বৃহস্পতিবার ১৩ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং , ২৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা রবিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী

নিয়ম না মেনে পশুখাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক, মহা ঝুঁকিতে মানুষ

ডিসেম্বর ৪, ২০১৮ | ৮:৪০ পূর্বাহ্ণ

।। জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট ।।

ঢাকা: পশুখাদ্য আইন অনুযায়ী, কোনো প্রাণীকে মোটাতাজা করার কাজে ব্যবহৃত পশুখাদ্য ও পোলট্রি ফিডে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেবল প্রাণীর চিকিৎসার কাজেই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে। অথচ নিয়ম না মেনে হাঁস-মুরগি, মাছ ও গরু-ছাগলের খাবারে যথেচ্ছভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে মানুষের ওষুধ হিসেবে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবায়োটিক। এতে সেই অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাকটেরিয়া জন্ম নিচ্ছে সেই প্রাণীর শরীরে, তা ডিম-দুধ-মাংসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে মানুষের শরীরেও।

মাছ-মাংস-মুরগি-গরু বা অন্য প্রাণীর মাধ্যমে মানবদেহে ছড়িয়ে পড়া অ্যান্টিবায়োটিকের বিপদজনক প্রভাব পড়ছে ক্যান্সার, হৃদরোগ, আলসারসহ কিডনি ও লিভারের বিভিন্ন অসুস্থতায়। পশুখাদ্যে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক তাই শেষ পর্যন্ত গিয়ে মানবদেহের অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ক্ষমতা গড়ে ওঠার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর বলছে, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ এক কোটি মানুষের মৃত্যু হবে। আর এ কারণে বর্তমানে প্রতিবছর মারা যাচ্ছে সাত লাখ মানুষ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যান্টিবায়োটিক হচ্ছে এমন একটি ওষুধ যা দ্বারা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণজনিত রোগের চিকিৎসা করা হয়। সেই ওষুধ যখন আর শরীরে কাজ করে না, তখনই সেই অ্যান্টিবায়োটিক ওই ব্যাকটেরিয়াটির বিরুদ্ধে অকার্যকর হয়ে যায়। ফলে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণজনিত রোগের চিকিৎসা করা কঠিন হয়ে পড়ে। আর এমন চলতে থাকলে খুব সাধারণ ইনফেকশন বা সংক্রমণের চিকিৎসাও জটিল হয়ে পড়বে। সেই অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই জনস্বাস্থ্যের জন্য বর্তমানে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।


চিকিৎসকরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিকের কারণে বাংলাদেশের মানুষ ‘সুপার-বাগ’-এর হুমকির মুখে পড়বে। আর স্বাস্থ্য অধিদফতফরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা, ওষুধ প্রশাসন, আইসিডিডিআরবি, গ্লোবাল অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স, দ্য সেন্টার ফর ডিজিজ ডিনামিক্স ও ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিসির এক যৌথ প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে এই ব্যাকটেরিয়ার (সুপার-বাগ) সংক্রমণ ঠেকাতে অধিকাংশ ওষুধই ব্যর্থ হচ্ছ। দেশে ডায়রিয়াজনিত অসুখ, যক্ষ্মা, টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, গনেরিয়া-সিফিলিসের চিকিৎসায় বেশ কয়েকটি অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে মানবদেহে এই প্রতিরোধী ব্যবস্থা গড়ে ওঠার জন্য বিভিন্ন রোগে যথেচ্ছভাবে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন ছাড়াও পশুখাদ্য ও পোল্ট্রি ফিডে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারকে অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, পোলট্রি ও গবাদিপশুর উৎপাদন ও মোটাতাজাকরণে ব্যবহৃত ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের কারণে দুধ, ডিম ও মাংস খাওয়ার মাধ্যমে ক্ষতিকর পদার্থ ঢুকছে মানুষের শরীরে। মুরগির খাদ্য হিসেবে অনেক খামারে ব্যবহার করা হয় হচ্ছে বিষাক্ত রাসায়নিকযুক্ত খাবার। এ ছাড়া মানুষের জন্য ক্ষতিকর নানা হরমোন বা অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ প্রয়োগ করা হয় মুরগির শরীরে, যা আগুনের তাপে নষ্ট না হওয়ায় ওই মাংসের মাধ্যমে তা ঢুকে পড়ে মানবদেহে।

বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা থেকে জানা যায়, ২৩ শতাংশ খামারের মুরগিতে ও বাজারের ৬৩ শতাংশ মুরগির শরীরেই পাওয়া গেছে সিপ্রোফ্লক্সাসিন নামের অ্যান্টিবায়োটিক। অন্যদিকে খামারের ৩০ শতাংশ ও বাজারের ৫৩ শতাংশ মুরগিতেই পাওয়া গেছে আরেক অ্যান্টিবায়োটিক সালফোনামাইড।

কেবল পশুখাদ্য বা পোল্ট্রি ফিড নয়, পশু-প্রাণীদের চিকিৎসাতেও নিয়ম না মেনেই ব্যবহার করা হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক। আইন অনুযায়ী, যদি কোনো কারণে কোনো প্রাণীর চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয়, তাহলে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানোর প্রায় চার সপ্তাহ পর তা বাজারজাত করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রাণী উৎপাদন গবেষণা বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধান ড. খান শহীদুল হক জানান, এ নিয়ম একেবারেই মানা হচ্ছে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক এ বি এম ফারুক সারাবাংলাকে বলেন, অ্যান্টিবায়োটিকযুক্ত খাবার খাওয়ানো হয়— এমন প্রাণীর দুধ, ডিম ও মাংস যখন মানুষ খাবে, তার শরীরেও এসব অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি হবে। তখন অ্যান্টিবায়োটিক আর মানুষের অসুস্থতার চিকিৎসায় কাজ করবে না। আর তাই পশু, হাঁস-মুরগি ও মাছ চাষের সময় রোগ প্রতিরোধে ও মোটাতাজা করতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। আর একান্তই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতেই হলে প্রাণীর জন্য তৈরি অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।


প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, মাছ, গবাদি পশু ও খামারের মুরগির খাবারের সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক মেশানো হচ্ছে। এটা পরে মানুষের শরীরে ঢুকছে। এর ফলে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স গড়ে উঠছে মানবদেহে। এরই মধ্যে অস্ত্রোপচারের ক্ষত শুকাতে ও রোগ সারতে অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়তে শুরু করেছে। এ পরিস্থিতি পুরো মানব জাতির জন্য এটা এক ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়াবে, সেদিন বেশি দূরে নেই।

অ্যানিমেল হেলথ বা পশু, হাঁস-মুরগির মাধ্যমে শতকরা ৭০ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিক আমাদের শরীরে ঢোকে বলে জানান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (বাংলাদেশ) অ্যাসেনসিয়াল ড্রাগ অ্যান্ড মেডিসিন বিভাগের ন্যাশনাল কনসালট্যান্ট মেহেদী হাসান। হাসপাতালভিত্তিক সংগৃহীত তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, অ্যান্টিবায়োটিকের ঝুঁকিতে বাংলাদেশে এখন কত মানুষ রয়েছে, সে তথ্য এখনও সেভাবে নেই। তবে ৯৫ শতাংশ মানুষের মধ্যেই কোনো না কোনো অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স রয়েছে।

এদিকে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক জরিপ থেকে জানা যায়, অ্যামপিসিলিনের ক্ষেত্রে ৪৪ শতাংশ, মেথিসিলিনের ক্ষেত্রে ৩২ শতাংশ ও অ্যাজিথ্রোমাইসিনের ক্ষেত্রে ১২ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স পাওয়া গেছে। আবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) এক জরিপ থেকে জানা যায়, যারা এখানে চিকিৎসা নিতে এসেছেন তাদের ৯৩ শতাংশের শরীরই অ্যাজিথ্রোমাইসিনের ক্ষেত্রে প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে।

মেহেদী হাসান বলেন, অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে মানবশীরের এভাবে প্রতিরোধী হয়ে ওঠার পেছনে গবাদি পশু বা হাস-মুরগির খাবারে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স প্রাকৃতিকভাবেই ছড়িয়ে পড়ছে প্রাণি থেকে পরিবেশে, পরিবেশ থেকে মানুষে, আবার মানুষ থেকে প্রকৃতিতে। এই চক্রে পড়ে দিন দিন আরও বেশি অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে।

সারাবাংলা/জেএ

নিয়ম না মেনে পশুখাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক, মহা ঝুঁকিতে মানুষ
নিয়ম না মেনে পশুখাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক, মহা ঝুঁকিতে মানুষ
নিয়ম না মেনে পশুখাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক, মহা ঝুঁকিতে মানুষ