংখ্যা বৃদ্ধি খারাপ খবর নয়; ভাল খবর !

জানুয়ারি ১৬, ২০১৮ | ৪:৫৩ অপরাহ্ণ

শিরোনাম পাঠ করে অনেকের ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে গেছে নিশ্চয়ই। ভাবছেন এ কোন পাগলের প্রলাপ! ‘বিচ্ছেদ’ কী করে ভাল খবর হয়! হয়, হয়! চিন্তাটাকে একটু ঘুরিয়ে দিলেই হয়। আমাদের ছকবদ্ধ স্টেরিওটাইপ চিন্তা পদ্ধতি ভিন্নভাবে ভাবতে পারার শক্তি কেড়ে নিয়েছে। ফলে লেখাপড়া জানা অনেক শিক্ষিত মানুষও উপরের শিরোনাম পড়ে স্বাভাবিকভাবে আঁতকে উঠবেন!

‘বিচ্ছেদ’ শব্দটা প্রধানত বেদনার আলোড়নখচিত অনুভূতি প্রকাশ করে। প্রেমাষ্পদের হাত কেউ ছেড়ে দেবার জন্য ধরে না। তথাপি জীবনের জটিলতা কিংবা কুটিলতার কাছে পরাস্ত হয়ে কোনও কোনও হাত চিরতরে ছেড়ে দিতে হয়। এই ছেড়ে দেওয়া অন্য অর্থে মুক্তির বারতা নিয়ে আসে। তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদকে তেমনই মুক্তি সনদ হিসেবে আমি দেখি। আমার মেঝ চাচার প্রথম স্ত্রী অর্থাৎ আমার চাচী দুটি শিশু সন্তান রেখে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। কারণ নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন। চাচার দ্বিতীয় বিয়ে তিনি মেনে নিতে পারেননি। ওদিকে আমার মায়ের ভাগ্যেও একই পরিণতি অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। আমাদের জন্মদাতা যখন আমাদের সৎমাকে ঘরে আনেন তখন আমার মা’ও দুটি কিশোর সন্তানের জননী।

চাচীর সাথে পার্থক্য হলো চাচী কড়িকাঠে ঝুলে মুক্তি খুঁজেছেন, অন্যদিকে আমার মা সতীনের সাথে ঘর করাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড হিসেবে মাথা পেতে নিয়েছেন। সমাজের গভীরে তাকালে এখনও ওই একই চিত্র দেখতে পাওয়া যায়। পত্রিকার পাতা জুড়ে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের বিশদ বিবরণ। কোথাও যৌতুক দিতে না পারায় পিটিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে স্ত্রীকে, কোথাও স্বামীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে বিষ খাচ্ছে স্ত্রীটি নয়তো ফ্যানের সাথে শাড়ি-ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলে পড়ছে কিশোরী বধূটি।

ছয় বছর একটি উন্নয়ন সংস্থায় আইন সহায়তা নিয়ে কাজ করেছি। কাজের প্রয়োজনে দেশের বিভিন্ন জেলায় যেতে হতো। একেবারে প্রান্তিক মানুষ বিশেষ করে নারীরা আমাদের কাছে আইনী পরামর্শ নিতে আসতেন। এইসব হাউজ ওয়াইফ নারীদের অভিযোগ শুনে প্রায়শ তালাকের পরামর্শ দিতে হতো। কিন্তু লক্ষ্য করতাম এঁদের মধ্যে অধিকাংশই স্বামীকে তালাক দিতে অস্বীকৃতি জানাতেন। খুব করে অনুরোধ করতেন সালিশ-মীমাংসার মাধ্যমে বিষয়টার ফয়সালা করে দিতে। সালিশে সবসময় কাজ হতো না। কিন্তু তাঁদের বাস্তবতা এমন ছিল স্বামীর অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে মুখ বুজে থাকা ছাড়া গত্যন্তর থাকতো না।

তালাকের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে অপারগ হওয়ার পেছনে একাডেমিক কিংবা কারিগরি শিক্ষা না থাকা, ছোট ছোট সন্তান থাকা, পিতামাতার অভাবের সংসার এসব ছিল প্রধান কারণ। বদমাশ স্বামী নারীর এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করে বেড়ায়। স্বামীর মদ জুয়া, ভিন্ন নারী গমন, লাম্পট্য, মারধর এসব মেনে নিয়ে অসুস্থ্য দাম্পত্য জীবন বয়ে বেড়াতে হয় এক একজন প্রান্তিক নারীর। বিয়ে তাঁদের জীবনে লোহার শেকল হিসেবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকলেও সেই শেকল ভাঙার সাহস, শক্তি, বল তাঁদের থাকে না। উৎপাদনের সাথে বিযুক্ত এদেশের নারীদের গল্প কমবেশি এরকমই।

কিন্তু এই গল্পের পিঠে অন্য গল্পও আছে। সেই গল্প শিক্ষিত, স্বাবলম্বী, আত্মমর্যাদাশীল নারীর। উৎপাদন ও কর্মের সাথে যুক্ত নারী তাঁর গল্পটা নিজেই তৈরি করে নিতে শিখেছে, শিখছে। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে যে কর্মজীবী মেয়েটি গার্মেন্টসে ছুটছে শ্রম দেবার জন্য কিংবা যে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নারীটি অফিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হচ্ছে তাঁদের জীবন সংগ্রাম একজন প্রান্তস্থিত অসহায় নারীর থেকে একেবারেই আলাদা।

একজন কর্মজীবী নারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারছে স্বাধীনভাবে। তাঁর কেন দায় থাকবে দাম্পত্যের পাথর বয়ে বেড়াবার? ওই পাথর সরিয়ে সে পথ করে নিচ্ছে সামনে এগিয়ে যাওয়ার। এই পথে সম্পর্ক বাধা হিসেবে দাঁড়ালে সম্পর্ক ভাঙছে, বিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে তাও ভেঙে দিচ্ছে। সঙ্গত কারণে তাই তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ঘুণে ধরা, ধ্বজভঙ্গ সমাজ যতো ভাঙবে, ভেঙে নতুন সমাজের দিকে এগোবে ততই তালাকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। ততই একজন নারী সত্যিকারের স্বাধীনতা ও মুক্তির আনন্দ গ্রহণ করবে।

সমাজ বিধাতাগণ এতে গোস্যা করবেন নিশ্চিত। তাঁরা পশ্চিমের উদাহরণ টানবেন, আবহমান বাংলার ইতিহাস ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাইবেন। যেকোনো প্রকারে সংসারধর্ম  টিকিয়ে রাখার মহান উপদেশ মনে করিয়ে দেবেন। কিন্তু তাঁরা কখনও তথাকথিত মধুর দাম্পত্যের ভেতরের করুণ গল্পটা পাল্টে দিতে এগিয়ে আসবেন না। তাঁরা একজন নারীর আত্মহত্যাটা দেখবেন কিন্তু পরবর্তীতে আত্মহনন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেবেন না। যাঁদের কারণে নারীটিকে তাঁর অসম্মানের গ্লানিকর জীবনের ইতি টানতে হলো তাঁদেরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন না। তাঁরা পশ্চিমের সমাজ ব্যবস্থার ‘হরহামেশা’ ডিভোর্সের কথা পেড়ে নিজেদের গোঁড়া সমাজের কদর্য মুখ ঢাকতে চাইবেন কিন্তু পশ্চিমের নারীদের স্বাধীন ও মুক্ত জীবনযাপনের গৌরবের দিকটি ভুলেও উচ্চারণ করবেন না।

এইসব ভণ্ড সমাজ রক্ষকদেরকে বাতিল করতে হবে। এরাই পিতৃতন্ত্রের পাহারাদার। হাজার বছর ধরে এই এঁরাই বাঙালির আবাহমান পিতৃতান্ত্রিক সমাজ টিকিয়ে রেখেছে। এদের একপক্ষ বিয়ে নামক সংস্থাটিকে চুক্তির কথা বলে একে যেকোনো প্রকারে চালু রাখার জন্য মিষ্টি মিষ্টি কথার বিভ্রম তৈরি করেছে। এরা সগর্বে ঘোষণা করে, স্বামীর ঘর নারীর আসল ও স্থায়ী ঠিকানা। পিতার গৃহ অস্থায়ী কার্যালয়। ওই কার্যালয়ে কিছুক্ষণ বসে ঘরে ফিরে যেতে হবে, মানে স্বামী গৃহে আসতে হবে। এটাই একজন পুণ্যবতী, ভদ্র, সুশীলা নারীর অবশ্য কর্তব্য। স্বামীর সুখ স্বাচ্ছন্দ্য উন্নতি সমৃদ্ধি মঙ্গল কামনা সতীলক্ষ্মী মহিলার একমাত্র আরাধ্য। অন্যদিকে অন্যপক্ষ বিয়েকে আনুষ্ঠানিকতার নাম দিয়ে এতে দেবত্ব আরোপ করেছেন। অগ্নীকে সাক্ষী রেখে সাতপাকে বাঁধা নারী আজীবন স্বামীর কেলোর সংসার করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এজন্য এদেশে হিন্দুদের জন্য বিচ্ছেদের আইনই করা হয়নি। বিয়ের মধ্যদিয়ে আমৃত্যু দণ্ডাদেশ ঘোষিত হয়েছে এদেশের হিন্দু নারীদের জন্য। স্বামীটি দেশের কুখ্যাত সন্ত্রাসী কিংবা লম্পটশ্রেষ্ঠ হলেও তাঁকে ছেড়ে দেওয়া কিংবা অন্য পুরুষের মাঝে স্বপ্ন খোঁজা বারণ! তাই এদেশীয় হিন্দু এলিটগণ যতই গর্ব করে বলুক না কেনো তাঁদের সম্প্রদায়ে বিবাহবিচ্ছেদের বালাই নেই, তা মস্ত ভণ্ডামীপূর্ণ বক্তব্য ব্যতীত কিছু নয়। একবার আইন পাশ হোক তখন দেখা যাবে ক’জন মর্যাদাসম্পন্ন আত্মনির্ভরশীল নারী বদমাশ স্বামীর ঘর করে।

সুতরাং বদলে যেতে থাকা সমাজে নারীর শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা, তাঁকে যতবেশি আত্মনির্ভরশীল করবে, সচেতন করবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার কেন্দ্রে নিয়ে আসবে, স্বপ্ন দেখাবে ততবেশি ঝুঁকিতে পড়বে বিদ্যমান প্রথাবদ্ধ সমাজ। পুরুষতান্ত্রিক শাসকগণ কেঁপে উঠবে হারানোর ভয়ে। আগামীর নারী মেনে নেবে না পূর্বনারীর সমাজ নির্ধারিত নিয়তি এবং একইসাথে সনাতন পুরুষতান্ত্রিক চিন্তার অধিকারী পুরুষও মানতে চাইবে না, ছেড়ে দিতে চাইবে না পূর্ব পুরুষের দেখানো দাম্পত্য সাম্রাজ্য।

একজন উপার্জনক্ষম পশ্চাৎপদ চিন্তার পুরুষ সুন্দরী ও শিক্ষিত স্ত্রী চাইবে, চাইবে তাঁর নারীটি সেজেগুজে তাঁর ফেরার অপেক্ষা করুক। কিন্তু চাইবে না স্ত্রী উপার্জন করুক, বড়বড় দায়িত্ব গ্রহণ করুক। কিংবা স্ত্রীর বাইরে কাজ করার অধিকার স্বীকার করলেও মেনে নিতে পারবে না স্ত্রীর কর্তৃত্ব। কারণ তাঁর ধারণার ভেতরে প্রোথিত রয়ে গেছে যে পুরুষ নারীর থেকে শিক্ষায়, যোগ্যতায় যতই দুর্বল, অক্ষম, অকিঞ্চিৎকর হোক না কেনো সংসারের কর্তা বা বিধাতা একমাদ্বিতীয়ম পুরুষ, তাঁর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত, তাঁর কথাই আইন!

এহেন মানসিকতার স্বামী নামক পুরুষের সাথে যথেষ্ট মর্যাদসম্পন্ন আধুনিক চিন্তার নারী একঘরে, একসাথে দাম্পত্য সম্পর্ক চালিয়ে নিতে চাইবে না এটাই তো স্বাভাবিক এবং এমন স্বাধীনচেতা, উন্নত মন ও মননের ধারক নারীকে ধারণ করতে না পারার কারণে পুরুষ পুঙ্গবটিও চাইবে না একসাথে থাকতে। ফলাফল অনিবার্য বিচ্ছেদ। তাই তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ কেবলই বেদনার বেলাভূমি নয়, মুক্তির আনন্দে ভাস্বর সুনীল আকাশও বটে!

 

[রোকেয়া সরণি কলামে প্রকাশিত লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত]

সারাবাংলা/এসএস

 

Tags: , , ,

তালাকের সংখ্যা বৃদ্ধি খারাপ খবর নয়; ভাল খবর !
তালাকের সংখ্যা বৃদ্ধি খারাপ খবর নয়; ভাল খবর !