বুধবার ২০ জুন, ২০১৮, ৬ আষাঢ়, ১৪২৫, ৫ শাওয়াল, ১৪৩৯

পাঠকের মননে লেগেছে রুচির ছোঁয়া

ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৮ | ২:৫৯ অপরাহ্ণ

 এসএম মুন্না ।।

অমর একুশে গ্রন্থমেলা বাঙালির প্রাণের মেলা। একই সাথে জ্ঞান এবং সৃজনশীলতার মেলা। তাই নতুন প্রজন্মের পাঠকদের আগ্রহ বেড়েছে সৃজনশীল ও গবেষণাধর্মী বইয়ের প্রতি। জনপ্রিয়ধারার লেখকদের পাশাপাশি গবেষণাধর্মী বইও বিক্রি হচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা বেশি এগিয়ে আছেন।

মেলায় অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। তাদের রয়েছে নানা রকমের গবেষণাধর্মী বই। বিশেষ করে বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের জ্ঞানকোষ ‘বাংলাপিডিয়া’জন্য বিখ্যাত এ প্রতিষ্ঠান। ‘ঢাকা কোষ’সহ ঢাকা বিষয়ক বেশ কয়েকটি গবেষণাধর্মী বই বের করেছে তারা। সমঝদার পাঠকরা একবারের জন্য হলেও ঘুরে আসছেন এ স্টল থেকে। আগ্রহভরে নেড়েচেড়ে দেখছেন বাংলাপিডিয়াসহ অন্য বইগুলো। কথা হয় রাজধানীর শ্যাওড়াপাড়া থেকে আসা সৈয়দ জাহিদুল হকের সাথে। তিনি জানালেন, ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে তার আগ্রহ সেই স্কুলজীবন থেকেই। তার একটা ব্যক্তিগত লাইব্রেরি রয়েছে। প্রতি বছর মেলা থেকে বই কেনেন। তবে বেশি কেনেন গবেষণাধর্মী বই। এবারও এসেছেন ঢাকা কোষসহ ঢাকা বিষয়ক কয়েকটি গবেষণার বই।

এশিয়াটিক সোসাইটি মেলা উপলক্ষে বাংলাপিডিয়ার বাংলা ও ইংরেজি ভাষার দুইটি সংস্করণে ওপর ৫০ শতাংশ ছাড় দিচ্ছে। সোসাইটির অন্যান্য গবেষণাধর্মী বইয়ের জন্য প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে দর্শনার্থীদের ভিড়।

জাতীয় জাদুঘর, শিল্পকলা একাডেমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থা, প্রেস ইন্সটিটিউট বাংলাদেশ, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের স্টলে পাওয়া যাচ্ছে বিষয়ভিত্তিক গবেষণাধর্মী বই। স্টলগুলোর বিক্রয়কর্মীরা জানালেন, ‘এসব বইয়ের পাঠক ভিন্ন। সাধারণ পাঠকরা এসব বই দেখে চলে গেলেও যাদের পছন্দের বিষয় গবেষণা তারা বই কেনার জন্য এখানে আসেন।’

একাধিক প্রকাশক জানালেন, ‘এখন শুধু জনপ্রিয় ধারার বই নয়, সৃজন ও মননশীল বইয়ের প্রতি পাঠকদের রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। প্রবন্ধ, গবেষণা, ইতিহাসধর্মী বইয়ের একটি বিশেষ পাঠকগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে।

একাধিক শিক্ষার্থী জানালেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে অ্যাসাইমেন্ট করতে গবেষণাধর্মী বইয়ের প্রয়োজন। অন্যান্য সময়ে এ ধরণের বই খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়। কিন্তু বইমেলায় এসব বই পাওয়া যায়। তবে মেলায়ও খুঁজে বের করতে বেশ সময় লাগে। মেলায় যদি একটি স্থানে শুধু গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা কর্নার থাকতো তাহলে সময় বেঁচে যেতো।

অ্যাডর্ন পাবলিকেশন গবেষণা, নিরীক্ষা ও সিরিয়ার বই প্রকাশ করে আসছে কয়েক বছর ধরে। এবারও বেশ কয়েকটি বই প্রকাশ করেছে যা বেশ প্রশংসাযোগ্য। অ্যাডর্নের প্রধান নির্বাহী সৈয়দ জাকির হোসাইন সারাবাংলাকে বলেন, ‘গল্প-উপন্যাসের পাশাপাশি  সৃজনশীল ও গবেষণাধর্মী  বইয়ের চাহিদা বেড়েছে। তারা শুধু সাময়িক আনন্দের জন্য বই না পড়ে, জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে বই পড়েন। পাঠকের মননে লেগেছে রুচির ছোঁয়া। তারা এখন তথ্য চান।’

উৎস প্রকাশনেও পাওয়া যাচ্ছে গবেষণাধর্মী বই জানালেন এর সত্ত্বাধিকারী মোস্তফা সেলিম। তাদের স্টলে পাওয়া যাচ্ছে নাগরি সাহিত্য, হালতুন নবী, সিলেটের ইতিহাস, আদিবাসী ইতিহাসসহ নানা গবেষণা ও ইতিহাসধর্মী বই।

বাংলায় লেখা বা বাংলায় অনূদিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই এখন আর পাওয়া যায় না। হয়তো কারও কারও সংগ্রহে রয়ে গেছে একটা-দুটো কপি। তবে বইগুলোর প্রতি পাঠকের আগ্রহ কিন্তু রয়েই গেছে। পাঠক যে ধরণের বই খোঁজে কিন্তু পায় না-সে রকম কিছু দরকারি কিন্তু দুষ্পাপ্য বই সংগ্রহ করে ছাপছে দিব্যপ্রকাশ। এই স্টলে পাওয়া যাচ্ছে ‘আইন-ই-আকবরী’পুরনো সংস্করণসহ বেশ কিছু বিষয়বৈচিত্র্য নতুন বই।

ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ, ঐতিহ্য, অনিন্দ্য প্রকাশন, অবসর, আদর্শ, অনুপম, মাওলা ব্রাদার্স এ গবেষণাধর্মী বই পাওয়া যাচ্ছে । আর বাংলা একাডেমিতে তো রয়েছে গবেষণাধর্মী বইয়ের বড় ভাণ্ডার।

একুশে স্মরণে ১৯৭২ সাল থেকে শুরু হয় বাঙালির প্রাণের এ উৎসব। একুশের চেতনা ধারণ করে এ মেলা শুরু হলেও বাংলা ভাষা ও ভাষা আন্দোলনের ওপর মিলছে না গবেষণা ও ইতিহাসধর্মী মানসম্পন্ন বই। ভাষা আন্দোলনের ৬৬ বছর পূর্তি হলেও এবারের মেলায় খুবই স্বল্পসংখ্যক বই এসেছে ভাষা আন্দোলন নিয়ে। একই কথা বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও গবেষণাধর্মী বইয়ের ক্ষেত্রে বলা যায়। প্রকাশকরা বলছেন, ‘পাণ্ডুলিপির অভাব’ ও ক্রেতাদের অনাগ্রহ দুটো বিষয়ই এ ক্ষেত্রে কাজ করছে। তবে গবেষক ও লেখকরা বলছেন, ‘প্রকাশকদের বাণিজ্যিক বই করার প্রবণতার জন্য এ ধরনের বই কমেছে।’ একই সুরে পাঠকরা জানান, বাংলা ভাষা ও ভাষা আন্দোলনের ওপর গবেষণাধর্মী বই তারা পড়ে। তবে এসব বইয়ের প্রকাশনা খুব কম। মেলায় রীতিমতো হাতড়ে খুঁজতে হয় এ ধরনের বইগুলো।

বাংলা একাডেমির সমন্বয় ও জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এ পর্যন্ত ৪ হাজার ১৭ টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে বাংলা ভাষা, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর রচিত গবেষণাধর্মী বইয়ের সংখ্যা মাত্র ১৮৪। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত বই রয়েছে ৭০-৭৫টি। ভাষা আন্দোলনের বইয়ের সংখ্যা একেবারেই কম।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভাষা আন্দোলনের ওপর বই প্রকাশে পিছিয়ে আছে বড় প্রকাশনা সংস্থাগুলোও।

সৃজনশীল ও মননশীল প্রকাশনা সংস্থা আগামী প্রকাশনীর প্রধান নির্বাহী ওসমান গনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের দেশে ভাষা আন্দোলনের ওপর লেখার মতো লেখকের অভাব রয়েছে। ফলে আমরা চাইলেও এ বিষয়ের ওপর নতুন বই বের করতে পারছি না। এ বিষয়ের ওপর যেসব বই আছে, তার সবই পুরনো। আর আমি ব্যক্তিগতভাবে নতুন মলাটে পুরনো বই বিক্রি করার পক্ষে নই।’

ভাষা সংগ্রামী ও বিশিষ্ট গবেষক-লেখক আহমদ রফিক সারাবাংলাকে বলেন ‘আমাদের দেশে ভাষা ও ভাষা আন্দোলনের ওপর বহু ভালো কাজ হয়েছে। বই ও বিভিন্ন গবেষণাপত্রও প্রকাশিত হয়েছে। তবে তা সংখ্যায় কম। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট নিয়ে যেসব বই বের হয়েছিল, এখন তা বাজারে নেই। কিন্তু এ বইগুলোর পুনর্মুদ্রণের বিষয়ে প্রকাশকরা উৎসাহী নন। প্রকাশকদের এটি এক ধরনের ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি। এ বিষয়ে লেখকদের একতাবদ্ধ হতে হবে। প্রতিবাদ জানাতে হবে প্রকাশকদের এ অন্যায় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে।’

এ ছাড়াও তিনি গবেষকদের ভাষা আন্দোলনের ওপর কাজ করতে অনুরোধ জানান।

বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণাধর্মী বই :  বাংলায় মুসলিম স্থাপত্য- বুলবন ওসমান (সময় প্রকাশন), বাংলাদেশে গণতন্ত্রের হাল- হারুনুর রশীদ (আনন্দধারা), শরৎসাহিত্যে ব্যক্তি ও সমাজ- ড. সেলিমা সাঈদ (প্রতিভা প্রকাশ), ইতিহাস সমাজ ও সংস্কৃতি-শফিউদ্দিন তালুকদার (কথাপ্রকাশ), বাংলা লোকগান- আবু ইসহাক হোসেন, (শোভা প্রকাশ), নোয়াখালীর নারী মুক্তিযোদ্ধা- এ. কে. এম. গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ (তৃণলতা প্রকাশ), সিলেটের প্রত্নসম্পদ- মোহাম্মদ আবদুল হাই (চৈতন্য প্রকাশ),  গণহত্যা গজারিয়া : রক্ত মৃত্যু মুক্তি-সাহাদাত পারভেজ (সাহিত্যপ্রকাশ), উকিল মুন্সি : প্রামাণ্য পাঠের সন্ধানে-মুহম্মদ আকবর (য়ারোয়া বুক কর্ণার), বাংলাদেশের মণিপুরী ভাষা সাহিত্য- ড. রণজিত সিংহ (আজকাল), বাংলাদেশের ইতিহাস- ড. ওয়াজেদ আলী ও শায়খুল ইসলাম মামুন জিদাদ, (তাম্রলিপি), ভারতবর্ষ এবং বাঙালির স্বশাসন (১ম খণ্ড) শেখ হাফিজুর রহমান (বাংলা একাডেমি), স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের পেছনের কথা- রঙ্গলাল দেব চৌধুরী (মূর্ধন্য), মধুকবির জীবনে নারী- মুহম্মদ শফি (আগামী), শঙ্খশিল্প- শিপ্রা সরকার, (কথাপ্রকাশ), ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ- মহসিন হোসাইন (জ্যোতিপ্রকাশ), ভয়াল ২৫ মার্চ রাত ও মুজিবনগর ইতিহাস- ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম (ভোরের শিশির), মুক্তিযুদ্ধ ও মিত্রবাহিনী- আসাদুজ্জামান আসাদ (আগামী), রংপুর বিভাগ ইতিহাস ও প্রত্নসম্পদ- মো. জাহাঙ্গীর আলম (আহমদ পাবলিশিং), রবীন্দ্র বিচিত্রা- ড. নাসরীন জেবিন (অনন্যা), ইলিশ কথা- হাসান মেহেদী (যুক্ত), নারী পুরুষ ও পরিবারের বিবর্তন- গরীব নেওয়াজ (অন্যপ্রকাশ), প্রাচীন ভারতে বিবাহ- জীবন মুখোপাধ্যায় ( আকাশ), অভাজনের রবীন্দ্রনাথ- মফিদুল হক (বিদ্যাপ্রকাশ), শব্দ ও বাক্যের শুদ্ধ প্রয়োগ- ড. ফজলুল হক সৈকত (শাহজী), সিপাহি বিদ্রোহে দিল্লির যন্ত্রণা- আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু (কারুবাক), রংপুরের লোক সাহিত্য ও সংস্কৃতি-আনওয়ারুল ইসলাম রাজু (আইডিয়া প্রকাশন), মুক্তিযুদ্ধে দাস পার্টি-রনেন্দ্র তালুকদার পিংকু (নাগরী), উলকান্দি থেকে ভৈরব- মুহম্মদ মনিরুল হক (বাংলা একাডেমি) বাংলাদেশের ফোকলোর, তত্ত্ব ও অধ্যয়ন-মোস্তফা তারিকুল আহসান (বেহুলা বাঙলা)।

সারাবাংলা/এসএমএম/পিএম

 

পাঠকের মননে লেগেছে রুচির ছোঁয়া
পাঠকের মননে লেগেছে রুচির ছোঁয়া