মঙ্গলবার ২০শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং , ৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১০ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী

পঙ্খীরাজ

নভেম্বর ৪, ২০১৮ | ৩:৫৩ অপরাহ্ণ

শাকুর মজিদ ।।

টিউশনীর সুবাদে আমি যখন দ্রুত বড়লোক হয়ে উঠছিলাম, প্রথমেই আমার নিজস্ব একটা বাহনের কথা চিন্তা করি। ‘আর নয় রিকশা- এটা খুবই অমানবিক, একজন মানুষ তাঁর পেছনে বসা আরো দুইজন মানুষকে টেনে নিয়ে যাবে এ হতেই পারে না’- এমন এক শ্লোগানকে মুখে মুখে বলে, আর আসলে রিকশা ভাড়া থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার ধান্ধায় আমি কয়েক মাসের টিউশনীর টাকা পাওয়ার সাথে সাথে ২১’শ টাকা দিয়ে একটা সাইকেল কিনে ফেলি। সাইকেল কেনার জন্য একজন বিশেষজ্ঞ জোগাড় করেছিলাম, যার সাইকেল আছে, এমন একজন। তাঁকে নিয়ে নগদ আড়াই হাজার টাকা মানিব্যাগে ঢুকিয়ে চলে যাই বংশাল। সেখানে তিন-চার দোকান ঘুরে টকটকে লাল মোরগের রঙা একখানা ইন্ডিয়ান হিরো সাইকেল আমি কিনেই ফেলি। যাকে নিয়ে গিয়েছিলাম সঙ্গে করে তাঁকে বংশালে ফেলে রেখে ৫ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে আমি নিজেই চালিয়ে চলে আসি বুয়েটে আমার তিতুমীর হলে।

এই সাইকেল খানা পেয়ে আমার যোগাযোগ ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়। আমি দিনে দু’বার পর্যন্ত পত্রিকার অফিসে ঢু মারতে পারি। লেখা ছাপাতে দেরি হলে নিজে গিয়ে খবর নিয়ে আসতে পারি, কিংবা লেখার বিল পাওয়ার জন্য প্রতিদিন তাদের অফিসে গিয়ে তাড়া দিতে পারি।

আমার চকচকে লাল রঙের সাইকেলখানা ক্রমশই আমার হলের বয়-বেয়ারা আর ডিপার্টমেন্টের বন্ধুদের খুব প্রিয় বাহনে পরিণত হতে থাকে। তারা অনেকেই আমার সাইকেল চালাতে চায়। সাইকেল থাকে তালা দেয়া । আমি বার বার তাদেরকে চাবি দিতে দিতে বিরক্ত হবার ফলে একসময় তালা না মেরেই সাইকেলখানা এক জায়গায় রেখে দেই।

মাঝে মাঝে সাইকেল খুঁজে পাইনা। জানি, কেউ হয়তো বাটারপেপার কিনতে নিউমার্কেট নিয়ে গিয়েছে, চলে আসবে। আসেও।

কিন্তু একবার প্রায় ২৪ ঘন্টা পার হয়ে যায়, আমার সাইকেল খুঁজে পাই না।

এক সময় আবিস্কার হলো, আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের দক্ষিন পাশে যেখানে বড় একটা পানির রিজার্ভার, যার ভেতর বৃস্টির পানি জমা থাকে, তার ভেতর কে যেনো চুবিয়ে রেখেছে।

২৪ ঘন্টার চুবানি খেয়ে সাইকেলটি আমার আরো পরিচ্ছন্ন হয়ে আসে। আমি ফ্যাকাল্টির নীচে আর তালা না মেরে রাখিনা।

কিন্তু আমার তিতুমীর হলে এই নিয়ম আমি মানতে পারি না।

আমার কতোগুলো সাগরেদ বনে যায় হলে, তারা মূলত ক্যান্টিন আর মেসের বয়-বেয়ারা। এরা আমার ফুট ফরমাস খাটার জন্য এখানে সেখানে যায়। এদের মধ্যে দুইজন খুব প্রিয়। বাসার আর আমিনুল। এরা আমার পত্রিকার অফিসও চেনে। লেখা দিয়ে সাইকেলে পাঠিয়ে দিলে তারা জমা দিয়েও আসতে পারে। আমি সাইকেলটা তাদের হেফাজতেই দিয়ে দেই। তারাই চালায়। আমি মাঝে মাঝে, সুযোগ পেলে।

আমরা যখন সেকেন্ড ইয়ারে তখন আমার এই সাইকেলটি জুনিয়র ক্লাসের সুন্দর সুন্দর মেয়েদের আগ্রহের বিষয় হয়ে যায়। আমি মহা পুলক বোধ করতে থাকি। এদের কেউ কেউ সিনেমায় যেমন কিশোর-কিশোরী নায়ক-নায়িকাকে সাইকেল চালাতে দেখেছেন সেভাবে আমার সাথে সাইকেলে উঠতে চায়। আমি মহা আগ্রহের সাথে তাদেরকে আমার সাইকেলে চড়াই। কেউ কেউ পেছনের ক্যারিয়ারে বসে, কেউ সামনের ডান্ডায়। কখনোবা দুইজন একসাথে, একজন সামনে একজন পেছনে । আমার নিজেকে তখন ফিল্মি হিরো বলেই মনে হয় আর আমার হিরো সাইকেল যেনো পঙ্খীরাজ ঘোড়া।

এই কথা একবার বলার পর দেখি এর নামই ‘পঙ্খীরাজ’ হয়ে যায়। জুনিয়র ক্লাসের মেয়েরা আমাকে হাঁটতে দেখলে জিজ্ঞেস করে, আপনার পঙ্খীরাজ কই আজ ?

আমি বলি, হলের বেয়ারা চালায়। লাগবে তোমার ? আনবো ?

কেউ কেউ বলে, না না আরেক দিন।

কেউ বলে, আনান, আমি সাইকেল চালাবো শিখবো, আমাকে শিখাবেন ?

আমি মহানন্দে সাইকেলের ড্রাইভিং কোর্স করাই। কাউকে আধা ঘন্টায়, কাউকে এক ঘন্টায় লেসন শেষ করিয়ে কাউকে কাউকে লাইসেন্স দেয়ার মতো বলি- নাও, এবার নিজে নিজে চালাও। তোমার হয়ে গেছে । তাদের কেউ কেউ দুলদুল ঘোড়ার মতো এই সাইকেল নিয়ে দৌড়ায়, আর আমার প্রাণটা ভরে যায়।

এই সাইকেল পাওয়ার পর আমার টিউশনীর মাত্রাও বেড়ে যায়, ছবি তোলার আগ্রহও বেড়ে যায়। আগে পায়ে হেঁটে হেঁটে সাবজেক্ট খুঁজতে বেরূতাম। এখন আর লাগে না। আমি হাটে-মাঠে-ঘাটে-বস্তিতে-চিপায়-চাপায় সাইকেল নিয়ে চলতে থাকি। আমার ডর নাই। মাঝে মাঝে ডর লাগে বড় রাস্তায় । পলাশী থেকে এয়ারফোর্স কোয়ার্টার আমার সবচেয়ে দূরত্বের যাত্রা, ফার্মগেট পার হবার পর ওই রাস্থায় অনেক বাস-ট্রাক চলে। আমি রাস্তার বাম পাশের একটা বড় বাস বা ট্রাকের পিছু নেই। ওর পিছু পিছু সাইকেল চালালে আমার চিন্তা লাগেনা।

আমার সাইকেলটি একবার খুব বিখ্যাত হয়ে গেলো। তখন আমি দ্বিতীয়বারের মতো থার্ড ইয়ারে। এক ফটো কন্টেস্টে আমার এই সাইকেলে চাকার ছায়া পুরস্কৃত হয়ে যায়। এ নিয়ে আমার অনেক মায়া জাগে এই সাইকেলটাকে নিয়ে।

দিনে দিনে আমার মতোই ঔজ্বল্য হারায় আমার সাইকেল। কখনো টায়ার পাংচার। টায়ার বদলাই, লিক সারাই। একসময় দেখি মাঝে মাঝে এর ব্রেক ধরে না। তখন আবার খুব বিপদে পড়ে যাই। বছর চারেক ক্রমাগত চালানোর পর আমার কাছে অনেক উপদেশ আসতে থাকে, এই সাইকেলটি বদলে নতুন সাইকেল কেনার জন্য । আট-নয় হাজারে পুরাতন মটর সাইকেল পাওয়া যায়, কেউ বলে এটা বেচে আরো কিছু পুরিয়ে একটা মটর সাইকেলই কিনে ফেলতে। আমি মটর সাইকেল চালাতে জানি না। এটা আমার কাছে খুব ভয়ের জিনিস বলে মনে হয়। আমি এটাতেই থাকি। লিক সারাই, স্পোক বদলাই, চেইনের গিয়ার সারাই, আবার বদলাই।

আমার হলের বয়-বেয়ারা আমার জন্য কাস্টমার এনে দেয়। তারা অন্য ক্যান্টিনের বেয়ারা। বলে, স্যার এটা বেচে দেন ৬-৭শ’ পাবেন, নতুন সাইকেল কিনেন, ফিনিক্সেরটা অনেক ভালো স্যার, আপনাকে আর এটাতে মানায় না।

কিন্তু আমি এই সাইকেল ছাড়ি না ।

এক ছুটির দিনে সাইকেল নিয়ে ডিপার্টমেন্টে গিয়ে ভয়ানক মন খারাপ হয়ে যায়। প্রায় নির্জন ফ্যাকাল্টিতলায় দেখি আমার এক প্রাক্তন শিক্ষার্থী সাইকেলচালিকা একা একা বসে আছে। আমাকে দেখে একটু বিচলিত। বুঝতে পারি না, বিচলিত হবার কারণ। আমি বলি, চালাবা ?

এমন কথা আগেও বলেছি। সে দৌড়ে এসে সাইকেল নিয়ে পঙ্খীরাজের মতো চরে বেড়িয়েছে। আজ মাথা নাড়ায়। নেবে না।

আমি সাইকেল ঘুরিয়ে ফেরত আসি হলের দিকে। মাঝপথে শহীদ মিনারের কাছে একটু দাঁড়াই। এখানে অনেকে বসে আছে। আমিও বসি। এক লোক ফ্লাস্কে করে চা বিক্রি করে। আমি এক কাচ চা নিয়ে বসে থাকি, আর দেখি- সেই শিক্ষার্থী সাইকেলচালিকা আমার চেয়ে দুই ব্যাচ সিনিয়র এক ভাইয়ের মটর সাইকেলের পেছনে চড়ে নিউমার্কেটের রাস্তার দিকে হাওয়া হয়ে গেলো।

এই কারনেই আমার মন খারাপ। আচ্ছা, আমার মন খারাপ হবে কেন ?

জানি না।

আমি সাইকেল নিয়ে ছুটতে থাকি।পলাশী থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত এসে ভাবলাম, ইব্রাহীমপুরে আমার এক আপা থাকেন। তাঁর বাসায় গেলে আমাকে খিচুড়ি আর গরুর মাংস ভুনা খাওয়ান। চলে যাই ইব্রাহীমপুর।

ক্যান্টনমেন্টের ভেতর দিয়ে কচুক্ষেত বাজার পার হয়ে একটা বাজারের ভেতর দিয়ে ছোট রাস্তায় আমাকে ঢুকতে হয়। এখানে রাস্তার মধ্যে অনেক গর্ত। আগেও দেখেছি। এবার যতোই আমি খেয়াল করে সাইকেল চালাই না কেন, আমি হঠাৎ টের পেলাম, আমার সাইকেলখানা একটা ম্যানহোলের আধখোলা দরোজা দিয়ে ঢুকে পড়েছে।

আমি কি খুব অন্যমনষ্ক ছিলাম ? জানি না।সাইকেলটাকে গর্তের ভেতর থেকে উদ্ধার করে টেনে টেনে নিয়ে এলাম এক রিকশার গ্যারেজে। এ রকম রিকশার গ্যারেজ আমার সাইকেলের হাসপাতাল। ইমার্জেন্সির ডাক্তার দেখে বলেন- টায়ার ফেটে গেছে, নতুন টায়ার নিয়ে হবে। স্পোক গেছে আট খানা, নতুন স্পোক লাগাতে হবে। স্পোকের গিয়ার বদলাতে হবে। সব মিলিয়ে খরচ পড়বে ৪শ টাকার মতো।

আর যদি এটা আমি আপনার কাছে বিক্রি করতে চাই ?

আমরা পুরান সাইকেল কিনি না।

ধরেন কেউ এসে কিনলো। দাম কতো হতে পারে ?

এটা আর কতো হবে , ৪-৫শ পাবেন।

আমার পঙ্ক্ষীরাজকে মাত্র ৫ শ’ টাকায় ছেড়ে দেব ? হবে না। আমি সাইকেলটি না সারিয়ে নিয়ে আসি। ভাঙ্গা সাইকেল নিয়ে হাঁটতে থাকি রাস্তার কিনারা ধরে ধরে। ফুট পঞ্চাশেক হাঁটার পর একটা ল্যাম্পপোস্ট পাওয়া যায়। আমি সাইকেলটাকে তার গায়ে হেলান দিয়ে রেখে দেই।

সাইকেলে আর তালা মারি না। আমি বাকিটা পথ হেঁটে হেঁটে চলে যাই আপার বাসায়। সেখানে সাতকরা দিয়ে গরুর মাংস ভুনা করে রান্না হয়েছে। আজ খিচুড়ি হয়নি, সময় নেই। আমি পেট ভরে ভাত খাই। গল্প করি । বিকালের দিকে তার বাড়ির কাছে যে বাসস্ট্যান্ড আছে, সেখান থেকে ফার্মগেটের বাসে উঠি।

এক সময় বাসের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি, আমার পঙ্খীরাজ এখনো হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সারাবাংলা/পিএম

 

 

Tags: , ,

পঙ্খীরাজ
পঙ্খীরাজ
পঙ্খীরাজ