শুক্রবার ২০ জুলাই, ২০১৮, ৫ শ্রাবণ, ১৪২৫, ৫ জিলক্বদ, ১৪৩৯

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস : উড়াও শতাবতী (পর্ব-০২)

জানুয়ারি ১৪, ২০১৮ | ১২:৪২ অপরাহ্ণ

<< আগের পর্ব

থাক সে কথা! আপাতত বাইরে কেউ নেই। দোকানের সামনের অংশটা একটু গোছানো। দামি পণ্যগুলো সাজানো এ অংশে। হাজার দুয়েক বইয়ের স্থান সংকুলান হয়েছে এখানে। এক্সক্লুসিভগুলো রাখা জানালার দিকটায়। ডান দিকে একটা গ্লাসআঁটা শোকেসে শিশুদের বই। পাজির পাঝাড়া শিশুদের নিয়ে র‌্যাকহ্যামের জংলি ইলাস্ট্রেশনের একটি বইয়ের মলাটের ওপর থেকে সরে ব্লুবেল গ্লেড হয়ে ওয়েন্ডলি পর্যন্ত গিয়ে থামলো গর্ডনের চোখ। এরপর দৃষ্টি সোজা কাচের দরজা ভেদ করে বাইরে। বাজে দমকা হাওয়ার বেগটা বাড়ছে। উপরে মেঘেঢাকা আকাশ, নিচে বৃষ্টিভেজা সড়ক।

দিনটি নভেম্বরের ১৩। সেন্ট এন্ড্রু দিবস। চার রাস্তার সংযোগের এক কোণায় ম্যাকেচনির এই দোকান। দরজা থেকে যতটা চোখ যায়, বাইরে বাঁয়ে বড় এল্ম গাছটির পত্রশূন্য অসংখ্য ডালপালা আকাশের বিপরীতে বাদামীরঙা কারুকাজ ছড়িয়েছে। উল্টোদিকে প্রিন্স অব ওয়েলসের পাশে লম্বা লম্বা বোর্ডগুলো বিজ্ঞাপনে ঠাসা। খাদ্য আর ওষুধ পণ্যের নৈর্ব্যক্তিক উপস্থাপনা ও প্রসারকর্ম। গ্যালারিতে বড়বড় গোলাপিরঙা ফাঁপা মুখগুলোয় বোকামির আশাবাদিতা ঝুলে রয়েছে। কিউ.টি সস, ট্রুইট ব্রেকফাস্ট ক্রিসপস (শিশুরা ব্রেকফাস্ট ক্রিসপসের জন্য কান্না জুড়ে দেয়), ক্যাঙারু বারগান্ডি, ভিটামল্ট চকোলেট, বোভেক্স। এগুলোর মধ্যে বোভেক্সের বিজ্ঞাপনটি দেখে গর্ডনের মেজাজ বেশি খিচড়ায়। চশমাআঁটা ইঁদুরমুখো এক কেরানি তেলচপচপে পরিপাটি চুলে একটি ক্যাফের কোণার টেবিলে বসে সাদা মগ ভরা বোভেক্স সামনে নিয়ে দাঁত কেলাচ্ছে। নিচে লেখা- ‘কোণার টেবিলে বসে খাচ্ছি বোভেক্স সহকারে’।

দৃষ্টির পরিধি একটু ঘনিয়ে আনলো গর্ডন। ধুলোজড়ানো কাচের ভেতর থেকে নিজের প্রতিবিম্বটি তার দিকেই তাকিয়ে। এখনো ত্রিশে পৌঁছায়নি, কিন্তু এরই মধ্যে পোকায় কাটা মুখ; ফ্যাকাশে, আঁচড় পড়া। কপালের দিকটা লোকেরা ‘ভালো’ বলে বটে- উন্নত, তবে সেটুকুই। চোয়ালটা চিমসে। ফলে সবমিলিয়ে মুখমণ্ডলটা ডিম্বাকৃতি নয় বরং নাশপাতির আকার পেয়েছে। ইঁদুররঙা উশকো-খুশকো চুল, গোমড়া মুখ, বাদামী চোখ। দৃষ্টির পরিধি আবার একটু বাড়ালো। আজকাল আয়নায় বড্ড ঘেন্না তার। বাইরেটা বড়ই বিবর্ণ নিষ্প্রাণ। খসখসে ইস্পাতের হাঁসের মতো ভাসতে ভাসতে একটি ট্রাম পাথুরে সড়কে ঘর্ঘর শব্দ তুলে এগুচ্ছে, তাতে রাস্তায় ঝরাপাতাগুলো ঘুর্ণি খেয়ে খেয়ে উড়ছে। এল্ম গাছে পত্রহীন ডালগুলো বাতাসে পূবের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। কিউ.টি সসের পোস্টারটির এক কোনা ছিঁড়ে ফিতার মতো ঝুলে ছোট্ট নিশান হয়ে ঘুরে ঘুরে উড়ছে। ডান দিকে পাশের সড়কেও ন্যাড়া গাছগুলো বাতাসের তোড়ে ঝুঁকে ঝুঁকে পড়ছে। ফালতু বাতাস। ঝাপটা মেরে জানান দিয়ে গেলো শীতের কামড়। ওদিকে কবিতার দুটি চরণ জন্ম নেওয়ার আকুলতায় গর্ডনের মনের গর্ভে হাত-পা ছুঁড়ে চলছে:

তীব্র (কিছু একটা) বাতাস— হতে পারে হুমকির বাতাস, না ভালো হয় ভীতির বাতাস। ভীতির বাতাস বয়ে চলেছে, না বলি ছুটে চলেছে, মনে মনে কবিতা আওড়াচ্ছে গর্ডন।

‘কিছু একটা ডালগুলো- আত্মসমর্পিত ডালগুলো, না ভালো হয় ঝুঁকে পড়া ডালগুলো, তাহলে ভীতির সাথে ঝুঁকে যাওয়ার মিল থাকে, কিছু এসে যায় না, ঝুকে পড়া ডালগুলো সদ্য ন্যাড়া। বাহ বেশ!

– তীব্র ভীতির বাতাস ঝাপটায় সদ্য ন্যাড়া ডালগুলো হয়ে যায় নত।

(শার্পলি দ্য মেনাসিং উইন্ড সুইপস ওভার দ্য বেন্ডিং পপলারস, নিউলি বেয়ার।)

বেশ ভালো। ‘বেয়ার’ শব্দটা ছন্দে বেমানান। যাইহোক, বরাবরই ‘এয়ার’ শব্দটা এলে, সেই চসার থেকে শুরু করে সব কবিকেই দেখা গেছে, ছন্দ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।

 

নাহ! গর্ডনের মনের ভেতরে কবিতার তাড়ণাটা মিইয়ে গেলো। মনজুড়ে আবার ফিরে এলো পকেটের সেই খানকয়েক কয়েন। দুইপেন্সের হাফপেনি আর একটি জোই মুদ্রা। মনের ওপর বিরক্তির ভাবটা সরছেই না। ছন্দ আর বিশেষণের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না তার মন। পকেটে মোটে দুইপেন্সের হাফপেনি রেখে কেউ পারে না।

 

ফের উল্টোদিকের পোস্টারগুলোর ওপর চোখ পড়লো। ওগুলোর ওপর প্রচণ্ড ঘৃণার ব্যক্তিগত কারণও তার রয়েছে। যন্ত্রের মতো আরও একবার পোস্টারের স্লোগানগুলো পড়ে ফেললো। ‘ক্যাঙ্গারু বারগান্ডি- ব্রিটনদের মদ।’ ‘হাঁপানির কষ্টে ভুগছে মেয়েটি’। ‘কিউ.টি. সসে স্বামীর মুখে হাসি।’ ‘ভিটামল্ট খাও পাহাড় চড়ে বেড়াও’, ‘কার্ভ কাট- ভবঘুরে ধূমপায়ীদের জন্য।’ শিশুরা চায় ব্রেকফাস্ট ক্রিসপস।’ ‘কোণার টেবিলে বসে খাচ্ছি বোভেক্স সহকারে।’

হাহ্! একটা মোটে ক্রেতা চাই, তা সে যেই হোক! ভিতরে ভিতরে ভীষণ মুষড়ে যাচ্ছে গর্ডন। দরজায় দাঁড়িয়ে সামনের জানালার বাইরে একটা দৃশ্য সরাসরি দেখা যায়। এখানটাতে কোনো কাচ নেই, ফলে প্রতিবিম্বও নেই। সেদিকটা দিয়েই একজন সম্ভাব্য ক্রেতার আগমন চোখে পড়ে তার।

কেতাদুরস্ত গোছের মাঝবয়সী লোকটা কালো স্যুট, বোলার হ্যাট, ছাতা আর ডিসপ্যাচ কেস হাতে- রাজ্য সরকারের কৌসুলি কিংবা শহরের করনিক গোছের কিছু হবেন। বড় বড় ফ্যাকাশে চোখ দুটো জানালা পথে বাড়িয়ে দিলেন। নজরে নোংরা একটা ভাব। লোকটির চোখের দৃষ্টিপথ ধরে নজর ফেললো গর্ডনও। ওহ… তবে এই তোমার মনে! দূরের কোনায় ডি এইচ লরেন্সের প্রথম সংস্করণের তাকেই সে দৃষ্টি। স্ক্যান্ডালের কাহিনীতে ব্যাটার ঝোঁক আছে বুঝা গেলো। অনেক আগে লেডি চ্যাটার্লির কথা শুনেছে সে। লোকটার চেহারায় নোংরামির ভাষাটা যেন পড়ে ফেলতে পারছে গর্ডন। বিবর্ণ ভারি, লুকোনো, বাজে একটা ছোঁকছোঁক ভাব। তবে মুখের কোণায় একটা অবজ্ঞাও ঝুলিয়ে রাখা। বাড়িতে স্থানীয় শুদ্ধবাদী লিগের কিংবা সমুদ্রপাড়ের নজরদারি (রাবার সোলের স্লিপার পরে ইলেক্ট্রিক টর্চ হাতে বেলাভূমিতে চুম্বনরত যুগলদের মনিটরিং করা) কমিটির সভাপতি হবেন নিশ্চয়। আর এখন শহরে নোংরা আনন্দ খোঁজায় ব্যস্ত। গর্ডনের মন চাইছে… ইস! লোকটা যদি ঢুকতেন, যদি ঢুকতেন! তাহলেই উইমেন ইন লাভ’র একটা কপি গছিয়ে দিতে পারতো। তা যতই খারাপ লাগুক না কেন!

কিন্তু না! ওয়েলশের উকিলবাবু মত বদলালেন।….

পরের পর্ব>>

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস : উড়াও শতাবতী (পর্ব-০২)
ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস : উড়াও শতাবতী (পর্ব-০২)