বুধবার ২০ মার্চ, ২০১৯ ইং , ৬ চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১২ রজব, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

পাখির চোখে দেখে আসা পদ্মাসেতু

জানুয়ারি ৬, ২০১৯ | ১:৪২ অপরাহ্ণ

মাহমুদ মেনন, নির্বাহী সম্পাদক ।।

পাখির ডানা মেলে তখন পদ্মার আকাশে চোখ মেলেছে টিম সারাবাংলা। শীতের সোনারোদ ঝিলিক মারছে নদীর বুকে। এরই মাঝখান দিয়ে নদীকে এ ফোঁড়-ও ফোঁড় করে দিয়ে চলে গেছে একটি পথ। সে পথে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে বেশকিছু পিলার। ক্রমেই বড় হতে থাকে চোখ। ঘনিয়ে আসে দৃষ্টিসীমা। তাতে নজরে পড়ে রূপালি নদীর বুকে আরও রূপালি এক অবয়ব, স্বপ্নের পদ্মাসেতু।

এবার সেতুর পাটাতনে নেমে আসে টিম সারাবাংলা। এটি জাজিরার অংশ। প্রথম পাটাতন দিয়ে চলে যাবে সড়ক পথ। নিচে দ্বিতীয় পাটাতনে বসছে রেল লাইনের স্ল্যাব। সেখানে ধুন্ধুমার কাজ চলছে। শ্রমিকরা জানালেন ১১২টি স্ল্যাব এরইমধ্যে বসে গেছে।

আর সেতু প্রকল্পের উপ-সহকারী প্রকৌশলী হুমায়ূন কবির জানালেন, স্ল্যাবগুলো তৈরি হচ্ছে ওয়ার্কশপে। সেখানেই পুরোপুরি প্রস্তুত করে বার্জে করে বয়ে আনা হয়। এরপর ক্রেনের সাহায্যে তোলা হয় সেতুর পাটাতনে। সেতুর নিচের পাটাতনে মাঝ বরাবর বসিয়ে দেওয়া হয় স্ল্যাবগুলো। এগুলোর ওপর দিয়ে বয়ে যাবে একটি ব্রজগেজ রেলওয়ে। আর সেতুর রেল পাটাতন থেকে সড়ক পথের পাটাতনের মাঝে যে উচ্চতা, তাতে রেলপথে দুই স্তরের কনটেইনার পরিবহন করা যাবে।

এরআগে সেতুর এ পর্যন্ত যতটুকু অগ্রগতি, তা তুলে ধরছিলেন এই উপ-সহকারী প্রকৌশলী। জানাচ্ছিলেন, প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ এরইমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

সেতুর কিছু সাধারণ তথ্য
মূল সেতু:              ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার।
পিয়ার (পিলার):     ৪২টি।
স্প্যান:                  ৪১টি।
পাইল:                  ২৯৪টি। যার মধ্যে-
– ১৮টি পিয়ারে ৬টি করে মোট ১০৮টি স্টিল টাবলার ড্রাইভেন পাইল।
– ২২টি পিয়ারে ৭টি করে মোট ১৫৪টি স্টিল টাবলার ড্রাইভেন পাইল।
– ২টি পিয়ারে ১৬টি করে মোট ৩২টি বোরড পাইল।


সেতুর যেসব কাজ এগিয়ে চলেছে
পাইল বসানো পুরোপুরি (পানির উপর ও নিচ) শেষ হয়েছে:    ১৮৮টির।
পাইলের নিচের অংশ বসানো শেষ হয়েছে:                           ১১টির।
নকশা শেষ হয়েছে:                                                          ৪০টি পিয়ার ২৮০টি পাইল।
নকশা রিভিউ করা হচ্ছে:                                                   ২টি পিয়ার ১৪টি পাইল।
পাইল বানানো শেষ হয়েছে:                                                ২২০টি।
পিয়ারের পূর্ণাঙ্গ কাজ শেষ হয়েছে:                                       ১৫টি।
স্প্যান বসানো হয়েছে:                                                       ৬টি।
যেসব পিয়ারে ৬টি করে পাইল বসছে:                                  পি২-পি৫, পি১৩-পি১৪, পি১৬-পি১৮, পি২০-পি২৩, পি৩৭-পি-৪১
যেসব পিয়ারে ৭টি করে পাইল বসছে:                                  পি৬-পি১২, পি১৫, পি১৯, পি২৪-পি৩৬।


যেসব কাজ বাকি রয়েছে

স্কিন গ্রাউটেড পাইল ৭৭টি। যা বসবে
পি৬-পি১১, পি২৬-পি২৭, পি২৯-পি৩২ নম্বর পিয়ারে
স্টিল পাইল পুরোপুরি বসানো হয়েছে ৫৬টি
স্টিল পাইল আধাআধি বসানো হয়েছে ১১টি
ডিজাইন পর্যালোচনায় রয়েছে পিয়ার ৬ ও পিয়ার ৭

মোট ৭টি মডিউলে ভাগ করে চলছে সেতু নির্মাণের কাজ। এরমধ্যে মডিউল-১-এর পিয়ার নম্বর ৬ ও ৭ নিয়ে কিছু জটিলতার কথা আগে থেকে শোনা যাচ্ছিল। প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান মো. আবদুল কাদের সে বিষয়টিই স্পষ্ট করলেন সারাবাংলার কাছে। তিনি বলেন, ‘প্রমত্তা পদ্মার স্রোতই কেবল নয়, এর তলদেশের মাটিও বড় অবাধ্য। সেতু প্রকল্পের শুরুতে আমরা প্রতিটি পিয়ারের অবস্থান নির্ণয় করে সয়েল টেস্ট করে নেই। কিন্তু ওই সময় নদীর তলদেশে, বিশেষ করে যে অংশে পিয়ার ৬ ও ৭ বসছে, তার মাটির যে অবস্থা ছিল, তা এখন অনেকটাই পাল্টে গেছে। ফলে নতুন করে মাটি পরীক্ষা করে পাইল বসানোর পদ্ধতি ও পাইলের স্ট্রাকচারে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে।’

এই প্রকৌশলী আরও জানান, টিউব অ্যা ম্যানশেট (ট্যাম) নামের একটি পদ্ধতির কথা। যা ব্যবহারে তৈরি হচ্ছে বিশেষ পাইল।

সে পাইল দেখতে কেমন? তা সরেজমিন দেখতে টিম সারাবাংলা যায় পদ্মার মাওয়া পয়েন্টে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে গড়ে তোলা ওয়ার্কশপে। সেখানে চলছে আরেক কর্মযজ্ঞ। এখানে কাজের তদারকি করছিলেন প্রকৌশলী মোহাম্মদ নূরে আলম। তিনি ব্যাখ্যা করে জানালেন পুরো প্রক্রিয়াটি। বললেন, ‘ট্যাম একটি অত্যাধুনিক প্রক্রিয়া। এতে প্রতিটি পাইলের ভেতরে ও বাইরে খাঁজ বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যেন মাটির গভীরে যখন যাবে, তখন চারিদিক থেকে মাটিগুলো আটকে থাকতে পারে। নদীর তলদেশে মাটির গতিবিধি পাল্টালেও সেতুর পাইলগুলোতে কোনও সমস্যা হবে না।’

দেখা গেছে, বিশাল ওয়ার্কশপে বিপুলকায় কয়েকটি পাইল প্রস্তুত হয়ে রয়েছে পদ্মার গভীরে প্রোথিত হওয়ার অপেক্ষায়। কোনো কোনোটি তৈরির কাজ এগিয়ে চলেছে।

সব কাজই কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক মেশিনে সম্পন্ন হচ্ছে। ওয়ার্কশপে সে অর্থে শ্রমিক নেই বললে চলে। মেশিন কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। তদারকিতে বসে আছেন দেশি-বিদেশি প্রকৌশলীরা। লেজার দিয়ে কাটা হচ্ছে ইস্পাত। কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত সে মেশিন একের পর এক খাঁজ কেটে যাচ্ছে নির্দিষ্ট ব্যবধানে।

ওয়ার্কশপে দেখা গেলো, একসঙ্গে এগুচ্ছে পাইল ও স্প্যান তৈরির কাজ। ওয়ার্কশপের বাইরের দিকে পদ্মার তীর ঘেঁষে দেখা গেলো দুটি স্প্যান পুরোপুরি প্রস্তুত। তাতে সূর্যের আলো পড়ে চিকচিক করছে। অদূরে স্প্যান বহনকারী বিপুলাকায় সাদা রঙের ক্রেনটি রয়েছে নোঙর ফেলে। এরই মধ্যে পদ্মা সেতুর ৭টি পিয়ারের ওপর ৬টি স্প্যান বসে গেছে। জাজিরা অংশে পিয়ার নম্বর ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪১ ও ৪২-এর ওপর বসেছে পাঁচটি স্প্যান। সে অংশে প্রতিটি স্প্যান ১৫০মিটার হিসাবে নদী পথে পদ্মাসেতু বিস্তৃত হয়ে রয়েছে ৭৫০ মিটার পর্যন্ত।

এদিকে মাওয়া অংশে পিয়ার নম্বর ৪ ও ৫-এর ওপর বসেছে আরও একটি ১৫০ মিটার দীর্ঘ স্প্যান।

কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, এরই মধ্যে জাজিরা অংশে পিয়ার-৩৬ পুরোপুরি প্রস্তুত। সে অংশে একটি স্প্যান বসালে সেপথেই টানা ৯০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে সেতু। এছাড়া মাওয়া অংশে পিয়ার ২ ও পিয়ার ৩ পুরোপুরি প্রস্তুত। তাতে দুটি স্প্যান বসানো হলে এই অংশে ৪৫০ মিটার পর্যন্ত আকার পাবে সেতু।

এছাড়া, মাঝামাঝি অংশে মডিউল-৩-এ পিয়ার ১৩, ১৪ এবং পিয়ার ১৬ ও ১৭ পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। এতেও বসানো যাবে আরও দুটি স্প্যান। যা বসানো হয়ে গেলে সেতুর মোট কাঠামো বাড়বে আরও ৩০০ মিটার।

ওদিকে ওয়ার্কশপে দুটি স্প্যান রূপালি রঙ নিয়ে পদ্মার তীর ঘেঁষে পুরোপুরি প্রস্তুত। তিনটি স্প্যানে দ্বিতীয় ছোপ হিসেবে সোনালি রঙ লাগানো হয়েছে। সে রঙ শুকালে তৃতীয় ছোপ হিসেবে রূপালি রঙ লাগানো হবে।

কর্তৃপক্ষের গ্রিন সিগন্যাল পেলেই অন্তত দুটি স্প্যান বসানোর জন্য পদ্মার তীর পুরোপুরি প্রস্তুত। সংশ্লিষ্টরা জানালেন, শীত মওসুমে নদীতে চর জেগেছে। চর কাটার কাজ চলছে। সে কাজ শেষ হলেই বসানো হবে এ দুটি স্প্যান।

আর সেগুলো বসানো হয়ে গেলে ২০১৯ সালের প্রথম এক দুই মাসেই পদ্মাসেতু বিস্তৃত হবে দেড় কিলোমিটারেরও বেশি পথ।

এসব কর্মযজ্ঞ দেখতে দেখতে টিম সারাবাংলা আবার উঠে আসে আকাশে। দৃষ্টি বিস্তৃত করে দেখে আসে ওপাড়ে জাজিরা পয়েন্টে সেতুর টোল প্লাজা ছাড়িয়ে লিংক রোডসহ সব কিছু প্রস্তুত। এপাড়ে ওয়ার্কশপের বিস্তীর্ণ মাঠ পেরিয়ে সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে থাকা পিলার। সড়ক পথে মাওয়া ছাড়িয়ে অনেকদূর পর্যন্ত চলছে নানান কর্মযজ্ঞ।

সারাবাংলা/এমএনএইচ

Tags: , ,

পাখির চোখে দেখে আসা পদ্মাসেতু
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন