রবিবার ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ইং , ১২ ফাল্গুন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৮ জমাদিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

নদী জানবেও না তলদেশে নির্মাণযজ্ঞের খবর!

ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৯ | ১:০১ অপরাহ্ণ

।। আসাদ জামান, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট ।।

কর্ণফুলী টানেল প্রকল্প থেকে ফিরে: … ওরে সাম্পানওয়ালা, তুই আমারে করলি দিওয়ানা… হ্যাঁ কর্ণফুলী নদীর সাম্পানওয়ালা, যে কি না তার প্রেয়সীকে দেওয়ানা বানিয়ে আপন খেয়ালে কর্ণফুলী নদীতে সাম্পান ভাসায় রোজ। এই সাম্পানওয়ালাও জানবে না তার প্রিয় নদী ‘কর্নফুলীর তলদেশে কী নির্মাণযজ্ঞ চলছে! সাম্পানওয়ালা তো দূরের কথা, বিশ্বের নানা দেশ থেকে এসে যেসব বিশালাকায় জাহাজ ভেড়ে এই নদীর দুই তীরে গড়ে ওঠা শিল্প কারখানার ঘাটে, জানবে না তার ক্যাপ্টেন, মাস্টার, খালাসিরাও। আর এমনকি খোদ নদীও জানতে পারবে না তার তলদেশে নির্মাণের কী মহাযজ্ঞ চলছে প্রতিদিন প্রতিক্ষণ!

আরও পড়ুন: যেভাবে টানেলের যুগে ঢুকে পড়ছে বাংলাদেশ

কথা হচ্ছে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে শুরু হওয়া টানেল নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে।

বিজ্ঞাপন

নদীর ১৬০ ফুট গভীরে শক্তিশালী ‘টানেল বোরিং মেশিন-টিবিএম (Tunnel Boring Machine-TBM)’ দিয়ে সুড়ঙ্গ পথ তৈরি করা হচ্ছে। এই সুড়ঙ্গ পথেই বাস্তবায়ন হবে উন্নয়নের মহাসড়কে থাকা বাংলাদেশের আরেকটি স্বপ্নের প্রকল্প ‘কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বহুলেন সড়ক টানেল নির্মাণ প্রকল্প।’


বাংলাদেশের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ৮০ ভাগ যোগানদাতা বন্দর নগরী চট্টগ্রামের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল পতেঙ্গা ও আনোয়ারার মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরি করবে এই টানেল। নগরীর মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া খরস্রোতা গভীর কর্ণফুলীর তলদেশের আরও গভীর পাতাল পথে তৈরি হচ্ছে এই টানেল। প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা (৯,৮৮০) ব্যয়ে এই প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার দিচ্ছে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা (৩,৯৬৭ )। বাকি প্রায় ছয় হাজার কোটি (৫,৯১৩) টাকা দিচ্ছে চীন সরকার।

আরও পড়ুন: কর্ণফুলীর তলদেশ যেভাবে কাটবে দৈত্যাকৃতির টিবিএম

চট্রগ্রাম শহরে নিরবচ্ছিন্ন ও যুগোপোযুগী সড়ক যোগাযোগ ব্যাবস্থা গড়ে তোলা এবং বিদ্যমান সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করার জন্য কর্ণফুলী নদীর বঙ্গোপসাগর মোহনায় নির্মাণাধীন এই টানেল নদীর গায়ে দৃশ্যমাণ কোনো আঁচড় কাটছে না। নদীর চিরকালীন চেহারা অবিকল রেখে, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ অখুন্ন রেখে এবং ‘জলের সংসারে’ কোনো প্রকার আঘাত না হেনে নির্মাণ হচ্ছে টানেল।

নির্মাণ কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত দেশি-বিদেশী বিশেষজ্ঞ, প্রোকৌশলী এবং শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যে পয়েন্টে টানেল নির্মাণ হচ্ছে সেখানে নদীর গভীরতা ৭০ ফুটের মতো। আর শিল্ড ড্রাইভেন মেথড পদ্ধতিতে (Shield Driven Method) ডুয়েল টু লেন টানেল (Dual Two Lane Tunnel) নির্মাণ হচ্ছে ১৬০ ফুট গভীরে। অর্থাৎ নদীর তলদেশ থেকে আরো ৯০ ফুট গভীরে থাকবে টানেল টিউব।

কিন্তু এই টানেল টিউব স্থাপনের জন্য বিশাল যে কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে তার বিন্দুমাত্রও নদীর ওপর দৃশ্যমান নয়। কর্ণফুলীর জলে ভাসছে না ‘দানবীয়’ কোনো নির্মাণযন্ত্র। নেই কোনো ভাসমান ক্রেইন বা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির সমাহার! ফলে লাখ লাখ টন ওজনের পণ্যবাহী দৈত্যাকৃতির জাহাজগুলো টানেল পয়েন্টের উপর দিয়ে দিব্যি আসা-যাওয়া করছে।

শুধু টানেল পয়েন্ট নয়, নদীর দুই তীর দেখেও কেউ বুঝতে পারবে না, এর তলদেশে কী ‘মহাকর্মযজ্ঞ’ শুরু হতে যাচ্ছে। কারণ, নদীর উভয় পাড় থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে রয়েছে টানেলের প্রবেশ ও বহির্গমণ পথ। আর এই প্রবেশ ও বহির্গমণ পথে কড়া নিরাপত্ত বেষ্টণী তৈরি করে তার ভেতর চালানো হচ্ছে মহাকর্মযজ্ঞ।

হাজারো ‘কর্মবীরের’ ঘামে-শ্রমে রচিত হচ্ছে কর্ণফুলীর নতুন ইতিহাস

পতেঙ্গা প্রান্তে টানেলের প্রবেশ পথ থেকে আনোয়ারা প্রান্তের বহির্গমণ পথ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেলের পুরো কর্মযজ্ঞটাই চলবে মাটির নিচ দিয়ে। ফলে মাটির উপরে থাকা বিভিন্ন স্থাপনা, শস্যক্ষেত, গাছপালা, রাস্তা-ঘাট সব কিছুই থাকবে যার যার জায়গায়। আর সব কিছু অক্ষত রেখে নিখুঁত এই কাজটি করবে ‘টানেল বোরিং মেশিন-টিবিএম (Tunnel Boring Machine-TBM)’। যেটা এরইমধ্যে পতেঙ্গা প্রান্তে স্থাপন করা হয়েছে।

কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা শহরের সঙ্গে চট্টগ্রাম শহর, সমুদ্র বন্দর ও আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরকে যুক্ত করাই টানেল নির্মাণের প্রধানতম লক্ষ্য। এছাড়া প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্র বন্দরনির্মাণ কাজ ত্বরান্বিত করা, ঢাকা-চট্রগ্রাম-কক্সবাজারের মধ্যে নতুন সড়ক যোগাযোগ ব্যাবস্থা গড়ে তোলা সর্বপরি চীনের সাংহাই শহরের মতো চট্রগ্রাম শহরকে “One City Two Town”মডেলে গড়েতোলার লক্ষ্য পূরণে নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করবে কর্ণফুলী টানেল।

সম্প্রতি কন্সট্রাকশন ইয়ার্ডে গিয়ে টানেল নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত ‘বিষ্ময়কর’ কিছু উপকরণ চোখে পড়ে। টানেলের টিউব তৈরির জন্য চীনের জিয়াংসু প্রদেশের জেংজিয়ান শহরে ‘টানেলসেগমেন্ট কাস্টিং প্ল্যান্টে নির্মাণ করা প্রায় ২১ শ’ সেগমেন্ট এনে পতেঙ্গা প্রান্তে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতর সাজিয়ে রাখা এই সেগমেন্টগুলো ‘টানেল বোরিং মেশিন-টিবিএম (Tunnel Boring Machine-TBM)’ দিয়ে সুড়ঙ্গের ভেতরেই জোড়া লাগানো হবে। আর এভাবেই তৈরি হবে সাড়ে তিন কিলোমিটিার দীর্ঘ কর্ণফুলী টানেল— যা হবে দক্ষিণ এশিয়ায় কোনও নদীর তলদেশ দিয়ে চলে যাওয়া প্রথম সড়ক পথ।

সারাবাংলা/এজেড/এমএম

Tags: , , , ,

নদী জানবেও না তলদেশে নির্মাণযজ্ঞের খবর!
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন