বুধবার ২১শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং , ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১২ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী

নারীর পুরুষ সহকর্মী- বন্ধু নাকি শত্রু?

নভেম্বর ৬, ২০১৮ | ৪:২০ অপরাহ্ণ

তিথি চক্রবর্তী।।

কর্মজীবী নারীর দিনের একটি বড় সময় কাটে সহকর্মীদের সাথে। কর্মক্ষেত্রে মেয়েরা সহকর্মীর মাধ্যমে নানান অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। অনেক নারী তাদের পুরুষ সহকর্মীর কাছ থেকে সহযোগিতা পান। তখন সহকর্মীও হয়ে যায় বন্ধুর মতো। আবার কোন কোন নারী পুরুষ সহকর্মীর দ্বারা এমন বিরূপ আচরণের শিকার হন যে চাকরি করাই কঠিন হয়ে যায়।

আমাদের সমাজে কর্মজীবী নারীকে সংসার ও চাকরি দুটো দায়িত্ব একসাথে পালন করতে হয়। সাংসারের গৃহস্থালী কাজে পুরুষের সহযোগিতা নেই বললেই চলে। ফলে পুরুষের চেয়ে নারীর দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রেই বেশি। সবকিছু সামলিয়ে চাকরি করতে গেলে নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় নারীকে। নারীর জীবনের সাথে যে বিষয়গুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত যেমন- গর্ভধারণ, সন্তান লালন, রান্না করা, সাংসারিক অন্যান্য কাজ, অতিথি আপ্যায়ন, শ্বশুরবাড়ির লোকজনের দায়িত্ব পালন করা ইত্যাদি। তাছাড়া সন্তান জন্মের পরও অনেক মা বিষণ্নতায় ভোগেন। গর্ভপাতও নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। প্রতিমাসে পিরিয়ড নারীর কষ্টকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এই সমস্ত ব্যাপারগুলো নারীর জীবনের অংশ।

অনেক মেয়ে নিজের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার কথা পুরুষ সহকর্মীকে বলতে পারে, অনেকে পারে না। পুরুষ সহকর্মীর অসহযোগিতামূলক আচরণ ও বিরূপ মন্তব্যই অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীকে চুপ থাকতে বাধ্য করে।

প্রত্যেক পুরুষ তার পরিবারে মা ও স্ত্রীর সংগ্রামী জীবন দেখেন। পরিবারের প্রত্যেকটি বিষয়ের সাথে মেয়েদের যুক্ততা থাকে এটাও সব পুরুষ জানেন। সন্তান জন্ম ও লালন পালনে নারীর ভূমিকাও তারা অস্বীকার করতে পারেন না। নিজের স্ত্রীর গর্ভধারণকালীন সমস্যা কিংবা কষ্টের অভিজ্ঞতাগুলোও তাদের অজানা নয়। তারপরও কর্মক্ষেত্রে নারী সহকর্মীকে কতটুকু সহযোগিতা করার মানসিকতা পুরুষের থাকে?

 

কেস স্টাডি :  রোকেয়া রহমান একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন। গর্ভধারণের সময় পুরুষ সহকর্মীর নেতিবাচক আচরণের কারণে নানা মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে তাকে। তিনি বলেন, ‘গর্ভধারণের পর কখনও কখনও শরীরটা একটু খারাপ লাগতো। অফিসে একদিন হঠাৎ বেশি খারাপ লাগলে পুরুষ সহকর্মীকে বলে তাড়াতাড়ি বাসায় চলে যেতে চাই। তখন সেই পুরুষ সহকর্মী আমাকে বলেন, আমার স্ত্রী দুটি সন্তান জন্ম দিয়েছে। কোনদিন তার শরীর খারাপ লাগেনি। আপনার এতো শরীর খারাপ লাগে কেন?’

রোকেয়ার মতো অনেক কর্মজীবি নারী পুরুষ সহকর্মীদের কাছ থেকে এমন বিদ্বেষী আচরণ পান। ফলে একটা সময় চাকরি করাটাই কঠিন হয়ে যায়। অনেক নারী চাকরিও ছেড়ে দেন।

চাকরি করলে দিনের একটা বড় সময় জুড়ে অফিসে থাকতে হয়। আর এই সময়ের সঙ্গী হন সহকর্মীরা। সহকর্মী যদি সহযোগিতামূলক আচরণ করেন, সহমর্মিতার সাথে একজন আরেকজনকে বোঝার চেষ্টা করেন তাহলে অন্যান্য অনেক সমস্যার মধ্যেও চাকরি করাটা কঠিন মনে হয় না। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানের নারী সহকর্মীরা নিজেদের মধ্যে খুব ভাল সম্পর্ক নির্মাণ করেন। ফলে তাদের মধ্যে একতা তৈরি হয়। কর্মক্ষেত্রে নারী সহকর্মীদের পারষ্পরিক বোঝাপড়া ভাল থাকলে অনেক সমস্যার সমাধান করা সহজ হয়।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. সোমা দে বলেন, ‘আমরা শিক্ষিত হলেও জেন্ডার সংবেদনশীলতা আমাদের মধ্যে নেই। শিশুরা কেবল স্কুল থেকেই শেখে না; পরিবার, বন্ধু ও প্রতিবেশির কাছ থেকেও অনেককিছু শেখে। শিশুর আসল ভিত তৈরি হয় ৫ বছর পর্যন্ত। তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বা পাঠ্যপুস্তক জেন্ডার সংবেদনশীল নয়। যেমন পাঠ্যপুস্তকে বাবাকে এমনভাবে তুলে ধরা হয় যেন বাবাই পরিবারের পালনকর্তা। আর মাকে ঘরের কাজকর্মে দেখানো হয়। অর্থাৎ নারীকে কর্মক্ষেত্রের চেয়ে ঘরের কাজে দেখানোর প্রবণতাই আমাদের বেশি। ছোটবেলা থেকেই শিশুরা এসব শেখে। তাই বড় হওয়ার পর তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টায় না।’

ড. সোমা দে আরও বলেন, ‘বুদ্ধিদীপ্ত কাজে মেয়েদের অংশগ্রহণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ইতিবাচকভাবে দেখে না। তাই কর্মক্ষেত্রেও নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় মেয়েদের।’ এই অবস্থার পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রথমত পাঠ্যপুস্তক জেন্ডার সংবেদনশীল হতে হবে। অফিসগুলোতে জেন্ডার সংবেদনশীলতা সম্পর্কে ট্রেনিং এর ব্যবস্থা রাখা উচিত। তাহলে ধীরে ধীরে এই অবস্থায় কিছুটা পরিবর্তন আসবে।’

অনেক পুরুষ সহকর্মী মনে করেন, মেয়েরা কম কাজ করে বেশি সুবিধা পায়। অফিসের উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে মেয়েদের ভাল সম্পর্ক থাকে। এতেই মেয়েদের দ্রুত পদোন্নতি হয়।

পুরুষ সহকর্মীর পদোন্নতিকে স্বাভাবিক চোখেই দেখা হয়। মনে করা হয়, পুরুষের যোগ্যতা বেশি। নিজের যোগ্যতায় তারা পদোন্নতি পায়। এক্ষেত্রে একটি বিষয় অনেকেই ভুলে যান, কর্মক্ষেত্রে যেকোন পদে নারী পুরুষ সমান যোগ্যতা নিয়ে আসেন। তবুও নারীর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। নারীর পদোন্নতিকেও নানাভাবে ছোট করা হয়। এ ধরনের মানসিকতা থেকেই এখনও অনেক প্রতিষ্ঠানে নারী ও পুরুষের সমান যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বেতনের ক্ষেত্রে বৈষম্য আছে। নারীর চেয়ে পুরুষের বেতন কাঠামো ওইসব প্রতিষ্ঠানে বেশি।

এই ধরনের সামাজিক চিন্তাগুলো মেয়েদের যোগ্যতাকে শুধু খাটো করে না, অপমানও করে। এ প্রসঙ্গে ড. সোমা দে বলেন, ‘নারীর অর্জনগুলোকে শারীরিক সৌন্দর্য দিয়ে বিবেচনা করা হয়। আমাদের সমাজে নারী মানেই ভোগ্যপণ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। অফিসে পুরুষের রূপ বা পোশাক নিয়ে কথা হয়না। কিন্তু নারীর এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে সবাই পছন্দ করে।’

অনেক নারী সন্তানকে বাসায় রেখে আসতে পারেন না। অনেকসময় সন্তানকে দেখার মতো বাসায় কেউ থাকে না। তাছাড়া সন্তান ব্রেস্ট ফিড করলে বাসায় রেখে আসা আরও কঠিন হয়ে যায়। সন্তানকে নিয়ে অফিসে আসার অভিজ্ঞতা একেকজনের ক্ষেত্রে একেকরকম।

অনেক পুরুষ সহকর্মী নারী সহকর্মীর সন্তানের প্রতি ভালবাসা ও দায়িত্ব অনুভব করেন। আবার অনেকের অভিজ্ঞতা এক্ষেত্রে তিক্ত। অনেক অসুবিধা থাকলেও অফিসে বাচ্চা নিয়ে আসতে পারেন না।

কেস স্টাডি :   আবিদা পারভীন সন্তান জন্মের পর কাজ করতেন একটি অনলাইন মাধ্যমে । সন্তান নিয়ে অফিসে যাওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘মাত্র একদিন বিশেষ প্রয়োজনে অফিসে বাচ্চা নিয়ে গিয়েছিলাম। সেদিন অফিসের প্রধান পাশের ঘর থেকে বার বার নিউজরুমে এসে আমার দিকে দেখছিলেন। সাধারণত অন্যদিন এতবার তিনি নিউজরুমে আসেন না। আমি কাজ করি নাকি বাচ্চা সামলাই সেটাই দেখার জন্য বার বার আসছিলেন।’ তিনি বলেন, ‘অসুবিধার কারণে মাত্র একদিন বাচ্চা নিয়ে অফিসে গিয়েছি তাতেই যে অবস্থা, যদি প্রায়ই নিয়ে যেতাম তাহলে হয়তো চাকরিই থাকতো না।’

অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তা হোসনে আরা (ছদ্মনাম) সন্তানকে নিয়ে অনেকদিন অফিস করলেও এই ধরনের সমস্যায় পড়েননি। বরং পুরুষ সহকর্মীদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় এক্ষেত্রে সহযোগিতা পেয়েছেন বলে জানান তিনি।

কেস স্টাডি : অডিট ফার্মে কাজ করেন সালমা। মাঝে মাঝে ঢাকার বাইরে যেতে হয় তার। একদিন তার ৮ মাসের ছেলে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যায়। অফিসের দায়িত্বরত কর্মকর্তাকে বলে ছুটি নেন। সেদিন সালমা ও তার একজন পুরুষ সহকর্মীর নারায়ণগঞ্জ যাওয়ার কথা ছিল। সালমার ছুটি নেওয়ার কথা শুনে তার সেই পুরুষ সহকর্মী বলেন, ‘বাচ্চা আমাদেরও আছে। বাচ্চা অসুস্থ হলে আমরা সব কাজ ঠিকই করি। আসলে মেয়ে মানেই অজুহাত।’

সালমা বলেন, ‘এই কথাগুলো শুনলে নারী হিসেবে খুব অপমানিত বোধ করি। একজন পুরুষ যখন পারিবারিক কোন সমস্যা বা বাচ্চার অসুস্থতার কথা বলে ছুটি নেন তখন সেটাকে অজুহাত মনে করা হয় না। বরং পুরুষরা তখন ভাল বাবা হয়ে যান।’

অনেক নারী তার পুরুষ সহকর্মীর কাছে শারীরিক সমস্যার কথা জানাতে কুন্ঠাবোধ করেন। কারণ সমাজের বেশিরভাগ পুরুষই নারীর শারীরিক ব্যাপারগুলোকে সহজভাবে দেখতে পারে না। উল্টো ব্যঙ্গ করার মানসিকতাও থাকে কারও কারও মধ্যে। যেমন পিরিয়ডের ব্যথা হলেও নারী তার পুরুষ সহকর্মীর কাছে বলতে পারেন না। নারী নিজের সমস্যা অন্য একজন পুরুষের কাছে বলতে পারবে এমন দৃষ্টিভঙ্গি অধিকাংশ পুরুষই অর্জন করেনি।

পুরুষ সহকর্মীর দৃষ্টিতে নারী

কেস স্টাডি : নারী সহকর্মীদের সমস্যাগুলোকে কিভাবে দেখেন জানতে চাইলে সরকারি কর্মকর্তা শাহীন আলম জানান, ‘আসলে প্রতিটি সম্পর্ক পারষ্পারিক। একজন নারী সহকর্মী যদি পুরুষের প্রতি সহযোগি হন তাহলে পুরুষও নারী সহকর্মীর প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখাবে। তবে অনেক সময় পুরুষরা তাদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে চায়। অফিসের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা নারী হোক, এটা অনেক পুরুষ মানতে পারে না। অর্থাৎ নারীর অধীনে কাজ করার মানসিকতা অনেকের নেই। তবে অফিসে নারী পুরুষের পদ যখন একই থাকে তখন এত সমস্যা হয় না।’

 

 

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অধিকাংশ মানুষই মনে করেন নারীরা পুরুষের সমকক্ষ হতে পারে না। যতক্ষণ পর্যন্ত একজন নারী শিক্ষাদীক্ষায় পুরুষের চেয়ে ছোট থাকে ততক্ষণ সবকিছু ঠিক থাকে। যখনই উপরে ওঠে তখনই শুরু হয় নানা ধরনের দ্বন্দ্ব ও সমস্যা। খেলাধুলা থেকে শুরু করে সমস্ত ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ও সাফল্যকেও নানাভাবে অবজ্ঞা করা হয়।

কেস স্টাডি : প্রিয়তোষ রায় কাজ করেন একটি অনলাইন পত্রিকায়। নারী সহকর্মীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দিনের বেশিরভাগ সময় অফিসে থাকি। সুতরাং অফিসকেও একটি পরিবার ভাবা উচিত। পরিবারের সদস্যদের যেমন অনেক সমস্যা থাকে তেমনি অফিসের সহকর্মীদেরও সমস্যা থাকে। নারী সহকর্মীদের সমস্যাগুলোকে আমি ইতিবাচকভাবে দেখার চেষ্টা করি। কারণ আমি মনে করি, আমার স্ত্রী যেসব দায়িত্ব পালন করে, আমার একজন নারী সহকর্মীকেও সেসব দায়িত্ব পালন করতে হয়।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন্স এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, ‘কর্মক্ষেত্রে নারী সহকর্মীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি একটি জেন্ডার ইস্যু। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরুষ সহকর্মীদের নেতিবাচক আচরণের শিকার হন নারীরা। যেমন নারীর পদোন্নতি হলে অনেক পুরুষ সহকর্মী এমন আচরণ করে যেন যোগ্যতা ছাড়াই নারী সেই স্থানে গেছে। তারা মনে করে, পুরুষের চেয়ে নারী বেশি যোগ্য এবং বেশি জ্ঞানী হতে পারে না। আবার একটি অফিসে একজন মেয়ের জীবনে বেশি কষ্ট থাকতে পারে। আবার আরেকজন পুরুষ সহকর্মীর জীবনে কষ্ট কম থাকতে পারে। একেকজনের জীবন একেকরকম। যার জীবনে কষ্ট কম সে যদি আরেকজনকে খোটা দিয়ে কথা বলে তাহলে বিষয়টি কখনই মানবিক হয় না।’

অধ্যাপক তানিয়া হক আরও বলেন, ‘নিম্নবিত্ত নারীরা কর্মক্ষেত্রে কম সুবিধা পান এবং পুরুষ সহকর্মীদের সরাসরি খারাপ আচরণের শিকার হন। আর কর্পোরেট অফিসের নারী কর্মকর্তারা একটু বেশি সুবিধা পান। পুরুষ সহকর্মীরা সেখানে প্রকাশ্যে খারাপ আচরণ না করলেও এই ঘটনাগুলো নিভৃতে হয়। পার্থক্য শুধু এটুকুই। শুধু পুরুষ নয় কর্মক্ষেত্রে অনেকসময় নারীরাও নারীদের শত্রু হয়ে যায়।’

 

কর্মক্ষেত্রে নানা ধরনের হয়রানি

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে পণ্য ভাবা হয়। নারীর বুদ্ধি ও যোগ্যতাকে তুচ্ছ করে নারীকে পুরুষের ভোগ্যপন্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। নাটক, সিনেমা কিংবা বিজ্ঞাপনে নারীকে সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়। সমাজে এই ধরনের মনন বা চিন্তা থাকার ফলে পুরুষ সহকর্মীরাও নারীকে সম্মান দিতে পারেনা।

কর্মক্ষেত্রে নারীরা বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হয়। সামাজিক কলঙ্ক এড়াতে এসব হয়রানিতেও নারী অভিযোগ করেন না। তাছাড়া অভিযোগ দিলে পুরুষ সহকর্মীরা তাকে এড়িয়ে চলতে পারে কিংবা আরও বিড়ম্বনা সৃষ্টি হতে পারে এই ভয়ে অনেক নারী বিষয়গুলো গোপন করে রাখেন। কেয়ার বাংলাদেশ নামের একটি বেসরকারি সংস্থা কর্মক্ষেত্রে পুরুষ সহকর্মী দ্বারা নারী হয়রানি নিয়ে একটি জরিপ করেছে। এই জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, ৮৪ দশমিক ৭ শতাংশ নারী কর্মক্ষেত্রে কখনও না কখনও মৌখিকভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।

সম্প্রতি কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকদের নিয়ে একটি জরিপ করা হয়। এই জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, বিভিন্ন পোশাক কারখানায় কর্মরত শতকরা ৮৩ ভাগ নারী কারখানার সুপারভাইজার ও ব্যবস্থাপকদের মাধ্যমে নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। এমনকি পুরুষ সহকর্মীদের অপ্রত্যাশিত স্পর্শও তাদেরকে মুখ বুঝে সইতে হয়।

তাছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানের পুরুষ সহকর্মীরা নারীকে উদ্দেশ্য করে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য (সেক্সিষ্ট কমেন্ট) করেন। কখনও আড়ালে, কখনও প্রকাশ্যে। নারীর বয়স, সাজ-পোশাক, চেহারা নিয়ে কথা বলেন অনেকে। যে নারীরা এগুলোর প্রতিবাদ করেন তাদের সাথে পুরুষ সহকর্মীদের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। শুধু তাই নয়, নারী সহকর্মীদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও অনেক পুরুষ সহকর্মী আলোচনা করতে পছন্দ করেন।

অনেকে মনে করেন, সংসার চালানোর জন্য পুরুষের উপার্জন জরুরী। অর্থাৎ সংসারের আর্থিক দায়িত্ব কেবল পুরুষের। আর নারী চাকরি করে ভাল ভাল শাড়ি, গহনা কেনার জন্য। পুরুষ সহকর্মীদের এমন ভাবনার কারণে নানা ধরনের বিরূপ মন্তব্য শুনতে হয় নারীদের। যেমন অনেক সময় প্রতিষ্ঠানে বেতন দিতে দেরি হলে অনেক পুরুষ সহকর্মী নারীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনাদের তো সংসার চালাতে হয় না, এত টাকা দিয়ে কি করবেন? সংসার চালাই আমরা। টাকা দরকার আমাদের।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফাতেমা রোজিনা পারভীন বলেন, ‘মানব ইতিহাসের শুরুতে সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক। কিন্তু ধীরে ধীরে নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সমাজের মাতৃতান্ত্রিকতা চলে গেল এবং সমাজ হলো পিতৃতান্ত্রিক। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারী অধঃস্তন অবস্থায় চলে গেল। সমাজের পতি হয়ে গেল পুরুষরা। পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবার থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র সবজায়গায় নারী হয় অবদমিত। সহ্য করতে হয় অপমান ও লাঞ্ছনা।’

ড. ফাতেমা রোজিনা পারভীন আরো বলেন, ‘কর্মক্ষেত্রে নারীকে তার সহকর্মীরা তখনই সম্মান করতে পারবে যখন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হবে। এর জন্য প্রথমত ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। যেমন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দুর্নীতি দমনের কাজে নিয়োজিত থাকলেও যতদিন পর্যন্ত মানুষ ব্যক্তিগতভাবে পরিবর্তন হবে না ততদিন পর্যন্ত সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর হবে না। এজন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া মেয়েদেরও তাদের অধিকার নিয়ে সচেতন হতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘মেয়েরা সন্তান ধারণ করবে এটা মেয়েদের একটি অলংকার। এই ক্ষমতা পুরুষের নেই। সন্তান ধারণ ও জন্ম দেওয়ার কষ্ট ছেলেরা ভোগ করে না। এজন্য তাদের উচিত মেয়েদের সম্মান করা।’

একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে নারী সহকর্মীদের কীভাবে সহযোগিতা করেন জানতে চাইলে নামকরা একটি বেসরকারি ব্যাংকের ম্যানেজার (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, ‘আমার অফিসের নারী সহকর্মীরা যেকোন সমস্যার কথা যেন বলতে পারে সেই ধরনের পরিবেশ এখানে আছে। তাছাড়া কর্মক্ষেত্রে ভাল, খারাপ দুই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই যেতে হয়। নারীর ব্যক্তিগত জীবনের সাথে যে বিষয়গুলো যুক্ত সেগুলোকে খাটো করে দেখার কোন উপায় নেই। তবে চাকরিতে এমন কিছু নিয়ম আছে যেগুলোর সাথে নারী পুরুষ সবাইকেই তাল মেলাতে হয়। সবচেয়ে বড় কথা আচরণ, সম্পর্ক এই বিষয়গুলো পারষ্পারিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে নির্মিত হয়। প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব থাকলে সবাই সবার শত্রু হয়ে যাবে।’

জেন্ডার বিশ্লেষক ফারহানা হাফিজ বলেন, ‘সম্প্রতি আন্তর্জাতিক কিছু সংস্থা কর্মক্ষেত্রে নারীর বিভিন্ন ধরনের হয়রানি নিয়ে কাজ করছে। তবে নারীর প্রতি পুরুষ সহকর্মীর আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি, সহযোগিতা কিংবা অসহযোগিতার জায়গাগুলো নিয়ে এখনও তেমন গবেষণা হয়নি এদেশে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে প্রত্যেক নারীর অভিযোগ খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। নাম প্রকাশ না করেও অনেকে অভিযোগ করে থাকেন।’

নারী সহকর্মীর প্রতি পুরুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব জানতে চাইলে ফারহানা হাফিজ বলেন, ‘প্রতিবাদ করতে হবে নারীকেই। তাছাড়া পুরুষ সহকর্মীদের নেতিবাচক আচরণ নিয়ে কর্মক্ষেত্রে খোলামেলাভাবে আলোচনা করতে হবে। চুপ করে থাকলে ছোট সমস্যাও অনেকসময় বড় হয়ে যায়। তখন সেগুলো সমাধান করা কঠিন হয়ে যায়।’

 

আলোকচিত্র- আশীষ সেনগুপ্ত

সারাবাংলা/ টিসি/ এসএস

নারীর পুরুষ সহকর্মী- বন্ধু নাকি শত্রু?
নারীর পুরুষ সহকর্মী- বন্ধু নাকি শত্রু?
নারীর পুরুষ সহকর্মী- বন্ধু নাকি শত্রু?