সোমবার ২৮ মে, ২০১৮ , ১৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫, ১১ রমযান, ১৪৩৯

পুরুষতন্ত্র কেন যুগ যুগ ধরে টিকে থাকে?

নভেম্বর ২৭, ২০১৭ | ১০:০৪ পূর্বাহ্ণ

সাদিয়া নাসরিন

“Patriarchy has no gender.” নারীবাদী লেখক ও সোশ্যাল এক্টিভিস্ট বেল হুকসের বিখ্যাত উক্তিটি পরিষ্কারভাবে নির্দেশ করে যে, পুরুষতন্ত্রকে কেবল পুরুষের ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া দিয়ে ডিফাইন করা যায়না। বরং পুরুষতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখে বহু প্রতিষ্ঠান, প্রথা এবং সংস্কৃতি। নিপীড়নের অন্যান্য ধরনের মতোই পিতৃতন্ত্র আমাদের কনভিন্সড করতে পেরেছে যে, পুরুষাধিপত্যের এসব প্রতিষ্ঠান, বিশ্বাস, প্রথা এবং চর্চাগুলো সব সময় এভাবেই ছিলো, এভাবেই আছে, তাদের কোন বিকল্প নেই এবং সেহেতু এগুলো কখনো পরিবর্তিত হবেনা। নারী পুরুষ নির্বিশেষেই এই বার্তাকে বহন করেছে এবং পিতৃতন্ত্রের এই ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করাকে প্রতিরোধ করেছে।

পুরুষতন্ত্রের প্রথম সুবিধাভোগী হলো পুরুষ যে নিজের প্রয়োজনে পুরুষতন্ত্রকে দীর্ঘজীবী করে। নারীকে সম্পূর্ণ বন্দী করতে না পারলে ধ্বংস হবার যে ভয় পুরুষের রয়েছে সেই ভয় থেকে পুরুষ গড়ে তুলেছে পিতৃতান্ত্রিক সভ্যতা যার সব কেন্দ্রেই নিজের অবস্থান প্রধান করেছে পুরুষ এই সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত এমন কোন ক্ষেত্র নেই যেটি পুরুষ তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নারীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করেনি। পুরুষ ব্যবহার করেছে পরিবার, সমাজ, ধর্ম, রাষ্ট্রের মতো একপেশে প্রতিষ্ঠান, এনেছে ধর্মের দোহাই, দর্শন, সাহিত্য এবং শাস্ত্র। প্রাইভেট ও পাবলিক ডোমেইনের ক্ষেত্র তৈরি করে পুরুষকে মুখ্য ও নারীকে গৌণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, পরিবার ও মাতৃত্ব নিয়ে পুরুষতান্ত্রিক মিথকে সুবাসিত করেছে। “এতো অস্ত্র আর প্রস্তুতি নিয়ে কোন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়নি পৃথিবীর কোন সেনাবাহিনি…( নারীঃ হুমায়ুন আজাদ)”।

যে ধারণাগুলো পুরুষতন্ত্রকে চিরস্থায়ী করেছে তার মধ্যে প্রথম এবং প্রাথমিক প্রচার হলো, “ছেলেরা ছেলে হবে।” এই ধারণা পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায় চলতে থাকা সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক বর্ণনাগুলোর একটি যা পুরুষকে সমস্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণের বিরুদ্ধে গিয়ে জৈবিকভাবে নির্দিষ্ট কিছু আচরণ করার জন্য, ‘প্রোগ্র্যামড’ করে দেয়। এই আচরণগুলো পুরুষকে, অনেক নারীকেও ‘ম্যাচোগিরি’ বা ‘মর্দানি’ স্বভাব উদযাপন করতে উৎসাহিত করে, যার ফলে বেশিরভাগ পুরুষই অন্য পুরুষের পুরুষতান্ত্রিক আগ্রাসন এবং লৈংগিক সহিংসতাকে চ্যালেঞ্জ করার বদলে নিরব থাকতে, উপেক্ষা করতে এবং পুরুষালী বৈশিষ্ট্য ও অ্যাকশনগুলো রক্ষা করতে বাধ্য হয়।

তাই এখনো এই সমাজে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বললে পুরুষরা একাট্টা হয়ে দল পাকায়। নারীর প্রতি বঞ্চনা, বৈষম্য, নিপীড়ন আর নির্যাতনের প্রতিবাদে কথা বললে পুরুষ প্রতিক্রিয়া দেখায়, প্রত্যেকেই মনে করে তার দিকেই বুঝি আঙ্গুল তুলেছি আমরা। এই দেশে ধর্ষণাক্রান্ত নারী বাঁচার জন্য ধর্ষকের লিঙ্গ কেটে দিলে ‘পুরুষ’রা ব্যাথা পায়। এই দেশে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বললে বেশির ভাগ পুরুষই নারী প্রধানমন্ত্রী, নারী বিরোধীদলীয় নেতা, নারী স্পিকার, নারী সচিব, সংসদে সংরক্ষিত আসন ইত্যাদি উদাহরণ দিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে পাশ ফিরে ঘুমান।

যুগের পর যুগ ধরে এই পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতাকে নিরাপদে চলমান রাখার জন্য এর প্রাথমিক মুখপাত্র হিসেবে তৈরি করেছে একদল সুবিধাভোগী নারীগোষ্ঠি, যারা নিজেদের উপর পুরুষের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্যকে সমীহ করে এবং টিকিয়ে রাখে। রোজগার-উৎপাদন থেকে সম্পুর্ণ নির্বাসিত হয়ে গৃহকর্ম, মাতৃত্ব আর যৌনতার কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পন করা এই নারীদের মানসিক গঠন এমন করে ফিক্সড হয়ে যায় যে, তারা, রোজগেরে স্বনির্ভর নারীদের “বেচারা” হিসেবে চিহ্নিত করে আর ভাত কাপড়ের জন্য বাবা-স্বামী-ছেলের উপর নির্ভর করে নিজেদের সুখী নারী হিসেবে ব্র্যান্ডিং করে। এই শিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত নারীদের জীবন দর্শনটি অত্যন্ত স্বাভাবিক যেখানে তারা চান স্বামীরা তাদের এটিএম মেশিন হয়ে তাদের জীবনকে সুখ আর সচ্ছলতায় ভরিয়ে রাখবে। এই পুরুষতান্ত্রিক নারীরা পুরুষের পাশাপাশি নারীর বিরুদ্ধে সক্রিয় থাকেন, পুরুষের ভাষায় কথা বলেন, পুরুষের স্বার্থ রক্ষা করেন এবং পুরুষতন্ত্রের ভিত্তি পাকা করেন।

আবার, পুরুষতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করে নারী এবং পুরুষ উভয়কেই এই চোরাগলি থেকে মুক্ত করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ ও কণ্টকময় পথে যারা হাঁটছেন তাদের মধ্যেও দৃশ্যমান আদর্শিক বন্ধন বা ঐক্য গড়ে উঠেনি। কারণ, পুরুষতন্ত্রের রাজনীতি ঠিক এটাই চায়। কেননা, পুরুষতন্ত্রকে আরো হাজার বছর টিকিয়ে রাখতে হলে নারী অধিকার আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, নারীদের মধ্যে অনৈক্য নিয়ে আসা, এবং পরষ্পরের প্রতি সন্দেহ ঢুকিয়ে দেওয়ার মতো ভালো অস্ত্র আর কী আছে পুরুষের হাতে? আর পুরুষতন্ত্রের ফাঁদে পা দিয়ে নারীরা বিভক্ত হয়েছে, দ্বিখণ্ডিত হয়েছে। নারীদের মধ্যে এই বিভক্তি, ভয় আর সংস্কারই পুরুষতন্ত্রকে টিকিয়ে রেখেছে যুগ যুগ ধরে।

পুরুষতন্ত্রের পাথর দেয়াল ভাঙ্গতে না পারার আরেকটা বড় কারণ হলো, নারী-পুরুষের সমতার যে চলমান আন্দোলন তার সাথে নারীদের বড় একটা অংশের কোন সম্পৃক্ততা তো নেই-ই, ন্যুনতম কৌতুহল পর্যন্ত নেই। কারণ, নারীর সমান অধিকার আন্দোলন নিয়ে বিরক্ত পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা এমন শিক্ষা-দীক্ষা, প্রথা-প্রচারণা চালিয়ে এসেছে যেন নারী নিজের অস্তিত্ব, স্বকীয়তা, স্বাধীনতা ইত্যাদি মৌলিক মানবিক বিষয়ে ভাবার সুযোগ না পায়। তাছাড়া, পুরুষতান্ত্রিকতাকে চ্যালেঞ্জ করার কাজটা পুরুষদের কাছে অনাকংখিত তো বটেই, নারীদের জন্যও যথেষ্ট কষ্টের। কারণ, নারীদেরকে তাদের একান্ত ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোর ভেতরে থেকেই এসব প্রশ্ন তুলতে হয় এবং এর মধ্যেই সামাজিক ও পারিবারিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক নির্মাণ করতে হয়। নারীদের জন্য এই ঝুঁকি নেয়ার মতো জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শণের চর্চার কোন ক্ষেত্র অনায়াস করে রাখেনি পুরুষরা।

লিঙ্গ বৈষম্যকে আমরা শুধুমাত্র নারীর ইস্যু হিসেবে ভাবতে থাকি বলেই পুরুষের হাতে পুরুষতন্ত্র দীর্ঘজীবী হয়। পুরুষের স্বাভাবিক মানবিক বিকাশকে খণ্ডিত করেছে পুরুষতন্ত্রের লিঙ্গ রাজনীতি, যেখানে একটি ছেলেকে শৈশব থেকে শেখানো হয় কোমলতা পুরুষকে মানায়না, চোখের জলে পৌরুষ থাকেনা, ভয়, দুর্বলতা, আপোষ পুরুষের জন্য নয়। পুরুষতন্ত্র নির্ধারণ করেছে পুরুষকেই সবসময় উপার্জন করতে হবে, দায়িত্ব নিতে হবে, রক্ষা করতে হবে, জয়ী হতে হবে। এই ব্যবস্থায় আগ্রাসী ছেলেদের প্রশংসার চোখে দেখা হয়, কোন পুরুষ আগ্রাসী না হলে তাকে ‘মেয়েলি’ বলে নিপিড়ন করা হয়; উগ্র ছেলেরা শান্ত স্বভাবের ছেলেদের নির্যাতন করে, যৌন হয়রানি করে। পুরুষতন্ত্র যে শুধু নারীকেই নিপীড়ন করেনি, পুরুষকেও শৃংখলিত ও শোষিত করেছে এই সত্যকে স্বীকার করতে না পারার কারণেই পুরুষরা নিজস্ব ব্যক্তিত্বের স্বাধীনতা হারিয়ে “পৌরুষের দাসে” পরিণত হয়, যেখানে ক্ষমতা চর্চার উৎসই হলো পুরুষতন্ত্র।

পুরুষতন্ত্রের যে ক্ষমতা, সেই আধিপত্যের জমিনকে পোক্ত করেছে ভাষার রাজনীতি। হাজার বছর ধরে পুরুষের শ্রেষ্ঠত্বকে স্থায়ী রুপ দেওয়ার জন্য এমন সব লিঙ্গবিদ্বেষী শব্দ, বাক্য, ভাষা আর সাহিত্যের বর্ণনাকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে যা নারীকে নিপীড়ন করে পুরুষতান্ত্রিক আগ্রাসনকে চলমান রাখার মুখ্য শক্তি হয়ে ওঠেছে। ভাষা-সাহিত্যের সুক্ষ্ম রাজনীতিতে নির্ধারণ করা হয়েছে কে প্রভু আর কে দাসী, কে কর্তা আর কে কর্ম, কে শক্ত আর কে কোমল, কে যন্ত্রী আর কে যন্ত্র। এই ভাষার ব্যকরণ দিয়েই নির্ধারণ করা হয়েছে প্রথম লিঙ্গ হচ্ছে পুংলিঙ্গ, যে প্রত্যক্ষ, ইতিবাচক, শক্তিমান, চালক। আর স্ত্রীলিঙ্গ হলো দ্বিতীয় লিঙ্গ যে সবসময়ই পরোক্ষ, পুরুষের ছায়া, পুরুষের বিজয়ের পেছনের কায়া-প্রেরণাদাত্রী।

পুরুষতন্ত্রকে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর করার জন্য একযোগে কাজ করে পুঁজিবাদ ও গণমাধ্যম যেখানে নারী উপস্থিত হয় ফর্সা আর ছিপছিপে যৌনাবেদনময় শরীর, আর মুনাফাদায়ী পণ্য হয়ে পুরুষতান্ত্রিক স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটাতে। সৌন্দর্যের রাজনীতি এখানে মেয়েদের এন্টিএইজিং, ওয়েক্সিং, ফেসিয়াল, জিরো ফিগার, ট্রেডমিল, সিলিকন ব্রেস্ট এ ব্যস্ত রেখে ভুলিয়ে রাখে নিজের অধিকারবোধ থেকে, যেন তারা নিজেদের রোজগার, মেধা, সময়, সব কিছু ওই সৌন্দর্য চর্চার পেছনে খরচ করে স্বনির্ভরতার চিন্তা থেকে দূরে থাকে। পুরুষতান্ত্রিক বিজ্ঞাপন যেখানে নারী মানেই বাথরুম ক্লিনার, কাপড় ধোয়া, পরিষ্কার না হলে স্বামীর ঝাড়ি খাওয়া, ডিস ওয়াস, রান্নাকরা, পাশে দাঁড়িয়ে থেকে পুরুষকে খাওয়ানো। হেলথ ড্রিংক এর বিজ্ঞাপনে ছেলেদের সম্পর্কে বলা হয় ‘শক্তির পাওয়ার’ যেখানে মেয়েরা কেবল ‘পুষ্টির পাওয়ার’। সার্ফ এক্সেল এর বিজ্ঞাপনে অনেক লোকের ভীড়, কাঁটাতার পেরিয়ে হিরোর অটোগ্রাফ আনতে পারা ভাইটি বোনের চোখে রিয়েল ‘হিরো’ হয়ে যায় আর বোনটি হতাশায় ভেঙ্গে পড়ে বলে, “আমি কোনদিন অটোগ্রাফ পাবোনা”!

পিতৃতান্ত্রিক সভ্যতার প্রথম শোষকশ্রেণি ‘পুরুষ’ এবং পরিবারে, সমাজে, প্রতিষ্ঠানে, রাজনৈতিক দলে পিতৃতন্ত্রেরই জয়গান, সেখানে নারীর মর্যাদা প্রশ্নটি অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত। ধর্মের বইতে এই বৈষম্যের শুরু আর আইনে তার প্রতিধ্বনি। পুরুষতন্ত্রকে নিশ্চিন্তে বাড়তে দেয়ার জন্য রচিত হয়েছে এমন সব আইন ও বিধি বিধান, যা নারীর জন্য বজ্র আঁটুনি ফষ্কা গেরোর মতো। পুরুষের তৈরি আইনে ‘মা’ কে তার গর্ভজাত সন্তানের অভিবাবকত্বের অধিকারটুকু দেয়না, সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমান অধিকার স্বীকার করেনা, ধর্ষিতাকেই প্রমাণ করতে হয় তার প্রতি ঘটা অপরাধ, বিয়ে নামক চুক্তির পাতায় “নারী কুমারী কিনা” লেখা থাকে অথচ পুরুষের কৌমার্যের কোন প্রশ্ন থাকেনা।

নারীবাদী রাজনীতির আত্মা হচ্ছে নারী ও পুরুষের উপর পিতৃতান্ত্রিক আধিপত্যের অবসান এবং কেবলমাত্র লিঙ্গসাম্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই তা সম্ভব। আধিপত্যের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকা কোন সম্পর্কের মধ্যে ভালবাসা থাকতে পারে না। সুতরাং এবিউসিভ সম্পর্ক থেকে বাঁচতে চাইলে পুরুষতান্ত্রিক বিশ্বাস ও চর্চাকে চ্যালেঞ্জ করতেই হবে নারী পুরুষ উভয়কেই। কারণ, সম্পর্কের সমতা দাসত্ব থেকে স্বাধীনতা আনবে, প্রেমহীনতা থেকে প্রেমময়তা আনবে।

আমাদের উত্তর প্রজন্মের জন্য, পিতৃতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করার অভ্যাস ও চর্চা শুরু হয়ে গিয়েছে এবং একদিন নিশ্চয়ই আসবে যেদিন এসব লিঙ্গাধিপত্য একেবারে শেষ হবে। সেদিন এই পৃথিবীতে লক্ষ কোটি নতুন নারী পুরুষ নেতৃত্ব দেবে, যারা পা শক্ত করে দাঁড়িয়ে অস্বীকার করবে লিংগ বৈষম্যের অপ-রাজনীতিকে।

[সাদিয়া নাসরিন, কলামিস্ট ও প্রধান নির্বাহী, সংযোগ বাংলাদেশ]

সারাবাংলা/ এসএস

Tags:

আরও পড়ুন