মঙ্গলবার ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ৮ ফাল্গুন, ১৪২৪, ২ জমাদিউস-সানি, ১৪৩৯

‘নয় মাসে অনুভব করেছি, দেশ কাকে বলে’

ডিসেম্বর ১০, ২০১৭ | ৬:২৫ অপরাহ্ণ

জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

‘নয়টি মাস পরে যখন ফিরে আসছিলাম যুদ্ধে যাওয়ার সেই পথ ধরে তখন প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিটি সৈনিক বুঝতে পারছিলাম— এই দিনটিও যদি আমাদের শেষ দিন হয় তবুও সেটিই আমাদের আনন্দের দিন! কারণ নয় মাসে আমরা অনুভব করেছি, দেশ কাকে বলে, দেশের ভালোবাসা কাকে বলে, দেশ বলতে কী বোঝায়, মাটির কী দাম!’ —চোখের কোণে কিছুটা পানি নিয়ে কথাগুলো বলেন মেজর জেনারেল (অব.) হেলাল মোর্শেদ খান বীর বিক্রম।

তিনি বলেন, ‘জয়দেবপুর থেকে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলাম। সেই জয়দেবপুর থেকে ময়মনসিংহ-আশুগঞ্জ-ব্রাহ্মণবাড়িয়া-আখাউড়া হয়ে চলে গিয়েছিলাম ভারতে। সেই পথ ধরেই জঙ্গলে থেকে ১৫টি ছোট-বড় আক্রমণ করে বেঁচেছিলাম এবং সেই রাস্তা ধরেই মিত্র বাহিনীর সঙ্গে ঢাকার ডেমরাতে ফিরে আসি ১৩ ডিসেম্বর— যেখান থেকে ঢাকা আক্রমণ করতে চেয়েছিলাম।’

বিজয়ের ৪৬তম বর্ষের আগে মিরপুর ডিওএইচএস-এ নিজ বাসভবনে মুক্তিযুদ্ধে যাবার আগে বাঙালি সেনা অফিসারদের প্রতি পাকিস্তানি সেনবাহিনীর বৈরি মনোভাব, যুদ্ধে যাবার অভিজ্ঞতা এবং যুদ্ধ শেষে বীর বাঙালি হয়ে ফিরে আসার কথা জানান জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন মেজর জেনারেল (অব.) হেলাল মোর্শেদ খান, বীর বিক্রম। তিনি বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সেন্ট্রাল কমান্ড কাউন্সিলের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান। সাহসীযোদ্ধা হেলাল মোর্শেদ খান সারাবাংলাকে জানালেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের কথা, মুক্তিযুদ্ধের কথা এবং যুদ্ধপরবর্তী আরেকটি যুদ্ধের কথা।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রারম্ভে হেলাল মোর্শেদ খান ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লেফট্যানেন্ট র‌্যাংকের একজন তরুণ কর্মকর্তা। ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালি অধ্যুষিত ব্যাটালিয়ন দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন। আর এই ব্যাটালিয়নটি ছিল জয়দেবপুরে। দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ছিল তৎকালীন পাকিস্তানের ঢাকার ৫৭ পদাতিক ব্রিগেডের অংশ— বাকি দুই রেজিমেন্ট ছিল ১৮ পাঞ্জাব ও ৩২ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট। হেলাল মোর্শেদ জানান, ‘পরে ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চ লাইটে এই ১৮ পাঞ্জাব ও ৩২ পাঞ্জাব রেজিমেন্টই ঢাকার বুকে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল।’

মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে হেলাল মোর্শেদ ফিরে যান ৭০-এর নির্বাচনে। তিনি  জানালেন সেই নির্বাচনে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে বৃহত্তর ময়মনসিংহে নির্বাচনী নিরাপত্তার দায়ত্ব পালনের অভিজ্ঞতার কথা— ‘আর সেখান থেকেই আমি বুঝতে পারি, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে। বাঙালি জাতির অভিব্যক্তি তারা ভোটের মাধ্যমে প্রকাশ করছে।’

‘বঙ্গবন্ধুর ডাকে মানুষ কীভাবে সাড়া দিয়েছে সেই নির্বাচন ছিল তার প্রমাণ। বাঙালি জাতি তাদের নিজস্ব জাতীয়তাবাদকে, নিজস্ব স্বকীয়তাকে তৎকালীন নির্যাতন ও নিপীড়নের মুখে থেকেও কীভাবে সুদৃঢ় করার জন্য চেষ্টা করছে—সেনাবাহিনীর একজন তরুণ কর্মকর্তা হিসেবে আমি তা থেকে নিজেকে অনুপ্রাণিত করলাম। বুঝতে পারলাম, বাঙালি জাতির উত্থানের সময় এসেছে। আমরা বাঙালি জাতি নিজেদের অবস্থান করে নিতে পারব— এই অনুভুতি তখন আমাকে পেয়ে বসেছে।’

‘নির্বাচন শেষ হলো, আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয় লাভ করল। বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হবেন বলে জানানো হলো এবং বাঙালি জাতি সেটি উল্লসিতভাবে গ্রহণ করল। বাঙালি একজন তরুণ অফিসার হিসেবে বুঝতে পারছিলাম, পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যেসব জ্যেষ্ঠ বাঙালি কর্মকর্তারা রয়েছেন তাদের মধ্যে এক ধরনের অনুভুতি সৃষ্টি হয়েছে, তারা যে পদে পদে বঞ্চিত হয়েছেন সেটি থেকে তারা বেরুতে পারবেন— তখন এ অনুভুতিটি স্বভাবতই হবার কথা এবং এটি ন্যায্য ছিল। কিন্তু এর বিরুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যে চক্রান্ত সেটিও বুঝতে পারছিলাম। এবং বাঙালি হিসেবে মেইনস্ট্রিমের বাইরে রাখার চেষ্টা হচ্ছিল সেটিও বুঝেছিলাম। এক ধরনের টানাপোড়েন সর্ম্পক ছিল যদিও সেটি শৃঙ্খলার আবরণে ঢাকা ছিল বিষয়টি, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সর্ম্পকে যে চিড় ধরছে, সেটি বোঝা যাচ্ছিল মার্চের শেষ দিকে এসে।’

মার্চের ঐ সময়টায় তিনি তখন বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটাতে একটি ট্রেনিং এ ছিলেন। তার সঙ্গে আরও ছিলেন ৩২ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের আরেক বাঙালি কর্মকর্তা লেফটেনেন্ট বায়েজেদুল ইসলাম। ১৭ মার্চ ট্রেনিং শেষ করে তারা দুজন পরিকল্পনা করেছেন আরও ১০ দিন ছুটি কাটাবেন করাচিতে। কিন্তু  হলো না। হেলাল মোর্শেদ বলেন, ‘আমরা যখন কোয়েটাতে কোর্স করছিলাম তখন ১ মার্চ জাতীয় সংসদ অধিবেশনের স্থগিতাদেশ শোনানো হলো ট্রেনিং সাময়িক বন্ধ করে এবং বলা হলো সব দোষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। আর এ থেকে সেখানেই বুঝতে পারলাম, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এই চক্রান্তের সঙ্গে আমাদের আর থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু সেটি ওই মুহূর্তে প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না, কিন্তু তখনো বুঝতে পারিনি ২৫ মার্চ কী ঘটতে যাচ্ছি, যদিও জানতাম এটি হবে যেকোনো সময়।‘

হেলাল মোর্শেদ বলেন,  ‘১৯ মার্চ জয়দেবপুরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঢাকা ৫৭ ব্রিগেড সিদ্ধান্ত নিয়েছিল দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করা হবে কার ২৫ মার্চ তারা ঢাকা আক্রমণ করবে। তাদের ভয় ছিল দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টকে সশস্ত্র অবস্থায় রাখে, তাহলে ২৫ মার্চের গণহত্যাকে তারা প্রতিহত করতে পারে। সেদিন ঢাকা ব্রিগেড কমান্ডার জাহানজেব হাজির হন এক কোম্পানি সেনাবাহিনী নিয়ে।  সেখানে বাঙালি সেনাদের সঙ্গে তাদের গোলাগুলির সৃষ্টি হয়। কিন্তু এই ঘটনাটি পাকিস্তান রেডিওতে গোপন করা হলো, আমি শুনলাম বিবিসি থেকে। বিবিসিতে শোনার পর আমি এবং বায়েজেদুল ইসলাম সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরা এখানে আর থাকব না, সময় এসে গেছে বাংলাদেশে যাবার কারণ যেকোনো সময়ে সংর্ঘষ হতে পারে।  তখন আমাদের থাকতে হবে আমাদের রেজিমেন্টের সঙ্গে। আমরা নির্বাচনে জিতেছি, তারা আমাদের ক্ষমতা হস্তান্ত করছে না বরং তারা আমাদের সঙ্গে অসহযোগিতা করছে। এই তাড়না থেকে বায়েজেদুল ইসলামকে নিয়ে আমি ছুটলাম করাচি পিআইএ অফিসে। কিন্তু জানানো হলো, ২৭ মার্চের আগে কোনো টিকিট নেই। ’

‘এ সময় বায়েজেদুল জানান, এই ট্রানজিট ক্যাম্পের ইনচার্জ কর্নেল আজহার তিনি বাঙালি এবং তিনি আমাদের সাহায্য করতে পারেন। তার বাসায় গিয়ে দেখতে পাই, তিনি সিভিল পোশাকে জিপে উঠে রাওয়ালপিন্ডি যাচ্ছেন কারণ সেদিন তার শেষ কর্মদিবস। একজন বাঙালিকে ট্রানজিটের মতো একটি স্পর্শকাতর স্থানে তাঁকে ওরা রাখতে চাচ্ছিল না। দেশে ফিরতে চাই এবং টিকেট চাই অথচ টিকিট পাচ্ছি না, তাই ব্যবস্থা করতে হবে— জানালে তিনি কয়েক জায়গায় ফোন করে বিশেষ ব্যবস্থা করলেন। ২২ মার্চের পিআইএ-এর শেষ ফ্লাইটে দেশে এলেন তারা। জানালেন, একই ফ্লাইটেই জুলফিকার আলী ভুট্টো দেশে আসেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শেষ আলোচনা জন্য।’

হেলাল মোর্শেদ  বলে চললেন, “২২ মার্চ ঢাকা শহরটি অবরুদ্ধ ছিল। ২৩ মার্চ সকালে বাসা থেকে বের হলাম। দেখলাম, বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে ধানমণ্ডি ৩২ নাম্বারে হাজার হাজার মানুষ, তারা জয় বাংলা বলে স্লোগান দিচ্ছে। দেখি জেনারেল ওসমানী ‘প্রাক্তন সৈনিক সংস্থা’ ব্যানার নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দিকে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে গিয়ে দেখি, তিনি বাংলাদেশের পতাকা ওড়াচ্ছেন— তখনকার পাকিস্তানের মাটিতে উড়ছে বাংলাদেশের পতাকা— আর হাজার হাজার মানুষ বলছে ‘জয় বংলা’। আমি নিশ্চিত হলাম, আর পাকিস্তান নয়, আমাকে যুদ্ধে যেতেই হবে।”

‘সেদিনই আমি বেলা তিনটার দিকে ঢাকা ক্যান্টেনমেন্টে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখা হলো পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বন্ধুদের সঙ্গে। তারা আমাকে দেখে অনেকটাই অপ্রস্তুত কার তারা ২৫ মার্চের পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত, তারা রেডি হচ্ছে তার জন্য। জয়দেবপুরে তখন ক্যাপ্টেন পরবর্তীকালে মেজর জেনারেল আজিজুর রহমান যিনি বীর উত্তম তাকে জানাই, আমি চলে এসেছি এবং গাড়ি পাঠানোর জন্য।’

‘জয়দেবপুর গিয়ে দেখলাম, ১৯ মার্চের ঘটনার জন্য সেদিন থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে আমার প্রিয় দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্ট সর্ম্পক ছিন্ন করেছে, তারা ইতোমধ্যেই বিদ্রোহ করে ফেলেছে, শুধু আঘাত কে কাকে কখন হানবে— এর জন্য অপেক্ষা। আমরা আঘাত করতে পারছি না, কার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তখনো আলোচনা চলছে। আমরা যদি আঘাত করি, তাহলে এটি হয়ে যেত বিদ্রোহ এবং বঙ্গবন্ধুর সেই ধীরে ধীরে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা সেটি ব্যাহত হতো।’

হেলাল মোর্শেদ সেই রক্ত-ঝরা স্মৃতির কথা বলে চললেন, ‘২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চ লাইট শুরু হয়ে গেলে আমরা বুঝলাম, আর এখানে থাকার সময় নেই। আমাদের কৌশলগতভাবে অবস্থান নিতে হবে এবং যুদ্ধের জন্য তৈরি হতে হবে। ঐ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত হলো, ময়মনসিংহ গিয়ে সমাবেশ করে আশুগঞ্জ, ভৈরব এবং নরসিংদী হয়ে ডেমরার দিক থেকে। ২৯ মার্চ ময়মনসিংহ গিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম, কীভাবে মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিতে হবে এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কী করে অগ্রসর হব। সকলে মিলে অনেক বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে ময়মনসিংহ এসে একত্রিত হলাম। যুদ্ধ শুরু হয়েছে, কিন্তু অন্য কেউ আমাদের সঙ্গে রয়েছে কিনা তখনো জানি না। আমরা ধরে নিয়েছি, আমরাই মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছি। পরে জানতে পারি, ২৮ মার্চ অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্ট সহযোদ্ধা হিসেবে যোগ দিয়েছে, প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট যশোহরে যোগ দিয়েছে এবং চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে যোগ দিয়েছে। ’

“২৮ মার্চ টাঙ্গাইলে যাই মেজর কে এম শফিউল্লাহর সঙ্গে, সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। কাদের সিদ্দিকী তখন তরুণ— হাতে শটগান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিয়ে টাঙ্গাইল ব্রিজের সামনে এসে আমাদের স্বাগত জানায়। তারা জানায়, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে এবং টাঙ্গাইলকে তারা স্বাধীন করে ফেলেছে। টাঙ্গাইলের সার্কিট হাউসে তখন বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। সেখানে গিয়ে বুঝলাম, জনগণ আমাদের সঙ্গে এসে গেছে।”

‘ময়মনসিংহে এসে তৎতালীন মেজর শফিউল্লাহ সিদ্ধান্ত নিলেন, বাঙালিকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে ঢাকায়, তার প্রতিশোধ যদি ন্যূনতম নিতে হয় তাহলে আমাদেরকে কোথাও গিয়ে আক্রমণাত্মক ভূমিকা নিতে হবে, পাকিস্তান বাহিনীকে প্রত্যুত্তর দিতে হবে। এই সিদ্ধান্ত মোতাবেক যাত্রা শুরু করি, ময়মনসিংহ থেকে ভৈরব হয়ে কিশোরগঞ্জ হয়ে নরসিংদী হয়ে ঢাকা ডেমরাতে সমাবেশ করে ঢাকা সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করব। কিন্তু চারদিন পর জানতে পারি চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল  রেজিমেন্ট বিদ্রোহ করেছে। তাদের সঙ্গে আমাদের সমন্বয় হলো। কুমিল্লাতে মেজর খালেদ মোশাররফ মেজর শফিউল্লাহর সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিলেন, এভাবে আক্রমণ করা আমাদের জন্য আত্মঘাতি হবে। রক্ষণাত্মক ভূমিকা  নিতে হতে হবে আমাদের। মেজর খালেদ মোশাররফ এবং মেজর শফিউল্লাহ সিদ্ধান্ত নিলেন, মুক্তিযুদ্ধকে প্রলংঘিত করতে হবে, তাদেরকে রিডিউস করতে হবে, ধ্বংস করতে হবে। তার জন্য আমাদের প্রশিক্ষণ, জনগণের সমর্থণ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রয়োজন। ’

‘পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রাথমিক ভাবনা ছিল এক মাসের মধ্যে বাংলাদেশকে দমন করবে কিন্তু তারা আগস্টের মধ্যে বুঝতে পারে বাংলাদেশের চার মুক্তিযোদ্ধা ব্যাটেলিয়ন সঙ্গে আনসার বাহিনী, পুলিশ বাহিনী এবং মুক্তিযোদ্ধারা ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে, কাজেই বাংলাদেশকে দমন করা সম্ভব হবে না। সরকার গঠিত হবার পরে ১১টি সেক্টর ভাগ হয়ে যায়, এসব সেক্টরের নেতৃত্বে ছিল সশস্ত্র বাহিনীর ব্যক্তিরাই। তাঁরা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার এবং গেরিলাযোদ্ধাদের উত্থানের ব্যবস্থা করে।  জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত গেরিলা বাহিনীর উত্থান শুরু হয়। এরা পাকিস্তান বাহিনীকে পর্যুদস্ত করত রাতের বেলায় আর দিনের বেলায় ছিলাম আমরা। এই দুই কারণে পাকিস্তান বাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে যেতে থাকে।’

মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিক বর্ণনা উঠে আসে বীর বিক্রম হেলাল মোর্শেদের স্মৃতিচারণে, ‘আমরা প্রথমে মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় ধাপে যুদ্ধ করতাম, পাকিস্তানি বাহিনীকে আঘাত করতাম, মৃত্যু ঘটাতাম আর ফিরে আসতাম। কোনো জায়গা দখল করার ক্ষমতা তখনও তৈরি হয়নি, কিন্তু প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলাম ভবিষ্যতে সেটা করার জন্য। সেই লক্ষ্যেই বাংলাদেশের তিন ব্রিগেড এস ফোর্স, কে ফোর্স এবং জেড ফোর্স গড়ে ওঠে। এর সঙ্গে সেক্টর ট্রুপস আর সঙ্গে যোগ হয় হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা আর গেরিলা বাহিনী। এই শক্তি গড়ে উঠে তিন শক্তির সমন্বয়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করি।’

‘অক্টোবর এবং নভেম্বর— এই দুই মাসে ছিল সব বড় সম্মুখযুদ্ধ বলেন তিনি। প্রায় আটটি যুদ্ধ হয় অক্টোবরের শেষ থেকে নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত। তারই একটি ছিল ১৩ এবং ১৪ এপ্রিল ভৈরব আশুগঞ্জের যুদ্ধ। সেখানে ১৫০ জনের একটি ছোট্ট কোম্পানি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি বিশাল দলের বিরুদ্ধে। ১৫০ জনের দলের ওপর পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করে একটি বিশাল ব্রিগেড নিয়ে। তাদের সঙ্গে ছিল দুইটি ব্যাটেলিয়নের প্রায় ১ হাজার ৪০০ সৈনিক, সঙ্গে ছিল একটি সম্পূর্ণ ফায়ারিং রেজিমেন্ট, এবং কমান্ডো বাহিনী এবং তৎকালীন পাকিস্তানের যতগুলো যুদ্ধ বিমান ছিল, নদী পথে ছিল আরেকটি ব্যাটেলিয়ন।’

‘এই ছোট্ট আলফা কোম্পানি নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন ক্যাপ্টেন নাসিম পরবর্তীকালে যিনি লেফটেন্টেন্ট জেনারেল এবং সেনাপ্রধান হয়েছিলেন। আমি তাঁর সহ-উপঅধিনায়ক। সেই যুদ্ধে ১২ জনের মতো মৃত্যু হয় আর ২০ জনের মতো আহত হন। আর পাকিস্তান বাহিনীর প্রায় কমান্ডো বাহিনীর ৩০ জনের মৃত্যু হয় এবং সম্মুখ যুদ্ধে শত শত পাকিস্তান সেনার মৃত্যু হয়।  এই যুদ্ধটি ১৩ এবং ১৪ এপ্রিল সারাদিন চলে। কিন্তু কৌশলগতভাবে তাদের কাছে হেরে পিছু হটতে শুরু করি, সেখানেই ক্যাপ্টেন নাসিম ও আমি আহত হই, দলে থাকা চিকিৎসক আমাদের চিকিৎসা দেন। এ আহত হবার কারণে আমাদের কোম্পানির মনোবলে ঘাটতি দেখা দেয়। বিকালের দিকে পিছু হটতে থাকি এবং দ্বিতীয় যুদ্ধটি মাধবপুরের যুদ্ধটির জন্য তৈরি হই। সেখানে আমাদের মনোবল আবার ফিরে পাই’ —বলে উজ্জীবিত হাসি হাসেন হেলাল মোর্শেদ।

কিছুটা সময় নেন হেলাল মোর্শেদ। তিনি ফের বলতে শুরু করেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি সংগঠিত, পরিকল্পিত এবং সমন্বিত যুদ্ধ পরিকল্পনার মাধ্যমে হওয়া যুদ্ধ।  এ কারণে পাকিস্তান বাহিনীর মনোবল ভেঙে যায়। তাদের কৌশলগত পরিকল্পনাগুলো মার খেয়ে যায় নভেম্বর থেকে।’

‘আখাউড়ার যুদ্ধটি শেষ হয় ৫ ডিসেম্বর। সেদিন আখাউড়ার সবচেয়ে বড় ডিফেন্সটিকে আমরা ধ্বংস করতে পেরেছিলাম, ভ্রাম্যমাণ মিত্রবাহিনীর দুইটি ব্যাটেলিয়ন, দশম বিহার রেজিমেন্ট, চতুর্থ রেজিমেন্ট, দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং এগার বেঙ্গল রেজিমেন্ট মিলে তাদের আক্রমণ করা হয়। তাদের ধ্বংস করে আমরা ভৈরব ব্রিজ পর্যন্ত চলে আসি। এরপর আখাউড়া থেকে ঢাকার ডেমরা পর্যন্ত চলে আসি আমরা ১৩ ডিসেম্বর। ততক্ষণে পাকিস্তান বাহিনীর মধ্যম পর্যায়ের ব্রিগেড কমান্ডারদের মনোবল ভেঙে যায়, তারা সব ছেড়ে বসেছিল। আমার সবচেয়ে অভিজ্ঞতাটি হলো, ১৩ ডিসেম্বর এসে পৌঁছাই ডেমরাতে। আমরা ঢাকা শহর দেখছি— মাঝে কেবল শীতলক্ষ্যা নদী, তারপর বালুচড় শেষের গ্রামেই রয়েছে পাকিস্তানি বাহিনী। সৈনিকরা শারীরিকভাবে দুর্বল হলেও মানসিকভাবে উৎফুল্ল।’

মেজর জেনারেল (অব.) হেলাল মোর্শেদ খান যেন ফিরে যান ১৯৭১ সালের সেই স্বর্ণালী সময়ে,  ‘আমরা চারটি ব্যাটেলিয়ন সেখানে। মনের ভেতরে অদম্য ইচ্ছে— ঢাকা শহরকে দখল করব, সেখানে যুদ্ধ হবে ঢাকায় নিশ্চয় অনেক পাকিস্তানি সৈন্য রয়েছে— তাদেরকে আমরা পর্যুদস্ত করব। সেনাবাহিনীর একজন তরুণ অফিসার হিসেবে মনে হয়েছে এটাই বোধ হয় শেষ যুদ্ধ। কারণ, ঢাকায় নিশ্চয় অনেক পাকিস্তানি সেনা রয়েছে। ধারণা ছিল না, ঢাকায় আসলে কিছুই নাই— কেবল এ দুটি কোম্পানি সামনে রয়েছে। আমার চিন্তা ছিল, ঢাকা শহরকে দখল করতে হলে অন্তত আরও দেড় মাস যুদ্ধ করতে হবে। কারণ, ঢাকার যুদ্ধটি অত্যন্ত ভয়াবহ হওয়ার কথা ছিল। এই কারণে মনে হচ্ছিল, নয় মাস তো বেঁচেই এলাম, কিন্তু ঢাকার দিনগুলো কেমন হবে। পরের দিন সকালে আমরা একত্রিত হচ্ছি, সামনে শত্রু দেখা যাচ্ছে— কিন্তু যুদ্ধ শুরু করি নাই। নিজেদের ভেতরে সমন্বয় করতে ১৫ তারিখ চলে গেল।’

একটু থেমে বীর যোদ্ধা ফের বলা শুরু করেন, “হঠাৎ দেখি, ১৬ ডিসেম্বর তিনটার দিকে দুপুর তিনটার দিকে মাথার উপর দিয়ে ৫ থেকে ৬টি বেশ নিচ দিয়ে হেলিকপ্টার যাচ্ছে। মাথায় চিন্তা হলো, এত নিচ দিয়ে কেন যাচ্ছে। তখনো কিছু জানি না আমরা। এক সময় দেখলাম দূর থেকে হেঁটে আসছেন আমার কমান্ডিং অফিসার, সেক্টর কমান্ডার তৎকালীন কর্নেল কে এম শফিউল্লাহ আসছেন তার দল নিয়ে। কাছে এসে তিনি আমাকে বলেন, ‘ওরা সারেন্ডার করেছে— তুমি দল নিয়ে রাস্তায় পৌঁছে যাও এবং সেখান থেকে স্টেডিয়াম চলে যাও। আমি ভেবেছি সামনের গ্রামের পাকিস্তানি সেনাদের কথা বলছেন আমার কমান্ডার। তাকে আমার ভাবনার কথা বলতেই তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমার্পণ করবে। চারটার সময়ে আত্মসমার্পণের আনুষ্ঠানিকতা হবে। আমি যাচ্ছি— তুমি তোমার বাহিনী নিয়ে চলে এস।’”

“ফুটবল খেলা শেষ হলে যেমন খেলোয়াড়রা উল্লসিত হয়, তেমনি করে আমার সৈনিকরা অস্ত্র নিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কোনো ভয় নেই, বুকের ধুঁপধুঁপানি নেই। এক সময় সবাই মিলে ডেমরা পৌঁছে গেলাম। বাদিকে মুক্তিবাহিনী আমার দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্ট মাঝে পাকিস্তান বাহিনী, তাদের কাঁধে সব অস্ত্র এবং ডান দিকে মিত্র বাহিনী। পাকিস্তান বাহিনীকে নিয়ে মাঝে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে নিয়ে। স্টেডিয়ামে সারেন্ডার হয়ে গেছে। মানুষজন অবাক হয়ে আমাদের দেখছে, আমরা মার্চ করে ঢাকা শহরে ঢুকলাম। মুক্তিযোদ্ধারা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দিতে আকাশের দিকে গুলি ছুঁড়ছে— পুরো শহর কেবল ‘জয় বাংলা’ স্লোগান, আমরা স্টেডিয়ামে বসে দেখলাম—  স্বাধীন বাংলাদেশকে অনুভব করা শুরু করলাম।”

তবে যুদ্ধের পরও যে যুদ্ধ করতে হবে সেটা জানা ছিল না তাঁর। হেলাল মোর্শেদ বলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু ফিরে আসেন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা করছেন, সরকারকে পুনর্গঠিত করার চেষ্টা করছেন এবং মুক্তিবাহিনীর অস্ত্র সংবরণ করে একটি নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় আত্মসমার্পণের করার ব্যবস্থা করছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় জানুয়ারির ৩০ বা ৩১ তারিখে সারা দেশে বর্তমান বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে রাষ্ট্রীয়ভাবে অভিবাদনের সারাদেশের মুক্তিযোদ্ধার অস্ত্র সমার্পণ হবার কথা ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে জানানো হলো, মিরপুর এবং মোহাম্মদপুরের অস্ত্রধারী অবাঙালি এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দলছুট কয়েকজন সদস্য রয়েছে যারা এলাকা দখল করে রেখেছে, তাদের অস্ত্র সংবরণ করা উচিত এই অস্ত্র সমার্পণ হওয়ার আগেই। ২৮ জানুয়ারি পুলিশ বাহিনীকে বঙ্গবন্ধু নির্দেশ মিরপুর মোহাম্মদপুরকে অবমুক্ত করার এবং আমাকে বলা হয় পুলিশ বাহিনীকে সাহায্য করার জন্য।

‘৩০ জানুয়ারি সারাদিন সেখানে যুদ্ধ হয়, কিন্তু কৌশলগত তথ্যের অভাবে আমরা অবরুদ্ধ হয়ে যাই এবং দ্বিতীয়বারের মতো আহত হই’— বলেন হেলাল মোর্শেদ।

তিনি ব্যথাতুর কণ্ঠে বলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশের সেই যুদ্ধে প্রথম একঘণ্টায় সেনাবাহিনীর ৪২ জন সৈনিক এবং ৮০ জন পুলিশ সদস্য শহীদ হন।

হেলাল মোর্শেদ বলেন, ‘অত্যন্ত সাহসী মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া যোদ্ধাসঙ্গীসহ ননকমিশন অফিসার, সেকশন কমান্ডার ও প্লাটুন কমান্ডারসহ অনেকেই শহীদ হন, শহীদ হন লেফটেন্টেন্ট সেলিম। আহত হই আমিসহ ২০ জনের মতো। তারপরও সারাদিন যুদ্ধ চালিয়ে যাই এবং পরবর্তীকালে চতুর্থ এবং প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্ট মিলে প্রায় ১৫ দিনের মতো যুদ্ধ করে চার ট্রাক ভারী অস্ত্র উদ্ধার করে এবং এর পরিসমাপ্তি হয়।’

হেলাল মোর্শেদ খান বীর বিক্রম বলেন, ‘এই এলাকা যে কী ভয়াবহ ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় ২০০৫ সালে যখন মিরপুরের খননকাজ শুরু হয়। মাটির নিচে অগণিত মানুষের মৃতদেহ পাওয়া যায়, পাওয়া যায় মাথার খুলি। ফরেনসিকের মাধ্যমে তাদের কিছুটা শনাক্ত করতে পারি।

সারাবাংলা/জেএ/আইজেকে