বুধবার ১৯শে ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং , ৫ই পৌষ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১০ই রবিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী

নারীর সাফল্য যখন কারো চোখের কাঁটা!

নভেম্বর ২৯, ২০১৮ | ৩:১২ অপরাহ্ণ

রাজনীন ফারজানা।।

রুমানা মঞ্জুরের কথা মনে আছে আপনাদের?

২০১১ সালের ঘটনা। পারিবারিক কলহের এক পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক রুমানা মঞ্জুরের দুচোখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দেয় তার স্বামী হাসান সাইদ। চোখ উপড়ে ফেলা ছাড়াও কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে নাকসহ শরীরের নানা অংশ। কোনকরমে প্রাণে বাঁচলেও দৃষ্টিশক্তি হারান রুমানা।

রুমানার অপরাধ ছিল কেরিয়ারের দিক দিয়ে তিনি তার স্বামীর চাইতে সফল। দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্কের পরেই সাইদকে বিয়ে করেছিলেন রুমানা। বুয়েটে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হলেও পড়াশোনা শেষ করেননি সাইদ। অন্যদিকে রুমানা পড়াশোনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এখানেই থেমে না থেকে তিনি কানাডার অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয় ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় পড়তে যান। মাস্টার্সের থিসিস জমা দেওয়ার আগে পরিবারের সাথে সময় কাটাতে দেশে এসেছিলেন রুমানা। স্বামীসহ বাবার বাড়িতেই ছিলেন তিনি। তখনই ঘটে নির্মম সেই ঘটনা। পরকীয়ার মনগড়া অভিযোগ এনে বেকার সাইদ তার সফল স্ত্রীর দু’চোখ উপড়ে ফেলতে চেষ্টা করে।

পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন সাইদ জেলখানায় মারা গেলেও নিজের অন্ধত্বকে জয় করে এগিয়ে চলেছেন রুমানা। ২০১৩ সালে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে ইউনিভার্সিটি ল’ স্কুল থেকে অনার্স ও ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার (ইউবিসি) পিটার এ অ্যালার্ড স্কুল অব ল’ থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি নেন তিনি। বর্তমানে কাজ করছেন ডিএলএ পিপার  নামে সেখানকার একটি প্রসিদ্ধ আইনবিষয়ক প্রতিষ্ঠানে।

একটা সাফল্য আরও অনেকগুলো সাফল্য অর্জনের দ্বার খুলে দেয় মানুষের সামনে। যেকোন কাজে বা উদ্দেশ্যে সাফল্য লাভ করলে মানুষ নতুন করে চ্যালেঞ্জ নিতে অনুপ্রেরণা পায়। কিন্তু আমাদের দেশে নারীদের সাফল্য অর্জন করা শুধু যে কঠিন তাই নয়, একজন নারীর জন্য সাফল্য অর্জন করাও মাঝেমধ্যে তাকে উল্টো বিপদে ফেলে। পরিবার এবং সমাজ থেকে অনেকসময় উল্টো চাপের মুখে থাকেন অনেক নারী। অনেক সময়ই অনেককে এগিয়ে চলার অপরাধে রুমানার মত ভয়ঙ্কর ফল ভোগ করতে হয়।

অনেককে আবার মাঝপথেই থেমে যেতে হয়। এমনই একজন সাফিনা। বাড়ির অমতে জোর করে ইন্টারিমিডিয়েট পর্যন্ত পড়াশোনা করে মেয়েটি। ভালো ফলাফলও করেছিল সে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু বাবা মা চেয়েছিল মেয়েকে পড়াশোনা না করিয়ে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব সেরে ফেলতে। আর মেয়েটি পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছিল। বিয়ে না করে উচ্চশিক্ষা নেবার ইচ্ছার কথা জানালেই বাবামায়ের সাথে সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে। এক পর্যায়ে পারিবারিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে সাফিনা। মারা যাওয়ার আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের হতাশার কথা, হেরে যাওয়ার কথা বলে যায় সে।

সাফিনার মত হার না মেনে নিলেও অনেকেই নানারকম কম্প্রোমাইজ করতে বাধ্য হন। কেউ কেউ চাকরি, পড়াশোনা কিংবা অন্য কোন শখের কাজ ছেড়ে দেন। কোন মেয়ে হয়ত ভালো গান গাইত, কি ছবি আঁকত কি নাচত। বিয়ের পরে কিংবা বিয়ের আগেই সেসব কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় অনেক মেয়ে। এর পেছনে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চিন্তাধারাকে দায়ী করেন শিশু কিশোর উন্নয়ন ও মনো-সামাজিক সংস্থা প্রেরণার সাধারণ সম্পাদক সাইকো থেরাপিস্ট এস জেড রেজিনা পারভীন।

তিনি বললেন, তার কাছে এমন অনেক নারীই আসেন যাদের অদম্য ইচ্ছা আছে ব্যক্তিগত ও চাকরি জীবনে সাফল্য অর্জনের। কিন্তু দেখা যায় স্বামী কিংবা শ্বশুরবাড়ির চাপে নিজেদের ইচ্ছাকে দমন করতে বাধ্য হন তারা। অনেকে চাকরি ছেড়ে দেন। অনেকে নাচ, গান, মডেলিং কিংবা অভিনয় ছেড়ে দেন পুরোপুরি সংসারী হতে গিয়ে। প্রথম প্রথম বুঝতে না পারলেও কয়েক বছর পরে হলেও তারা বিষণ্ণতায় ভুগতে থাকেন। তখন অনেকেই মনোবিদের শরণাপন্ন হন।

এমনই একজন শাকিলা জামান। একটা কলেজে সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষিকা শাকিলার ছাত্রজীবন থেকেই লেখালিখি করার শখ। নিয়মিত বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখেন তিনি। কয়েকটি বইও বের হয়েছে তার। গল্প, কবিতা, ভ্রমণকাহিনীর পাশাপাশি নানা বিষয়ে নিজস্ব মতামত দেওয়ার জন্য অনেকেই ফেসবুক বা ব্লগকে বেছে নেন আজকাল। শাকিলাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের মতামত তুলে ধরতে ও প্রকাশিত এবং অপ্রকাশিত লেখা দিতে শুরু করেন। পাঠকদের কাছ থেকে সরাসরি ফিডব্যাক যেমন পাচ্ছিলেন তেমনি নানা লেখক প্রকাশকের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও গড়ে উঠতে শুরু করেছিল তার। দাওয়াত পেতে শুরু করেছিলেন নানারকম লেখকদের সংগঠনে ও লেখকদের সম্মেলনে।

এক পর্যায়ে তার স্বামী এবং স্বামীর বাড়ির লোকজন ফেসবুকে ব্যস্ত থাকা নিয়ে অভিযোগ জানাতে শুরু করল। এরপর আপত্তি জানান তার নিজের ভাই। মেয়ে হয়ে ফেসবুকে এত লেখালিখি করার কিংবা অপরিচিত লোকের সাথে দেখা করতে বা তাদের সাথে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ঘরের বাইরে যাওয়াটা মেনে নিতে পারেননি তারা। কিন্তু নিজের শখের সাথে কম্প্রোমাইজ করতে চাননি শায়লা। তাই তিনি ভিন্ন নামে আইডি খুলে পরিবারের সবাইকে ব্লক করে লেখালিখি চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

রেজিনা পারভীন বলেন, মেয়েদের সাফল্য পাওয়ার পথে কিংবা সাফল্য উপভোগের পথে স্বামী কিংবা শ্বশুরবাড়ির বাঁধা হয়ে দাঁড়ানোর পেছনে প্রধাণত কাজ করে ঈর্ষাবোধ। অনেকসময় দেখা যায় শ্বাশুড়ি নিজে জীবনে অনেক কিছু করতে পারেননি বা করার সুযোগ পাননি, তখন তিনি ছেলের বউ কিছু করুক তা মেনে নিতে পারেননা। তখন  বউয়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করতে থাকেন বা তার এগিয়ে চলার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ান।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় পুরুষদের ইগো অনেকসময় নারীর এগিয়ে চলার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। এই ইগোর কারণেই স্বামীরা স্ত্রীর সাফল্য কিংবা খ্যাতি মেনে নিতে পারেননা। অনেকসময় দেখা যায় বিয়ের আগে নাচগান জানে, মডেলিং করে এমন মেয়ে দেখে বিয়ে করে বিয়ের পরে সেসব ছাড়তে বাধ্য করেন অনেক স্বামী। নিজের পছন্দমত পোশাক পরতে বাধ্য করেন অনেকে। এমনকি অনেক বিবাহিত নারী নিজের ইচ্ছামত কেরিয়ার পর্যন্ত বেছে নিতে পারেননা। অনেক স্বামীই চান তাদের স্ত্রীরা সবার আগে সংসারকে প্রাধান্য দেবে। তখন দেখা যায় সংসারে শান্তি বজায় রাখার জন্য মেয়েটাকেই চাকরি ছাড়তে হয় বা কেরিয়ারের সাথে কম্প্রোমাইজ করে কাজ করতে হয়।

রেজিনা পারভীন বলেন, বিয়ের আগে একটা মেয়ে কি চায়, কীভাবে চায় তা পরিষ্কারভাবে জানিয়ে তারপর বিয়ে করা উচিৎ। তাহলে বিয়ের পর সাফল্য অর্জনের পথে বাঁধা আসার সম্ভাবনা কমে আসে।

অনেকসময় মেয়ের বাবামায়ের পরিবার থেকেও বাঁধা আসে। রেজিনা পারভীন বলেন, বিয়ের আগে কি পরে একটা মেয়ের নিজের অধিকার নিজেকেই অর্জন করে নিতে হবে। তাকেই ঠিক করতে হবে সে কী চায়। চাওয়ার ধরণ অনুযায়ী পরিবারের সদস্যদের বোঝাতে হবে। তবে কার সাথে কীভাবে কথা বললে বুঝবে সেটাও বুঝে নিতে হবে বলে জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, একটা নারীর সাফল্য অর্জনের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। তাই মেয়েটির পাশাপাশি মানিয়ে চলতে হবে পরিবারের বাকি সবাইকেও। এতে সংসার কিংবা পরিবারে শান্তি বজায় থাকবে।

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় অধিকাংশ নারী এখনও নিজেকে পূর্ণ মানুষ হিসেবে ভাবতে শেখেননি। তারা মনে করে তাদের সব দায়িত্ব পরিবারের পুরুষ সদস্যের উপর। তাদের ভরণপোষণ, নিরাপত্তা, ভ্রমণ ইত্যাদিতে প্রত্যেকটা কাজ কোন না কোন পুরুষ অভিভাবক করবে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজই মূলত এভাবে ভাবতে শেখায়। তারপরেও নানা বাধা পার হয়ে অর্থনৈতিক প্রয়োজনে কাজ করতে বাধ্য হলেও অনেক নারীই নিজের সাফল্য নিয়ে কুন্ঠিত থাকে। সে যদি উদযাপন করতেও চায় কার সাথে করবে ভেবে পায়না। কারণ এতদিন যাদের অভিভাবক কিংবা আপনজন বলে জেনে এসেছে তাদের কাছ থেকেই আনন্দের হাসির বদলে ভ্রূকুটি দেখতে পায়। এই ভ্রূকুটি যাতে দেখতে না হয় সেকারণেই অনেকে সাফল্যের কথা সবার সামনে বলেন না। সাফল্য উপভোগ করার সঙ্গী খুঁজে পান না তারা।

পুরুষতান্ত্রিক ধারণার ফলেই অনেকেই মেয়েদের সাফল্য উদযাপনকেও নেতিবাচক ভাবে দেখে থাকেন। কিছুদিন আগেই এক মেয়ের গ্রাজুয়েশন পার্টির আয়োজনের ছবি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রল করা হয়। মেয়েটির বাবা মা মেয়ের গ্রাজুয়েশন ডিগ্রী অর্জন করা উপলক্ষে বড় পার্টি দিয়েছিল। সেইসব ছবিতে নারী পুরুষ নির্বিশেষে ঘৃণা এবং বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করে। অনেকেই বলতে থাকনে, ছোট অর্জনে বড় আয়োজন করে ফেলেছে, এসব আদিখ্যেতা ইত্যাদি। কিন্তু কোন ছেলে যখন বন্ধুদের সাথে বারে কিংবা রেস্টুরেন্টে গিয়ে গ্রাজুয়েশন ডিগ্রী অর্জন উদযাপন করছে তখন তাকে কেউ অস্বাভাবিকভাবে নিচ্ছে না।

সাফল্য অর্জনের পর উৎসাহ না পেলে কী হয়? মনোবিদ রেজিনা জানালেন, কেউ কাজের ক্ষেত্রে উৎসাহ বা অনুপ্রেরণা না পেলে বা নেতিবাচক মন্তব্য পেলে তাদের কর্মস্পৃহা কমে যায়, কমে যায় কাজ করার উৎসাহ।

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে একটা সাফল্যের হাত ধরে অনেকগুলো সাফল্য আসার বদলে অনেক নারীর ক্ষেত্রে উল্টো কাজের স্পৃহা কমে যায়। ছেলেবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভালো হওয়ার পরেও বাবামায়ের উৎসাহের অভাবে আজীবন পাইলট হতে চাওয়া মেয়েকে বেছে নিতে হয় অতি সাধারণ কোন চাকরি। অনেকসময় দেখা যায় স্বপ্ন পূরণের ক্ষেত্রে মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা বাবামায়ের কাছ থেকে অনেক বেশি উৎসাহ পান।

আফরা আজীবন চেয়েছিলেন বিদেশে পড়তে যাবেন। কিন্তু তাকে বিদেশে পড়তে পাঠাতে অস্বীকৃতি জানালেও তার ভাইকে ঠিকই টাকা খরচ করে বিদেশে পাঠান তার বাবামা। আফরা ক্ষোভের সাথে বলেন, ছেলে তো আজীবন কামাই করে খাওয়াবে তাই ছেলের জন্য খরচ করতে তাদের সমস্যা নাই। আর সে যেহেতু বিয়ে করে চলে যাবে তাই তার জন্য টাকা খরচ করতে চাননি তার বাবামা।

এই চিত্র এখনও সমাজের নানা অংশেই দেখা যায়। পরিবার থেকে একটা ছেলে যতটা উৎসাহ পান, একটা মেয়ে ততটা পান না। শুধু পড়াশোনা বা কেরিয়ার চয়েসের ক্ষেত্রেই নয়, নিজের পছন্দের কথাও অনেকে নিজের মাঝে দমিয়ে রাখেন।

অনেকসময় কর্মক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনের জন্যও মেয়েদের অনেক কটু কথা শুনতে হয়। যোগ্যতা এবং কাজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে সাফল্য অর্জনের পরেও অনেক নারীকে নিয়েই তার পুরুষ সহকর্মীরা ঈর্ষাবশত কুৎসা রটান। তার কাজ এবং চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এই বাস্তবতার কারণেও অনেক নারী নিজের সাফল্য উদযাপন করতে বা কারও সাথে শেয়ার করতে সহজ বোধ করেননা।

একবিংশ শতাব্দীর নারীর আসলে গুটিয়ে নয়, খুলে বাঁচার কথা ছিল। তার সাফল্য, হতাশা, ব্যর্থতা, স্বপ্ন, কাজ সবকিছু নিয়ে খোলামেলা কথা বলার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি এখনও নারীর অনুকূলে না থাকায় নারীরা এখনও নিজের কাজ এবং সাফল্য নিজের মাঝেই রেখে দেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে। একটা সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে আরও সাফল্য আসার বদলে বাঁধা আসে অনেকের এগিয়ে চলায় বা অনেকের ক্ষেত্রে থেমে যায় পথচলা

সারাবাংলা/আরএফ/এসএস

নারীর সাফল্য যখন কারো চোখের কাঁটা!
নারীর সাফল্য যখন কারো চোখের কাঁটা!
নারীর সাফল্য যখন কারো চোখের কাঁটা!