শনিবার ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ৭ আশ্বিন, ১৪২৫, ১১ মুহররম, ১৪৪০

নিজ কানে শুনেছি, ‘এবারের সংগ্রাম… স্বাধীনতার সংগ্রাম’

মার্চ ৭, ২০১৮ | ১১:৩৯ পূর্বাহ্ণ

হাসান আজাদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: শাহজাহান মিয়া। বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের সাথে যার সম্পৃক্ততা। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালে তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র। থাকতেন ঐতিহাসিক ইকবাল হলে (বর্তমানের সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)। টগবগে এক তরুণ। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যান। বিক্রমপুরের লৌহজংয়ের বিভিন্ন এলাকায় সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন। দেশ স্বাধীন করেন। পরবর্তীতে দেশ গড়তে বেছে নেন গুরু দায়িত্ব- শিক্ষকতা। ২০১১ সালে সরকারি হরগঙ্গা কলেজের উপাধক্ষ্য পদ থেকে অবসর নেন। বর্তমানে তিনি বিক্রমপুর জাদুঘরের কিউরেটর হিসেবে কাজ করছেন। এছাড়া বাংলাদেশের ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখি করেন। কেমন ছিলো ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ দিনটি। সারাবাংলার কথা হয় শাহজাহান মিয়ার সাথে।

…১৯৭১ সালের ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ হবে। সারা পূর্ব পাকিস্তান তখন বঙ্গবন্ধুর ডাকে উত্তাল। ছাত্র জনতা সবাই বঙ্গবন্ধুর একটি সিদ্ধান্তের আশায়… অপেক্ষায়। চুড়ান্ত ঘোষণাটা ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু দেবেন সেটাই সবার জানা। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের ছাত্র। যে ইকবাল হলকে বলা হত, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূতিকাগার। কারণ তখন বঙ্গবন্ধুর চার ঘনিষ্ঠ ছাত্র নেতা আ স ম আব্দুর রব, শাহজাহান সিরাজ, নুরে আলম সিদ্দিকী ও আব্দুল কুদ্দুস মাখন থাকতেন এই ইকবাল হলে। এরা এই ইকবাল হলেরই ছাত্র ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই তখন এই ইকবাল হলের যারা আবাসিক ছাত্র ছিল তাদের মধ্যে উত্তেজনাটা একটু বেশি ছিলো।

বিশ্ববিদ্যালয় ও হলের পরিস্থিতি মার্চ মাস শুরু থেকেই ছিলো উত্তেজনাপূর্ণ। একের পর এক কর্মসুচি ছাত্ররা ঘোষণা করছে। তখনকার ছাত্র আন্দোলনের মুল নেতৃত্বই ইকবাল হলে ছিল। যেমন ২ মার্চ পতাকা উত্তোলন নিয়ে ইকবাল হলে যে উত্তেজনা ছিল, অন্যান্য হলে তুলনামুলকভাবে কম ছিল। ইউনিভার্সিটি তখন খোলা থাকলেও আমরা ক্লাশ করতাম না। আমাদের সকলের আগ্রহ ছিল আন্দোলন সংগ্রাম।

আমি ছাত্র ইউনিয়নের সমর্থক ছিলাম। আমার রুমমেট ছিলেন নূহ আলম লেনিন সাহেব। তিনিও তখন ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। আমরা কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রশ্নে সকলেই একাট্টা হয়ে গেলাম। সকলের ভেতর তখন একটাই বিষয়, আমাদের সামনে আর কোনও পথ নেই। ওই সময় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় তখন আন্দোলন সংগ্রাম ও মিছিলের ক্ষেত্র ছিল। যখন তখন আমাদের নেতৃবৃন্দ ডাক দিতেন আমরা মিছিলে যেতাম। সেখানে ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা ডাক দিল কি ছাত্রলীগের নেতারা ডাক দিল সেটা বড় কথা না। এই একটি প্রশ্নে আমরা যখন তখন বের হয়ে যেতাম। কি উত্তেজনাপূর্ণ ছিল, সেই শক্তি ও প্রেরণা কোথায় থেকে যে আসতো তা ভাবলেই এখন অবাক হই।

এর মধ্যে ২ মার্চ আ.স.ম আব্দুর রব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। তখন থেকেই পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ছিল উত্তেজনাময় ও বিদ্রোহে উন্মুখ। আমাদের ইকবাল হল ছিল একেবারেই উত্তেজনাপূর্ণ। সকলের মধ্যেই যেন চরম উত্তেজনা। বঙ্গবন্ধু একটা ঘোষণা দিবেন, আমরা যেন দেশের সংগ্রামের জন্য লড়াইয়ের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারি। আমরা আগেরদিন রাত্রে হলে ঘুমাতে পারিনি, এত বেশি উত্তজনা ছিল। সকলের ভেতরেই একটা আগ্রহ যে, বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চে একটা সিদ্ধান্ত দেবেন। এবং আমরা আশা করছিলাম বঙ্গবন্ধু আর কোন আপোষের কথা বলবেন না। ওদের (পশ্চিম পাকিস্তান) সাথে আর কোন সহযোগিতা নয়, এবার আমাদের স্বাধিকার অর্জন করতে হলে, আমাদের সংগ্রামের মধ্যে যেতে হবে। এটা কিস্তু আমরা মনে মনে চাইছিলাম।

তার মধ্যে যখন জানা গেলো বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেবেন, সেই ভাষণ শোনার জন্য আমাদের মাঝে চরম উত্তেজনা। ভাবনা এই যে, আমরা যেন খুব কাছ থেকে আমাদের প্রিয় নেতাকে দেখতে পারি। তাঁর নির্দেশনা নিজ কানে শুনতে পারি। আগের সারারাত জেগে ছিলাম সেই উত্তেজনায়। সকাল ১০টার মধ্যে চলে গেলাম রেসকোর্স ময়দানে। তখন রেসকোর্সের ময়দান আজকের মত ছিল না। ফাঁকা ছিল। ঘোড়দৌড়ের মাঠ ছিল। ওপেন স্পেস ছিল।

আমরা তিন বন্ধু- আমি মনির হোসেন, শৈলেন কুমার দাশ, সেও পরে সরকারি কলেজেন অধ্যাপক ছিল, একসঙ্গে চলে গেলাম রেসকোর্স ময়দানে। মঞ্চের সামনের দিকে নারীদের বসার জন্য অনেকখানি জায়গা বাঁশের বেড়া দিয়ে আলাদা করে দেয়া হয়েছিল। তারপরে পুরুষদের জন্য। আমরা মহিলাদের বসার জায়গার পরপরেই একেবারে লাগোয়া স্থানে নিজেদের জায়গা করে নিলাম। তখন বেলা ১১টা। এরপর শুধু অপেক্ষা আর অপেক্ষা। অধীর আগ্রহে বসে অপেক্ষা করছি। কখন আসবেন বঙ্গবন্ধু। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। মাথার ওপর রোদ চড়া। তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই। আমাদের মধ্যে তখন একটাই উন্মাদনা কাজ করছে। বঙ্গবন্ধু আসবেন। তাকে কাছাকাছি থেকে দেখবো, ভাষণ কাছাকাছি থেকে শুনবো। এই একটা অনুভূতি আমাদের মধ্যে কাজ করেছিল। রেসকোর্স ময়দান জুড়ে অনবরত মিছিল, ছাত্ররা আসছে ময়দানে। কৃষক, মজুর সবাই আসছে। তখন পুরো ঢাকা শহরের একমাত্র গন্তব্য ছিল রেসকোর্স ময়দান। দুপুর নাগাদ কানায় কানায় ভরে গেল রেসকোর্স ময়দান। আমরা যেখানে বসছিলাম, পেছনে তাকিয়ে দেখি রমনার কালী মন্দির পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য। এত জনসমাগম আর কখনো দেখিনি।

বিকেল তিন টার পরপরই বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে এলেন। আর ভাষণটা দিলেন, সে ভাষণে তিনি আমাদের প্রাণের দাবিটা স্বগৌরবে উচ্চারণ করলেন, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।

ওইদিন জনগণ একটা লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়েই আমরা রেসকোর্স ময়দানে গিয়েছিলাম। সকলের হাতে বাঁশের লাঠি। লক্ষ লক্ষ বাঁশের লাঠি। হাত উঁচিয়ে, যখন লাঠিগুলো উঁচু করে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সাথে সাথে তারা শ্লোগান দিচ্ছে , সে এক অভূতপুর্ব দৃশ্য।
জনগণ সত্যিই প্রস্তুত ছিল। আমাদের নেতা ঘোষণা দেবেন। আর আমাদের কোন কাজ নেই। আমরা এখন ওদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে নেমে পড়বো। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রশ্নে, পুর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানের সঙ্গে থাকবে না নতুন দেশ হবে; এই প্রশ্নে কিন্তু সকল ছাত্র সংগঠনগুলো এক হয়ে গিয়েছিল।

সমস্ত জন সমাবেশটাই আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলাম। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের আগে আমাদের ছাত্র নেতারাও যে ভাষণগুলো দিচ্ছিলেন, তাতে একটা ক্ষেত্রই প্রস্তুত ছিল যেন স্বাধীনতা ঘোষণা ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। আমাদের নেতা যেন আপোষহীন দ্ব্যর্থহীন একটি ঘোষণা দিয়ে যান, তোমাদের সাথে আর আপোষ করা যাবে না। এখন আমাদের স্বাধীকার অর্জনের লড়াই শুরু করতে হবে।

এখন আমার স্মৃতিতে যেটা মনে পড়ে রেসকোর্স ময়দানের পূর্ব উত্তর কোনায় (বর্তমানে ঢাকা ক্লাবের স্থান) বড় বড় সেগুন গাছগুলো ছিল, প্রত্যেকটা গাছের উপরে, গাছের ডালে ডালে মানুষ বসে বসে দুর থেকেও বঙ্গবন্ধু ভাষণ শোনার জন্য অপেক্ষা করছিলো। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শেষ হইয়াও হইলো না শেষ। ভাষণ দিয়ে উনি নেমে গেলেন। আমরা স্তম্বিত হয়ে গেলাম। বঙ্গবন্ধু কি মহাবাণী উচ্চারণ করে গেলেন আমাদের জন্য। কি যে তেজদীপ্ত বাণী উনি আমাদের জন্য রেখে গেলেন। পরক্ষণেই আমরা আমাদের করণীয় ঠিক করে ফেললাম।

তবে তখনও আমরা স্তম্বিত হয়ে চুপ হয়ে আছি। জনগণ যখন মিছিল নিয়ে বের হতে লাগলো, বঙ্গবন্ধুর এই মহাবাণীকে হ্নদয়ে ধারণ করে , তখন আমি ভাবলাম এখন আর ঘরে বসার সময় নেই। এখন আর আমাদের শ্রেণিকক্ষে যাওয়ার সময় নেই। আমাদের নেতাদের মহাবাণীকে কার্যকর করতে হবে। আমাদের সামনে লড়াই ছাড়া আর কোন পথ খোলা নেই।

আমাদের তখন তরুণ বয়স। আমাদের আবেগের মধ্যে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিয়ে এমন আগুন জ্বালিয়ে দিলেন, আমি তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। বঙ্গবন্ধুর এই ডাকে সাড়া দেব।

তিনি বলছেন, তোমরা গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে যাও, স্বাধীনতার পক্ষে কাছ করো। আমরা তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম গ্রামে চলে যেতে হবে। গ্রামে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের জন্য কাজ শুরু করতে হবে।

ইকবাল হলের ১১৬ নম্বর রুমে ছিলাম আমরা। যে রুমে নূহ আলম লেনিন আমার রুমমেট হয়েছিলেন। আর আমাদের এক রুম পড়েই ১১৮ নম্বর রুমে থাকতের আ.স.ম. আব্দুর রব, শাহজাহান সিরাজ। ফলে অতি কাছ থেকে এই ছাত্রনেতাদের আমরা দেখেছি।

আমরা কিন্তু সাধারণ ছাত্র। আর তারা তখন শক্তিশালী ও জনপ্রিয় ছাত্রনেতা। তারাই স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে শুরু করলেন। ওই দিনগুলোতে তাদের খুব বেশি রুমে দেখতাম না। মাঝে মাঝে রুমে দেখা যেত। কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম নিতে রুমে আসতেন। বেশির ভাগ সময় তারা বাইরে থাকতেন। তারা সিনিয়র ছিলেন, তাদের আমরা অত্যন্ত সমীহ করতাম। কিন্তু তারা বিশ^বিদ্যালয়ের বটতলায় যে ভাষণ দিতেন তা অত্যন্ত জ্বালাময়ী হতো। যেদিন প্রথম পতাকা উত্তোলন করা হল সে কি এক উত্তেজনা!

৭ মার্চের পরের দিনগুলো এগুচ্ছিলো। আমার রুমমেট নূহ আলম লেনিন আগেই বুঝতে পেরেছিলেন ২৫ মার্চ কিছু একটা হবে। একটা আঘাত আসছে। উনি বললেন তোমরা আর হলে থেকো না, হল ছেড়ে গ্রামে চলে যাও। ২৩ মার্চ আমি হল ত্যাগ করি।

২৫ মার্চ ইকবাল হলেই প্রথম আঘাত আসে। আমার খুব মনে পড়ে, আমার হলে যে আমাকে ইকবাল হলে ভর্তি হওয়ার ব্যাপারে সহযোগিতা করেছিলেন একজন ছাত্রলীগের নেতা। তিনি শাহ হেলালুর রহমান চিশতী। তিনি ওই হলে ছিলেন এবং ২৫ মার্চ রাত্রে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

চিশতী ভাইয়ের স্মৃতিটা আমার মনে উজ্জ্বল হয়ে আছে। আমি তখন গ্রাম থেকে উঠে আসা একজন সাধারণ ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। ইকবাল হলের দিকে হাটঁছি। উনি আমাকে বললেন, আসুনতো। আপনি কি ইকবাল হলে সিট নিতে চান। আমি বললাম, হ্যাঁ আমিতো এ্যাটাচড হয়েছি ইকবাল হলে। উনি প্রভোস্টের কাছে নিয়ে গেলেন এবং বললেন, স্যার আমাদের নতুন ছাত্র এসছে। তাকে একটা সিট দিয়ে দেন। প্রভোস্ট আমাকে ১১৬ নম্বর রুমে সিট দিয়ে দিলেন। সিট হয়ে গেল। এই যে আমি ১৯৬৯ সালে ১১৬ নম্বর সিট পেলাম, পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনটা ওই রুমেই কাটিয়ে দিলাম।
১৯৭৪ সালে আমি এই রুম থেকেই আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হই।

তবে ১৯৭১ এর ২৩ মার্চ হল ছেড়ে চলে যাই যুদ্ধের প্রস্তুতিতে। বিক্রমপুরের লৌহজংয়ের বিভিন্ন এলাকায় সম্মুখ যুদ্ধ করেছি বেশ কয়েকবার। সে অন্য ইতিহাস। দীর্ঘ নয় মাসের ইতিহাস। পুরো যুদ্ধকালে একটা কথাই শুধু কানে বাজতো, এবারের সংগ্রাম… স্বাধীনতার সংগ্রাম।

সারাবাংলা/এমএম

নিজ কানে শুনেছি, ‘এবারের সংগ্রাম… স্বাধীনতার সংগ্রাম’
নিজ কানে শুনেছি, ‘এবারের সংগ্রাম… স্বাধীনতার সংগ্রাম’