বৃহস্পতিবার ১৯ জুলাই, ২০১৮, ৪ শ্রাবণ, ১৪২৫, ৫ জিলক্বদ, ১৪৩৯

পেছনে না, সামনে তাকাই, এগিয়ে যাই

জানুয়ারি ৩, ২০১৮ | ৮:৪৪ পূর্বাহ্ণ

জাকিয়া আহমেদ

গ্রুপের সঙ্গে সাইকেল চালিয়ে সকাল ১১ টার দিকে বাসায় আসেন তানিয়া। গ্যারেজে সাইকেল রেখে বাসা ঢুকেন, আবার যখন বেরুবেন তখন আর সাইকেলটাকে কোথাও খুঁজে পেলেন না তিনি। জানা গেল, তার এলাকার মানুষরাই সাইকেলটা চুরি করেছে, এমনকী নিজেদের দোষ আড়াল করতে সিসি ক্যামেরার ফুটেজটাও দেখতে দেননি তারা। কিন্তু তাতে দমে যাননি তানিয়া। গ্রুপের সবাইকে জানাতেই সেদিন বিকালেই নতুন আরেকটি সাইকেল নিয়ে তারা হাজির হন তানিয়ার বাসায়। তানিয়া বলেন, এলাকার মানুষ ভাবতেই পারছিলেন না, একটা মেয়ে সাইকেল চালাবে!

 

একই গল্প নুসরাত জাহান দিনার। তিনি বলেন, বাসা থেকে যখন সাইকেল নিয়ে বের হই, বুঝতে পারি চারপাশটা ‘পজ’ দিয়ে আছে। তাই আর কোনোদিকে তাকাই না। প্যাডেলে পা দিয়ে কেবল সামনে তাকাই এবং এগিয়ে যাই। হয়তো একদিন আসবে পরিস্থিতি এমন বিপরীতে থাকবে না। সাইকেলে চালিয়ে মেয়েরা যাচ্ছে এ দৃশ্যে মানুষের চোখ অভ্যস্ত হয়ে যাবে-আমরা সেদিনের অপেক্ষায়।

পাশ থেকে টিজ শুনছি, পেছন থেকে ইট মারা হয়েছে, কথা শুনতে হয় আত্মীয়-বন্ধু-প্রতিবেশীদের থেকে। কিন্তু আমরা পথ তৈরি করছি, আমাদের পরে যারা আসবে তাদের পথটা যেন মসৃণ হয়। প্রত্যয় দিনার গলায়।

গণ পরিবহনগুলোতে নারীদের জন্য সীমিত আসন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা, হেলপারদের অশোভন ব্যবহার, কখনও কখনও পুরুষযাত্রীদের নোংরা ইঙ্গিত-এসব কিছুর কিছুই থাকবে না, যদি মেয়েরা সাইকেলে করে যাতায়াত করে। বলছিলেন, ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় সাইকেল চালানো দিনা, তানিয়া, সামিরা এবং রাবেয়া।

নুসরাত জাহান দিনা

দুই হাতে মোজা, পায়ে কেডস, মাথায় হেলমেট, পিঠে ব্যাকপ্যাক ঝুলিয়ে দুই চাকার সাইকেল ধরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন মেয়েরা। সত্যিই যেন তাদের দিকে তাকিয়ে থেমে আছে চারপাশের সব কিছু। পথচারীরা কিছুক্ষণ তাকিয়ে বুঝে নিতে চাইছেন, এই মেয়েরা কারা? কেন এ মেয়েরা তাদের দেখা মেয়েদের চেয়ে আলাদা!

পথচারীদের দৃষ্টির বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে রাবেয়া বলে উঠেন, ‘অভিভাবকরাও যদি একটু সচেতন হতেন মেয়েদের সাইকেল চালানোর বিষয়ে! ঢাকার যানজট এড়িয়ে চলার জন্য সাইকেলের কোনো তুলনা নেই!’

তবে বললেই তো আর হলো না। এত সহজে কি আর বেগম রোকেয়ার অবরোধবাসিনীদের ঢাকার রাস্তায় চলাচল করতে দেওয়া হবে? কী হয়েছে তো দেড় শত বছর পেরিয়ে গেছে!

‘যুদ্ধ আমাদেরও করতে হয়েছে’ বললেন তানিয়া। ‘আমাদের দেশে মধ্যবিত্ত ঘরের অন্যতম সমস্যা হচ্ছে, নিজেরা রাজি থাকলেও সমাজ কী বলবে সে ভয়ে সাহস করে এগিয়ে আসেন না। তাছাড়া রাস্তায় নানান ঝামেলা থাকে। মেয়েকে এভাবে বের করার সাহস না পাওয়াই স্বাভাবিক।’

‘একবার সাহস করলে বিষয়টা খুব সহজ হয়।’ জানান তানিয়া

মায়ের জোরাজুরিতে সাইকেল চালানো শেখা শুরু করেন তানিয়া।

সামিরা ইয়াসমিন

এখন বাসায় ফিরে যখন মাকে গল্প সাইকেল চালানোর গল্প বলেন তিনি খুব আফসোস করেন, তার যদি বয়স থাকতো! ভাইরা প্রথমদিকে তেমন সহযোগিতা না করলেও এখন তারাও খুব উৎসাহ দেয়। বোন সাইকেল চালায়-এটা তাদের জন্য বিশাল গর্বের বিষয়।

সবাই অবশ্য তানিয়ার মতো ভাগ্যবান নন। যেমন সামিরা ইয়াসমিন। তার ভাইয়েরা প্রথমদিকে বোনের সাইকেল চালানো মেনে নেননি। তবে তাতে দমে যাননি তিনি।

গতবছরের জানুয়ারি মাসে নিজের বাসার গ্যারেজে সাইকেল চালানো শেখেন সামিরা ইয়াসমিন। সামিরা বলেন, আমার খুব ইচ্ছা ছিল সাইকেল চালাবো-নিজের চেষ্টায়। গ্যারেজের বাসার কেয়ারটেকারের সাইকেল নিয়ে শুরু করেছিলাম, সপ্তাহ খানেক লেগেছিল-তারপর গাড়ির পেছনে সাইকেল বেঁধে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এসে হাত পাকাই।

পুরানঢাকার যে এলাকায় আমরা থাকি, সেখানে সাইকেল নিয়ে একটা মেয়ের বের হওয়া খুব সহজ ছিল না। গায়ে পাথরও মেরেছে লোকে। তবে সবাই অসহযোগিতা করেছে এমন নয়। প্রথমে যখন সাইকেল নিয়ে টলমল করে চালাচ্ছিলাম, একটা দোতলা বাসের ড্রাইভার থেমে গিয়ে আমার জীবন রক্ষা করেছিল।

‘ভাইরা প্রথমদিকে বলেছিল, তুমি গাড়ি চালাও, কিন্তু সাইকেল না। অথচ আমি বুঝি, সাইকেলের প্যাডেলের যে আনন্দ সেটা গাড়ির এস্কেলেটরে সে আনন্দ হয় না।’ ঝলমলে খুশিতে বলে উঠেন সামিরা।

 

তানিয়া রহমান

পথ চলতে গিয়ে দেখেছি, বাস, ট্রাক এরা আমাদের সহযোগিতা করলেও সিএনজি, অটো রিক্সার মতো ছোট যানবাহনগুলো অসহযোগিতা পাই। তবে যাই ঘটুক না কেন নিজের ১৩ বছরের মেয়েটাকে সাইকেল চালানো শেখাবেন এমনই ইচ্ছা সামিরার

একই ঘটনা ঘটে দিনার ছোটবেলাতেও। স্কুল থেকে ফেরার সময়ে বাসার সামনে থাকা সাইকেলের দোকানের ছোট ছেলেটাকে এক টাকা করে দিয়ে আসতেন দিনা, যেন বিকাল বেলাতে ছেলেটা ভাঙ্গা একটা সাইকেল নিয়ে এসে দিনাকে সাইকেল চালানো শিখিয়ে যায়। কিন্তু একদিন, দুইদিন করে দিন যায়, দোকানের ছেলেটা আর আসে না। শেষে একদিন তার সঙ্গে দেখা হবার পর দিনা জানতে চান, সে কেন আসে না। তখন ছেলেটি তাকে জবাব দেয়, ‘আপনি আমারে এক টাকা দেন যাওয়ার জন্য, আর খালাম্মা আমারে দুই টাকা দেয় আমি যেন না যাই, আপনারে সাইকেল চালানো না শিখাই’।

এসব কারণে ছোটবেলায় সাইকেল শেখা হয়নি দিনার। কিন্তু বিয়ের পর স্বামী ন্যাশনাল হ্যান্ডবলের কোচ কামরুল ইসলাম কিরণ এগিয়ে আসেন। দিনা বলেন, কিরণ আমাকে সাইকেল কিনে দিয়ে স্টেডিয়ামে নিয়ে গেলেন। ঠিক তারপরের দিনই আমি সাইকেল নিয়ে রাস্তায় রেরিয়েছি, আমি সাইকেল চালাতাম, আমার বর থাকতেন মোটর সাইকেল নিয়ে পেছনে।

দুই ছেলেসহ যে কোনও ছুটির দিনের রাতে আমরা বের হয়ে পরি রাস্তায়। আমি সাইকেল নিয়ে সামনে-ছেলেদের নিয়ে পেছনে তার বাবা। ছেলেরা পেছন থেকে চিৎকার করতে থাকে, মা, জোরে চালাও, স্পিড আপ করো, প্যাডেলে প্রেশার দাও….

সাইকেল নিয়ে রাস্তায় বের হবার পরে প্রতিবন্ধকতাগুলো কী ছিল জানতে চাইলে দিনা বলেন, বাংলাদেশে এখনও গুটিকয়েক মেয়ে সাইকেল চালায়, মানুষ এখনও নারী সাইকেল আরোহীদের দেখে অভ্যস্ত নয়। সেখানে আমরা যদি খুব হৈচৈ না করে, স্পিড না দেখিয়ে একটু নমনীয় হই তাহলেই কোনও সমস্যার মুখোমুখি পড়তে হয় না বলে আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি।

আমি যদি একজন ট্রাক চালককে পাশ থেকে বলি, ওস্তাদ একটু যেতে দেন-আমি দেখেছি তার মানসিকতা তখন বদলে যায়, সে আমাকে প্রয়োজনের চেয়েও বেশি জায়গা করে দেন। এমনও হয়েছে, ট্রাক-বাস থেমে গিয়ে আমাকে আগে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।

রাবেয়া বুশরা

যেহেতু পরিবেশ এখনও তৈরি না, তাই পরিবেশটা তৈরি করতে হবে নিজেকেই। একটু যদি বুঝে চলা যায়, তাহলেই সাইকেল চালাতে কোনও সমস্যা হয় না। আমি যদি রাস্তার মানুষগুলোর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে চলি, তাহলে আরেকজন সাইক্লিস্টকে সে অন্য দৃষ্টিতে দেখবে না-এটাও মাথায় রাখতে হবে, পথটা এভাবেই তৈরি হবে।

গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাবেয়া বুশরার বাসা বাসাবোতে। প্রতিদিন বাস, রিকশা করে যাতায়াতে যেমন নানা হয়রানির মধ্যে পরতে হতো, তেমনি ছিল খরচের বিষয়টাও। এখন বাসাবো থেকে নীলক্ষেতে কলেজে সাইকেলে করে যাতায়াত করেন বুশরা। তিনি বলেন, আমার বাবা সঙ্গে করে নিয়ে সাইকেল কিনে দিয়েছেন। তারা খুব খুশি, মেয়ে সাইকেল চালিয়ে যাতায়াত করে, শিক্ষকরাও খুব উৎসাহ দেন তারা আমাকে।

সাইকেল চালকদের বেশকিছু গ্রুপ এখন ঢাকায় রয়েছে। এসব গ্রুপের ছেলেরা মেয়েদের প্রতি কেমন আচরণ করে জানতে চাইলে নুসরাত জাহান দিনা বলেন, আর সাইকেল গ্রুপগুলো যারা আছেন, তারা মেয়েদের প্রতি এতো যত্নবান যে গ্রুপে না এলে কেউ সেটা বুঝতে পারবে না। ছেলেদের স্পিড সাধারণভাবেই মেয়েদের চেয়ে বেশি। কিন্তু গ্রুপের ছেলেগুলো সবসময় খেয়াল করে, দলের মেয়েগুলো কীভাবে চালাচ্ছে, সেই স্পিডে ওরা চালায়, যেন ওরা আমাদের সামনে না চলে যায়, আমরা পেছনে পরে না থাকি। আমরা যদি কোনও কারণে থেমে যাই, ওরা সঙ্গে সঙ্গে থেমে যায়-সাউথ ঢাকা সাইক্লিস্ট গ্রুপ সর্ম্পকে বলছিলেন দিনা।

সারাবাংলা/জেএ/এমএ

পেছনে না, সামনে তাকাই, এগিয়ে যাই
পেছনে না, সামনে তাকাই, এগিয়ে যাই