রবিবার ২৭ মে, ২০১৮ , ১৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫, ১০ রমযান, ১৪৩৯

পুরুষের দুই ভাগ, নারীর এক ভাগ !

জানুয়ারি ২৯, ২০১৮ | ৩:২৩ অপরাহ্ণ


জান্নাতুল মাওয়া।।

জনপ্রিয় মিনা কার্টুনের দুটি দৃশ্যের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই অনেকের! ওই যে মিনা আর মিঠু মিলে গাছ থেকে আম পেড়ে আনে। আর তাদের মা খুব স্বাভাবিকভাবেই আমটি ভাগ করে দুই ভাগ দেন রাজুকে, আর এক ভাগ মিনাকে! মিনা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলে মিনার দাদী বলে, “হ ওতো বেশিই পাইয়া থাকে, জানোনা অমনই তো হইয়া থাকে!” আবার রাতে খাবার সময় রাজুর পাতে দেয়া হয় ডিম, কারন “রাজু তো বড় হইতে আছে”।

মিনা কার্টুনের এই দৃশ্যগুলো আকাশ থেকে আসেনি। চিরায়ত বাংলায় এমনই চলে আসছে বছরের পর বছর। তবে এখন মানুষ যথেষ্ট পরিশীলিত হয়েছে। শিক্ষার প্রসার এবং ঘরের অর্থনীতিতে মেয়েদের অংশগ্রহণের ফলে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে এবং সুশিক্ষিত পরিবারগুলোতে খাবার দাবারের এই বৈষম্য কমে আসছে। তবে মানুষের চিরায়ত অভ্যাসের অনেক কিছুই আমাদের প্রবীণরা বহন করে আসছেন এবং নবীনরাও অনেকে এগুলোকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

 

 

আমার নিজের চোখে দেখা ১৮ বছর আগের একটি গল্প বলি। হালিমা আখতারের বয়স চল্লিশের ওপরে। ঘরে তার চার মেয়ে এক ছেলে। তিনি তার রান্না করা খাবার সমান দুইভাগে ভাগ করে এক ভাগ দিতেন তাঁর ছেলেদেরকে আর এক ভাগ দিতেন তার চার মেয়েকে। মেয়েরা প্রতিবাদ করলে বলতেন, “তোরা কি আমারে দেখবি? বুড়া বয়সে ওই তো আমারে দেখবে”। তবে অতি সম্প্রতি জেনেছি তাঁর মৃত্যুশয্যায় তাঁর কন্যারাই পাশে ছিলেন, আদরের পুত্রটি নিজের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করে অনেক আগেই আলাদা হয়ে গিয়েছে। তিনি গত হওয়ায় এই লেখায় তাঁর সাম্প্রতিক মন্তব্য তুলে ধরতে পারলাম না।
এবার চলুন চলে যাই আরো, ৫০ বছর আগের এক বাড়িতে। সে বাড়ির পুরুষেরা ব্যবসার কাজ শেষ করে ঘরে ফিরতে ফিরতে গভীর রাত করে ফেলতেন। যেহেতু পুরুষের আগে নারীরা খেলে খাবারে বরকত কমে যায় সেহেতু সে বাড়ির নারীরা সারাদিন নানান কাজ কর্ম করে, রান্না বান্না করে ক্ষুধার্ত পেটে বসে থাকতেন।অনেকে ক্ষুধার জ্বালায় শুকনো চাল চিবিয়ে পানি খেতেন তবুও ভাত খাবার অনুমতি মিলতো না।

অনেকেই বলবেন এসব অনেক আগের কথা। এখন আর সেইদিন নেই। যারা এমনটা ভাবছেন তাদেরকে নিয়ে যাই দুই সপ্তাহ আগের সালেহা খাতুনের রান্নাঘরে। তিনি শীতের পিঠা রান্না করছেন। প্রথম পিঠাটি কোন মেয়ের হাতে দেয়া তার কড়া নিষেধ। ঘরের যে কোন একটি ছেলে প্রথম পিঠাটি খাবে। এখন খুঁজে পেতে দেখা গেল প্রায় সব বয়স্ক পুরুষেরা বাইরে কাজে গিয়েছে। ঘরে আছে দুই বছরের ছোট নাতি। নাতি আবার পিঠা খায়না। কিন্তু, ছোট হোক, পুরুষতো! না খেলেও জোর করে একটু পিঠা ভেঙ্গে নাতির মুখে ঢুকিয়ে দেয়া হল। নইলে বাকিরা কোনমতেই পিঠা খাওয়া শুরু করতে পারবেনা!

আপনারা যারা ভাবছেন দেশের মানুষ এখন অনেক আধুনিক হয়ে গিয়েছে তারা শুধু কষ্ট করে ঢাকার বাইরে যান এবং রান্না ঘরের আশেপাশে চোখ কান খোলা রেখে ঘুর ঘুর করেন। দেখবেন অনেক কিছুই এখনো পাল্টায়নি।

এ যুগের বউ জেবা নাসরিন খুব দুঃখ করে জানালেন, “কবে যে মাছের মাথা আর মুরগীর বড় টুকরো খেয়েছি ভুলেই গেছি! শ্বাশুড়ি মনে করেন ছেলেরাই এসব খাবে, মেয়েদের এত খেতে হয়না। শ্বাশুড়ির সামনে কি আর জোর করে পাতে পছন্দের খাবার তুলে নেয়া যায়! লজ্জায় নিতে পারিনা।”

এ গল্প এখনো যৌথ পরিবারের শত শত বউ এর। এখনো শহরের বাইরে যে কোন পারিবারিক সম্মেলনে বা দাওয়াতে দেখা যায় প্রথম পাতে ছেলেদের খেতে দেয়া হয়। পুরুষেরা প্রথম ব্যাচে খাবে আর মেয়েরা পরের ব্যাচে খাবে; এই ব্যাপারটা বলতে গেলে এখনো প্রথার মত মানা হয়। এত বেশি স্বাভাবিকভাবে এই ঘটনাটি ঘটে যে এটি নিয়েও যে প্রশ্ন তোলা যায় সেটিও কারো মাথাতে আসেনা। কেউ প্রশ্ন তুললে তাকে বলা হয়, “এ বেশি বাড়াবাড়ি করে, সব কিছুতেই দোষ ধরা চাই”।

 

অনেকেই হয়তো ভাবছেন, এখন তো চারপাশে ওভারওয়েট মেয়েদের ছড়াছড়ি; মেয়েরা এখন জিম আর ইয়োগা সেন্টার দখল করে ফেলেছে বাড়তি মেদ ঝরানোর জন্যে। তাদের জন্যে একটা তথ্য দেয়া খুব জরুরি। ইউএসএইড এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের নারীদের অপুষ্টির একটি অন্যতম কারণ হল ঘরের অর্থনৈতিক এবং উৎপাদনশীল কাজগুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান জেন্ডার বৈষম্য। অর্থাৎ যতদিন নারীরা পরিবারের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা হাতে না পাবে ততদিন নারীর অপুষ্টি জনিত সমস্যাও পিছু ছাড়বেনা। এই সংস্থার জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়েসী নারীদের মধ্যে ৪২ শতাংশি রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। একই বয়েসী নারীদের ২৪ শতাংশ ক্ষীণস্বাস্থ্যের অধিকারী। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) জরিপমতে, বাংলাদেশের ৫০ শতাংশের বেশি নারী পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন। এছাড়াও বাংলাদেশের গর্ভবতী নারীদের মধ্যে ৫৭ শতাংশের বয়স ১৯ বছরের নিচে এবং এদের মধ্যে ৪৬ শতাংশ নারী পরিপূর্ণ পুষ্টির অভাবে রক্তশুন্যতায় ভোগে। অর্থাৎ এই যে পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ এর সাথেও জড়িয়ে আছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকা না থাকার মত বিষয়টি।

যে মেয়েটি খুব অল্প বয়সে সংসার শুরু করেছে সে খুব স্বাভাবিকভাবেই নিজের দরকারি পুষ্টি পাচ্ছেনা। কিংবা যে বউটির হাতে সংসারের চালিকা শক্তি নেই তাকে খাবার বেলায়ও অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে, তবে সেটিকে উদাহরণে আনা যাচ্ছেনা আপাতত। বর্তমানে শিক্ষিত ও সচেতন পরিবারগুলোতে দৃশ্যপট বদলালেও সামগ্রিকভাবে দৃশ্যগুলোতে এখনো বিপুল কোন পরিবর্তন আসেনি।
বাংলাদেশের নাটক, সিনেমা, বিজ্ঞাপনের অতি পরিচিত দৃশ্য হল বাড়িতে জামাই এর আগমন এবং বিশাল মাছের মাথা জামাই এর পাতে ঢেলে দেয়ার দৃশ্য। বাড়িতে মেয়ের জামাই আসবে বলে বড় বড় মাছ, গোটা মুরগী রান্না করা হয় জামাইর জন্যে। আবার ঘরে ছেলে আসবে অনেকদিন পর শহর থেকে, ছেলের কথা মনে করে মা দেশি মুরগী কিংবা ছেলের পছন্দের মাছ রান্না করেন। এইসব রন্ধন উৎসবে বউ এর জন্যে কিংবা মেয়ের জন্যে আলাদা করে ভাবা হয় খুব কম।

অনেকেই বলতে পারেন, তাতে কী এসে যায়। কেউ তো আর ওদের খেতে মানা করছেনা! আসলেই কি তাতে কিছু এসে যায়না! একজন পুরুষ সারাজীবনই যদি দেখে যায় তার সাথের বিপরীত লিঙ্গের মানুষটি শুধুমাত্র লৈঙ্গিক পরিচয়ের কারনেই সব জায়গায় কম মুল্যায়িত হচ্ছেন তার মধ্যে কি আপনা আপনি নিজের পুরুষ পরিচয়ের ব্যাপারে দম্ভ উপস্থিত হবেনা? অন্যদিকে নারীটি কি আপনা আপনি নিজেকে অধঃস্তন ভাবতে শুরু করবেনা? এর সুদুরপ্রসারী প্রভাব সমাজের অন্য ক্ষেত্র গুলোতে পড়তে বাধ্য।

সালেহা খাতুনের ছোট্ট নাতিটি বড় হবার আগ থেকেই ছেলে হবার কারনে তার থেকে বারো বছরের বড় বোনটির চেয়ে যে সে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেই খবর পেয়ে গিয়েছে। এটি কি বাকি জীবনে তার আচরনে কোন প্রভাব ফেলবেনা! আমাদের দেশের পুরুষেরা অতিমাত্রায় মিসোজিনিস্ট কিংবা মেল শভিনিস্ট হন কী কী কারণে এই বিষয়টি কি আমরা কখনো খতিয়ে দেখেছি?

 

ছবি – ফারহানা ফারা

মডেল- জাকিয়া সুলতানা , সাবিহা আফরোজ ও শাশ্বত ইসলাম

সারাবাংলা/এসএম

আরও পড়ুন