মঙ্গলবার ১৩ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং , ২৯শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী

নিয়মের গ্যাঁড়াকলে থমকে যাবে মা-ছেলের লড়াই!

নভেম্বর ৬, ২০১৮ | ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ

।। কবির কানন, ঢাবি করেসপন্ডেন্ট ।।

মায়ের কোলে চড়ে গত ২১ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কলা অনুষদের অন্তর্ভুক্ত ‘খ’ ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসেছিলেন নেত্রকোনার হৃদয় সরকার। সেই ভর্তি পরীক্ষায় পাসও করেছেন, মেধাক্রম পেয়েছেন ৩৭৪০। মেধাক্রমে তার পরে স্থান পাওয়া আরও অনেক প্রতিবন্ধী ঢাবি ‘খ’ ইউনিটের অধীনে ভর্তির সুযোগ পেলেও হৃদয় ভাঙছে হৃদয়ের। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী দৃষ্টি, শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধীদের জন্য কোটা থাকলেও ‘সেরিব্রালপালসি’তে আক্রান্ত হৃদয়ের জন্য নেই কোনো কোটা। ফলে শৈশব থেকেই পড়ালেখার জন্য সংগ্রাম করে আসা হৃদয় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করেও পারছেন না ভর্তি হতে।

সোমবার (৫ নভেম্বর) দুপুর ২টায় কলা অনুষদে ‘খ’ ইউনিটে উত্তীর্ণ ওয়ার্ড, খেলোয়াড় ও প্রতিবন্ধী কোটাধারীদের মনোনয়ন সংগ্রহের জন্য ডাকা হয়। অনুষদের ওয়েবসাইটে দেখা যায়, ৯ জন দৃষ্টি প্রতিবন্ধীকে ডাকা হয়েছে মনোনয়ন সংগ্রহের জন্য। এর মধ্যে ৪৫৮৪ মেধাক্রমেও রয়েছেন একজন। কিন্তু ৩৭৪০ মেধাক্রমে থেকেও হৃদয় সরকার মনোনয়ন সংগ্রহের ডাক পাননি। কর্তৃপক্ষ বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধুমাত্র দৃষ্টি, শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধীদের কোটা প্রযোজ্য। ফলে হৃদয়ের জন্য বন্ধ হয়েছে ঢাবির দরজা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় মেধাক্রমে স্থান পাওয়া হৃদয় সরকার হাঁটতে পারেন না ছোটবেলা থেকেই। তার হাতের সব আঙুলও কাজ করে না। সমাজ সেবা অধিদফতর হৃদয় সরকারকে ‘সেরিব্রালপালসি’ প্রতিবন্ধী উল্লেখ করে একটি আইডি কার্ড দিয়েছে। যার নম্বর ২০০০৭২২৭৪০৯০০১৭৪৮-১০।

মা সীমা সরকারের কোলে চড়ে স্কুল-কলেজে যেতেন হৃদয় সরকার। এইভাবেই তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন যথাক্রমে ৪.০৬ ও ৪.৫০ জিপিএ নিয়ে। গত ২১ সেপ্টেম্বর ঢাবি ‘খ’ ইউনিটে পরীক্ষা দিতেও আসেন তিনি মায়ের কোলে চড়েই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর তোলা সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে পরিচিতি পায় হৃদয়। উচ্চ শিক্ষার জন্য তার এমন নিরলস সংগ্রামকে এককথায় স্যালুট জানিয়েছেন সবাই। সেই হৃদয় ‘খ’ ইউনিটের পরীক্ষায় পাস করলে তার পরিবারে খুশির বন্যা বয়। কিন্তু ঢাবি’র নিয়মের চক্করে ‘প্রতিবন্ধী’ হয়েও প্রতিবন্ধী কোটা থেকে বাদ পড়েছেন হৃদয়।

স্বাভাবিকভাবেই এ ঘটনায় হতাশ হৃদয় ও তার পরিবার। হৃদয় সারাবাংলাকে বলেন, আমার কোটার কাগজপত্র আছে। কিন্তু ঢাবিতে নাকি আমার কোটা নাই! এটা কোন নিয়মের মধ্যে পড়ল, আমি বুঝলাম না। অনেক সংগ্রাম করে আমি আজ এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি। সরকারও তো আমাকে প্রতিবন্ধী হিসেবে পরিচয়পত্র দিয়েছে। কিন্তু ঢাবিতে এসে আমি প্রতিবন্ধীর স্বীকৃতিই পেলাম না!

হৃদয় সরকারের মা সীমা সরকার সারাবাংলাকে বলেন, প্রতিটি দিন কোলে করে ছেলেকে স্কুল-কলেজে নিয়ে গেছি। ওর বাবার (সমীরণ সরকার) মনে আশা ছিল, ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। ছেলে তো আমার পাসও করল পরীক্ষায়। কিন্তু ভর্তি তো হতে পারছে না। হৃদয় আর ও বাবা— দু’জনেরই মন খুব খারাপ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাবি কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শর্তের মধ্যে বাক, শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর জন্য কোট বরাদ্দ আছে। হৃদয় সেই শর্তের মধ্যে পড়ে না। যদি এ ধরনের প্রতিবন্ধীর জন্য কোটা চালু হয়, তখন তারা নিশ্চয় ভর্তি হতে পারবে।

সমাজসেবা অধিদফতর প্রতিবন্ধী হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও কেন ঢাবি ভর্তি পরীক্ষায় হৃদয় বা তার মতো প্রতিবন্ধীদের জন্য কোটা প্রযোজ্য হবে না— জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান কোনো উত্তর দেননি। তিনি বলেন, ডিনরা এর ব্যাখা দিতে পারবেন।

সারাবাংলা/কেকে/টিআর

Tags: , , ,

নিয়মের গ্যাঁড়াকলে থমকে যাবে মা-ছেলের লড়াই!
নিয়মের গ্যাঁড়াকলে থমকে যাবে মা-ছেলের লড়াই!
নিয়মের গ্যাঁড়াকলে থমকে যাবে মা-ছেলের লড়াই!