রবিবার ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ইং , ১২ ফাল্গুন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৮ জমাদিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

পছন্দের পার্থক্য: সামলে নেবেন কীভাবে?

জানুয়ারি ২৮, ২০১৯ | ২:৩৮ অপরাহ্ণ

তিথি চক্রবর্তী।। 

কেস স্টাডি : সোহেল রানার বিবাহিত জীবন ১৩ বছরের। স্ত্রীর সাথে পছন্দের পার্থক্য নিয়ে কথা হয় তার সাথে। তিনি জানান, অনেক ব্যাপারেই তাদের দুজনের ভালোলাগাগুলো আলাদা। যেমন সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করানোর সময় সোহেল চেয়েছিলেন বাসার কাছাকাছি কোন স্কুলে পড়াতে। তাছাড়া সোহেলের আয় সীমিত, তাই খুব নামিদামি স্কুলে পড়ানোও সম্ভব না। কিন্তু তার স্ত্রী চেয়েছিলেন সন্তান ভালো স্কুলে পড়ুক। টাকা কিংবা বাসার দূরত্ব কোন কিছুই তার স্ত্রী বিবেচনা করছিলেন না। সোহেল বলেন, ‘ভালো স্কুলে বাচ্চাকে পড়ানোর ইচ্ছা সব বাবা-মায়েরই থাকে। তবে বাস্তবতা তো আলাদা। আমার স্ত্রী অনেকসময় এসব বুঝতে চায় না।’

এছাড়াও ঘুরতে যাওয়া, বাসা ভাড়া নেওয়া সহ অনেক ক্ষেত্রেই দুজনের পছন্দ দুরকম হয়, জানালেন সোহেল রানা। কোন বিষয়ে পছন্দের পার্থক্য হলে কী করে সমাধান করেন, জানতে চাইলে সোহেল বলেন, ‘প্রথমে তাকে বুঝিয়ে বলি। তারপরও যদি দেখি আমার স্ত্রী নিজের পছন্দকেই প্রাধান্য দিচ্ছে তাহলে পুরো ব্যাপারটি তার উপরেই ছেড়ে দেই। আর বলি, বিষয়টি যদি আরও জটিল হয় তাহলে আমি দায়ী থাকবো না।’

কেস স্টাডি : ফারজানা রিয়া স্বামী, স্ত্রীর পছন্দের পার্থক্যকে দেখেন ইতিবাচকভাবে। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে ফারজানা বলেন, ‘সম্পর্কের ক্ষেত্রে আস্থা ও সম্মান থাকাটাই আসল ব্যাপার। এটা ঠিক থাকলে যেকোন বিষয়ে পরস্পর আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।’

১১ বছরের দাম্পত্য জীবন তার। ফারজানা বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে পছন্দের পার্থক্য তো থাকেই। যেমন আমি পছন্দ করি ভারতীয় ক্ল্যাসিক্যাল গান। আর আমার স্বামী পছন্দ করেন ইংরেজি গান। তবে পছন্দের এই পার্থক্যগুলো আমাদের দু’জনকে আসলে সমৃদ্ধ করে। নতুন গান কিংবা বই নিয়ে আমাদের মধ্যে কথা হয়, তখন দুজনের জানার পরিধি বেড়ে যায়।’

রুচিগত জায়গায় স্বামীর সাথে প্রায় পুরোপুরি মিলে যায় ফারজানার। যেমন তারা দুজনই বই পড়তে, গান শুনতে ও সৃজনশীল নানা ধরনের কাজ করতে পছন্দ করেন। দুজনের ধরনটা একটু আলাদা হলেও দৃষ্টিভঙ্গিগত জায়গাটি একইরকম হওয়ার কারণে দাম্পত্য জীবনে সমস্যায় পড়েননি, জানালেন ফারজানা।

স্বামী স্ত্রী ভিন্ন দুটো পরিবার ও পরিবেশে বড় হয়। একেকটি পরিবারের সংস্কৃতি, রীতি-নীতি ও মূল্যবোধ একেকরকম। প্রত্যেকের বেড়ে ওঠার ধরনও আলাদা। দাম্পত্য জীবনে স্বামী স্ত্রীর পছন্দের পার্থক্য থাকাটা খুব স্বাভাবিক। যেমন স্বামী হয়তো ঘুরতে পছন্দ করেন, আর স্ত্রীর ভালোলাগে ঘরে বসে বই পড়তে কি লেখালেখি করতে। আবার স্বামী হয়তো কর্পোরেটভাবে থাকতে পছন্দ করেন, আর স্ত্রী চান ক্যাজুয়াল থাকতে। কখনও স্ত্রী হয়তো আড্ডা প্রিয়, আর তার স্বামী চাকরি ও ক্যারিয়ারের প্রতি বেশি মনোযোগী। স্বামী, স্ত্রীর পছন্দ কিংবা ভালোলাগার এমন পার্থক্য প্রায়ই দেখা যায়। তারপরও কীভাবে দাম্পত্য জীবন উপভোগ করা যায়?

 

 

অভিনেত্রী শাহানাজ খুশি ও নাট্যকার বৃন্দাবন দাস দম্পতির সাথে কথা হলো এই প্রসঙ্গে। দুই সন্তান তাদের।

শাহানাজ খুশি বলেন, ‘স্বামী-স্ত্রীর পছন্দ বা মতের পার্থক্য থাকবেই। মা-বাবার সাথে সন্তানদের, ভাইয়ের সাথে বোনের, তেমনি স্বামীর সাথেও স্ত্রীর পছন্দের পার্থক্য থাকে। দুজন দুই আদর্শে বড় হয়। তাই স্বামী স্ত্রী দুজনকেই ছাড় দিতে হবে। দুজনের মধ্যেই যদি সততা থাকে, তাহলে অন্য অসুবিধা বড় হয় না। আমি মনে করি, স্বামী যদি চতুর না হয় তাহলে ছোট খাটো অনেক সমস্যা মেনে নেওয়া যায়। এজন্য সততা থাকলেই আমি খুশি।’

কোন বিষয়ে মতের অমিল হলে কী করেন জানতে চাইলে শাহানাজ খুশি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে দুজনে একসাথে বসে কথা বলি। কোন কাজটি করলে সুবিধা ও অসুবিধা কেমন হবে, তা নিয়ে আলোচনা করি। তারপর সিদ্ধান্ত নেই।’ তবে এখন সন্তানদের ভাললাগাকেই প্রাধান্য দেন তারা জানালেন শাহানাজ খুশি।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে পছন্দের পার্থক্য হলে কীভাবে নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছেন জানতে চাইলে শাহানাজ খুশি বলেন, ‘আমি রাগ কখনও দীর্ঘায়িত করি না। তাছাড়া আমি জানি, বৃন্দাবন সৎ ও নৈতিক। তাই ছোট ছোট বিষয়গুলো নিয়ে মাথা ঘামাই না। বরং তার কাজের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাই ও উৎসাহ দেই। প্রত্যেক মানুষের কিছু ভাল দিক ও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। এটা মানতে হবে। ভালো দিকগুলো টিকিয়ে রাখার জন্য উৎসাহ দিতে হবে। আর সীমাবদ্ধতাগুলো নিয়ে কথা বলতে হবে এবং তাকে সহযোগিতা করতে হবে। আমি মনে করি, মূল জায়গাগুলোতে দুজনের মতের ও পছন্দের মিল থাকলে সমস্যা হয় না।’

এবার নাট্যকার বৃন্দাবন দাসের সাথে কথা হলো। স্বামী স্ত্রীর পছন্দের পার্থক্যকে তিনি কীভাবে দেখেন- এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কোন সম্পর্কই তত্ত্বে ফেলা যায় না। সম্পর্ক পুরোপুরি চর্চার বিষয়। স্বামী স্ত্রীর পছন্দ বা ভালোলাগার ভিন্নতা নিয়ে আমার মনে হয়, যদি দুজনের দর্শনগত জায়গায় মিল থাকে তাহলে অন্য সমস্যা মুখ্য হবে না। সামাজিক ও ব্যক্তি জীবনকে নিয়ে প্রতিটি মানুষের মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। এই জায়গাগুলোতে মিল থাকাই আসল। ব্যক্তি মানুষের ধরন বা আচরণ আলাদা হতেও পারে। তাতে অসুবিধা নেই। তবে দুজনই মুক্তচিন্তার কিনা তা বুঝতে হবে। এজন্য বিয়ের আগেই পরষ্পরের সাথে খোলামেলা আলোচনা হতে হবে।’

নিজেদের প্রসঙ্গ টেনে বৃন্দাবন দাস বলেন, ‘আমরা বিয়ের আগেই নিজেদের ভাবনাগুলো শেয়ার করেছি। খুব ভেবেচিন্তে সংসার শুরু করেছিলাম এবং এখনও মূল ভাবনায় আমাদের কোন সমস্যা হয় না। এজন্য নিজেদের ঘর আমাদের খুব ‍প্রিয়। ঘরে বসে দুজনে আড্ডা দিতে, গল্প করতে খুব পছন্দ করি আমরা। অনেকসময় খুব প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যেতেও ভালো লাগে না আমাদের’ হাসতে হাসতেই বললেন বৃন্দাবন দাস।

ভালোলাগার মধ্যে পার্থক্য হলেও মিলেমিশে থাকা যায় কীভাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অন্যের মতামত নেওয়া ও পছন্দকে শ্রদ্ধা করার মানসিকতা থাকতে হবে। আমি যদি স্ত্রীর পছন্দকে শ্রদ্ধা না করি, মতামত গ্রহণ না করি তাহলে সামাজিক অন্যান্য কাজেও অন্য কারও মতামত নিতে পারবো না। আর এটা না পারলে আমি কখনও সামাজিক মানুষ হতে পারবো না। তাই নিজের ঘর থেকেই এই চর্চা শুরু করা উচিত।’

 

বিশেষজ্ঞ মতামত

এই প্রসঙ্গে কথা হলো শিশু কিশোর উন্নয়ন মনো-সামাজিক সংস্থা প্রেরণার সাধারণ সম্পাদক ও সাইকো থেরাপিষ্ট এস জেড রেজিনা পারভীনের সাথে। তিনি বলেন, ‘দুজন মানুষ দুটো ভিন্ন পরিবার থেকে আসে। ফলে দুজনের মধ্যে পছন্দের পার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে পরষ্পরের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে একজন আরেকজনের পছন্দ ও মতামত গুলো গ্রহণ করতে পারে। শ্রদ্ধাবোধ না থাকলে এই ব্যাপারগুলো কখনও কখনও জটিল হয়ে যায়। সাধারণ খুনসুটি ও ঝগড়া থেকেই অনেক বড় কিছু হতে পারে। ডিভোর্সও হতে পারে। এমনও দেখা যায়, বিয়ের ৩৬ বছর পর ডিভোর্স হয়ে যাচ্ছে।’

পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে দায়ী করে রেজিনা পারভীন বলেন, ‘আমাদের সমাজ যেহেতু পিতৃতান্ত্রিক, তাই মেয়েদেরকেই এই সমস্যাগুলোতে কষ্ট পেতে হয় বেশি। ছেলেরা মেয়েদের ওপর কর্তৃত্ব করে। অধিকাংশক্ষেত্রে স্বামীর পছন্দগুলো স্ত্রীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার একটা প্রবণতা দেখা যায়। এটা একেবারেই উচিত না। স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই ছাড় দেওয়ার মনোভাব থাকতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘অনেকসময় দেখা যায় ছোট ছোট বিষয়েই স্বামী বা স্ত্রী কেউ কাউকে ছাড় দিতে চায় না। যেমন শোবার সময় ফ্যান কমানো, বাড়ানো নিয়েই ঝামেলা তৈরি হয় অনেক সময়। কারও বেশি গরম লাগে, কারও হয়তো ঠান্ডা লাগে। এসব ক্ষেত্রে দুজনের জন্যই ভাল হয় এমন একটি ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে ছোটখাটো বিষয়গুলো অনেকসময় সম্পর্কে তিক্ততা তৈরি করে, পারষ্পারিক শ্রদ্ধাবোধ কমিয়ে দেয়।’

সমাধান কোন পথে?

রেজিনা পারভীন বলেন, ‘ভালোলাগার ব্যাপারগুলো মানুষভেদে আলাদা হবেই। স্বামী-স্ত্রী পরষ্পরের প্রতি আস্থা ও সম্মান থাকলে পছন্দের পার্থক্য নিয়ে সমস্যা হয় না। দুজনকেই ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। দাম্পত্য জীবনে পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে। এক্ষেত্রে আমি মনে করি, কারণ যত ছোট বা বড়ই হোক ভুল স্বীকার করার মানসিকতা দুজনকেই থাকতে হবে। নিজের ভুল স্বীকার করলে কেউ ছোট হয় না। তারপরও যদি স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে কোন টানাপোড়েন তৈরি হয় তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।’

 

মডেল: লায়লা হাসান ও হাসান ইমাম

সারাবাংলা/টিসি/ এসএস

 

 

 

 

 

 

 

পছন্দের পার্থক্য: সামলে নেবেন কীভাবে?
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন