শনিবার ২৩ জুন, ২০১৮, ৯ আষাঢ়, ১৪২৫, ৮ শাওয়াল, ১৪৩৯

পর্ব- ১১ শিমুলের ডালে ডালে হৃদয়ক্ষরণ…

ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০১৮ | ২:৫৪ অপরাহ্ণ

কাকরাইলের চৌরাস্তায় অবস্থিত সবচেয়ে পুরানো শিমুল গাছে ফাগুনে ফোটা প্রথম রাঙা ফুল দেখবার প্রবল বাসনা, সেই বহুকালের অভ্যাস। ছেলেবেলায় শেখা গণসংগীত – ‘রক্ত শিমুল তপ্ত পলাশ দিলো ডাক/ সুনীল ভোরে একুশের মশাল হাতে ছুটে চল নতুন প্রাতে’ – গুনগুনিয়ে মনের ভেতর রক্তে রাঙা হৃদয়ে বিপ্লবের কথা বলে যেতে থাকে।

ফাগুন মানেই আগুন রাঙা দিন। আমাদের দ্বিগুণ হবার সম্ভাবনার কথা বলে যাওয়া, বাতাসে বাহিত হওয়ার সময়।

 

 

পৌষের মাঝামাঝি সময়েই একটা লতানো গাছের খোঁজে নেমেছিলাম নার্সারীতে। বসন্ত আসতেই যেন ফুল ফুটতে আরম্ভ করে তাই ছিল মনে। একটা মরিচ গাছের ড্রাম খালি হয়েছিল। পুরোনো মাটিতে আবারও কিছু জৈবসার মিলিয়ে তৈরি করে রেখেছিলাম তার জন্য। নার্সারীর মালী সঠিক বলতে পারেনি গাছটার নাম। আমি আমার চাষী বুদ্ধিতে পারুল ভেবে তাকে দত্তক নিয়ে এসে ড্রামে বসবাসের জায়গা করে দিয়েছিলাম। লতানো বলে বাঁশের কঞ্চিতে কাঁধ বানিয়ে তাকে হালকা সুতোয় বেঁধে রেখেছিলাম।

শীতের সময় গাছের পরিচর্যা একটু বেশি করতে হয়। শুষ্কতা যেন ভর না করে তাই জল দেয়াটা নিয়মিত হতে হবে। মাঘের প্রথম হতেই সে তিন চারটা নতুন লতা নিয়ে বড় হচ্ছিল। অপেক্ষায় ছিলাম তার ফুল আসবে। পারুল হলে নীল বা বেগুনী হবে জানি। তা না হয়ে আমাকে অবাক করে সাদা সাদা থোকায় থোকায় ফুলের কুঁড়ি বের হচ্ছিল।

ভেবে নিয়েছিলাম হয়তো শুধু সাদা রঙা ফুলই ফুটবে। তাও ফুটুক। পাঁচ/ছয়দিন পর সাতসকালে অবাক করে সাদা ফুলের মাঝখান থেকে এক ফোঁটা রক্তবিন্দুর মতন চারটি লাল পাতাসহ লম্বা কেশর বের হয়েছে। সে এক অভাবনীয় এবং অপার্থিব দৃশ্য। ঠিক যেন হৃদয়ের মাঝখান চিড়ে রক্তক্ষরণ। পরে জেনেছিলাম ইংরেজিতে ‘ব্লিডিং হার্ট’ বলে ডাকা হয় তাকে। আর শ্রদ্ধেয় হুমায়ুন আহমেদ বেঁচে থাকতে এই ফুলের বাংলা নাম দিয়েছিলেন ‘হৃদয়ে রক্তক্ষরণ’।

 

 

আমার চাষাবাদ বাংলাদেশের হৃদয় খুঁড়ে বের করে আনা ইতিহাসের বিষয়গুলোর সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। কখনও প্রতিযোগীতায় নামতে ফল ফুলের চাষ করি না আমি। তাই ছাদবাগান জুড়ে নানা রকমের গাছ দিয়ে এক অদ্ভুত প্রাকৃতিক বাগান তৈরি করছি বছরের পর বছর ধরে। প্রতিটা গাছের সাথে আমার জীবনের একান্ত কোন না কোন স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের ইতিহাস জড়িয়ে আছে।

আগুন ঝড়া ফাগুনে ব্লিডিং হার্ট ছাদবাগান পরিবারের নতুন সংযোজন। যাকে আমি ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আমাদের বলিষ্ঠ রাজনৈতিক ইতিহাস ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ এর প্রতীক হিসেবে আগামীতে দেখে যাবো। যদিও ফুলগুলোর দিকে তাকালেই তারা মনে করিয়ে দিয়ে যায় সেই গণসংগীতের কথাগুলো আবারও, বারবার করে – ‘রক্তে আমার আবার প্রলয় দোলা ফাল্গুনে/ আজ দীপ্ত আত্মভোলা আমি কি ভুলিতে পারি/ আমি কি ভুলিতে পারি একুশে ফেব্রুয়ারী একুশে ফেব্রুয়ারি’ – মোটে তিনটি লতায় ব্লিডিং হার্ট, বাংলা ভাষাকে নিজের করবার মর্যাদার লড়াইয়ের কথা বলে যাচ্ছে। ভাষার জন্য রক্ত দেয়ার কথা বলে যাচ্ছে। বাংলার প্রতিটি শব্দ যেন বাংলা ভাষাভাষিদের হৃদয়ে রক্তক্ষরিত গর্বের, সে কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। বুকের পাঁজরে আগুন লাগবার কথা বলে দিয়ে যাচ্ছে।

 

 

ব্লিডিং হার্ট শুনেছি সম্পূর্ণ লাল রঙাও হয়ে থাকে। আগামীতে ছাদবাগান পরিবারে তাকে দত্তক নেয়ার ইচ্ছে জেগেছে খুব। অতি সাধারণ পরিচর্যায় বেড়ে ওঠা এই লতা বাগানের যে কোণে বেড়ে উঠতে পারবে। পর্যাপ্ত রোদ পেলে বারান্দায়ও রাখা যাবে তাকে। এখন পর্যন্ত কোন পোকামাকড়ের দেখা মেলেনি। তাই সবগুলো লতা খুব সুস্থই আছে। ঝকঝকে গাঢ় সবুজ পাতার গাছে থোকায় থোকায় ফুলগুলো হৃদয়ের রক্তক্ষরণের কথা নীরবে জানান দিয়ে যাবে। ছাদবাগানে ফাগুন মাসে পলাশ শিমুল নাই তো কি হয়েছে! হৃদয়ে রক্তক্ষরণের মতন ফুল তো থাকতেই পারে।

আমি জানি আপনার কাছেও এই ফুল বাংলাদেশের ফাগুনে আগুন রাঙা ইতিহাসের কথা বলবে, ভালোবাসার কথা বলবে। ফুলের দেখা পাওয়া মাত্র মনের কোণে নিজের অজান্তে বলবেন- চাষী পরিবার, সুখী পরিবার।

 

ছবি- লেখক

সারাবাংলা/ এসএস

পর্ব- ১১ শিমুলের ডালে ডালে হৃদয়ক্ষরণ…
পর্ব- ১১ শিমুলের ডালে ডালে হৃদয়ক্ষরণ…