রবিবার ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ৮ আশ্বিন, ১৪২৫, ১২ মুহররম, ১৪৪০

তোমাদের অনন্ত ছুটি শান্তিময় হোক

মার্চ ১৩, ২০১৮ | ৬:০৯ অপরাহ্ণ

শারমিন শামস্।।

ফরেনসিক পরীক্ষার পর ঘরে ফিরবে মৃতদেহগুলো।

আজ তাদের যাবার কথা ছিল পোখারায়, কি চিতওয়ানে, কি নাগরকোটে। পাহাড় দিয়ে ঘেরা নেপালে ছুটি কাটাতে যাচ্ছিলেন তারা। অফিস থেকে পাঁচদিনের ছুটি নিয়েছিলেন সংবাদকর্মী ফয়সাল। এনজিও কর্মকর্তা রিমু আর তার স্ত্রী বিপাশা আট বছরের পুত্র অনিরুদ্ধকে নিয়ে হিমালয়ের দেশে যাচ্ছিলেন। তাদের প্রিয়জনদের কাছে শুনলাম,  বহুদিন ধরেই ট্যুর প্ল্যান করছিলেন তারা। দুজনের ছুটি আর মেলে না, তাই যাওয়াও হয় না। অবশেষে ছুটি মিলল তিনজনের।

প্রিয় বিপাশা আপা, রিমু ভাই, ছোট্ট অনিরুদ্ধ, তোমাদের যাবার কথা ছিল হিমালয়ের দেশে। কোথায় কোন মেঘের দেশে পাড়ি জমালে তোমরা?

ত্রিভুবন এয়ারপোর্টের ল্যান্ডিংয়ের স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করি। বছরে অন্তত সাত আটবার, কি তারও বেশি নেপাল যাই। আমার হাসব্যান্ড সেজান কর্মসূত্রে বাস করছে নেপালে।  ও প্রতিমাসেই অন্তত একবার  কাঠমান্ডু থেকে ঢাকায় আসে। আমাদের ইমিগ্রেশন ফর্মে  বিএস ২১১ লিখতে হয়েছে কত কতবার। এক ঘণ্টা বিশ মিনিটের পথ। চার বছরের মেয়ের হাত ধরে এই পথ পাড়ি দেই। ভবিষ্যতে আরও দেব হয়তো।

ভাববার চেষ্টা করি। অনুভব করার চেষ্টা করি। ১২ মার্চ ইউএস বাংলার বিএস ২১১ নম্বর ফ্লাইটে আমরা ছিলাম না। কী সৌভাগ্যবান আমরা! কিন্তু বুকের ভেতরে এরকম তীব্র রক্তক্ষরণ হচ্ছে কেন? কেন কিছুতেই আজ যায় না মনের ভার? কেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না অর্ধশত মৃত্যুর বিভীষিকাকে? কেন কিছুতেই চোখ থেকে সরে যাচ্ছে না তিন বছরের প্রিয়ন্ময়ীর মুখ?

ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করে চিকিৎসক হিসেবে ঘরে ফিরছিল তেরজন নেপালী ছেলে-মেয়ে। বিধ্বস্ত বিমানের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জিনিসপত্রের ভেতরে পাওয়া গেছে তাদের পাঠ্য মেডিকেল বই।  ওদের এগারজনই চলে গেছে।

ভাবতে চেষ্টা করি। এতগুলো বছর দেশ ছেড়ে দূরে থেকে পড়া-লেখা করে দেশের সম্পদ হয়ে ফিরছিল ওরা। কী অসম্ভব ক্ষতি এক একটা পরিবারের, দেশের। এক একটা মনুষ্য জীবন- কী অনায়াসে নাই হয়ে যায়— মাটি ছোঁয়ার আগেই এক একটা অমূল্য প্রাণ কোথায় ভেসে গেল? কেন গেল? কেন যায়?

বিপাশা রিমু অনিরুদ্ধর ছবিগুলো দেখি। বিপাশার বড় বড় স্বপ্নময় চোখগুলো দেখি। ফয়সালের বাবার বুকভাঙা কান্না দেখি। প্রতিভাবান ফটোগ্রাফার প্রিয়ক আর তার পরিবারের চেক ইন সেলফি দেখি। স্বামীকে নেপালের উদ্দেশ্যে বিদায় জানিয়ে ফেসবুকে দেওয়া জ্যোতি রায়ের ভালোবাসায় ঘেরা স্ট্যাটাস দেখি—  ‘যেমন সুস্থভাবে যাচ্ছ তেমন সুস্থভাবে ফিরে আসো।’ বৈমানিকের পোশাকে সপ্রতিভ পৃথুলার উজ্জ্বল মুখখানা দেখি। পাইলট আবিদ সুলতানের সরল সুন্দর ছবি দেখি।  তারুণ্য ঝলমল এক একটা পরিবার দেখি। স্বপ্ন দেখি। জীবনের আয়োজন দেখি।

আর সবকিছু ভেঙে-চুড়ে শেষমেষ শুধু মৃত্যুকেই দেখি। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুই সত্য, অনিবার্য। কিন্তু এভাবে কেন? কেন এভাবেই সময়ের আগে মৃত্যু আসে? আসবে? কেন এই ২০১৮ সালে বিমানবন্দরের অদক্ষতা আর বিমানের ত্রুটির বিষয়টি নিয়ে আমাদের আহাজারি করতে হবে? কেন একটি পর্যটন-প্রধান দেশের বিমানবন্দর হবে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপদজনক বিমানবন্দর?

আমরা হাহাকার করতে পারি— এটুকুই সাধ্যে কুলায় বলে। আমরা দাবি তুলতে পারি। আর একটিও দুর্ঘটনা যেন না ঘটে, এ জন্য সোচ্চার হতে পারি। এ ছাড়া আর কিছুই আমাদের করার নেই।

জীবন থেমে থাকে না বলেই বাংলাদেশ-নেপাল ফ্লাইটে আবার পাড়ি জমাতে হবে আমাদের। কখনো কাজের প্রয়োজনে, কখনো ঘরে ফেরার তাগিদে, কখনো ভ্রমণের ইচ্ছায়। যারা সিস্টেম তৈরি করেন, যারা দায়িত্বে থাকেন, যারা তদারকি করেন, যারা জবাবদিহী করান, করেন— জানি না এরপর তারা কী করবেন! সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে এই দেশে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। কয়েকদিন পর পর ঝরে যায় কত প্রাণ। লঞ্চ ফেরি দুর্ঘটনায় অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারায় প্রতি বছর। আজকাল বড় গা সওয়া হয়ে গেছে। এসবের মধ্যেই কাঠমান্ডুর এই বিমান দুর্ঘটনা! জানি না, এই জাতির জীবনে আর কত শত বীভৎস মৃত্যু অপেক্ষা করে আছে!

আকাশ পরিষ্কার থাকলে কাঠমান্ডু যাবার পথে প্লেনের জানালা দিয়ে মাউন্টেন রেঞ্জ দেখতে পাওয়া যায়। মেঘের ভেতর দিয়ে হঠাৎ জেগে ওঠা অন্নপূর্ণাকে দেখে খুশিতে ঝলমল করে ওঠেন যাত্রীরা। একটু পরেই পাহাড়ের দেশে পা রাখবেন। ল্যান্ডিংয়ের আগেই সেই অন্নপূর্ণাকে চোখের সামনে আকশে ভেসে থাকতে দেখা একটা অনন্য অভিজ্ঞতাই বটে। বারোই মার্চ বিএস ২১১-এর একাত্তর জন যাত্রী— ওরাও নিশ্চয়ই জানালার বাইরে মেঘেদের ভিড়ে খুঁজেছিলেন অন্নপূর্ণাকে! ছোট্ট অনিরুদ্ধ নিশ্চয়ই পাশে বসা মায়ের হাত ধরে বলেছিল, ‘ওই দেখো মা, হিমালয়!’ দেবীর মতো আয়ত চোখের বিপাশা নিশ্চয়ই প্রবল ভালোবাসায় রিমুর হাত ধরে বলেছিলেন, ‘এসে গেছি আমরা!’

জীবন সত্য। মৃত্যুও সত্য। এইসব কিছু মেনে নিয়ে আবার ভুলে যাওয়াটাও সত্য। আমাদের জীবনে এরকম অজস্র বেদনার রেখা বার বার পা রেখে যায়। কিন্তু দায়িত্বহীনতা আর অদক্ষতার কারণে আজ এই একবিংশ শতকে এরকম বীভৎস মৃত্যু কেন বার বার মেনে মেনে নিতে হবে, আমি জানি না। কেবিন ক্রু নাবিলার সন্তান হিয়া— এই মস্ত পৃথিবীতে ওই অবোধ শিশুর মায়ের জন্য অপেক্ষা কেন আর কোনোদিন ফুরাবে না? সব রেখা মুছে ফেলে, সব দাগ ধুয়ে রেখে, ক্ষতিপূরণের হিসাব সুনিপুণ মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্ববানেরা কি কোনোদিন  মা-হারা ছোট্ট হিয়ার চোখে চোখ রেখে ওর মুখোমুখি দাঁড়াতে পারবেন?

সানজিদা হক বিপাশার বাবা মা, রফিক জামান রিমুর বৃদ্ধা মা এখনো জানেন না তাদের সন্তান মৃত। মৃত্যু হয়েছে আট বছরের অনিরুদ্ধের। মৃত্যু হয়েছে একটা সম্ভাবনার। মৃত্যু হয়েছে আমাদের নিশ্চিত ভ্রমণের স্বপ্নের। আজ এই মুহূর্তে প্রার্থণা বিএস ২১১ দুর্ঘটনায় নিহত আহত সব যাত্রীর জন্য। ভালো থাকুন ওই পাড়ে। ভালো থাকো বিপাশা, রিমু, ছোট্ট অনিরুদ্ধ –  অন্নপূর্ণার ওই পাড়ে মেঘের সীমানা ছাড়িয়ে তোমাদের অনন্ত ছুটি শান্তিময় হোক!

সারাবাংলা/এসএস

তোমাদের অনন্ত ছুটি শান্তিময় হোক
তোমাদের অনন্ত ছুটি শান্তিময় হোক