সোমবার ২৮ মে, ২০১৮ , ১৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫, ১১ রমযান, ১৪৩৯

পর্ব -৯ ভালোবাসার কুমড়ো ফুলে ফুলে ….

জানুয়ারি ৩১, ২০১৮ | ১:২৫ অপরাহ্ণ

“কুমড়ো ফুলে ফুলে

নুয়ে পড়েছে লতাটা, সজেন ডাঁটায়

ভরে গেছে গাছটা,

আর আমি

ডালের বড়ি শুকিয়ে রেখেছি।

খোকা, তুই কবে আসবি?

কবে ছুটি?”

চিঠিটা তার পকেটে ছিল

ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা।”

ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ্ লিখেছিলেন এক অপার্থিব বেদনাগাঁথা। আমার মাথায় গেঁথে থাকা তাঁর কবিতায় আমি ভেসে চলে যাই সেই ‘৫২ সাল, ভাষা আন্দোলন, ভাষা শহীদের কাছে। প্রতিটা বাক্য সত্য হয়ে আমার চোখে ভেসে আসতে থাকে। খোকার জন্য মায়ের অপেক্ষা তো শুধু অশ্রুতেই নয়, প্রকৃতির প্রতিটা ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে বসবাস করে। প্রতিটা ধূলোকণায় মায়ের খোকা হারানোর ছোঁয়া খুঁজে পাই আমি।

 

 

চাষাবাদ এক নেশার নাম। মাটির সাথে সময় কাটানোর নেশা। চাষী নিজের শত ক্ষতি মেনে নিয়েও আবারও মাটির নেশায় শস্য ফলায়। প্রকৃতি মাঝে মধ্যে নিজের নিয়ম নিজেই ভাঙ্গে। কখনও নিজস্ব খেয়াল খুশি মতন চলে। প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে, মাটির সাথে হাত তলিয়ে শস্য ফলায় চাষী। বৈরি আবহাওয়াকে নিজের মতন করে মোকাবেলা করবার উপায় খুঁজে নিয়েই চলতে থাকে তার চাষাবাদের সব রকমের আয়োজন।

 

 

সবার কাছে সব শস্য ফলে না। এ আরেক এক অদ্ভুত বিষয়। সে কারণে খেয়াল করবেন বড় চাষীরা একেক জন একেক শস্য বেছে নিয়ে তার চাষাবাদ চালায়। আমার মতন নগর চাষীরা প্রায় সব ধরনের শস্য, সবজি এবং ফুল ফলের গাছ ছাদবাগানে চাষ করতে চায়। তবে যত সময় যায় ঠিক তত জানা হয়ে যায় যে, সে কোন ধরনের চাষাবাদের জন্য উপযুক্ত। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে সেই কবিতার পঙ্তিমালা এতোটাই হৃদয় কামড়ে থাকে যে পর পর তিন বছর কুমড়া চাষে চরম অসফলতাও আমাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি এক ফোঁটাও।

কুমড়ো ফুলে ফুলে নুয়ে পড়েছে লতাটা – অব্যক্ত এক অপেক্ষা দেখবার নেশায় আমি আসক্ত হয়ে আছি। গত তিন বছরে কুমড়া চাষে তাই প্রতি বছরে দুইবার করে চাষ করবার আয়োজন করেছি। একবারও তাদের ফুল দেখবার সুযোগ হয়নি। হয়তো ভুল সময়ে বীজ বুনেছি, নতুবা চাষাবাদের নিয়ম না জানায় তাদেরকে পুরোপুরি বড় করতে পারিনি।

এ বছর আবারও তাই মিষ্টি কুমড়ার বীজ সংগ্রহ করেছিলাম। খুব সযতনে তাদের অঙ্কুরিত হবার জায়গা তৈরি করে বীজ বুনেছিলাম। চারটি বীজ থেকে শুধুমাত্র একটি চারা পেয়েছি। আগে থেকেই তৈরী করেছিলাম। তার বাসস্থানের জন্য একটা মাঝারী ড্রাম। সেখানে তিনভাগ জৈবসার আর একভাগ মাটি সাথে বাসার ফেলে দেয়া সবজি তো আছেই। চারাটি তিন ইঞ্চি হবার পর তাকে তার বাসস্থানে স্থায়ী বসবাসের বন্দোবস্ত করে দিয়েছি। ছয় সাত ইঞ্চি লম্বা হতেই সে কাঁধ খুজছিল। তার প্রতি আমার মনেযোগ অনেক বেশি থাকায় বাঁশের কঞ্চি দিয়ে মাঁচা করে দেই নাই। যদি বা আঘাত লাগে তার গায়ে তাই।

 

 

শুধুমাত্র ফুল যেন দেখতে পাই, সে কারণে আমার চোখের মণি একমাত্র মিষ্টিকুমড়াকে শক্ত নেট দিয়ে ছোট কাঁধ তৈরি করে দিয়েছি। ধীরে ধীরে গুটি গুটি পায়ে তার বড় হয়ে উঠবার মূহুর্তগুলো এ বছরের সেরা প্রাপ্তি হয়ে থাকবে। নেট আঁকড়ে ধরে বড় বড় পাতার মাঝে যেদিন সে ফুল ফোঁটালো, তখন চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। সে মূহুর্তে গত কয়েক বছরের সব অসফলতার কষ্ট ধুয়ে মুছে চলে গিয়েছিল আমার।

 

 

ছাদবাগানে কুমড়া ফুল, শিশু কুমড়া আর কুমড়া লতাগুলো সুস্থ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠছে। তারা ফাগুণ মাসের আগমনী বার্তা দিয়ে যাচ্ছে মাথা নেড়ে। ফাগুণে জন্ম নেয়া ছোট ছোট কালো পোকা হবার আশংকা তারপরও থেকে যায় এসব লতা শস্যতে। সবচেয়ে সহজ কীটনাশক ‘ছাই’ দিচ্ছি তিন চার দিন পরপর। জল তো চলবেই, একবেলা প্রতিদিন।

নেটের মাঁচায় কুমড়া ফুলে ফুলে এখনও নুয়ে পড়েনি লতাগুলো। তারপরও সেই খোকার জন্য অপেক্ষারত মায়ের জন্য উৎসর্গীত করে দিয়েছি আমার এ পর্যন্ত ফোঁটা সবগুলো কুমড়া ফুল। শত ব্যর্থতার বেদনা উপেক্ষা করে গাছেদের সাথে, ফুলেদের রঙে পথ চলতে চলতে তাই আবারও গুনগুনিয়ে উঠি। চাষী পরিবার, সুখী পরিবার।

 

সারাবাংলা/এসএস

Tags: ,

আরও পড়ুন