বুধবার ১৪ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং , ৩০শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী

[পর্ব -৩ ] নারী কেন তালাক দেয়?

সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৮ | ১:৫৭ অপরাহ্ণ

বিয়ে মানুষের জীবনের কাঙ্ক্ষিত একটি ঘটনা। একই সাথে উপভোগের ও আনন্দের, স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের সূচনা এই বিয়েতে। কিন্তু এই বিবাহিত জীবনেই নানা তিক্ততার কারনে কখনো কখনো এর পরিসমাপ্তি ঘটাতে হয়। এই পরিসমাপ্তি ঘটাবার একমাত্র আইনগত মাধ্যম হলো তালাক।

তালাক সবসময় নিন্দনীয় এবং অবশ্যই কাঙ্ক্ষিত নয়। তবুও নরনারীর জীবনে তালাকের মত ঘটনা ঘটে এবং মানুষকে বাধ্য করে তালাক দেবার মত ব্যবস্থা নিতে।

আজ আমি এমন একজন নারীর জীবনের কথা আপনাদের জানাবো যাকে ৪০ বছরের দাম্পত্য জীবনের ইতি টানতে হয়েছিল।

ফরিদা নাসরিন (ছদ্মনাম) বয়স ৬০ এর কোঠায়। আমার কাছে এসেছিলেন তার আইনী অধিকার আদায় করতে। সামনে বসে বলছিলেন, ‘‘ আমরা প্রায় ৪০ বছর সংসার করেছি।’’

নম্র আচরণ এবং পোশাকেও আভিজাত্যের ছোঁয়া ভদ্রমহিলার। শুরুতেই বললেন, ‘‘আপনি আমার কন্যাসম। তাই বলতে আমার খারাপ লাগবে না। বরং কথাগুলো বললে আমি হালকা হবো। সেই সাথে আমার অধিকার বা আইনে কি আছে আমি জানতে চাই।’’

খুব দৃঢ় কন্ঠে বললেন, আমি আমার স্বামীকে তালাক দিতে চাই।

তিনি আমাকে তার ইচ্ছার কথা বললেন। ফরিদার সাথে তার মেয়ে। বয়স ২৭/২৮ হবে। বলে, আপা আমি মাকে নিয়ে এসেছি। আপনাদের সংস্থার নাম শুনেছি। আপনি তো মায়ের কথা শুনবেনই। কিন্তু আমার কথাগুলো হয়তো আপনাকে মায়ের সমস্যা সমাধানে সহায়তা করবে।

ফরিদা তার দাম্পত্য জীবনের শুরু থেকেই বলতে শুরু করেন।

‘‘আমার বিবাহিত জীবনের ৪০ বছরে আমার দুটি সন্তান। ছেলেটি বড় আর মেয়েটি ছোট। এই আমার মেয়ে যাকে আমার সাথে দেখছেন। ছেলে বড় চাকুরে। বিয়ে করেছে। আমরা সবাই একসাথেই থাকি। আমার সংসারে কোন অভাব নেই। মেয়েকে মনের মত করে বড় করেছি। মেয়ে এমবিএ শেষ করে একটি ব্যাংকে বড় পদে কাজ করছে। আমার অভিযোগ আমার স্বামীর বিরুদ্ধে। আমি দীর্ঘদিন সংসার বলেন আর দাম্পত্য জীবনই বলেন পার করে কেন এখানে এসেছি তার অনেক কারণ রয়েছে। সহ্যের সীমা শেষ হয়েছে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে। আজ এই মেয়েই আমাকে সাহস দিয়েছে। আর সাথে করে নিয়েও এসেছে।

আমার স্বামী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরে। বয়স ৭০ উর্ধ্ব। খুব কম বয়সে বিয়ে হয়েছে আমার। স্বামীর সেবা, সংসার ও ছেলেমেয়ের দেখভাল, খুব মনোযোগ দিয়ে করেছি। পাছে স্বামীর কষ্ট হয়, সমস্যা হয় এমন কাজ জ্ঞানত করিনি। আমার মা যে এমন শিক্ষা দিয়েই সংসারে পাঠিয়েছেন।

সংসারে অশান্তি ছিল সবসময়ই। মূল যে বিষয়টি ছিল অকথ্য গালিগালাজ আর রূঢ় ব্যবহার। যা আমি মেনে নিয়েছি সবসময়ই। খুব সাধারণ ভুল ভ্রান্তিতেও আমাকে সর্বোচ্চ খারাপ গালিটি শুনতে হয়েছে। কিন্তু প্রতিবাদ করিনি। মেনে নিয়েই ছিলাম। আমার এখন বয়স হয়েছে। ডায়াবেটিস, প্রেসার ধরেছে। আর ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে। ছেলেরও বিয়ে দিয়েছি। এখন ছেলের বউয়ের সামনেই সেই পুরনো গালিগালাজ শুনতে হয়। এখন আর সহ্য হয়না। এখন মনে হয় আত্মসম্মানে লাগছে।’’

কথার ফাঁকে ফাঁকে তিনি তার স্বামীকে তালাক দেবার প্রক্রিয়া জানতে চান। খুব দ্রুততার সাথে আবার বলেন, ‘‘আমি তার সংসার চাইনা। লেখাপড়া কম করেছি। নিজস্বতা কিছুই ছিল না। চাকরি করিনি। আমার নামে কোন সম্পদ সে দেয়নি। শুধু সংসারটাকে আঁকড়ে ছিলাম। নিজের মনে করতাম। এখন এই সংসারটাও অসহনীয় হয়ে উঠেছে।’’

এবার ফরিদার মেয়ে আমাকে বলেন, ‘‘আপা আমি মাকে বাধ্য হয়ে নিয়ে এসেছি। আমার বাবা এই শেষ বয়সেও মায়ের সাথে যে আচরণ করে তা সহ্য করা আমার সম্ভব হচ্ছিল না। ভাইকে বলেছি। কিন্তু ভাই এসবের মধ্যে থাকতে রাজি হয়নি। তারও কথা পুরুষ মানুষ এমনই হয়। মা একটু আধটু সহ্য করলেই তো হয়।’’

ফরিদা নাসরিনের মেয়ে আবার বলে, ‘‘ আমি একজনের বাকদত্তা। তার সাথে আমার দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক। আমার মন খারাপ হলে সে বোঝে এবং আমার সংসারের বিষয়গুলো সে জেনে গেছে। আমি না পেরেই তাকে বলেছি। শেষ যে ঘটনা ঘটেছে আমার বাবা মায়ের গায়ে হাত তুলেছে। কারনটা মা আড়াল করলেও আমি করবো না। বাবা এই বয়সেও চায় মা তার শরীর মেসেজ করে দিক। যা মায়ের কাছে আপত্তিকর, সেই সাথে অরুচিকরও। মা রাজী না হওয়ায় বাবা বাসার সহকর্মী মেয়েটিকে দিয়ে নির্বিঘ্নে এ কাজটি করায়। যা ২/১ দিন দেখবার পর মা প্রতিবাদ করায় মাকে বাবার হাতে মার খেতে হয়েছে।

আমার বিয়ে সামনে আপা। তারপরও আমি সন্তান হিসেবে আমার মায়ের অসম্মানিত জীবন দেখতে চাইনা। আমি চাই তাদের তালাক হয়ে যাক। তারা আলাদা বসবাস করুক। আমার মায়ের সব দায়িত্ব আমি নিতে চাই।’’

মেয়েটির চোখে জল।

সংসারের নিয়মানুযায়ী মধ্যস্থতার জন্য উভয় পক্ষকে নিয়ে নির্ধারিত দিনে বসা হলো আমার সংস্থায়। দাড়ি,  মাথায় টুপি পড়া ৭০ উর্ধ্ব  ভদ্রলোকটি ফরিদা নাসরিনের স্বামী। যে কিনা প্রতিনিয়ত স্ত্রীকে অসম্মান করেন। নূন্যতম সম্মান স্ত্রীকে দেবার প্রয়োজন বোধ করেনি কখনও। ফরিদার লিখিত অভিযোগগুলো আলোচনায় আসে। তবে ফরিদার স্বামী কোনভাবেই স্বীকার করছিলেন না যে তিনি এমন কাজ করেন। বলেন, স্বামী স্ত্রীর ঝগড়া অশান্তি সব সংসারেই আছে। বিষয়গুলিকে তিনি নিতান্ত মামুলি অভিযোগ বলে মনে করেন। তার বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল যে, স্ত্রীর কর্তব্য স্বামীর সেবা করা। সেটি যদি স্ত্রী সঠিকভাবে না করে সেক্ষেত্রে গাল মন্দ হতেই পারে।

‘‘আমি সংসার চাই এবং তাকে (ফরিদা নাসরিন) আমার মতোই চলতে হবে।’’ বলেন তার স্বামী।

তবে ফরিদা সেই মুহূর্তেই খুব দৃঢ় কন্ঠে বলেন, ‘‘আমি তোমার সাথে আর সংসার করবো না। আমার যে একটা আত্মসম্মান আছে তা আমি বুঝেছি এবং বাকিটা জীবন মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই।’’

ফরিদার স্বামী খুব যে স্ত্রীকে সংসারের জন্য অনুরোধ করলেন তা নয়। বরং দ্বিতীয় বিয়ের কিঞ্চিত আগ্রহ তার চোখে মুখে এবং বক্তব্যে প্রতীয়মান ছিল।

ফরিদা শুধু একটি অনুরোধই করলেন আমাকে। আমার মেয়ের বিয়ে খুব শীঘ্রই। তিনি তার স্বামীকে মেয়ের বিয়ের পরই তালাক দিতে চান এবং সংস্থার মাধ্যমে সকল আইনগত অধিকার বুঝে চান। মেয়ে মায়ের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানালো এবং উভয় পক্ষের সিদ্ধান্ততেই বিষয়টি চূড়ান্ত মীমাংসায় রূপ নিল।

বর্তমানে একটি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, পুরুষের তুলনায় নারীরা বিবাহ বিচ্ছেদের মত সিদ্ধান্ত গ্রহন করছে বেশি। যার কারনে সিটি কর্পোরেশনে নারী আবেদন প্রার্থীর সংখ্যাই বেশি।

মেয়েরা অনেক বেশি স্বাবলম্বী হচ্ছে বলেই তালাকের সংখ্যা যে বেড়ে যাচ্ছে তা নয়। মেয়েদের এই পরিবর্তন আসছে কারন আমাদের সমাজের মেয়েরা নির্যাতনের শিকার সবচাইতে বেশি। নির্যাতনের ধরন পারিবারিক জীবনে বিভিন্ন। শ্বশুর বাড়ির সদস্যদের দ্বারা নির্যাতন, বিবাহ বর্হিভূত সম্পর্ক, স্বাভাবিক যৌন সম্পর্কে সন্তুষ্ট না হওয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে বিবাহিত জীবনে যৌন নির্যাতন। সর্বোপরি আর্থিক নির্যাতন।

বেশ কিছু বছর আগেও বিয়েকে বাঁচিয়ে রাখার প্রবণতা নারীর মধ্যে ছিল। কোন আত্মনির্ভরশীলতা ছিল না নারীর। নির্যাতনের শিকার হলেও তালাকের প্রক্রিয়ায় যায়নি তারা। বর্তমানে নারীরা আত্মনির্ভরশীল এবং সন্তান পালনে সক্ষম। যদিও বিবাহিত মেয়েরা শতকরা ৯০ ভাগ নির্যাতনের শিকার সে অনুযায়ী তালাকের আবেদন পড়েছে খুবই নগণ্য। সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি খুব কম সংখ্যক নারী তালাকের মত কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে আসতো। ‘চেষ্টা করি না আপা, পরিবর্তন তো মানুষের হয়’ – কথাগুলো খুব বিশ্বাস করে আমাদের বাঙালী নারীরা এবং বলেও।

আমার অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশে সম্মানীয় অভিজাত পরিবারের মেয়েরাও অনেক নির্যাতনের পরও তালাক দিতে নারাজ। উচ্চশিক্ষিত, পিতার কিংবা নিজের অঢেল সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও মানসিকভাবে তালাককে ভয় পায় নারীটি। অনেকক্ষেত্রে তালাকের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চাইলেও তার পরিবার যেকোনভাবে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চায়। তারা মনে করেন, সম্পর্ক করতে গেলে কিছু ছাড় দিতেই হয়। কিন্তু অনুধাবন করেন না যে এই ছাড়টি যে দেয় তার জন্য কতটা অসহনীয়।

একটি দম্পতির মধ্যে তালাক হয়ে যাওয়ার বহুবিধ কারন রয়েছে। জানা অজানা নানা বিচিত্র কারনে তালাক হয়ে যায়।

ফরিদা নামের নারীটিকে তার স্বামী প্রতিনিয়ত অবদমিত করে রেখেছিল। ভাষাগত উৎপীড়ন (ক্রমাগত খারাপ ভাষায় গালিগালাজ) যাকে আমরা ভারবাল অ্যাবিউজ বলতে পারি, তা ছিল। এক্ষেত্রে মানসিক শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি পুরো সংসার জীবনে ভাষাগত নির্যাতন বজায় ছিল। কিন্তু পরিবারের মানসম্মান ও সামাজিক মর্যাদার সাথে সাথে বিচ্ছেদের প্রভাব সংসারের ওপর পড়ার আশঙ্কায় তালাকের পদক্ষেপ নেননি তিনি।

কিন্তু এই তার কন্যা মানসিকভাবে অনেক বেশি দৃঢ়। সে কোনভাবেই তার মায়ের ওপর এ নির্যাতনকে মেনে নেয়নি। বরং মাকে সাহস যুগিয়েছে, যা অতুলনীয়। মেয়েটির চোখে মুখে দেখেছি সাহসিকতা। সে তার মাকে একজন ‘মা’ হিসেবে নয়, নারী হিসেবে ভেবেছে। সে চায়নি নারীটি আরও নিগৃহীত ও অসম্মানিত হোক।

আমাদের সমাজে তালাক যে পক্ষ থেকেই হোক না কেন নারীকেই সবসময় দায়ী করা হয়। বলা হয় নিশ্চয়ই নারীটির মধ্যে সমস্যা আছে। তার স্বামী যদি হয় তালাকদাতা সেক্ষেত্রে তো রক্ষে নেই। এমনকি স্বামী স্ত্রীর স্বাভাবিক যে যৌন সম্পর্ক তা পূরণে যদি স্বামী ব্যর্থ হয় সেক্ষেত্রেও তাকে সব সহ্য করে সংসার টিকিয়ে রাখতে বাধ্য করা হয়। নারীর এই স্বাভাবিক জৈবিক চাওয়াটি আমাদের সমাজে গ্রহনীয় নয়। এই বিষয়টিকে মেনে নিয়েই নারীর সংসার করবার পরামর্শ তৈরি হয়।

অনেকক্ষেত্রেই যৌনশিক্ষার অভাবে নারী অনেক দেরিতে বিষয়টা অনুধাবন করে। তার চাহিদা তখন সে যদি প্রকাশ করে এবং তালাকের কথা ভাবে, তবে চারিদিক থেকে ছিছি রব ওঠে। এ বিষয়টি বিয়ের শুরুতে বা মধ্যবয়সেও হতে পারে। কিন্তু এই কারনে স্বামীকে তালাক দিতে চাইলে নারীকে নানাভাবে হেনস্থা করে সমাজ ও পরিবারের নিকটাত্মীয়রা। আমাদের সমাজে সবসময় পুরুষকে সক্ষম মনে করা হয়। তালাক দিলেও তার কোন অপরাধ হয়না। অপরাধী ওই নারীটি যাকে সে তালাক দিয়েছে।

পারিবারিক অশান্তির শেষ পরিসমাপ্তি অধিকাংশ ক্ষেত্রে তালাকই হয় এবং শিকার হয় সন্তানেরা। বাবা মায়ের এই বিচ্ছেদ তারা কোনভাবেই মেনে নিতে পারে না। তবে সমাজ এগিয়েছে। চিন্তা চেতনায় নারী এখন অগ্রগামী। তালাক গ্রহনের আগে উভয় পক্ষের উচিত সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার নূন্যতম সুযোগ আছে কিনা তা ভাবা। সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র আইনজীবীর দ্বারস্থ না হয়ে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের কাছে সহায়তা চাইতে পারেন। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক শুধুমাত্র নির্যাতন নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে এমন কিছু মানসিক বিষয় থাকে যা বিশেষজ্ঞের কাছে গেলে তারা সমাধান পেতে পারেন। আর শুরু করতে পারেন নতুন করে স্বাস্থ্যকর দাম্পত্য জীবন।

বিচ্ছেদ কাম্য নয়-  ভালো থাকবার পন্থাগুলো জেনে নিক উভয় পক্ষ। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন কাম্য হোক প্রতিটি দম্পতির। তবেই না কমবে তালাকের মতো নিন্দনীয় একটি পদক্ষেপ।

 

সারাবাংলা/ এসএস

Tags: , ,

[পর্ব -৩ ] নারী কেন তালাক দেয়?
[পর্ব -৩ ] নারী কেন তালাক দেয়?
[পর্ব -৩ ] নারী কেন তালাক দেয়?